ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ইলেকট্রিক গাড়ির যুগ : বাংলাদেশের প্রস্তুতি

মাহাবুব মোরশেদ রিফাত
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১১:০১ এএম
ইলেকট্রিক গাড়ির যুগ : বাংলাদেশের প্রস্তুতি

ছেলেবেলায় আমাদের প্রায় প্রত্যেকের খেলাধুলার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিলো ব্যাটারি চালিত খেলনা গাড়ি। আমাদের শৈশবে প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতেই ছিলো “টয় অপারেশন থিয়েটার”, যেখানে দিনরাত খেলার ছলে মেরামত চলতো মটর নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা চাকা নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব খেলনা গাড়ির।

পরবর্তীকালে সাইন্স ফিকশনের সিনেমাটিক দুনিয়ার গন্ডি পেরিয়ে অটো পাইলট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে জানা গাড়িগুলো চলতে শুরু করলো পৃথিবীর বুকে। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ৫ মিলিয়নের মতো ইলেকট্রিক গাড়ি রয়েছে। বিশ্বে ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে ২০১৯ সালেই প্রায় ২.২ মিলিয়ন ইলেকট্রিক গাড়ির চাকার ছাপ পড়েছে পৃথিবীর বুকে।

 

দিন দিন পাল্টে যাচ্ছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর পরিবহণ ব্যবস্থার চিত্র। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন সহ ইউরোপের অনেক দেশ তাদের প্রতিদিনের যাতায়াতের বাহন হিসাবে বেছে নিচ্ছে ইলেকট্রিক গাড়িকে।

সাধারণত ইলেকট্রিক গাড়িগুলোতে এক বা একাধিক ইলেকট্রিক মোটর ব্যবহৃত হয়। লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির সাহায্যেই চালিত হয় ইলেকট্রিক গাড়িগুলো।

 

সারা বিশ্বেই পরিবেশ দূষণ এখন একটি বড় সমস্যা। তাই পরিবেশ দূষণের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে ইলেকট্রিক গাড়ি দিন দিন একটি ভরসার জায়গায় দাঁড়াচ্ছে। বিশ্বে প্রচলিত গাড়ির ইঞ্জিনগুলো থেকে প্রায় ২৪% কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হয়। কিন্তু ঠিক এই জায়গাতে ইলেকট্রিক গাড়িগুলো থেকে কোনো রকমের দূষণ নির্গমন হয় না। তাই পরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর দিক থেকে ইলেকট্রিক গাড়িগুলোই পারে আমাদের রক্ষা করতে।

 

ধারণা করা হচ্ছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে ইলেকট্রিক গাড়ির মার্কেট শেয়ার প্রচলিত গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে এক তৃতীয়াংশ ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।

সারাবিশ্বব্যাপী ২০১৯ সালের ১৬২ বিলিয়ন ডলারের যে ইলেকট্রিক মার্কেট রয়েছে সেটি ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলেই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

দিন দিন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় হচ্ছে। সেই সাথে বাড়ছে এদেশের নানান রকমের ব্যবসা বাণিজ্য। বৃহৎ জনসংখ্যার এই দেশটির এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার চাহিদাও বাড়ছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে এদেশের জনসংখ্যা, সেই দিক বিবেচনায় গনপরিবহন এর মাধ্যম হিসাবে বাস রাস্তায় চলাচল করলেও সে সংখ্যা বাড়ছে না বাড়তি জনসংখ্যার অনুপাতে। সাম্প্রতিককালে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ এর মাধ্যমে প্রাইভেট গাড়িগুলোতে প্রাইভেট ট্রান্সপোট সেবা দেওয়ার বিষয়টি বেশ বেড়েছে।  বাংলাদেশের পরিবহণ খাতে ইলেকট্রিক গাড়ির প্রবেশ মানুষকে আরামদায়ক এবং উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

 

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকের প্রচলন হয়েছে ২০০৬ সালের দিকে। সাধারণত ৮ জনের মতো যাত্রী একসাথে পরিবহণে সক্ষম হওয়ার কারনে এবং কম ভাড়ায় বেশি দূরত্বে যাত্রী পরিবহণ করার কারনে এটি বেশ গ্রহনযোগ্যতা লাভ করে। ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার এসব ইজি বাইক তাই বেশ পরিচিতি লাভ করেছে এদেশের মানুষের কাছে।

 

বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন এবং সরবরাহ বেড়েছে, তাই ইজিবাইক চার্জ করতে বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয় এই সমস্যার সমাধান এখন চাইলেই সম্ভব হতে পারে। তবে সঠিক রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি, ইঞ্জিন ও চেসিস নাম্বার না থাকার যে সমস্যা রয়েছে এটির সমাধানে মন দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে। কারন মফস্বল ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি মানুষকে পরিবহণ সেবা দেবার পাশাপাশি প্রায় ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে। বাংলাদেশে এপোলো সোলার পাওয়ার টেকনোলোজি, বিডি পাওয়ার, রহিম আফরোজ গ্লোব্যাট লিমিটেড, এবি পাওয়ার, গ্রিন কনসোরটিয়াম ইজি বাইকের মতো এসব ইলেকট্রিক গাড়ি ও এর যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

 

নিটল মটরস ইতোমধ্যেই একটি লোকাল এসেম্বলড ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। “সুভারে” নামের এই ইলেকট্রিক গাড়িটি সাধারণ সেডান গাড়ির মতোই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার দাম ধরা হতে পারে ১২ লাখ টাকার মতো। এছাড়াও বাংলাদেশ অটো ইন্ড্রাস্ট্রিজ লিমিটেড ২০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ইলেকট্রিক গাড়ি তৈরী শুরু করবে বলে জানাচ্ছে কতৃপক্ষ। ইতোমধ্যেই চট্রগ্রামে তাদের একটি প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়াও অন্যান্য অনেক দেশি কোম্পানি কাজ করছে বাংলাদেশে ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে।

 

তবে এখনো পর্যন্ত ইলেকট্রিক গাড়ি নিয়ে সঠিক কোনো নিতিমালা নেই, যার ফলে সারা বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে দূষণমুক্ত এবং আধুনিক ইলেকট্রিক গাড়িগুলো ব্যবহার থেকে এখনো বেশ খানিকটা পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

এছাড়াও ইলেকট্রিক গাড়িতে ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলো পুরাতন হয়ে গেলে এগুলো রিসাইকেল করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনো আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি, যা ইলেকট্রিক গাড়ির বিকাশে বাধা হিসাবে কাজ করতে পারে।

 

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা এবং বিকাশে আমদানির উপরে শুল্ক কমিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে অনেক সুবিধাই দিচ্ছে দেশগুলোর সরকার। অদুর ভবিষ্যতে হয়তো একদিন বাংলাদেশও তার পরিবহণ খাতে ইলেকট্রিক গাড়ির মাধ্যমে বিপ্লব নিয়ে আসবে। এর ফলে দেশের জনগনের উন্নত পরিবহণ সেবা প্রাপ্তির পাশাপাশি সমৃদ্ধ হবে দেশের অর্থনীতি।