ঢাকা, রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

হিরোশিমা ট্রাজিডির বধির সাক্ষী

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মঙ্গলবার, ০৮:০১ এএম
হিরোশিমা ট্রাজিডির বধির সাক্ষী

হিরোশিমা শি জাপানের একটি নগর। এটি হিরোশিমা প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী এবং জাপানের মূল দ্বীপ হোনশুর চুউগোকু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষার্ধে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট স্থানীয় সময় ৮টা ১৫মিনিটে আমেরিকান বিমান বাহিনী হিরোশিমাতে পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। আর এই ট্রাজিডির বধির সাক্ষী ছিল দ্য গ্রেট আর্টিস্ট। 

দ্য গ্রেট আর্টিস্ট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অন্তর্গত বিমান বাহিনীর ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপের ৩৯৩ বম্বার স্কোয়াড্রনের একটি বি-২৯ বোমারু বিমান। এই বিমানটি এর কর্মজীবনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জাপান অধিকৃত প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে বোমা বর্ষণের কাজে নিয়োজিত ছিল। কিন্তু এই বিমানটি অন্যান্য বোমারু বিমানের চেয়ে বিখ্যাত হওয়ার কারণ যেসময় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাবর্ষণ করা হয় তখন এটি হিরোশিমা ও নাগাসাকি উভয় স্থানেই উপস্থিত ছিল এবং এটিই একমাত্র বিমান যা দুটি পারমাণবিক বোমা হামলার সময় সেখানে ছিল।

দ্য গ্রেট আর্টিস্টকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গ্লেন লুথার মার্টিন কোম্পানির নেব্রাস্কার ওমাহায় অবস্থিত ফ্যাক্টিরতে তৈরী করা হয় এবং ১৯৪৫ সালের ২০ এপ্রিল অফিসিয়্যালি বিমান বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৫ সালের ২২ জুন এটিকে তিনিয়ানের নর্থ ফিল্ড বিমান ঘাঁটিতে নিয়োজিত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ হওয়া পর্যন্ত এটি সেখানেই কর্মরত ছিল।

কর্মজীবনের শুরু থেকেই এটি ৫০৯তম কম্পোজিট গ্রুপের অংশ ছিল এবং এটির পরিচিতি নম্বর ছিল `ভিক্টর-৯` কিন্তু পরবর্তীতে ১ আগস্ট তারিখে নিরাপত্তাজনিত কারণে এতে ৬ষ্ট বম্বার্ডমেন্ট গ্রুপের মার্কিং লাগানো হয়, তখন এর পরিচিতি নম্বর পাল্টে হয়ে যায় `ভিক্টর-৮৯`। এই বিমানটির পরিচিতি নম্বর `ভিক্টর-৮৯` হলেও এটি দ্য গ্রেট আর্টিস্ট নামেই সারা পৃথিবীতে বেশি পরিচিত, যদিও পরবর্তীতে এটিকে অফিসিয়্যালি এই নামটিই দেয়া হয়। এই বিমানটি তার এই দ্যা আর্টিস্ট নামটি পায় এর বম্বারডিয়ার ক্যাপ্টেন কারমিট বিহানের বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষতার কারণে। 

এই বিমানটি হিরোশিমা ও নাগাসাকি উভয় স্থানে বোমা নিক্ষেপের সময় থাকলেও দুই মিশনে এর কাজ ভিন্ন হওয়ার কথা ছিল। হিরোশিমা মিশনে এর কাজ ছিল নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমার ধ্বংস ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপ করা। প্রথমে নাগাসাকির বদলে ককুরা-শি শহরে বোমা হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, এবং বোমা বহন করে শহরের ওপর ফেলার দায়িত্ব ছিল এই দ্য গ্রেট আর্টিস্ট-এর। এটির যেহেতু ককুরা-শি শহরে বোমা নিক্ষেপ করার কথা ছিল সেজন্য এটি ১২টি ট্রেনিং মিশনেও অংশ নিয়েছিল। ট্রেনিংএর অংশ হিসেবে এটি ৪,১২ ও ১৪ জুলাই রোটা, ৮ জুলাই চু-উক লেগুন, ৯ জুলাই মিনামিতোরিশিমায়, ১৮ ও ১৯ জুলাই গুয়ানা, ২৪ জুলাই কোবেশি শহর ও ২৯ জুলাই কোরিয়ামা-শি শহরে ফ্যাট ম্যান বোমার মতো দেখতে পামকিন বোমা নামে পরিচিত বোমা বর্ষণ করে। 

৬ই আগস্ট ১৯৪৫ সালে যেদিন হিরোশিমায় প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়, সেদিন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি এর দায়িত্ব পালন করে  মিশনে এর কমান্ডার চার্লস ডাব্লিউ সুইনি । কিন্তু ককুরা-শি মিশনে এটি পরিকল্পনা অনুযায়ী বোমা নিক্ষেপ করতে পারেনি কারণ খারাপ আবহাওয়ার জন্যে ১১ই আগস্ট ককুরা-শি তে বোমা না ফেলার এবং তার পরিবর্তে দুই দিন আগেই নাগাসাকিতে বোমা হামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেসময় দ্য গ্রেট আর্টিস্টে পর্যবেক্ষণের জন্য লাগানো উপকরণগুলো বিদ্যমান থাকায় তাড়াতাড়ি বোমা হামলা করার স্বার্থে দ্য গ্রেট আর্টিস্টের বদলে বকস্কারকে বোমা ফেলার জন্য এবং দ্য গ্রেট আর্টিস্টকে পুনঃরায় পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে ৯ আগস্ট ক্যাপ্টেন ফ্রেডরিখ সি. ব্লকের নেতৃত্বে এটি নাগাসাকি মিশনে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করে। ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট সকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর লিটল বয় নামের নিউক্লীয় বোমা ফেলে এবং এর তিন দিন পর নাগাসাকি শহরের ওপর ফ্যাট ম্যান নামের আরেকটি নিউক্লীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

অনুমান করা হয় যে ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান।  নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন।  জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ এবং নাগাসাকিতে ১৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ।

জাপান আত্মসমর্পণের পেছনে এই বোমাবর্ষণের ভূমিকা এবং এর প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অধিকাংশের ধারণা এই বোমাবর্ষণের ফলে যুদ্ধ অনেক মাস আগেই সমাপ্ত হয়ে যায়। যার ফলে পূর্ব-পরিকল্পিত জাপান আক্রমণ সংঘটিত হলে উভয় পক্ষের যে বিপুল প্রাণহানি হত, তা আর বাস্তবে ঘটেনি। অন্যদিকে জাপানের সাধারণ জনগণ মনে করে এই বোমাবর্ষণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, কেননা জাপানের বেসামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধ থামানোর জন্য গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল।

জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে নভেম্বরে দ্য গ্রেট আর্টিস্টকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত রসওয়েল আর্মি বিমান ঘাঁটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর একটি প্রশিক্ষণ মিশনের জন্য গুস বে বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের সময় এর ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলে এটি ক্র‍্যাশ ল্যান্ডিং করতে বাধ্য হয়। এসময় বিমানটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এটিকে আর মেরামত না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং ১৯৪৯ সালে একে একেবারে ভেঙে ফেলা হয়। বর্তমানে ৫০৯তম অপারেটিং গ্রুপের সদরদপ্তর হোয়াইটম্যান বিমান ঘাঁটিতে একটি বি-২৯ কে দ্যা গ্রেট আর্টিস্টের মতো রংকরে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে।