ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তৃতীয় লিঙ্গ

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার, ০৮:০০ এএম
তৃতীয় লিঙ্গ

রাস্তাঘাটে বা ট্রাফিক সিগন্যালে প্রায়শই আমরা আমাদের চেয়ে অন্যরকম কিছু মানুষদের দেখে থাকি। এমনকি বাসাবাড়ি, দোকানপাট এবং সদ্য জন্ম নেয়া নবজাতক কে আশীর্বাদের নামে চাঁদা তুলতে দেখা যায় এই ভিন্ন ধরনের মানুষদের। এর বাইরেও এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত। সাধারণত আমরা এদেরকে দেখলে এড়িয়ে যাই। এরা কারা?

তৃতীয় লিঙ্গ… কি বুঝতে পারেননি …? তাহলে একটু মোটা দাগেই বলি ‘হিজড়া’। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন?  তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায় আমাদের প্রচলিত লিঙ্গের ধারণার একটি ব্যতিক্রম লিঙ্গ। ব্যতিক্রম এদের দৈহিক গঠন ও অঙ্গভঙ্গি এবং একারণেই এদেরকে বৈষম্যের স্বীকার হতে হয় সর্বক্ষেত্রে যেমন, শিক্ষাঙ্গণ, সামাজিক জীবন, কর্মক্ষেত্রে এমনকি পারিবারিক জীবনেও। ফলে এরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা সহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা আসলে জন্মগতভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ। সেক্স ক্রোমোসমের অস্বাভাবিকতার কারণেই এদের লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়। এর ফলাফল হলো তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া,  অর্থাৎ না পুরুষ, না নারী। আমরা জানি, পুরুষদের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য XY, এবং নারীদের ক্ষেত্রে XX সেক্স ক্রোমোসমের দরকার হয়। মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণের এই প্রক্রিয়ার পেছনে কোনভাবেই আমাদের হাত নেই। ব্যাপারটি সম্পূর্ণই  প্রাকৃতিক। নারীর গর্ভে পুরুষের ভ্রূণ নিষিক্ত হওয়ার সময়ে  ত্রুটির কারণে অস্বাভাবিক সেক্স ক্রোমোসমের সৃষ্টি হতে পারে,

যেমনঃ XXY কিংবা XYY। প্রকৃতির এই খেয়ালী আচরণের কারণে জন্ম হয় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।

এইসকল মানুষেরা আমাদের থেকে ভিন্ন। কিন্তু এ ভিন্নতার পেছনে তাদের কোনও হাত নেই।
শুধুমাত্র শারীরিক বৈচিত্র্যর কারণে তৃতীয় লিঙ্গ অর্থাৎ হিজড়াদের ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা হয়। অনেকে তাদের স্বাভাবিক মানুষ ভাবেন না । অথচ আমাদের সংবিধানের ১৫ (ঘ) ধারায় বলা আছে-

যেসকল পরিস্থিতির পেছনে মানুষের হাত নেই, আমাদের সেসব প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।
১৫(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃ পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্যলাভের অধিকার৷
অথচ, সর্বদিকথেকে বঞ্চিত- নিগৃহীত এই মানুষ গুলকে আমরাই বানিয়েছি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। আশার কথা, ২০১৩ সালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীকে লিঙ্গ পরিচয়য়ে `তৃতীয় লিঙ্গ` হিসেবে চিহ্নিত করে, এ-সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়। এই অনুমোদনের মাধ্যমে এখন থেকে সরকারি নথিপত্র ও পাসপোর্টে তাদের লিঙ্গ পরিচয় থাকবে `হিজড়া` হিসেবে। শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের বৈষম্য দূর করতে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ।

কিন্তু সামাজের মূলধারায় এই মানুষদের পুরোপুরি সম্পৃক্ত হতে এখনো বহু পথ বাকি। এক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীসহ সকল পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হবে। তাহলে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্যান্যদের মত সমান ভূমিকা রাখতে পারবে