ঢাকা, বুধবার, ২৭ মে ২০২০, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

ইউরোপে বিখ্যাত সব মুসলিম স্থাপত্য

মোস্তাকিম ভুঞা
প্রকাশিত: ২১ মে ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৫:১৪ পিএম
ইউরোপে বিখ্যাত সব মুসলিম স্থাপত্য

একটা সময় জ্ঞানবিজ্ঞানের সকল শাখায় ছিল মুসলিমদের অবাধ বিচরণ। তেমনি অবদান ছিল স্থাপত্য শিল্পে। মুসলিম স্থাপত্যশৈলী বাইজেন্টাইন, ইরানী, ভারতীয় ও চৈনিক স্থাপত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তখন মুসলিমরা স্থাপত্য রীতিতে এমন সব জিনিস উদ্ভাবন করে, যা ইউরোপীয় স্থাপত্য শিল্পেও ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তাই চলুন ইউরোপের কিছু বিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম সম্পর্কে জেনে নেই।  

নীল মসজিদ

সুলতান আহমেদ বা নীল মসজিদ নামে পরিচিত। ইস্তানবুলের এই মসজিদের ভেতরে সুলতান আহমেদের সমাধি, পান্থনিবাস, হাসপাতাল ও মাদ্রাসা রয়েছে। মসজিদটি প্রকৃতপক্ষে ধূসর বর্ণের। কিন্তু ছাদের উপর দিকটা নীল টালির মোড়কে আবৃত। আর তাই এটির অপর নাম ‘নীল মসজিদ’। নীল ছাড়াও এই মসজিদের নির্মাণকার্যে সবুজ রঙের টালিও ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি টালির উপরে রয়েছে মূলত ফুল, লতা-পাতার কারুকার্য। মুসলিম গৌরবময় ঐতিহ্যের প্রতীক এই মসজিদকে ১৯৩৪ সালে জাদুঘর ঘোষণা করা হয়। এটিতে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়। প্রতি বৎসর প্রায় অর্ধ কোটি পর্যটক এই স্থাপত্যকর্ম দেখতে ভিড় করে। তবে প্রবেশের সময় কিছু ড্রেস কোড মেনে চলতে হয়।

আল হাম্বরা

আল হাম্বরা মূলত একটি প্রাসাদ। স্পেনের গ্রানাডায় প্রাসাদটির অবস্থিত। মুসলিম শাসনের সময়ে স্পেনের কর্ডোভাকে একসময় ইউরোপের বাতিঘর বলা হত। স্পেনের মুসলিম শাসনামলে ১৩০০ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়। অসাধারণ অলঙ্করণ ও নান্দনিক স্থাপত্য প্রাসাদটির মূল আকর্ষণ। যে কোনো দর্শনার্থীর নজর কাড়বে খুব সহজে। মনোমুগ্ধকর বাগান, ঝর্ণা ও নান্দনিক শৈল্পিক অলঙ্করণ রয়েছে প্রাসাদটির ভিতরে। ইউনেস্কো ১৯৮৪ সালে আল হাম্বরা প্রাসাদকে ‘মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।

সুলতান সুলেমান

ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। মসজিদের সুউচ্চ ও সুরম্য চারটি মিনার মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহু গুণে। মসজিদের মেহরাবের অভ্যন্তর ইসলামী ঐতিহ্যের স্মারক ও বিভিন্ন কারুকার্যের উপাদানে পরিপুষ্ট। বৈচিত্র্য ও বহুবিধ রং তুলিতে আঁকা লতা গুল্ম, হরেক রকম দৃশ্য, কোরআনের আয়াত অন্য রকম এক আবহ কাজ করে। সেইসাথে মসজিদের আঙিনার চারপাশ ঘিরে রয়েছে সবুজাবৃত সজীব একটি উদ্যান। শ্যামল নিসর্গের আবহ ও ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে সুলাইমানিয়া মসজিদ সমধিক পরিচিত। তুরস্কের পর্যটকদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বিখ্যাত সুলাইমানিয়া মসজিদ।

