ঢাকা, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ২১ আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

নৃশংস যত সন্ত্রাসী হামলা

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২০ বুধবার, ০৯:০৪ এএম
নৃশংস যত সন্ত্রাসী হামলা

এশিয়া কিংবা আফ্রিকা, বিয়েবাড়ি কিংবা অফিস-হাসপাতাল, সর্বত্রই তাণ্ডব চালাচ্ছে জঙ্গিরা। ধর্মের দোহাই দিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যার ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছে তারা। জঙ্গিদের নির্বিচার, নৃশংস ও বর্বরোচিত হামলায় শুধু নিরীহ মানুষেরই মৃত্যু হচ্ছে না, গুমরে কেঁদে উঠছে মানবতাও। পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ঘটে যাওয়া নৃশংস কিছু জঙ্গি হামলার ঘটনাই এখানে তুলে ধরা হলো- 

ইরানের সিনেমা রেক্স ফায়ার

১৯৭৮ সালের আগস্টে ইরানের আবাদানে সিনেমা রেক্সে আগুন লাগিয়ে ৪৭০ জনকে হত্যা করা হয়। সিনেমা চলাকালীন দরজা বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইরানের তৎকালীন সরকার এ ঘটনায় ইসলামপন্থি জঙ্গিরা দায়ী বলে জানায়। তবে বেশ কয়েকটি পক্ষ এই হামলাকে ইরানি ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ সাভাকের নীল নকশা হিসেবে চিহ্নিত করে।

এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে হামলা

১৯৮৫ সালের ২৩ জুন ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩১ হাজার ফুট উঁচুতে আয়ারল্যান্ডের আকাশসীমায় বিধ্বস্ত হয় এয়ার ইন্ডিয়ার টরন্টো-দিল্লি ফ্লাইট। বিমানটিতে আগে থেকে বোমা রাখা ছিল। বোমা বিস্ফোরিত হলে প্লেনে থাকা ৩২৯ জন যাত্রী, পাইলট, ক্রুর সবাই নিহত হন। বিমানটির ধংসস্তূপ গিয়ে পড়ে আটলান্টিক সাগরে। এয়ার ইন্ডিয়ার এ হামলার সময় কানাডার নারশিয়া বিমানবন্দরেও বোমা হামলা হয়। দেশটির পুলিশের দাবি, ভারতের অমৃতসরে শিখদের পবিত্র উপাসনালয় গোল্ডেন টেম্পলে সেনা অভিযানের প্রতিবাদে শিখ জঙ্গিদের সংগঠন বাবর খালসা এই বোমা হামলা চালায়।

টুইন টাওয়ার হামলা

শুধু প্রাণহানির জন্য নয়, পুরো বিশ্বের ওপর প্রভাবের কারণে টুইন টাওয়ার হামলাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে দেখা হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারের ওপর এ হামলা চালানো হয়। এতে ২ হাজার ৯৯৩ জন নিহত এবং ৮ হাজার ৯শ জন আহত হন। আল কায়দার ১৯ জঙ্গি চারটি বিমান ছিনতাই করে। আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১ এবং ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ১৭৫ বিমান দুটি নিউইয়র্ক সিটির টুইন টাওয়ারের উত্তর এবং দক্ষিণ টাওয়ারের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত আনে। ছিনতাই হওয়া তৃতীয় বিমান আমেরিকান ফ্লাইট ৭৭ ভার্জিনিয়া রাজ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত করে। চতুর্থ বিমান ইউনাইটেড এয়ারলাইন ফ্লাইট ৯৩-এর লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটন ডিসি। কিন্তু যাত্রীদের সঙ্গে ছিনতাইকারীদের ধস্তাধস্তিতে বিমানটি পেনসিলভানিয়ার এক মাঠে বিধ্বস্ত হয়। এই হামলার মাস্টার মাইন্ড ওসামা বিন লাদেন বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীল নকশা বাস্তবায়ন করতেই এই হামলা চালানো হয় বলে সন্দেহ অনেকের।  

