ঢাকা, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

স্যাম মানেকশ: যুদ্ধদিনের অকৃত্রিম বন্ধু

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২০ শনিবার, ০৮:৪০ এএম
স্যাম মানেকশ: যুদ্ধদিনের অকৃত্রিম বন্ধু

‘পূর্ব পাকিস্তানের হাজার, হাজার শরণার্থী আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গে প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় আপনি কী করছেন?’ মন্ত্রীপরিষদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও লৌহমানবী নামে খ্যাত ইন্দিরা গান্ধীর এ প্রশ্নের উত্তরে স্পষ্ট ভাষায় জেনারেল মানেকশ জবাব দেন, “Nothing, it’s got nothing to do with me. You didn’t consult me when you allowed the BSF, the CRP and RAW to encourage the Pakistanis to revolt. Now that you are in trouble, you come to me. I have a long nose. I know what’s happening.” সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীপরিষদের সামনে এমনভাবে কথা বলার মতো স্পষ্টভাষী, নির্ভীক, দুঃসাহসী ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী জেনারেল পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে একজনই আছেন, যিনি হলেন ফিল্ড মার্শাল স্যাম হরমুসজি ফ্রামজি জামশেদজি মানেকশ।

তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সপ্তম প্রধান। দীর্ঘ নামের কারণে তিনি ‘Sam Manekshaw’, ‘Sam Bahadur’, ‘Sam the Brave’ ইত্যাদি নামে বেশি পরিচিত। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় মিলিটারি একাডেমি, দেরাদুনে প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে তিনি যোগদান এবং ১২তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের চতুর্থ ব্যাটালিয়নে কমিশন লাভ করেন। ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে সামরিক বাহিনীর বহু নামী-দামি জেনারেলের জন্ম হয়েছে যারা পরে বিভিন্ন সময়ে উভয় দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মানেকশ।

১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর দিনটি মিত্রবাহিনীর জন্য ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট করে বললে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলদের জন্য স্বস্তির। ওই দিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান স্যাম হরমুজজি প্রেমজি জামশেদজি মানেকশ কার্যত ভারতীয় বাহিনীকে ঢাকা অভিযানের অনুমতি দেন।

স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বাজি রেখে যুদ্ধরত বাংলাদেশ তত দিনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পূর্ব রণাঙ্গন। দিশেহারা পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর বিকেলে ভারতের পশ্চিম অংশে বিমান আক্রমণ করে বসেছিল। ফলে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তাকারী ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভারতীয়দের হিসাবে, মাত্র ১৩ দিনের সার্বিক যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

যুদ্ধ শুরু হলে চীন হস্তক্ষেপ করতে পারে—এই বিবেচনা থেকে ১৬৭ ও ৫ মাউন্টেন ব্রিগেডকে চীন সীমান্তে রাখার পক্ষে ছিলেন জেনারেল মানেকশ। ৮ ডিসেম্বর মানেকশ ওই ব্রিগেডগুলোকে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবহারের অনুমতি দেন। এতে যুদ্ধ নতুন গতি পায়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি রাষ্ট্রীয় সমর্থনকে সামরিকভাবে কার্যকর করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পর ইতিহাসের আলো গিয়ে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত সেনা কর্মকর্তা স্বাধীন ভারতের অষ্টম সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশর ওপর। চার দশকের সামরিক জীবনে পাঁচটি যুদ্ধ করেছেন তিনি। একাত্তরের শেষ যুদ্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে বিজয়ী হন মানেকশও।

একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এক সাক্ষাৎকারে মানেকশ বলেছিলেন, ‘এই যুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্ববাসী জানে। আমরাও জানি, এটা বাংলাদেশের যুদ্ধ। রণক্ষেত্রের অগ্রভাগে সাত-আট মাস ধরে তোমাদের হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করছে এবং তাদের জীবন উৎসর্গ করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা প্রতিরোধে তোমাদের বাবা-মা তাদের সন্তানদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে রণাঙ্গনে পাঠাচ্ছেন। এটাকে তোমাদের জনগণ এখন জনযুদ্ধে রূপান্তর করেছে। একটা দেশের গোটা জনগোষ্ঠী তাদের রুখে দাঁড়িয়েছে বলে এ যুদ্ধ বেশি দিন চলতে পারবে না।’

রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছেন কি না, জানতে চাইলে মানেকশ বলেছিলেন, ‘না, এখনো দেখিনি। কিন্তু আমাদের ইস্টার্ন সেক্টরের যেসব জেনারেল রণাঙ্গনে তাদের ক্ষিপ্র গতির আক্রমণ দেখেছে, তাদের রিপোর্ট পাচ্ছি। শত্রুর ওপর তাদের ভয়ভীতিহীন আক্রমণ দেখে তারা (জেনারেলরা) বিস্মিত। আমার জেনারেলরা আমাকে বলেছেন, বীর বাঙালিরা জন্মভূমির জন্য রণাঙ্গনে জান কোরবানি দেয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা বলতে পারেন, কিভাবে তোমাদের কিশোর, তরুণ, যুবক মুক্তিযোদ্ধারা জীবনের মায়া এমন তুচ্ছ করে হাসিমুখে দেশের পায়ে নিজেদের বলি দিতে পারে। তিনি বলেন, দ্বিধাহীন চিত্তে আমার এই অনুভূতি প্রকাশ করা কর্তব্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান মৃত্যুঞ্জয়ী মন্ত্র জানেন। তার নিখাদ মন্ত্রে এমন মৃত্যুঞ্জয়ী জাতি জন্ম নিয়েছে যে, এখন তারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চায়। বাংলাদেশের বীর মুক্তিবাহিনীকে অভিবাদন। তাদের সামনে শুধু বিজয় অপেক্ষা করছে। বিধাতার আশীর্বাদে ধন্য হোক বাংলাদেশ।’

২০০৮ সালের ২৭ জুন অর্থাৎ আজকের দিনে ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন আমাদের যুদ্ধদিনের এই অকৃত্রিম বন্ধু। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে অটি এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়। এই বীর সেনানায়কের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাকে স্মরণ করছি আমরা।