সেন্ট্রাল মসজিদ

লন্ডনের সেন্ট্রাল মসজিদ ‘ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিত। রিজেন্টস পার্কের পাশেই অবস্থিত নান্দনিক এই স্থাপত্যের স্থপতি ছিলেন ফ্রেডেরিক জিববার্ড। এর প্রধান আকর্ষণ হলো বিশালাকার সোনালি রঙের গম্বুজ। সেইসাথে মসজিদটির প্রধান হলরুমে একসঙ্গে পাঁচ হাজার প্রার্থনাকারী অবস্থান করতে পারবেন। সুবিশাল এই মসজিদে নারীদের জন্যও রয়েছে সুব্যবস্থা। কিছু ফার্নিচারের উপস্থিতিসহ গম্বুজের ভিতরের দিকটি সাজানো হয়েছে ইসলামী ঐতিহ্যের শিল্পকর্ম দিয়ে।

শেহজাদে মেহমেদ

হাঙ্গেরির অভিযান থেকে ফেরার পথে সুলতান সুলেমান ও হুররাম সুলতানের ছেলে শেহজাদে মেহমেদ গুটিবসন্তে মারা যান। সুলতান তার প্রিয় সন্তানের শোকে প্রায় ৪০ দিন ছেলের কবরের পাশে কাটিয়ে দেন। আর তখন তিনি প্রকৌশলী সিনানকে শাহজাদার নামে একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ তৈরি করার দায়িত্ব দেন। যা শেহজাদে মসজিদ হিসেবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। নির্মাণের সময় মসজিদের সাথে একটি ধর্মীয় স্কুল, লজিং হাউজ ও দরিদ্র মানুষের খাবারের জন্য রান্নাঘরও নির্মাণ করেন।

রোম মসজিদ

ইসলামিক স্থাপত্যে ইউরোপের সর্ববৃহৎ স্থাপনা বলা চলে ইতালির রোম মসজিদকে। ৩ লক্ষ ২০হাজার বর্গফুটের এই মসজিদে একত্রে ১২হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। আফগানিস্তানের রাজপুত্র মুহাম্মদ হাসান ও তার স্ত্রী রাজিয়ার উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হয়। নান্দনিক এই মসজিদটির নির্মাণ ব্যয় ৪০ মিলিয়ন ইউরো।

পেনা প্রাসাদ

পর্তুগালের সিন্ট্রা শহরের সাও পেদ্রো ডি পেনাফেরিমে অবস্থিত পেনা জাতীয় প্রাসাদ। এই স্থাপনায় নব্য গথিক, ম্যানুলাইন, ইসলামী ও রেনেসাঁ কারুকাজের সমাবেশ। প্রায় পুরো প্রাসাদটি পাথরের ওপর অবস্থিত। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে প্রাসাদটি লিসবনসহ শহরের অন্যান্য স্থান থেকে সহজেই দেখা যায়। জাতীয় এই স্থাপনাটি র মাধ্যমে উনবিংশ শতকের রোমান্টিসিজমের প্রকাশ পায়।

আয়া সফিয়া

তুরস্কে সুলতান আহমেদ মসজিদের কিছু দুরেই রয়েছে আয়া সফিয়া মসজিদ। মসজিদটির প্রকৃত ইতিহাস জানতে ইতিহাসের পাতা ধরে যেতে হবে অতীতে। মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ান। তিনি ৫৩৭ খ্রীস্টাব্দে আয়া সফিয়া গীর্জা নির্মাণ করেন। এই গির্জাটি তখন খ্রীস্টানদের কাছে পরম শ্রদ্ধার উপাসনাক্ষেত্র ছিল। দীর্ঘ ৯১৬ বছর ধরে এই গীর্জার রমরমা ছিল। পরে সুলতান দ্বিতীয় ফাতিহ দখল করে একটি ডিক্রী জারির মাধ্যমে গীর্জাকে মসজিদে পরিণত করেন।