ঢাকা, রোববার, ০৫ জুলাই ২০২০, ২০ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

ড. মোহাম্মদ আজহার আলীর চোখে গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

ডঃ মোহাম্মদ আজহার আলী
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১০:০১ এএম
ড. মোহাম্মদ আজহার আলীর চোখে গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

ডঃ মোহাম্মদ আজহার আলী
সহকারী অধ্যাপক
প্রাইমারী শিক্ষা বিভাগ শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারের ১৪/এইচ ফ্লাটে সপরিবারে অবস্থান করছিলাম। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাবে অন্যান্য বিভাগের অধ্যাপকদের সাথে বসেছিলাম। রাত নয়টার সময় প্রতিদিনের মত স্বাভাবিকভাবে আমরা ক্লাব ছেড়ে যার যার ফ্রাটে চলে গিয়েছিলাম। খাও দাওয়া করে আমরা সবাই শুয়ে পড়েছিলাম। রাত আনুমানিক বারটার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও ষ্টাফ কোয়ার্টারের চারিদিক থেকে অকস্মাৎ বৃষ্টির মত অবিরাম গুলিবর্ষণের শব্দ শুনে জেগে উঠি চার তলার অপর পাশে ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের অফিস সেক্রেটারী মিঃ মনসুর আহমেদ সাহেব সপরিবারে অবস্থান করছিলেন। আমি, আমার স্ত্রী, আমার আড়াই বছরের ছেলেটি এবং আমার ভাতিজা, কাজের ছেলে সবাই আমরা অবিরাম গুলিবর্ষণের বিভীষিকাময় শব্দে ভীত সম্প্রত্ৰস্ত হয়ে বসেছিলাম। সারারাত আমরা গুলিবর্ষণের আওয়া শুনেছি। সারারাত আমরা দরজা-জানালা বন্ধ করে বসেছিলাম-১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ সকাল ছয়টায় গুলিবর্ষণের গতি কমে গিয়েছিল। কাঁচের ফাঁক দিয়ে দেখলাম-সশস্ত্র পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের এলাকার প্রবেশ পথ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। পাঞ্জাবী সেনারা ১১ এবং ১২ নম্বর ফ্রাটে প্রবেশ করে এলাপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এসময় আমার ফ্রাটের নীচে অবস্থানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী মেডিকেল অফিসার ডাঃ মুর্তজা ষ্টেথোস্কোপ গলায় রেখে বাইরে পায়চারী করছিলেন। পাঞ্জাবী সেনারা ডাঃ মুর্তজা এবং অন্যান্য আরও তিনজনকে ১২ নং ফ্রাট থেকে লাশ তুলে বাহিরে নিয়ে রাখার নির্দেশ দান করে। ডাঃ মুর্তজাকে ও অন্যান্য লোকজনকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ মোকতাদির সাহেবের লাশ বের করতে দেখলাম। ইহার পর পাক সেনারা ১১ নং ফ্রাটে প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেবরেটরী স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেককে হত্যা করে। সাদেক সাহেবের লাশ পাক সেনারা ফেলে রেখে যায়। বিকাল চারটার সময় সাদেক সাহেবের পরিবার আমাদের ফ্রাটে চলে আসে। ২৬শে মার্চ সারাদিন সারারাত আমরা যার যার ফ্রাটে আটকা পড়েছিলাম। ২৭ শে মার্চ সকালে কাফু উঠিয়ে নিলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে সবাই নিরাপদ স্থানে যেতে থাকে। ১১ নং ফ্রাটের নীচ তলায় সাদেক সাহেবের লাশ পড়েছিল। বিভিন্ন ফ্লাট থেকে ফ্রিজের পানি এনে লাশের উপর দেওয়া হয়। সাদেক সাহেবের স্ত্রী, শ্যালক, ভাই, চার ছেলেমেয়ে লাশের চারদিকে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছিল। আমি আমার এবং সাদেক সাহেবের পরিবার অন্যত্র সরিয়ে রেখে ১১ নং ফ্রাটের দক্ষিণ পার্শ্বে সাদেক সাহেবের লাশ সমাহিত করি।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড; গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ: বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার। ঢাকা বিভাগ।