ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ইব্রাহিম ভূইয়ার চোখে গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

ইব্রাহিম ভূইয়া
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১১:০৪ এএম
ইব্রাহিম ভূইয়ার চোখে গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ

ইব্রাহিম ভূইয়া 

লাইব্রেরীয়ান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

১৯৭১ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আমি গ্রামের বাড়ী যাওয়ার জন্য ঢাকা সদরঘাটের দিকে রওয়ানা হয়েছিলাম। সদর ঘাট টার্মিনালের প্রবেশ পথে পাঞ্জাবী সেনাদের প্রহরায় মোতায়েন দেখলাম। কিছুক্ষণ পরে এক অতি বৃদ্ধ ভদ্রলোক মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার জন্য টার্মিনালে আসলেন। সঙ্গে তার নবপরিণিতা পুত্রবধূ এবং যুবতী মেয়ে ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা আমাদের সবাইকে তল্লাশি করতে বললো “ইয়ে দো আওরাত নাহি যায়েগী”। বৃদ্ধ নিরুপায় হয়ে কান্নাকাটি করে সামনে যাকে পায় তাকেই জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন, “আপনারা আমার মেয়ে ও পুত্রবধুকে বাঁচান।” কিন্তু আমাদের কিছুই করার ছিল না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেই অসহায় যুবতী মেয়ে দু’জনকে রক্ষা করার জন্য কোন কথা বলতে পারি নাই, কিছুই করতে পারি নাই। আমাদের সকলের চোখের সামনে পাঞ্জাবী সেনারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে যুবতী মেয়ে দুটিকে টেনে হিচড়িয়ে ওদের আর্মি ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। মেয়ে দু’টি এ সময় করুণ আর্তনাদে ভেঙ্গে পড়েছিল। দু’ঘণ্টা পর আবার যুবতী মেয়ে দুটিকে ফিরিয়ে নিয়ে এল। দেখলাম, মেয়ে দুটির চলার কোন শক্তি নাই, এলোমেলো চুল, অশ্রুভরা মুখমণ্ডল। আমরা লঞ্চে রওয়ানা হয়ে গেলাম। ‘পাগলার এম, এম ওয়েল পার্ক এলোমেলো চুলে করুণ ও অসহায় দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। জানালা দিয়ে তাদের দেহের যুতটুকু দেখা গেল তাতে মনে হলো তাদেরকে বিবস্ত্র করে রাখা হয়েছে। বুড়ীগঙ্গা নদীতে ১৫-২০ জন করে এক সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা বাঙ্গালী যুবকদের বহু লাশ ভাসতে দেখলাম। ১৯৭১ সনের অক্টোবর মাসের এক দিন আমি বাড়ীতে ছিলাম। সকাল নয়টার সময় আমি বাগড়া বাজারে গিয়েছিলাম বাজার করতে। বহু লোকের সমাগম ছিল। বাজারের দক্ষিণ দিকে পদ্মা নদী। পূর্বের দিন সন্ধ্যায় পাক সেনাদের নোঙ্গর করা ষ্টিমারটি পদ্মার ঘাট ছেড়ে চলে যাচিছল-ষ্টিমারের চারিদিকে সশস্ত্র পাক সেনারা প্রহরায় মোতায়েন ছিল। অকস্মাৎ দেখলাম পাক সেনারা ষ্টিমার থেকে সজোরে টেনে একটি লাশ ফেলে দিচ্ছে-ষ্টিমার দৃষ্টির বাইরে চলে যাওয়ার পর আমরা নৌকা নিয়ে গিয়ে দেখলাম এক ক্ষত বিক্ষত যুবতীর বীভৎস উলঙ্গ লাশ। এছাড়া কাশবনের পাড়ে পড়ে আছে ফোলা বীভৎস লালের গালে ও দেহের অন্যান্য স্থানে ক্ষত চিহ্ন দেখলাম। তাঁর ডান দিকের স্থনের বোটা তুলে নেওয়া হয়েছে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড; গণহত্যা ও নির্যাতনের বিবরণ: বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গৃহীত সাক্ষাৎকার। ঢাকা বিভাগ।