ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্মতা বোঝা’

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ শুক্রবার, ১১:০৪ এএম
‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্মতা বোঝা’

 

‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্মতা বোঝা’ কথাটি যদিও আমাদের  জীবনে প্রবাদ হয়ে এসেছে এবং প্রবাদটি দিয়ে পরক্ষভাবে যে কোন বিষয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝানো হয়ে থাকে। তবে প্রবাদ হয়ে এলেও দাঁতের গুরুত্ত কিন্তু আমাদের জীবনে অপরিহার্য। বিশেষ করে আপনার মুখের বা চেহারার সৌন্দর্যের জন্য। ধরুন একটি মানুষকে সুন্দর বলার জন্য যেসমস্ত গুনাবলি থাকা দরকার তা আপনার শরীরের ও চেহারায় পরিপূর্ণ ভাবেই আছে। কিন্তু আপনি যখনি হাসেন তখন যদি দেখা যায় আপনার মুখে সামনের দুটি দাঁত নেই তখনই কিন্তু আপনার সমস্ত সৌন্দর্য মাটি হয়ে যাবে নিমিষেই। অথচ আপনার আমার  শরীরের একটি ছোট অংশ জুড়ে এই দাঁতের অবস্থান। আকৃতিতে ছোট হলেও গুরুত্ত বিবেচনা করেই বোধহয় প্রবাদে উঠে এসেছে দাঁতের নাম। এবং চিকিৎসা শাস্ত্রে জায়গা করে নিয়েছে “দন্ত্যচিকিৎসা” নামে। দন্ত্যচিকিৎসা  শব্দটি এসেছে দন্তলোজি থেকে। প্রাচীন গ্রিক শব্দ ὀδούς (odoús অর্থাৎ দাঁত) - দাঁতের গঠন, ক্রমবিকাশ ও অস্বাভাবিকতার শিক্ষাই দন্তলোজি। বিষয়বস্তুর সাদৃশ্যের কারণে কোন কোন জায়গায় দন্ত্যচিকিৎসা এবং মৌখিক চিকিৎসাশাস্ত্র (মুখের বিভিন্ন সমস্যা ও রোগের শিক্ষা) দুই নামই ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

প্রাক-কৃষি সমাজে দাঁতের ক্ষয় কম ছিল, ১০,০০০ বছর পূর্বে কৃষি সমাজের বিস্তারের সাথে সাথে দাঁতের দাঁতের ক্ষয়ের হার বাড়তে থাকে। জানামতে প্রাচীনতম দন্ত্য চিকিৎসার নিদর্শন পাওয়া গেছে ১৩,৮২০ থেকে ১৪,১৬০ বছর আগের। ইটালিতে শক্ত পাথরের ন্যায় যন্ত্র দিয়ে একটি ক্ষতিপ্রাপ্ত দাঁত আংশিক পরিষ্কার করা হয়। ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বের হরপ্পা সভ্যতা থেকে দন্ত্য চিকিৎসার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। মেহেরগড়-এর এক জায়গায় দাঁত সম্পর্কিত সমস্যা সমাধানে ধনুকের ন্যায় যন্ত্রের ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন দন্ত্যচিকিৎসা পর্যালোচনা করে দেখা যায় তা নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর ছিল। ৬৫০০ বছর পূর্বে স্লোভেনিয়া-তে সর্বপ্রথম দাঁতের ফিলিং হিসেবে মৌমাছে থেকে প্রাপ্ত মোমের ব্যবহার আবিষ্কৃত হয়।

প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত হিপোক্রেটিস ও এরিস্টটল দাঁত ওঠার আদর্শ নমুনা, ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত ও মাড়ির অসুখ ও সাঁড়াশি যন্ত্রবিশেষের ব্যবহারে দাঁত উত্তোলন, তারের ব্যবহারে আলগা দাঁত ও চোয়াল স্থিতিশীল করার মত দন্ত্যচিকিৎসা নিয়ে লেখেন। প্রাচীন মিশরের প্রথম দন্ত্য চিকিৎসক উপাধি দেয়া হয় হাসি-রে কে। এছাড়াও রোমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের লেখক কর্নেলিয়াস সেলসাস বিস্তারিরভাবে দাঁতের রোগ ও তার প্রতিকারের উপায় নিয়ে লেখেন। ইতিহাসগতভাবে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা হিসেবে দাঁত উত্তোলন করানো হত। মধ্যযুগে এমনকি ১৯ শতাব্দিতেও দন্ত্য চিকিৎসাকে আলাদা পেশা হিসেবে বিবেচনা হত না এবং সাধারন নাপিত বা অন্য চিকিৎসকরা দন্ত্যচিকিৎসা এর প্রক্রিয়াগুলো করে থাকতেন। নাপিতেরা সাধারণত দাঁত উত্তোলনের কাজ করতেন যা পরবর্তীতে ব্যথা ও দীর্ঘমেয়াদি দাঁতের অসুখে পরিণত হত। ১৪ শতাব্দিতে গাই-দে-কোলিয়াক দন্ত্য পেলিক্যান্ (Dental pelican) উদ্ভাবন করেন, যা পেলিক্যান পাখির ঠোঁটের দেখতে মত ছিল এবং সেটি ১৮ শতাব্দি পর্যন্ত দাঁত উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত হত। দন্ত্য চাবি (Dental key) দিয়ে এর প্রতিস্থাপন করা হয় যা পরবর্তিতে ২০ শতাব্দিতে এসে আধুনিক সাঁড়াশি (forceps) দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়। শুধুমাত্র দন্ত্যচিকিৎসা নিয়ে রচিত প্রথম বইটি প্রকাশিত হয় ১৫৩০ সালে। প্রথম দন্ত্যচিকিৎসা নিয়ে রচিত পাঠ্যপুস্তকটিক নাম ছিল অপারেশন ফর দ্যা টিথ যার লেখক ছিলেন চার্লস অ্যালেন এবং এটি ১৬৮৫ সালে প্রাকাশিত হয়েছিল।

