ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৯:১৬ এএম
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে

তার কথা লিখতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে সেই ছেলেবেলায় পড়া কবিতাটার কথা- ‘আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে, বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ এই কবিতা না শুনে বড় হয়েছে, এমন মানুষ খুব কমই আছে। তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে- এই মজার কবিতা পড়তে এখনো যেন খুব ভালো লাগে। ঠিক সেই ছোটবেলা থেকেই মানুষটি তার লেখার মাধ্যমে আমাদের অন্তরে গেঁথে আছেন, তিনি প্রাণের কবি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার সাধ্য আমাদের আজও নেই।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হোক, মন খুব খারাপ হোক, আনন্দে উদ্বেলিত হোক, নিজে থেকে কোনোকিছু লিখতে যাই- রবি ঠাকুরের লেখা আর সৃষ্টিগুলো সবার আগে মাথায় চলে আসে। আমাদের লেখার গুরু তিনিই। তার লেখা, তার চেতনাবোধ জ্বলজ্বল করতে থাকে নিজের মধ্যে। তার লেখনী আর ধারণার মধ্যেই যেন নিজের ধারণাগুলো যেন মিশে যেতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ শুধু একটা নামই নয়, বিশাল একটা চেতনাও। কোনো বাঙালির মধ্যেই এতো ভাববোধ ছিল না বোধহয় কখনো। তাকে আমরা বুঝি, অনুভব করি তার প্রতিটি লেখায়।

আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, এই আকাশে…

মুক্তির আনন্দ কেমন রবীন্দ্রনাথ তা ভালোভাবে বুঝিয়ে ‍দিয়ে গেছেন। আমাদের মুক্তি ধুলায় ধুলায়, ঘাসে ঘাসে ছড়ানো, তা তিনি খুঁজে পেয়েছেন।

একটা শিশুমনকে চনমনে করে তুলতে রবীন্দ্রনাথের ছড়া, কবিতা বা গানগুলো বরাবরই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে- বীরপুরুষ কবিতায় এই যে মা’কে নিয়ে তার ছোট্ট বীরপুরুষ রাঙা ধুলোয় মেঘ উড়িয়ে আসে- এই অনুভূতিকে প্রকাশ করা কঠিন।

‘এক যে ছিল চাঁদের কোণায়

চরকা কাটা বুড়ি,

পুরাণে তার বয়স লেখে

সাতশ হাজার কুড়ি।’

আমাদের চিরপরিচিত চাঁদের বুড়ির সেই যে উপাখ্যান, ছোটদের মনে দাগ না কেটে পারেই না।

নবীনদের উদ্বুদ্ধ করতেও ভোলেননি তিনি। 

ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা। কবিগুরুর লেখা এই লাইনগুলো নতুনদের ভেতরে ভেতরে জাগিয়ে তোলে। তাদের মাধ্যমে জাতিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, সেটা তিনি অন্তর থেকে বোঝাতে পেরেছেন। তার একেকটি সৃষ্টি আমাদের শক্তি। উঠে দাঁড়ানো বা ঘুরে দাঁড়ানোর এমন অনুপ্রেরণা কোথায়ই বা মেলে! প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের জন্য তিনি এমন অসংখ্য লেখা রেখে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে বিরহ এবং প্রেম নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। প্রেমের বিরহের কারণে যে মনোঃকষ্ট, যন্ত্রণা, আক্ষেপ- সেই অনুভূতির বোধ সবারই অনেক একই। ‘মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে…’ যেই মানুষটি মনে এতো দ্বিধা রেখে জীবন থেকে চলে গেলো, তার জন্য হৃদয়ে যে মোচড়, সেটাও বুঝিয়েছেন তিনি। আর ভালোবাসার গল্প, গান, সাহিত্য, কবিতার ভাণ্ডার তো তার বরাবরই সমৃদ্ধ। ভালোবেসে সখীকে নিভৃতে যতনে নিজের নামটি লেখার আহ্বানেই তার প্রেমবোধ স্পষ্ট।

আমাদের চমৎকৃত বর্ণিল প্রতিটি ঋতু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের লেখনিগুলো অসাধারণ। প্রতিটি ঋতুকে তিনি আলাদা আলাদা স্বকীয়তায় তুলে এনেছেন। এসো হে বৈশাখ, বাদল দিনেরও প্রথম কদম ফুল, আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি মেন হয় এ যেন আমার প্রথম দেখা,  আজি হেমন্তের শান্তি ব্যাপ্ত চরাচরে জনশূন্য ক্ষেত্র-মাঝে দীপ্ত দ্বিপ্রহরে, শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে, আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে এত বাঁশি বাজে- এই যে ছয়ঋতুর এতো সৃষ্টি, আমাদের সাহিত্য আর সংষ্কৃতির ভাণ্ডারকে অকৃত্রিম করে তুলেছে।

এখন মনে প্রশ্ন জাগেই, কোথায় নেই রবীন্দ্রনাথ? তিনি সবখানেই আছেন। তার কথার খেই ধরেই বলতে হয়- নয়ন তোমায় পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। অর্থাৎ তাকে আমাদের প্রজন্ম নিজের চোখে দেখতে না পেলেও তার প্রতিটি কর্ম রয়ে গেছে একদম আগের মতো স্বমহিমায়। আমরা রবীন্দ্রনাথে অনেকটাই আচ্ছন্ন হয়ে আছি। রবির প্রভাব আসলেই এড়ানো অসম্ভব। তাকে নিয়ে শেষ একটা কথাই বলতে হয়, ‘কবিগুরু, তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।’

তার মহাপ্রয়াণ দিবসে তার এবং তার সৃষ্টির প্রতি অসংখ্য শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।