ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৪ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

বাকের-খনির করুন প্রেমের ইতিহাসে `বাকরখানি`

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২০ শনিবার, ০৮:০০ এএম
বাকের-খনির করুন প্রেমের ইতিহাসে `বাকরখানি`

বাংলাদেশের পুরান ঢাকাবাসীদের সকালের নাস্তা হিসাবে একটি অতি প্রিয় খাবার। বাংলাদেশে বাকরখানির প্রচলন নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন অভিমত। বাকরখানি রুটির নামের পেছনে আছে এক করুণ প্রেমের ইতিহাস। জনশ্রুতি অনুসারে, জমিদার আগা বাকের তথা আগা বাকর খাঁর নামানুসারে এই রুটির নামকরণ করা হয়েছে। 

নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের। প্রখর মেধার অধিকারী আগা বাকের যুদ্ধবিদ্যাতেও পারদর্শী ছিলেন। তৎকালীন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম এবং আগা বাকের পরস্পরের প্রেমে পড়েন। কিন্ত উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান ছিল পথের কাঁটা, সে খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করলে তিনি জয়নাল খানকে প্রত্যাখান করেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতির চেষ্টা করে এবং খবর পেয়ে বাকের সেখানে যান ও তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন। অন্যদিকে জয়নালের দুই বন্ধু উজিরকে মিথ্যা খবর দেয় যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে। উজির ছেলের হত্যার বিচার চায়।

নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ পুত্র বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। অবশেষে বাকেরের হাতে মারা যায় বাঘ। ইতিমধ্যে জয়নালের মৃত্যুর মিথ্যা খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সে জোর করে খনি বেগমকে ধরে নিয়ে পালিয়ে যান দক্ষিণ বঙ্গে অর্থাৎ বর্তমান বরিশালে। খনি বেগমকে উদ্ধার করতে দক্ষিণ বঙ্গে যান বাকের । পিছু নেন উজির জাহান্দার খান। ছেলে জয়নাল খান বাকেরকে হত্যার চেস্টা করলে উজির নিজের ছেলেকে হত্যা করেন তলোয়ারের আঘাতে। এই অবস্থাতেই জয়নালও খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করে। বাকেরগজ্ঞেই সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। আর বাকের সবকিছু ত্যাগ করে রয়ে গেলেন প্রিয়তমার সমাধির কাছে – দক্ষিণ বঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান বরিশালে। বাকের খাঁর নামানুসারেই বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ, বরিশাল - পটুয়াখালি অঞ্চলের নাম হয় বাকেরগঞ্জ। 

অবশ্য নামকরণের ব্যাপারে অন্য আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে। সে অনুযায়ী, মির্জা আগা বাকের ঢাকায় বাকরখানি রুটি প্রচলন করেন। তিনি বৃহত্তর বরিশালের জায়গীরদার ছিলেন। তার প্রেয়সী ছিল আরামবাগের নর্তকী খনি বেগম। তাদের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল বলে কথিত আছে। পরবর্তীতে আগা বাকের ২য় মুর্শিদ কুলি খাঁর কন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু খনি বেগমের স্মৃতি তিনি ভুলে যান নি। তার আবিস্কৃত এবং প্রিয় খাদ্য বিশেষভাবে তৈরি রুটির নাম তার প্রেমকাহিনীর উপর ভিত্তি করেই নামকরণ করা হয়েছিল বাকের-খনি রুটি। পরবর্তীতে এই নাম কিছুটা অপভ্রংশ হয়ে বাকরখানি নাম ধারণ করে।  জনশ্রুতি মেনে নিলে ধরে নিতে হয়, বাখরখানির সৃষ্টি আঠারোো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। যদিও অনেকে আবার ধারণা করেন, সিলেট জেলায় সর্বপ্রথম বাকরখানি তৈরী হয়। 

শুকনো গঠনের কারণে এটি শুকনা নান বা শুকনা রুটি নামেও পরিচিত। হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর ঢাকা পাচাশ বারস পহেলে অর্থাৎ “ঢাকা পঞ্চয়াশ বছর আগে” গ্রন্থে তিন ধরনের বাখরখানির কথা উল্লেখ করেছেন যেমন গও জোবান, শুকি এবং নিমশুকি। কাইচারুটি এবং মুলামও বাখরখানির অন্য এক প্রকারভেদ। 

বাকরখানির কাশ্মীরি বৈকল্পিক রয়েছে যা পাতলা, দেখতে গোল নানের মতো, তবে মচমতে এবং স্তরযুক্ত এবং এটিতে তিলের বীজ দেওয়া হয়। প্রাতঃরাশের সময় এটি সাধারণত গরম গরম খাওয়া হয়, কেউ কেউ আবার নুন চা দিয়েও খেয়ে থাকেন বাকরখানি। 

সাধারণত গম, দুধ, লবণ, চিনি, ডালডা, ঘি, পনির এবং খামির দিয়ে তৈরি করা হয়। রুটিটি তাওয়া দেয়ার পূর্বে বেলন দিয়ে কিছুটা চ্যপ্টা ও প্রসারিত করা হয়। তারপর ঘি, গুড়, জাফরান, পোস্ত বা নিগেল্লার বীজ ইত্যাদি দিয়ে তাওয়া বা তন্দুরে সেঁকে বানানো হয় বাকরখানি।