ঢাকা, শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠুক নারীবান্ধব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ নভেম্বর ২০২০ শনিবার, ০৯:৫৮ এএম
কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠুক নারীবান্ধব

উচ্চশিক্ষায় ভালো করার সাথে সাথে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং পেশায়তেও নিজেদের দক্ষ প্রমাণ করছেন নারীরা। অনেকক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর চেয়ে বেশি যোগ্যতা দেখিয়েছে তারা।

বিমান বাহিনী, সেনা বাহিনী, নৌ-বাহিনীসহ বিমান চালনার মতো চ্যালেঞ্জিং কাজের দায়িত্ব নিচ্ছেন তারা৷ উপ-সচিব পদ থেকে সচিব পদসহ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিচার বিভাগে বিচারক পদে, রাজনীতিতেও তাদের অবস্থান দৃঢ়। সামাজিক, সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।  এই অর্জনের পাশাপাশি একইসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার কথা, সামাজিকিকরণের বিষয়টা সমাজকে দেখতে হবে। যেটা এখনও তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের শিল্প কারখানাসহ পেশায় জড়িয়েছে নারী শ্রমিক। পোশাক শিল্পের মধ্যে প্রায় ৭৫/৮০ ভাগ নারীশ্রমিক। যে নারী বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা টেনে নিয়ে যাচ্ছে তার জন্য প্রথম প্রয়োজন নিরাপদ ও কর্মবান্ধব পরিবেশ। 
 
কর্মক্ষেত্রে নারীদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতা ও সহযোগিতার অভাব লুকিয়ে আছে অন্তরালে।
২০০৯ সালে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীদের যৌন হয়রানির ব্যাপারে একটি গাইড লাইন বেঁধে দিয়েছেন হাইকোর্ট। কিন্তু দেশের আদালত প্রাঙ্গণেই নারীবান্ধব পরিবেশ বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) এক গবেষণা জানায়, বাংলাদেশের আদালত প্রাঙ্গণের পরিবেশ নারীবান্ধব নয়।  আদালতের পেশাজীবী নারীদের বিভিন্ন যৌন হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে নারীদের পিছু নেয়া ও টিজিংসহ অন্যান্য অপব্যবহারতো আছেই। নারী আইনজীবীরা ক্লাইন্টদের থেকে সম্মানী পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন। অনেক ক্লায়েন্টসহ অন্যান্যদের অনেকে মনেকরেন নারী আইনজীবীরা জটিল মামলা সমাধানে ব্যর্থ হবেন।

পুরুষ সহকর্মীরা অনেকেই নারীর পদোন্নতিকে স্বাভাবিক চোখে দেখেন না। কর্মক্ষেত্রে যেকোন পদে নারী পুরুষ সমান যোগ্যতা নিয়ে আসলে নারীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। নারীর পদোন্নতিকেও নানাভাবে ছোট করা হয়। ‘নারীর অর্জনগুলোকে শারীরিক সৌন্দর্য দিয়ে বিবেচনা করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অধিকাংশ মানুষই মনে করেন নারীরা পুরুষের সমকক্ষ হতে পারে না। তাই সমস্ত ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ ও সাফল্যকেও নানাভাবে অবজ্ঞা করেন তারা। নারীরা অনেক পরিশ্রম করে দেখেই তাদের উন্নতি হয়। পরিশ্রম করলে অবশ্যই যে কেউ উন্নতি করতে পারে। কিন্তু উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নারী হোক তা অনেক পুরুষ মানতে পারে নারাজ। অর্থাৎ নারীর অধীনে কাজ করার মানসিকতা অনেকের নেই।