১৬৫০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে আধুনিক দন্ত্যচিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি হয়। ইংরেজ চিকিৎসক থমাস ব্রাউন তার বন্ধুর কাছে লেখা চিঠি (A Letter to a Friend - প্রায় ১৬৫৬ সালে প্রাকাশিত ১৬৯০ সালে)-তে স্বভাবসুলভ হাস্যরসের সাথে দাঁত নিয়ে তার পর্যালোচনা তুলে ধরেন এইভাবে,

“মিশরীয় যেই মমিগুলা দেখেছি, তাদের মুখ খোলা ছিল, এবং কিছুটা হাঁ করা, যেটা তাদের দাঁত পর্যবেক্ষন করার ভাল সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিল, সেখানে কোন কমতি বা ক্ষয় খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না, এবং তারমানে মিশরে কেউ অস্ত্রপচার চর্চা করতেন না তবে রোগগুলোর আলাদাভাবে চিকিৎসা করতেন, অর্থাৎ সেখানে শুধু দাঁত উত্তোলনকারী হওয়াটা অলাভজনক পেশা হত তবে রাজা পাইরাসের দাঁত উত্তোলনকারী হওয়ার চেয়ে ভাল হত কারণ তার মাথায় মাত্র দু টোই দাঁত ছিল।”

ফ্রেঞ্চ শল্যচিকিৎসক পেরি ফকার্ডকে বলা হয় আধুনিক দন্ত্যচিকিৎসার জনক। সেকালে ১৭ শতাব্দীর শেষদিকে এবং ১৮ শতাব্দীর শুরুতে অস্ত্রপচারের যন্ত্রের সল্পতা সত্ত্বেও ফকার্ড অত্যন্ত দক্ষ শল্যচিকিৎসক ছিলেন। তিনি প্রায়ই নাপিত, জহুরি ও ঘড়ি বানানোর লোকদের দেখে দন্ত্যচিকিৎসার জন্য যন্ত্র বানাতেন। তিনি দাঁতের গর্তের জন্য ফিলিং ব্যবহার শুরু করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে চিনি থেকে উৎপন্ন অম্ল যেমন চিঞ্চাম্ন দাঁতের ক্ষয়ের কারণ এবং এও ধারণা করেন যে এর কারণে পরবর্তীতে দাঁত ও মাড়ির পাশে অর্বুদ (tumor) দেখা দিতে পারে। এছাড়াও ফকার্ডকে কৃত্রিম দাঁত স্থাপনের অগ্রদূত বলা হয়।  এবং তিনি হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনের বিভিন্ন উপায়ও আবিষ্কার করেন। তিনি প্রস্তাব দেন যে হাতির দাঁত বা হাড় দিয়ে বিকল্প বানানো যায়। তিনি দন্ত্যবন্ধনীও (Dental braces) আবিষ্কার করেন, যদিও প্রাথমিকভাবে সেগুলো সোনার তৈরী ছিল।

দন্ত চিকিৎসা মুলত মুখগহ্বর সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে চর্চা করে। অন্যান্য আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠির তুলনায় সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য মুখগহ্বরের রোগগুলোই গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা কারণ হলেও এর অধিকতর ব্যাপ্তি এবং বিশ্ব জোড়া এর প্রাদুর্ভাব। এই প্রাদুর্ভাব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আপনাকে মানতে হবে “দন্ত্যচিকিৎসা” শাস্ত্রের নিয়ম নিতি। না হলে হয়তো আপনার জীবনেও এই প্রবাদটি নিতে পারে বাস্তব রুপ।