ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০, ৬ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নাগলিঙ্গম বা শিব কামান

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২০ রবিবার, ১০:০০ এএম
নাগলিঙ্গম বা শিব কামান

ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা। আমাদের এই বসুন্ধরার বাংলাদেশ, হাজারো রকমের পুষ্পে শোভিত। ঘ্রানে, বৈচিত্র্যে ও নান্দনিক নামের বাহারে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের বাংলার বনে জঙ্গলে সহ বিভিন্ন প্রান্তরে। উদয়পদ্ম, কলকে ফুল, কাঁঠালি চাঁপা, কাশফুল, কেলি কদম, ছাগল কুঁড়ি, জংলি ঝুমকো, দাঁতরাঙা, দোপাটি, নীলমনিলতা, বনচণ্ডাল, বেলি ফুল, বৈঁচি, মহুয়া, মাধবীলতা, মোরগফুল, লান্টানা, শাপলা, শিউলি, স্পদ্ম, কলমি, হাসনাহেনা, নাগলিঙ্গম বা হাতি জোলাপ প্রভৃতি নামের শোভায় শোভিত হয়ে আছে বাংলার ফুলগুলি। নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চলে হলেও, তিন হাজার বছর আগে থেকেই গাছটি ভারত উপমহাদেশে একটি পবিত্র উদ্ভিদ বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ফুলের নামেই নাগলিঙ্গম গাছটি আমাদের দেশে পরিচিত। শোনা যায়, নাগলিঙ্গম গাছে যখন ফুল ফোটে তখন ফুল হতে অদ্ভুত মাদকতাময় গন্ধ বের হয়। সেই গন্ধে নাগিনীর গায়ের ন্যায় কাম গন্ধ খুঁজে পায় নাগ। কামের নেশায় মত্ত হয়ে তখন নাগ ফনা তোলা নাগিনীর মতো দেখতে ফুলের কাছে ছুটে আসে। সাপুড়েরা তাই এই গাছের নাম দিয়েছেন নাগলিঙ্গম। উপমহাদেশে কালক্রমে এই নামটিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। মূলত ফ্রান্সের একজন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী জে এফ আবলেট ১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দে এর নামকরণ করেন। এই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita Guianensis আর ইংরেজী নাম Cannonball Tree। যা Lecythidaceae প্রজাতি গাছের পরিবারভুক্ত।

এই গাছে ফুল ধরার পর বেলের মতো গোল গোল ফল ধরে। এগুলি দেখতে কামানের গোলার মত বলে এদের ইংরেজী নাম ক্যানন বল গাছ। আবার এই ফল গুলি হাতির খুবই প্রিয় খাবার বলে এই অঞ্চলে এর অন্য নাম হাতির জোলাপ গাছ। নাগলিঙ্গম গাছ ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গুচ্ছ পাতাগুলো খুব লম্বা, সাধারণভাবে ৮ থেকে ৩১ সেন্টি মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বছরের প্রায় সব ঋতুতেই এই গাছের পাতা ঝরে এবং কয়েকদিনের মধ্যে আবার নতুন পাতা গজায়।

ভেষজ গুণসম্পন্ন নাগলিঙ্গম গাছের ফুল,পাতা ও বাকলের নির্যাস থেকে বিভিন্ন ধরনের ঔষুধ তৈরি হয়। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিব ও সর্প পূজায় নাগলিঙ্গম ফুল ব্যবহার করেন বলে ভারতে নাগলিঙ্গমকে ‘শিব কামান’ নামে ডাকা হয়। এছাড়াও বৌদ্ধদের মন্দির গুলতেও এই ফুলের যথেষ্ট কদর রয়েছে। এ কারণে থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারের বৌদ্ধ মন্দির প্রাঙ্গণে নাগলিঙ্গম গাছ বেশি দেখা যায়।

গাছের কাণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে আসে প্রায় ৭ ইঞ্চি দীর্ঘ অসংখ্য মঞ্জরি। এক একটি মঞ্জরিতে ১০ থেকে ২০টি ফুল ক্রমান্বয়ে ফুটতে থাকে। মঞ্জরির একদিকে নতুন ফুল ফোটে অন্যদিকে পুরাতন ফুল ঝরে পড়ে। ফুলের রং অনেকটা লালচে কমলা বা লালচে গোলাপী হয়ে থাকে। ফুলে ৬টি মাংশল পুরু পাপড়ী থাকে। ফুলের মাঝে থাকে নাগের ফনা আকৃতির পরাগচক্র। ধারনা করা হয় এর কারণেই এই ফুলের নাম হয়েছে নাগলিঙ্গম।

দ্রুত বর্ধনশীল নাগলিঙ্গম গাছে চারা রোপণের ১২ থেকে ১৪ বছর পর গাছে ফুল ধরে। গ্রীষ্মকাল এবং বর্ষাকালে ফুল ফোটে। ফলগুলো চকলেট রঙের। যার ব্যাস প্রায় ১৫ থেকে ২৪ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। ফল পরিপক্ব হতে প্রায় এক বছর সময় নেয়। পরিপক্ব ফল মাটিতে পড়লে ফেটে যায়। বাতাসে খানিকটা ঝাঁঝালো গন্ধ সৃষ্টি হয়। ফল মূলত পশু পাখির খাবার। মানুষের জন্য এ ফল অখাদ্য। একটি ফলে ২০০ থেকে ৩০০ বীজ থাকে।

নাগলিঙ্গম বা হাতি জোলাপ বিলুপ্ত প্রায় একটি প্রজাতির গাছ। বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম খুব একটা দেখা যায় না। রমনা উদ্যানে,  বলধা গার্ডেন, এবং মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন সহ তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশন, নটর ডেম কলেজ ঢাকা, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,বাংলাদেশ কৃষি বিশ্বিবদ্যালয়,ময়মনসিংহ, টংগী, শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট, বরিশালের বিএম কলেজ, ময়মনসিংহের মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, গফরগাঁও সরকারি কলেজ, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সারাদেশে অনধিক ৫০টি গাছ রয়েছে বলে ধারনা করেছেন আমাদের উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।