বেসলান হত্যাযজ্ঞ

ইঙ্গুস এবং চেচেন নামের ইসলামপন্থী জঙ্গিরা রাশিয়ার উত্তর ককেশাসের নর্থ অসেটিয়া এলাকার বেসলান শহরের স্কুল নাম্বার ওয়ানে এ হামলা করে। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর এই হামলা হয়। ভারি অস্ত্রশস্ত্রের মুখে জঙ্গিরা তিন দিন ধরে জিম্মি করে রাখে ১ হাজার ১শ মানুষকে। যাদের মধ্যে ৭৭৭ জনই ছিল স্কুলছাত্র। জিম্মি দশার তৃতীয় দিনে রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী ট্যাঙ্ক এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে স্কুলে প্রবেশ করে। এ ঘটনায় কমপক্ষে ৩৮৫ জন মারা যান।

লন্ডনে সিরিজ বোমা হামলা

২০০৫ সালের ৭ জুলাই মধ্য লন্ডনের তিনটি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন ও একটি বাসে আত্মঘাতী সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হন ৫২ জন। আহত হন সাত শতাধিক মানুষ। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে লন্ডনের রাসেল স্কয়ারের আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন স্টেশনে প্রথম হামলা চালানো হয়। প্রায় কাছাকাছি সময়ে এজওয়ার ও অ্যাল্ডগেটে পৃথক দুটি হামলায় যথাক্রমে ছয় ও সাত জন নিহত হন। এর প্রায় একঘণ্টা পর তাভিস্টক স্কয়ারে একটি দ্বিতল বাসে বোমা হামলা চালানো হয়। জানা যায়, বোমা হামলাকারী চার জঙ্গির সঙ্গে চরমপন্থি সংগঠন আল কায়েদার সংযোগ ছিল।

পাকিস্তানের স্কুলে গুলিবর্ষণ

২০১৪ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি স্কুলে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায় তালেবান জঙ্গিরা। এতে নিহত হয় ১৩০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী। আর আহত হয় ১২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী। হামলার দিন দুপুরের আগে ৮-১০ জন জঙ্গি সামরিক পোশাকে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা স্কুলের দিকে অগ্রসর হলে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণ। প্রায় ৮ ঘণ্টার অভিযানের পর স্কুলটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় সেনাবাহিনী।

ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে হামলা

২০১৬ সালের ২৮ জুন গুলিবর্ষণ আর বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দর। এ হামলায় নিহত হন ৪৭ জন এবং আহত হন ২৩৯ জন। প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে আন্তর্জাতিক টার্মিনালের একতলায়, দ্বিতীয়টি দোতলায় এবং তৃতীয়টি গাড়ি পার্কিংয়ে। পুলিশ পাল্টা আক্রমণ করার কিছু সময়ের মধ্যেই প্রথম আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। তুরস্কের সরকার এই হামলার জন্য জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে দায়ী করে।

প্যারিসে আত্মঘাতী হামলা

২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় ফ্রান্সের প্যারিস ও সেন্ট-ডেনিসে ধারাবাহিক ও সমন্বিত সন্ত্রাসী আক্রমণ হয়। ফ্রান্সের বাইরে তিনটি আলাদা আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং প্যারিসের কাছাকাছি চারটি ভিন্ন স্থানে গণহত্যা ও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ হামলায় অন্তত ১২৮ জন নিহত হন। আহত ৪১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এতে সাত হামলাকারীও মারা যায়। 

অরল্যান্ডোয় বন্দুকধারীর হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অরল্যান্ডো শহরের বিনোদন কেন্দ্র পালস ক্লাবে ২০১৬ সালে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। ১২ জুন অরল্যান্ডো শহরে সমকামীদের একটি নাইট ক্লাবে এ গোলাগুলি হয়। এতে ৫০ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত হন। স্থানীয় সময় দিবাগত রাতে এ হামলা হয়। হামলার তিন ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওমর মতিন নামের হামলাকারীকে হত্যা করে।

