ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১, ৭ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

তানা ও রিরি

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০২০ শুক্রবার, ০৮:৫৬ এএম
তানা ও রিরি

যিনি সাধনা করেন,তাকে সাধক বলে অভিহিত করা হয়। সাধকেরা নানাবিধ মত অবলম্বন করে সাধনা করে থাকে। অনেক সাধক,শাস্ত্রবিধি অনুসারে সাধন ভজন করে। আবার কোন কোন সাধক তার মত অনুসরন করে সাধনা করে,আর ভক্তি পথে সাধনা করা সাধকের অবশ্যই কর্তব্য। কারণ সাধনাই একজন মানুষকে নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে একজন বিখ্যাত সঙ্গীত সাধক “মিয়া তানসেন”। যিনি সাধনার এমন স্তরে উঠে গিয়েছিলেন যে তিনি রাগ “দীপক” পরিবেশন করলে তিনি শারীরিক ভাবে প্রভাবিত হতেন এবং তার শরীর অসহনিয় উত্তপ্ত হয়ে উঠত। তানসেনের শরীরের এই উত্তাপ, তানা ও রিরি নামের দুই যমজ বোন রাগ “মালহার” গেয়ে অবসান করতে পারতেন।    

তানা ও রিরি ১৫৬৪ সালের দিকে জন্মগ্রহণকারী দুটি ভারতীয় যমজ মেয়ে, যাদেরকে আকবরের দরবারে গান করতে বলা হয়েছিল। গল্পটি গুজরাটি লোকসংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে উঠেছে। যমজরা উত্তর গুজরাতের ভিসনগরের নিকটবর্তী শহর ভাদনগরে থাকতেন। তানা এবং রিরি দুই মেয়েই নরসিহ মাহেতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নরসিহ মাহেতার নাতি শর্মিষ্ঠা ছিলেন তানা ও রিরির মা।

আকবরের দরবারের গায়ক, মহামান্য তানসেনের গুরু যখন মারা গেলেন, তখন তিনি "দীপক" রাগটি গেয়েছিলেন। এই রাগটি গাওয়ার প্রভাবটিকে বলা হয়ে থাকে যে গায়ক তার শরীরে একটি অসহনীয় উত্তাপ অনুভব করতে শুরু করে। তানসেন যখন রাগ দীপক গেয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তখন তিনি পুরো ভারত জুড়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। অবশেষে তাদের সেনাপ্রধান আমজাদখান ভাদনগরে এসে এই যমজ বোন তানা এবং রিরি সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন, যারা দক্ষ গায়ক ছিলেন এবং রাগ মালহার গেয়ে তানসেনকে  নিরাময় করতে পারতেন। 

সম্রাট আকবর তানা ও রিরির কথা জানতে পারেন। একদিন আকবর তার দরবারে গান গাইতে তাদের দুই বোনকে আমন্ত্রন জানান। কিন্তু তানা ও রিরি সম্রাট আকবরের আমন্ত্রন রক্ষা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যায়। কারণ তাদের নগর ব্রাহ্মণ হিসাবে ব্রত ছিল যে তারা শুধুমাত্র গ্রামের দেবতার মূর্তির সামনে গান করতে পারবেন। এদিকে সম্রাটের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে না পারলে  শহরে যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই তারা সম্রাটের আমন্ত্রন প্রত্যাখ্যান করা এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া নিয়ে চিন্তায় পড়লেন। এদিকে নগরবাসীরাও পড়লো বেশ বিপদে। দুই বোন যদি আমন্ত্রন রক্ষা না করতে পারেন তাহলে সম্রাট আকবরের সেনাবাহিনী গ্রামে আক্রমন করতে পারে, এই আশঙ্কায় অনেক গ্রামবাসী ভয়ে আর আতঙ্কে গ্রাম ছেড়ে পালালো। অনেক গ্রামবাসী বানিয়াসে দেশান্তরী হয়েছিলো। ওদিকে দিন রাত ভেবেও কোনো সমাধানের দিকে মনকে স্থির করতে পারছিলেন না তানা ও রিরি। একদিকে দেবতার কাছে করা পণ, অপরদিকে সম্রাটের মতো মানুষের আমন্ত্রন রক্ষা। অবশেষে তারা একটি পথ খুঁজে পেয়ে দুজনেই সম্মত হলেন একই সাথে সেই সমাধানের রাস্তায় হাটতে। একমাত্র সমাধান হিসাবে তাঁরা আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। স্থান হিসাবে বেছে নিলেন কুয়াকে। পরিশেষে তারা দুজন মিলে একটি কুয়োতে ডুবে আত্মহত্যা করেছিলেন। 

পরে সম্রাট আকবরের বিষয়টি জানতে পেরে তাদের বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন এবং তানসেনকে তানা ও রিরির সম্মানে নামকরণ করে নতুন একটি ঘরানার অংশ তৈরি করতে বলেছিলেন।  যে সব গ্রামবাসী আকবরের সেনাবাহিনীর দ্বারা আক্রমণের আশঙ্কা করেছিল, তারা বানিয়াসে দেশান্তরী হয়েছিল যা এখন দাশনগর নামে পরিচিত।

তানা ও রিরিকে সম্মান জানাতে ভাদনগরে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করা হয়েছে। তানা ও রিরিকে উৎসর্গ করে প্রতি বছর গুজরাট সরকারের দ্বারা, তানা-রিরি সংগীত উৎসব আয়োজিত হয় ।