ঢাকা, বুধবার, ২০ জানুয়ারি ২০২১, ৭ মাঘ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

সন্তানের প্রথম বন্ধু হোক পরিবার

জিনিয়া শেখ
প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারি ২০২১ মঙ্গলবার, ০৮:০০ এএম
সন্তানের প্রথম বন্ধু হোক পরিবার

বুধবার রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ও লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকাকে তার বন্ধু আসামি দিহান ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা সারাদেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ঘুরেফিরে বেশিরভাগ মহল কিশোর বয়সের অপরিপক্ব প্রেমের পরিণতিকে দোষারোপ করছে। অনেকে আঙুল তুলছে ছেলে ও মেয়ের চরিত্রের পাশাপাশি তাদের পারিবারিক শিক্ষার ওপর কিন্তু যেই আঙ্গুলটি আপনি আজ তাদের ওপর তুলছেন সেই আপনি কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন, আপনার বাচ্চার সাথে এমনটি ভবিষ্যতে কখনোই হবেনা অথবা আপনার বাচ্চাটি তার বন্ধুর কাছে পুরোপুরি সুরক্ষিত? হয়তো আপনি ধারণা করে বসে আছেন আপনার বাচ্চা কখনোই এমনটি করবেনা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আপনি জানেনই না তার বন্ধু কারা অথবা সে কাদের সাথে মিশছে যেমটি ভেবেছিলো আনুশকা ও দিহানের বাবা-মা।     

মনোবিজ্ঞান বলে, সন্তানের পরিপূর্ণ শারীরিক আর মনোসামাজিক বিকাশে বাবা-মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বাচ্চা অন্যের সাথে কেমন আচরণ করবে সেটি কেবল আপনার পারিবারিক শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ছোটবেলা থেকে সন্তানকে শেখানো হয় বাবা-মা ও সন্তানদের সম্পর্ক কেবল শ্রদ্ধার। এতে বাচ্চাদের মধ্যে বাবা-মায়ের সাথে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। দূরত্ব বাড়ার কারণে দেখা যায় বেশিরভাগ বাচ্চারা বাবা-মাকে মনের কথা ব্যক্ত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা। দূরত্ব বাড়তে থাকায় একটা সময় তাদের মধ্যে কথা লুকানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যা আস্তে আস্তে ভয়ে পরিণত হয়।  

আমাদের সমাজের পারিবারিক শিক্ষার চিত্রটা অধিকাংশ পরিবারেই এক। আমরা সন্তানের বন্ধু না করে তাদের অভিভাবক হয়ে উঠতে বেশি চেষ্টায় থাকি। আর সেই শূন্যতা পূরণে তারা বাইরের বন্ধুদের খুঁজতে শুরু করে। আমরা এমনই অভিভাবক শুধু তাদের শাসন করতেই জানি কিন্তু তাদের জীবনে কি ঘটছে অথবা তারা কাদের সাথে মিশছে সেটি নিয়ে গল্প শোনার সময়টুকু নেই।

বয়ঃসন্ধিকালে বাচ্চারা কৌতূহলী থাকে সব চেয়ে বেশি। তাদের গল্প শোনার জন্য কিংবা তাদের বোঝে এমন মানুষকে আশেপাশে তারা বেশি চায়। বাব-মার  উচিত এই সময় তার বাচ্চাটির সব চেয়ে কাছের বন্ধু হওয়া। এতে করে আপনার বাচ্চা কার সাথে মিশছে অথবা আপনার বাচ্চা কোন ভুল করছে কিনা সেটির সম্পর্কে আপনি অবগত থাকছেন। কিন্তু তাকে অবশ্যই শাসন বা মারধোর না করে যুক্তি দিয়ে বোঝানো উচিত কেন এই রাস্তাটি তার জন্য আপনারা ঠিক মনে করছেন না।

আনুশকাকে দিহানের বাসায় যেতে গ্রুপ স্টাডির মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিল।  আনুশকার সাথে তার বাবা-মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলে হয়ত আজ তাকে কোন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হতো না। কারণ মিথ্যা বলে আনুশকা বাসা থেকে বের হয়েছিল  বলেই তার রক্তক্ষরণের সময় সে ভয়ে হাসপাতাল অথবা তার পরিবারের আশ্রয় নিতে চায়নি কারণ আনুশকার মনে তার জীবন থেকেও তার পরিবারের মানুষ বিষয়টি জানতে পারলে কেমন আচরণ করবে সেটি নিয়ে বেশি শঙ্কিত ছিল। তাই সন্তানের সাথে বাবা-মায়ের পারিবারিক দূরত্ব কখনোই ভাল কিছু বহন করে না।  

আনুশকা দিহানের ঘটনার রেশ ধরে বলতে হয়, তাদের দুইজনের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টিতে সঠিক ধারণা ছিলনা। বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে তারা সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী থাকে। এই সমটায় বাবা-মায়ের উচিত বাচ্চাকে সঠিক সেক্স এডুকেশন নিয়ে আলোচনা করা। আমাদের অভিভাবকরা তাদের সন্তানের সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে লজ্জাবোধ করে তাই তাদের কৌতূহলী মন বন্ধুদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হয় যা তাদের জন্য বিপদ বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

বর্তমান তরুণরা পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্ত। সঠিক সেক্স এডুকেশন না থাকায় তারা যা দেখে সেটিকেই স্বাভাবিক বলে মনে করে আর অবাধ শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পরে। আনুশকার ময়না তদন্তে উঠে আসে তার যোনি পথ ও পায়ু পথে অস্বাভাবিক বড় আকৃতির বস্তু প্রবেশ করানো হয় যেটি সেক্স টয় হিসেবে পরিচিত। এতে আনুশকার মাসল ছিন্নভিন্ন হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে অর্গানগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে সে মারা যায়। পারিবার থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলে হয়তো আনুশকার শারীরিক বিষয় নিয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা থাকতো এবং এই ভয়াবহতায় থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারতো। এক্ষেত্রে লজ্জা না পেয়ে সামাজিক বন্ধন নিবিড় করাটা খুব জরুরী এবং সব বিষয়ে সঠিক ধারণা প্রথমে পরিবার থেকে আসাটাও অপরিহার্য।