ফ্রান্সের নিসে সন্ত্রাসী হামলা

২০১৬ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় নিস শহরে সন্ত্রাসী হামলায় ৮০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন। জনতার ওপর দ্রুতগতিতে ট্রাক ও গুলি চালিয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটানো হয়। বাস্তিল দিবস উদযাপন করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ বহু লোক ওই সময় সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। স্থানীয় সময় রাত ১১টার দিকে ভিড়ের মধ্যদিয়ে ২৫ টনের ওই ট্রাক প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা এগিয়ে যায়। পরে পুলিশ চালককে গুলি করে হত্যা করে ট্রাকটি থামায়। হামলাকারী মোহামেদ লাউয়েজ বুলে`র জন্ম তিউনিসিয়ায় হলেও তিনি ফ্রান্সে বসবাস করতেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সেদেশে কাজ করার পারমিটও তার ছিল।

ম্যানচেস্টারে কনসার্টে হামলা

২০১৭ সালের ১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানচেস্টারে পপতারকা আরিয়ানা গ্রান্দের কনসার্টে হামলা হয়। কনসার্ট শেষে দর্শকরা বের হওয়ার সময় আত্মঘাতী এই হামলা চালানো হয়। বোমার বিস্ফোরণে কমপক্ষে ২২ জন নিহত ও ৫৯ জন আহত হন।

মুম্বাই হামলা

২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাই জঙ্গি হামলা ২৬/১১ নামেই পরিচিত। পাকিস্তান থেকে জলপথে মুম্বাইয়ে ঢুকে ১০টিরও বেশি জায়গায় হামলা চালায় জঙ্গিরা। ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাল, ওবেরয় ট্রাইডেন্ট, তাজ হোটেল, লিওপোল্ড ক্যাফে, কামা হাসপাতাল, নরিম্যান হাউস, ইহুদি কমিউনিটি সেন্টার, মেট্রো অ্যাডল্যাবস এবং টাইমস অফ ইন্ডিয়া ভবন ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের পিছনের একটি গলিতে চলে হামলা। এমনকি মুম্বাই বন্দরের অদূরে মাজাগাঁও ও ভিলে পার্লের একটি ট্যাক্সির মধ্যেও বিস্ফোরণ ঘটায় জঙ্গিরা। ২৬ থেকে ২৯ নভেম্বর জঙ্গি হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১৬৪ জন। আহত হন অন্তত ৩০৮ জন।

নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা

২০১৯ সালের ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি কেন্দ্রীয় মসজিদে বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক। এ ঘটনায় সরাসরি জড়িত ব্রেন্টন টারান্টকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বর্তমানে তার বিচার চলছে।   

শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে উৎসবে হামলা

গত বছরের ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে পালন করছিলেন খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরা। এ দিনেই কলম্বো, নেগোম্বো ও বাট্টিকালোয়া শহরের মোট আটটি গির্জা ও হোটেলে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় আইএস জঙ্গিরা। সরকারের দেওয়া সবশেষ তথ্য অনুসারে এ হামলায় নিহতের সংখ্যা ২৫৩।  

নাইজেরিয়ার গামবোরু-এনগালায় হামলা

নাইজেরিয়ার পাশাপাশি দুই শহর গামবোরু ও এনগালাতে ২০১৪ সালের ৫ মে রাতে হামলা শুরু করে বোকো হারাম জঙ্গিরা। একে-৪৭ ও আরপিজি দিয়ে এ হামলা চালানো হয় টানা ১২ ঘণ্টা ধরে। হামলায় নিহত হন শহর দুটির ৩৩৬ জন বাসিন্দা।

সোমালিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা

সোমালিয়া তো বটেই, পুরো আফ্রিকা মহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মনে করা হয় এটিকে। নিরাপত্তাকর্মীরা একটি বোমাভর্তি ট্রাককে মোগাদিসুর ব্যস্ততম সড়কে তল্লাশির জন্য আটকালে চালক এটির বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে অন্তত ৫৮৭ জনের মৃত্যু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ দায় স্বীকার না করলেও পুলিশের ধারণা, হামলার জন্য দায়ী জঙ্গি সংগঠন আল শাবাব।