ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

গজদন্তে এলোকেশী

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ২২ নভেম্বর ২০২০ রবিবার, ০৯:১১ এএম
গজদন্তে এলোকেশী

পাখিদের কলকাকলি জানান দিত সকাল বা গোধূলি বেলায় ৷ সেই বন এখন আর নেই ৷ পাহাড়ি শহর রাঙ্গামাটির কারাগার সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে একটু সামনে এগোলেই দেখা মিলবে একটি বাড়ির ৷ সদর দরজায় দুটো হাতির দাঁত ৷ না, সত্যিকারের গজদন্ত নয়, নকল দুটি গজদন্ত ৷ সেই বাড়ির মালিক বিজয় কেতন চাকমা ৷ বাপদাদা পেশায় ছিলেন গজদন্ত শিল্পী ৷ আজ তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র এবং শেষ গজদন্ত শিল্পী ৷ তাঁর দেখা সেই সময়ের পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বললেন, কত পুরানো গাছ ছিল৷ বড় বড়৷ ঘন অরণ্য চারদিকে৷ পাখি ছিল ৷ ছিল জন্তু জানোয়ার, ছিল হাতিও, বনে ফল ছিল, আমরা তা সংগ্রহ করতাম, খেতাম, এখন আর সেই সবুজ নেই। 

সারা পৃথিবীতেই হাতির দাতেঁর শিল্পকর্ম বিখ্যাত। প্রাচীন কাল থেকেই হাতির দাঁত বা গজদন্ত ব্যবহার করে মূর্তি, অলংকার ইত্যাদি তৈরির চল রয়েছে। প্রাচীন গ্রিক, ল্যাটিন, চীন ও ভারতীয় সাহিত্যে হাতির দাঁতের শিল্পকর্মের কথা বিবৃত আছে। ভারতবর্ষে কুষান যুগের হাতির দাঁতের তৈরি শিল্পকর্ম বেশ জনপ্রিয় ছিল। যারা এ ধরনের শিল্প তৈরি করে তাদের বলা হয় গজদন্ত শিল্পী। পশ্চিমবঙ্গের ইদিলপুর আর পূর্ববঙ্গের সিলেটে বহু গজদন্ত শিল্পীর বসবাস ছিল। এসব গজদন্ত শিল্পী তাদের শিল্পকর্মে এদেশের জনজীবনের চিত্র ফুটিয়ে তুলত। তারা হাতির দাঁত দিয়ে সিংহাসন, পালকি, মূর্তি, অশ্বারোহী সৈন্য, জীবজন্তু, রাজদরবার, দাবার ঘুঁটি, খড়ম, ছুরি, কলমদানি, পিঠ চুলকানি ইত্যাদি শৌখিন সামগ্রী তৈরি করত। কেউ বিশেষ কোনো বস্তুর জন্য ফরমায়েশ দিলে গজদন্ত শিল্পীরা তাও তৈরি করে দিত।

মধ্যযুগের প্রথমদিকে উড়িষ্যায় এ শিল্পকর্মের প্রধান ব্যবসায় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। মোগল শাসকদের কাছে হাতির দাঁতের তৈরি বিলাস সামগ্রীর বেশ কদরও ছিল। সে সময় নানা প্রকার হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম ভারতবর্ষ থেকে বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপে রপ্তানী হতো। ব্রিটিশ-ভারতে হাতির দাঁতের শিল্পকর্মের প্রধান বাজার ছিল ইউরোপ। ইংরেজ বণিকরা আফ্রিকা থেকে হাতির দাঁত এনে তা ভারতীয় গজদন্ত শিল্পীদের দিয়ে শৌখিন জিনিস তৈরি করে ইউরোপ পাঠিয়ে চড়া দামে বিক্রি করত।

আগের জামানায় রাজা-মহারাজা, নবাব, জমিদার তথা শাসক ও ধনীক শ্রেণীর মধ্যে হাতির দাঁতের তৈরি শিল্পকর্মের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। তা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। এখনো অনেক পরিবার তাদের গৃহসজ্জার জন্য হাতির দাঁতের জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকে। বাংলাদেশ সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় হাতির বসবাস ছিল। সে সময় হাতির দাঁত ছিল সহজলভ্য। সে কারণে হাতির দাঁত ব্যবহার করে শিল্প সামগ্রী তৈরির ব্যাপক চল শুরু হয়েছিল। বাংলার গজদন্ত শিল্পীদের খ্যাতি ছিল তখন জগৎজোড়া।

