ঢাকা, সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কার ফোন ফেরাল আমুকে?

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৭ শনিবার, ০৯:৫৫ পিএম
কার ফোন ফেরাল আমুকে?

অসুস্থ স্ত্রীকে সিঙ্গাপুরে রেখে দুই দিনের জন্য ঢাকায় এলেন। সময়টা ২০০৭। ইয়াজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নৈরাজ্যের পর দেশে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে দুর্নীতি বিরোধী অভিযান। প্রধান দুই দল থেকেই গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশ কিছু শীর্ষ নেতা। সেনা প্রধান ‘রাজনৈতিক সংস্কারের’ তত্ত্ব দিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গন ধরানোর জন্য কাজ শুরু করেছেন। আপাদমস্তক রাজনীতির মানুষটির এসবে মন নেই। তাঁর চিন্তা জুড়ে প্রিয়তমা পত্নীর অসুস্থতা। সিঙ্গাপুরের ডাক্তাররাও কোনো সুখবর দিতে পারছেন না। মনটা ভারী। এর মধ্যে ঢাকায় এসেই ব্যস্ত হলেন। রাজনৈতিক সহকর্মীদের ফোন, দেখা সাক্ষাতে স্ত্রীর অসুস্থতাই আলোচিত হলো বেশি। এর ফাঁকে দেখা করলেন দলের সভাপতির সঙ্গে। দলের সভাপতির আত্মীয়ও তিনি। রোগীর খোঁজ খবর জানালেন। দেখতে দেখতে দুই দিন সময় চলে গেল। সিঙ্গাপুরে যাবার প্রস্তুতি শেষ করলেন। রাত আটটায় নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে রওনা দিলেন। সোনারগাঁও হোটেলের সিগনালে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এসময় অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলো। প্রথমবার ধরলেন না। কিছুক্ষণ পর একটি ক্ষুদে বার্তা এলো। কয়েক সেকেন্ড পর আবার ফোন। এবার তিনি ফোনটা ধরলেন। গাড়ি এগুচ্ছে কথাও চলছে। দশ মিনিট কথা হলো গাড়ি ততোক্ষণে মহাখালী ফ্লাই ওভারে। ফোনটা রেখেই তিনি ড্রাইভারকে বললেন গাড়ি ঘুরিয়ে বাসায় ফিরে যেতে। এরপর হঠাৎ দৃশ্যপট পাল্টে গেল। কর্মী, নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করলেন। তারপর এত দিনের বিশ্বস্ততার হাত সরিয়ে তিনি দলের সভাপতির প্রতিপক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। দলের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ্যে বলা শুরু করলেন। দলের কর্মীরা প্রচণ্ড হোঁচট খেলো। কারণ তিনিই ছিলেন শেখ হাসিনার সবচেয়ে আস্থাভাজন নেতা তাঁর নাম আমীর হোসেন আমু।

রাজনীতিতে আবদুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমেদের চেয়ে সিনিয়র হলেও দলে আমু বেশ কোনঠাসাই ছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সময়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ের নেতারও স্বীকৃতি পাননি। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর দলকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ৮১ তে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। এ সময় আওয়ামী লীগে বহুমত, বহুপথ। প্রত্যেকেই নিজস্ব এজেন্ডায় শেখ হাসিনাকে প্রভাবিত করতে চান। দলের মধ্যে তোফায়েলপন্থী, রাজ্জাকপন্থীদের প্রকাশ্যে বিরোধ। এর মধ্যে আমু আস্তে আস্তে দলের সভাপতির আস্থাভাজন নেতায় পরিনত হন।

মাঠের বক্তৃতায় তিনি যত না ভালো তারচেয়ে ভালো ঘরোয়া বৈঠকে। কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে দলের সভাপতির পক্ষে তাঁর যুক্তির কাছে পরাজিত হয় সবাই। যুক্তিতে তাঁর সঙ্গে পারা কঠিন। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে যুবলীগ, ছাত্রলীগ পরিচালনার দায়িত্ব পান। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে, তিনি ১৫ দল গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিউক্লিয়াসে পরিণত হন।

৯১ এর নির্বাচনে আকস্মিক বিপর্যয়ের পর তিনি দলের সভাপতির পাশে দাঁড়ান। এসময় কর্মীদের মধ্যেও তিনি অর্জন করেন বিপুল জনপ্রিয়তা। ক্রমেই তিনি আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা শুধু তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করেই করতেন বলেও চাউর আছে।

৯৬ এর নির্বাচনে দল জয়ী হলেও আমু পরাজিত হন। মন্ত্রী না হলেও দলের কর্তৃত্ব তাঁর কাছেই থাকে। উপ নির্বাচনে তাকে জয়ী করে মন্ত্রী বানান শেখ হাসিনা। সবাই তাঁকে জানতো শেখ হাসিনার সবচেয়ে বিশ্বস্তদের একজন হিসেবে। শেখ হাসিনার পরামর্শক হিসেবেই।

২০০৭ পর্যন্ত সে অবস্থাই ছিল। সেই আমুই প্রথম বললেন, আওয়ামী লীগে সংস্কার প্রয়োজন। একজনের দুবারের বেশি সভাপতি থাকা উচিত নয়। তাঁর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের একাংশ শেখ হাসিনার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।

কিন্তু কেন? জানা যায়, শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়াকে দুই দল থেকে মাইনাস করে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেছিল সেনা সমর্থিত সরকার। এই সর্বদলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমীর হোসেন আমুকে বিবেচনায় আনা হয়েছিল। এনিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছিল। বৈঠকে, আমুর ভূমিকার কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। এসব বৈঠকের রেকর্ড সাব জেলে শেখ হাসিনাকে বাজিয়ে শোনানো হতো। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক গোয়েন্দারা বুঝতে পারে আমুদের পায়ের নীচে মাটি নেই। শেখ হাসিনার বাইরে দলে এবং দলের বাইরে তাদের অবস্থানও নড়েবড়ে। তখনই তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে আসে। প্রধানমন্ত্রী হবার লোভেই কি আমু তার সব বিশ্বাস আর অর্জনকে বিসর্জন দিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর বলতে পারবেন একমাত্র আমীর হোসেন আমু।

বাংলা ইনসাইডার 

বিষয়: আওয়ামী-লীগ