ঢাকা, রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ছিটমহলের ভিতরে আরেক ছিটমহল

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ বুধবার, ০৮:২৩ এএম
ছিটমহলের ভিতরে আরেক ছিটমহল

ছোট্ট একটা ঐতিহাসিক ঘটনা দিয়ে লেখাটা শুরু করবো। কোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ মূলত ছিল সামন্ত। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, ছিল ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মহলের বিনিময়। বলা হয়ে থাকে, সেই মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তার পাড়ে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশ্যে। খেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। খেলায় হারজিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতো। সাথে সাথে বদলাতো সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানা। এভাবেই নাকি সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্য রাজ্যের ছিট মহল।

বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে বৃহত্তর রংপুরের উত্তরে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা। বাংলাদেশের সর্ব-উত্তরের চারটি জেলা: পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম। সাধারণভাবে বললে, ছিটমহল হচ্ছে কোন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদ। ছিটমহল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ওখানে যেতে হলে অন্য দেশটির জমির উপর দিয়ে যেতে হয়।

১৯৯৬ সালে কলকাতায় তখনকার বিডিআর ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। পরে ১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল চূড়ান্ত হয় সরকারীভাবে নির্ধারিত ছিটমহলের যার মোট সংখ্যা ১৬২। 

একদিকে ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। এগুলো প্রশাসনিক দিক থেকে   লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানার অন্তর্গত। এদের মধ্যে লালমনিরহাটের আওতায় ৩৩টি ও কুড়িগ্রামের আওতায় রয়েছে ১৮টি ছিটমহল। ভৌগলিক দিক থেকে এদের ৪৭টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কুচবিহার জেলার অভ্যন্তরে এবং ৪টি জলপাইগুড়ি জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত।

অপরদিকে বাংলাদেশের ভেতরে ভারতের রয়েছে ১১১টি ছিটমহল। এগুলোর মধ্যে পঞ্চগড় জেলার সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ থানায় মোট ৩৬টি, নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় ৪টি, লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম থানায় মোট ৫৯টি এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানায় মোট ১২টি ছিটমহল অবস্থিত। প্রশাসনিক দিক থেকে এগুলি সবই ভারতের কুচবিহার জেলার অন্তর্গত। তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতের মোট ছিটমহলের আয়তন ২৪ হাজার ২৬৮ একর। 

ছিটমহলগুলোতে সম্প্রতি শুমারি অনুষ্ঠিত হলেও তার ফল সরকারীভাবে অপ্রকাশিত রয়েছে। বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ৭ হাজার ১১০ একর এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭০ হাজারের মত। অন্যদিকে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ১৭ হাজার ১৫৮ একর এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ লক্ষের মত। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের কয়েকটি বড় ছিটমহল রয়েছে যেগুলির ভেতর আবার বাংলাদেশের মালিকানাধীন ছিটমহল আছে। কুড়িগ্রামে ভারতের ছিটমহল দাশিয়ারছড়া। দাশিয়ারছড়ার ভেতরেই আছে চন্দ্রখানা নামের বাংলাদেশের ছিটমহল। তেমনই কুচবিহারেও সম্ভবত বাংলাদেশের এমন ছিটমহল আছে যার ভেতর আবার আছে ভারতের ছিটমহল। অর্থাৎ একদেশের ছিটমহলের ভেতর অন্যদেশের ছিটমহলের অস্তিত্বও রয়েছে। 

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ইংরেজরা এই ছিটমহলগুলিসহ এভাবেই ভারত ও পাকিস্তান সীমানা এঁকে ও জমি বণ্টন করে দিয়ে যায়। কিন্তু তারা কেন এরকমটি করলো তার কারণটি ইতিহাসের দিক থেকে আরও পুরনো। যদিও এর অতীত মোগল আমল পর্যন্ত বিস্তৃত।

ছিটমহলের ইতিহাসের শুরু রংপুর অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পর। আকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ ষোল শতকে রংপুর অঞ্চলের কিছু অংশ জয় করে। সতের শতকে এই পুরো অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ঘোড়াঘাট ‘সরকার’এর অধীনে ন্যস্ত হয়। অর্থাৎ তখন রংপুর অঞ্চল মোগলদের অধীন এবং তার উত্তরে স্বাধীন কোচ রাজার রাজ্য। যে কোচ রাজাদের ছিটমহল নিয়ে গল্প প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে। 

ছিটমহলবাসীরা বাস্তবে নিজদেশে পরবাসী। তাদের নাগরিকত্ব কার্যত নামমাত্র নাগরিকত্ব। নিজেদের মূল দেশের সাথে তাদের যোগাযোগ নেই। এ যেন ক্যাম্প-বন্দি জীবন। দেশের পরিচয়ে তারা বাংলাদেশের মানুষ, অথচ থাকতে হয় ভারতের ভেতর। আবার তারা ভারতের মানুষ, বসবাস বাংলাদেশের ভেতর। কিন্তু বাস্তবে এরা দেশহীন, নাগরিকত্বহীন। বাস্তবে এরা যাপন করছে ‘ছিটের মানুষ’ পরিচয় নিয়ে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থারগুলোরও কোন তৎপরতা সেখানে নেই। শিক্ষা, চিকিৎসা, পানীয়জল, রাস্তাঘাট, যানবাহনের তেমন কোন সুযোগ-সুবিধা সেখানে নেই; নেই ব্যাংক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পাকা সড়ক, সেতু, হাটবাজার ইত্যাদি। ছিটমহলগুলোতে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই। সেখানকার ৯০ শতাংশের বেশী মানুষ অক্ষর জ্ঞান শূন্য। অবহেলা, অবিশ্বাস আর হয়রানি তাদের নিত্যসঙ্গী। অবরুদ্ধ জীবন যাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার কষ্ট, সব মিলে দীর্ঘশ্বাসে ভরা অনিশ্চিত তাদের জীবন।  

ইংরেজের কাজ ইংরেজ করেছে। করে চলেও গিয়েছে। কিন্তু সমস্যা তো আমাদের, জাতিগতভাবে আমাদের নিজেদের স্বজনদের নিয়েই তো এই সমস্যা। কিন্তু কোন নির্মম প্রাণহীনতা নিয়ে আমরা দু’দেশের মূল ভূখণ্ডবাসীরা যে তাদের এতকাল উপেক্ষা করে চলেছি সে দায় আমাদের উপর থেকেই যাচ্ছে। একজন মানুষের নিরাপত্তাহীনতার দায়ও সমস্ত জাতির উপর বর্তায়। যাদের রাষ্ট্র থেকেও রাষ্ট্র নেই তাদের জীবনে আছে কী?