নমুনা উদাহরণে, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে হাতির দাঁতের তৈরি শিল্পকর্মের সংগ্রহ বেশ সমৃদ্ধ। এসব সামগ্রীর মধ্যে মনোমুগ্ধকর একটি শিল্পকর্মের নাম এলোকেশী। এটি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি পূর্ণাবয়ব এক নারী মূর্তির। গোলাকার পদভূমির উপর দণ্ডায়মান এক অর্ধনগ্ন নারীর অপূর্ব ভঙ্গিমাও এই শিল্পকর্মে প্রকাশ পেয়েছে। দীর্ঘ কেশ, আকর্ষণীয় মুখমণ্ডল, উন্নত নাক, চমৎকার ঠোঁট ও চিবুক, সুডৌল স্তন, চিকন কোমর, ভারী নিতম্ব দ্বারা বাঙালি সুন্দরী নারীর বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে এ শিল্পকর্মে অসাধারণ দক্ষতায়। তাছাড়া ডান হাতের কনুই বাম হাতের ওপর স্থাপিত এবং ডান হাতের মধ্যমা ডান গালে যুক্ত রয়েছে। এর দ্বারা সুন্দরী নারীর অহংকার এ শিল্পকর্মে তুলে ধরা হয়েছে। নারী মূর্তিটির ডান পা স্বাভাবিক থাকলেও বাম পায়ের গোড়ালি ভূমি থেকে সামান্য উঁচু। বাম পায়ের গোলাকার উন্মুক্ত উরু মূর্তিটিকে আরও আবেদনময়ী করে তুলেছে। উনিশ শতকের তৈরি এ শিল্প কর্মটির উচ্চতা ৫-৭ ইঞ্চি। এ অমূল্য নিদর্শনটির সংগ্রাহক ছিলেন বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী।

আসুন এবার পরিচিত হই গজদন্ত শিল্পের নান্দনিক ও বাহারি নামের যন্ত্রপাতির সাথে। আড়ি, চিহ্নে, কলম, থাপি, গিরদি, চোরসে এগুলোই যন্ত্রের নাম। হস্তিদন্ত শিল্পের নাতিদীর্ঘ বলয়ের বাইরে সাধারণ্যের তেমন পরিচিতি ছিল না এই যন্ত্রগুলির সাথে। শিল্পীরাই প্রয়োজন এবং উপযোগিতা-মাফিক বানিয়ে নিতেন যন্ত্রগুল। যেমন ‘আড়ি’ দেখতে করাতের মতো, কাজও করাতের। কিন্তু এর ব্যবহারবিধি আলাদা। ঠেলে নয়, আড়ি চালাতে হয় টেনে। না হলে কাটা যাবে না হাতির দাঁত। ফলে এই যন্ত্রের দাঁতগুলির আকার অন্য রকম। ‘চিহ্নে’ যন্ত্রটি বাটালির মতো, কিন্তু ঠিক বাটালি বলা যাবে না একে। হাতির দাঁত খোদাইয়ে চিহ্নের চেয়েও সরু যে যন্ত্রটি ব্যবহৃত হয়, তার নাম ‘কলম’। ‘থাপি’ আসলে কাঠের তৈরি এক রকম হাতুড়ি। ‘গিরদি’ আর ‘চোরসে’ রেতের মতো বলে মনে হলেও এদের গঠন আলাদা। হাতির দাঁত মসৃণ করার কাজে লাগে এগুলো।

হস্তিদন্ত শিল্পের শিকড় অনেক গভীরে। রামায়ণ, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, বাৎস্যায়নের কামসূত্র কিংবা বৃহৎসংহিতা-য় এই শিল্পের উল্লেখ আছে। হরপ্পা-মহেঞ্জোদরো সভ্যতায় এই শিল্পের নিদর্শন মিলেছিল। পরে চন্দ্রকেতুগড়, পাণ্ডুরাজার ঢিবি এবং পাল যুগে এর প্রচলনের কথা সুপ্রাচীন। শ্রীহট্ট এবং ত্রিপুরা অঞ্চলেও চল ছিল হাতির দাঁতের শিল্পের। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে শ্রীহট্ট-ত্রিপুরার হস্তিদন্ত শিল্পীরা ঢাকায় চলে আসেন। পরে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে ১৭০৪ সালে এই শিল্পীরা জিয়াগঞ্জ ও কাশিমবাজার-সহ মুর্শিদাবাদের নানান স্থানে বসতি তৈরি করে নবাব ও অভিজাতবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশির যুদ্ধে বহরমপুরে সেনা-ছাউনি তৈরি হলে, বিদেশেও প্রসার লাভ করে এই শিল্প। 

আড়াই দশক আগে, ১৯৯২-এর বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন শুধু যন্ত্রগুলিকেই নয়, কর্মহীন করে দিয়েছে বহরমপুরের কয়েকশো ‘গজদন্ত শিল্পী’কে। এখন এই সব যন্ত্রই পড়ে আছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গের মতো। তাঁদের বক্তব্য অনুসারে এতে কিন্তু হস্তি-নিধন কমেনি। আবার স্বাভাবিক কারণে মৃত হাতির দাঁতগুলিও কোনও কাজে লাগছে না। মাঝখান থেকে মৃত্যু হয়েছে ঐতিহ্যবাহি এক শিল্পের।