ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

দুর্যোগে মৃত্যুর সাথে লড়াই

মোস্তাকিম ভুঞা
প্রকাশিত: ১৯ মে ২০২০ মঙ্গলবার, ০৫:০৭ পিএম
দুর্যোগে মৃত্যুর সাথে লড়াই

বাংলাদেশের উপকূল এলাকার দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। আর আমাদের উপকূলীয় জেলার সংখ্যা হল ১৯টি। এই জেলাগুলোতে প্রতি বৎসরই আসছে ছোট বড় কোন না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে করে বারবার ভেঙে যায় তাদের ঘরবাড়ি, বিলীন হয়ে যায় ফসলি মাঠ, মাছের ঘের, সেইসাথে ভেঙে যায় বেঁচে থাকার স্বপ্ন। নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয় তাদের।  

১৭৯৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত পর্যালোচনায় করে দেখা যায় মোট ৪৭৮ টি মাঝারি ও বড় জলোচ্ছ্বাস যেমনঃ গোর্কি, হারিকেন, সিডর, নার্গিস ইত্যাদি উপকূলীয় এলাকাকে ক্ষতবিক্ষত করে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে ৩২৯বার। গড়ে প্রতি ৫ থেকে ১০বছর পরপর আঘাতে করে। অথচ আমাদের দেশের ২৫ শতাংশ জনগণ এই উপকূলীয় অঞ্চলে মৃত্যুর সাথে লড়াই করে বসবাস করছে। আর জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ২৫ শতাংশ অবদান রাখছে এই অঞ্চলের মানুষজন। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এই অঞ্চলের অবকাঠামো ও বসবাসকারী জনগণ নানা দুর্বিপাক, বৈষম্য, অবহেলার শিকার।

জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমের জেলাগুলোর আবহাওয়া ও জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়ে সৃষ্ট নোনা পানির স্রোত উপকূলীয় এলাকার ফসলি জমি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেইসাথে পর্যায়ক্রমে নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে থাকে। তাৎক্ষনিক ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি ও পরিবর্তন ঘটে। এসবের মধ্যে মিষ্টি পানির ফসল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া, অনেক বৃক্ষ ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ মারা যাওয়া, লোনাপানির বদ্ধতার কারণে অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া, গরু, ছাগল প্রভৃতির খাদ্য সংকট সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি।

আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার একটি দিক হলো এ অঞ্চলের মানুষের খাদ্য পুষ্টি ঘাটতি। সেইসাথে বড় কোন দুর্যোগের পর এ সকল অঞ্চলকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে লেগে যায় দশকেরও বেশি সময়। এমনকি মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও খাদ্য নিশ্চিত করাও সম্ভব হয় না অনেক সময়।

কাগজে কলমে সুপেয় পানি, পুষ্টি, চিকিৎসা, শিক্ষা নতুন করে বনায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা শোনা গেলেও সরজমিনে গিয়ে আর তা খুঁজে পাওয়া যায় না অনেক সময়। ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করে। সমীক্ষা-গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যবর্তী মাত্র ১৩ বছরে জাতীয় পর্যায়ে যেখানে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ শস্য (খাদ্য ও অর্থকরী ফসল) উৎপাদিত হয়েছে। সেখানে উপকূলীয় অঞ্চলে একই সময়ে শস্য উৎপাদন বাড়েনি, বরং কমেছে। কারণ সেখানে একটা ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসে হাজার হাজার মানুষ ও পশুপাখি প্রাণ হারায়। নষ্ট হয় হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, ধ্বংস হয়ে যায় গাছপালা, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা অবকাঠামোগত স্থাপনা। যা অনেক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। আর এরজন্য দীর্ঘদিন লড়াই করে যেতে হয়, সংগ্রাম করে যেতে হয়।