বিভিন্ন হয়রানির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ডা. তানজিয়া তামান্না (চিকিৎসক) বলেন, ‘একটি সরকারি হাসপাতালে যখন কাজ করেছি তখন রোগীর সাথে আসা লোকজন প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য ছুড়ে দিত। রাতে ডিউটি থাকলে হোস্টেল থেকে হাসপাতাল যেতে এবং ফিরে আসতে সবসময়ই একটা অজানা ভয় কাজ করতো।’ অন্যাদিকে আফসানা সিয়াম (শিক্ষক) জানান, ‘রাস্তায় চলতে ইভটিজিংয়ের শিকার হই, অনেক সময় ক্লাসের কিছু ছাত্রও এ কাজটি করে। ম্যাসেঞ্জারে অনেক আজে বাজে টেক্সট পাই।’

অনেকক্ষেত্রে নারীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়। সামাজিক কলঙ্ক এড়াতে এসব হয়রানিতেও নারী অভিযোগ করেন না। তাছাড়া অভিযোগ দিলে পুরুষ সহকর্মীরা তাকে এড়িয়ে চলতে পারে। বিড়ম্বনা সৃষ্টি হতে পারে। এই ভয়ে অনেক নারী বিষয়গুলো গোপন করে রাখেন। অফিসে পুরুষের রূপ বা পোশাক নিয়ে কথা বলা না হলেও নারীর এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে ঠিকই পছন্দ করেন। নারী সহকর্মীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও আলোচনা করতে পছন্দ করেন অনেকে। অনেক প্রতিষ্ঠানেপুরুষ সহকর্মীরা নারীকে উদ্দেশ্য করে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। কখনও আড়ালে, কখনও প্রকাশ্যে। নারীর বয়স, সাজ-পোশাক, চেহারা নিয়ে কথা বলেন অনেকে। যে নারীরা প্রতিবাদ করেন তাদের সাথে পুরুষ সহকর্মীদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

অনেক মেয়ে নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা পুরুষ সহকর্মীকে বলতে পারে পারে না।  আবার কোন কোন নারী পুরুষ সহকর্মীর দ্বারা এমন বিরূপ আচরণের শিকার হন যে চাকরি করাই কঠিন হয়ে যায়। 

পুরুষ সহকর্মীকে গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয় না। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো একজন নারী কর্মীকেও সমান সময় অতিবাহিত করতে হয়। একটা সময় কর্মক্ষেত্রে ক্রমাগত দুর্ব্যবহার পেতে পেতে মেজাজ হারিয়ে সন্তানের ওপর অকারণ বকাঝকাও করেন অনেক সময়। এভাবেই সবসময় খিটখিটে মেজাজের কারণে একজন নারী তার সন্তানের জন্য একজন ‘খারাপ মা’ হয়ে উঠতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে নারীর কর্মক্ষেত্রে মূল চ্যালেঞ্জ হলো পারিবারিক। পরিবার, বাবা-মা, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি কীভাবে নিচ্ছেন সেটাও মূল বিষয়।

কর্মক্ষেত্রে নিবিড় বন্ধুত্বের চেষ্টা করার পরিবর্তে, সহকর্মীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে সর্বোচ্চ। বাচ্চা নিয়ে অফিস চালাতে গিয়ে কর্মক্ষেত্রে চিল্ড্রেন্স সেন্টারের প্রয়োজন বোধ করেন নারীরা। অনেক অফিসে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পৃথক শৌচাগার, কমন রুম, অভিযোগ বক্স ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ সংবেদনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। কর্মক্ষেত্র ও পথে-ঘাটে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। পথ চলতে কর্মজীবী মেয়েদের পথে-ঘাট থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের মাত্রাও বেড়েছে। তাই নিরাপত্তা দিতে হবে রাষ্ট্রকে। মাতৃত্বকালীন ছুটিটা পর্যাপ্ত দেয়া প্রয়োজন। পরিবার সামলাতে যেমন ছেলে মেয়ে অসুস্থ হলে ছোট-খাট ছুটি প্রয়োজন হয়।এ ক্ষেত্রে কর্মজীবী নারীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের সহমর্মিতা দেখানো উচিৎ।