ঢাকা, রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মাহি খোর কুচিকু

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ বুধবার, ০৮:০০ এএম
মাহি খোর কুচিকু

“মাছে ভাতে বাঙ্গালী” নদী মাতৃক বাংলাদেশের একটি চিরাচরিত প্রবাদ।
বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে চার শত প্রজাতির অধিক মাছ পাওয়া যায়। মাছের দিক দিয়ে বাংলাদেশ খুব সমৃদ্ধ। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের সাথে সামনের কাতারে অবস্থান করছে। প্রায় চার শতের অধিক নদী, অসংখ্য খাল, বিল, হাওর, বাওর, ডোবা, নালার বাংলাদেশে পাওয়া যায় বিচিত্র নামের, নানান রঙের ও বাহারি স্বাদের মাছ। আকার আকৃতিতেও এরা যেমন বিচিত্র, নামগুলোও তেমনি নান্দনিক। বৌরাণী, গুলশা, তপসে, চিতল, কাকিলা, কই, শিং, পাবদা, ইলিশ আরও কত কি!

বাঙ্গালী জাতি মিশ্র জাতি হওয়াতে এখানের ভাষাতে পাওয়া যায় ব্যাপক মিশ্রতা। বিশেষ করে হিন্দি, উর্দু, আরবি ও ফরাসি ভাষা সহ অনেক দেশের ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় প্রায়শেই। কিন্তু আপনি কি জানেন উর্দুতে পালো ও পুল্লা, আরবি ভাষায় শোর, ওমানে চাকোরি, তামিল ভাষায় সেভ্ভা, উল্লাম, বার্মিজ ভাষায় না-থা-লোক, ম্যান্ডারিয়ান চায়নিজ ভাষায় ইচাচা। ইরানে ফারসি ভাষায় “মাহি খোর কুচিকু”- এর বাংলা অর্থ কি ? “ইলিশ মাছ”। হ্যাঁ ইলিশ মাছ, অঞ্চল ও ভাষা ভেদে এভাবে হরেক নামে ডাকা হয় ইলিশ মাছ কে। তেমনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই মাছকে ডাকা হয় ইলিশ মাছ নামে, আমাদের দেশে যেগুলো জাটকা ভারতের বাংলা ভাষা ভাষীরা সেগুলকে ডাকেন খোকা ইলিশ বলে। এভাবে একেক জাগায় একেক নামে পরিচিত ইলিশ মাছ।

ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha। এটি Clupeidae পরিবার এর অন্তর্গত। ইলিশ মাছ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় মাছ। ফিশবেইসে (ফ্রোইসি ও পোলি ২০১৭) ২৫টি ভাষায় এই ইলিশের নাম দেওয়া হয়েছে। ফিশবেইসে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে ইলিশকে বলা হয় হিলসা শ্যাড এবং আলোস হিলসা। বাংলাদেশে বলা হয়, ইলিশ মাছ, ইলিশ, পদ্মা ইলিশ, জাটকা—দেশের কোনো কোনো এলাকায় ইলিশকে ইলশাও বলে।

বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছে এই ইলিশ মাছ।  প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে নতুন পোশাক ও “পান্তা-ইলিশ” উৎসবের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার সংস্কৃতি চালু ও পরিব্যাপ্ত হয়েছে আমাদের দেশে। তেমনি ভাবে অনেক বাঙালি হিন্দু পরিবার বিভিন্ন পূজার শুভ দিনে জোড়া ইলিশ বা দুইটি ইলিশ মাছ কেনেন। সরস্বতী পূজা ও লক্ষ্মী পূজায় জোড়া ইলিশ কেনা খুব শুভ লক্ষণ হিসেবে মনে করা হয়। কিন্তু এই প্রথা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের মাঝে প্রচলিত আছে। তাদের অনেকে লক্ষ্মী দেবীকে ইলিশ মাছ উৎসর্গ করেন। অনেকেই ইলিশ উৎসর্গ ছাড়া পূজাকে অসম্পূর্ণ মনে করেন।

যদিও ইলিশ লবণাক্ত জলের মাছ বা সামুদ্রিক মাছ, বেশিরভাগ সময় সে সাগরে থাকে কিন্তু বংশবিস্তারের জন্য প্রায় ১২০০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে ভারতীয় উপমহাদেশে নদীতে পাড়ি জমায়। ইলিশ প্রধানত বাংলাদেশের পদ্মা (গঙ্গার কিছু অংশ), মেঘনা (ব্রহ্মপুত্রের কিছু অংশ) এবং গোদাবরী নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। এর মাঝে পদ্মার ইলিশের স্বাদ সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত। ভারতের রূপনারায়ণ নদী, গঙ্গা, গোদাবরী নদীর ইলিশ তাদের সুস্বাদু ডিমের জন্য বিখ্যাত। ইলিশ মাছ সাগর থেকেও ধরা হয় কিন্তু সাগরের ইলিশ নদীর মাছের মত সুস্বাদু হয় না। সর্ষে ইলিশ, ভাপা ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, কড়া ভাজা, দোপেয়াজা এবং ঝোল ইলিশ আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের কাছে ইলিশ রান্নার পদ হিসাবে খুবই জনপ্রিয়।
ইলিশ চর্বিযুক্ত মাছ হওয়ায় প্রচুর পরিমাণে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড (ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড) রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে, এই অ্যাসিড কোলেস্টোরেল ও ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।