ঢাকা, রোববার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ভালোবাসায় হোগলে আটকে গেলেন রহিমা খাতুন

তৌহিদ নাজমুল
প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সোমবার, ০৮:১৩ এএম
ভালোবাসায় হোগলে আটকে গেলেন রহিমা খাতুন

প্রেমে যদি মজে মন, কিবা হরি কিবা ডোম। এটি একটি প্রবাদ বাক্য। ভালোলাগা আর ভালবাসা হচ্ছে এমন এক জিনিস তা মানেনা কোন বাধা বারণ। আর তাই যুগে যুগে আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে হাজারো প্রেম কাহিনী। শিরি-ফরহাদ, লাইলি-মজনু, রোমীয়-জুলিয়েট, চন্ডিদাস-রজোকিনি সহ অসংখ্য প্রেম কাহিনী আমাদের জানা আছে সবারই। প্রেমের টানে সংসার ত্যাগি হয়েছেন অনেকেই, আবার প্রেমে ব্যর্থ আত্ম হননের ঘটনাও আমাদের সমাজে কম নয়। কম নয় ভালবাসার মানুষের টানে দেশ, সমাজ, ধর্ম উপেক্ষা করে একেবারেই ভিন দেশে, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে জীবন পার করার ঘটনাও। আজ তেমনি এক বিরল প্রেমের সত্য কাহিনী শোনাবো আপনাদের।   

বিরল এই ভালোবাসার গল্পের প্রেমিক আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস হোগল আর প্রেমিকা বাঙালি নারী রহিমা খাতুন। যে প্রেমিক তার প্রেমের টানে এখন একযুগ ধরে বাংলাদেশি নারীর সঙ্গে সুখে শান্তিতে ঘর সংসার করছেন যশোরের কেশবপুরের মেহেরপুর গ্রামে। যে সংসারে নেই কোন অভাব, অনটন, সুখ শান্তির কমতি। আছে শুধু বিশ্বাস, ভালবাসা আর ভালবাসা। যে ভালবাসার কাছে হার মেনেছে পৃথিবীর সবকিছু। আসুন প্রথমেই গল্পের প্রধান দুই চরিত্রের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই।

প্রথমে রহিমা খাতুন। যশোরের কেশবপুরের মেহেরপুর গ্রামের মেয়ে রহিমা খাতুনের ছিল অভাব, অনটনের সংসার, আর তাই অভাবের তাড়নায় শৈশবেই বাবা আবুল খাঁ ও মা নেছারুন নেছার হাত ধরে পাড়ি জমান ভারতে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে। সেখানে রহিমা খাতুনের মা অন্যের বাড়িতে কামিন খেটে আর বাবা আবুল খাঁ শ্রম বিক্রি করে সংসার চালাতেন। আর রহিমা সেই শৈশবে বারাসাতের বস্তিতে একা থাকতেন। রহিমার বয়স তখন তের কি চৌদ্দ বছর। অভাবের সংসারে যখন তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো ঠিকমতো পুরন হচ্ছিলনা তখন ঐ তের কি চৌদ্দ বছর বয়সেই রহিমার পরিবার তাকে বিয়ে দিয়ে দেন।

এবার পরিচয় করিয়ে দেব  আমাদের গল্পের আরএক প্রধান চরিত্র আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস হোগলের সাথে। ক্রিস হোগলের বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে,পেশায় তিনি একজন পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার। হোগল মুম্বাইয়ের অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ন্যাচারাল রিসোর্সেস লিমিটেড কোম্পানিতে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকুরী করতেন। 

আমাদের প্রধান দুই চরিত্রের পরিচয় মোটামুটি এটুকুই। এবার আসুন জানা যাক এই ভিনদেশী দুই চরিত্রের মিলন কিভাবে হল। আর এটা জানার জন্য আবার আমাদের ফিরে যেতে হবে রহিমা খাতুনের বিবাহিত সংসারে। 

রহিমা খাতুন একজন পরিশ্রমী নারী। শত অভাব অনটনের মাঝে না খেয়ে না পরে তিলে তিলে টাকা জমিয়ে কিছু জমিও ক্রয় করেন শ্বশুরালয়ের পাশেই। রহিমা খাতুন ততোদিনে তিন সন্তানের জননী। কিন্তু অভাবের তাড়নায় তার স্বামী সেখানকার জমি বিক্রি করে দেন। এবং রহিমা খাতুনকে একা ফেলে একদিন তার স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে যান, এবং আর কখনোই ফিরে আসেননি। তিন তিনটি সন্তান নিয়ে ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন হন রহিমা খাতুন, আর সেই বাস্তবতাকে মোকাবেলা করতে একদিন পাড়ি জমান ভারতের মুম্বাই শহরে এবং আশ্রয় হয় পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির বস্তির খুপরিতে। সেখান থেকে রহিমা ঘুরে ঘুরে কাজের সন্ধান করতেন। এরকমই একদিন কাজের সন্ধানে রহিমা যখন হাটছিলেন মুম্বাইয়ের রাস্তায়। এদিকে জীবিকার তাগিদে ভারতের মুম্বাই শহরেই থাকতেন ক্রিস হোগল। আর সেদিন সেই রাস্তায় ঘটনাক্রমে রহিমার সঙ্গে দেখা হয় ক্রিস হোগলের। রহিমা হঠাৎ খেয়াল করলেন একজন মানুষ অদ্ভুত এক প্রেম পূর্ণ  দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। তারপর সংকোচ নিয়ে এগিয়ে আসলেন তার দিকে। ক্রিস হোগল বাংলা বলতে পারতনা, আর রহিমা পারতোনা ইংরেজি বলতে। ততক্ষনে দুজনার দুজনকে ভালো লেগে গেছে প্রথম দেখাতেই। তাই ভাষা আর কোন বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনি তাদের মাঝে। কেবলমাত্র আধ ভাঙ্গা হিন্দি হয়ে গেল দুজনার ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। দুয়েক লাইন হিন্দিতে কথা বলার পর তারা বুঝতে পারে তাদের আবার দেখা করতে হবে এবং সেভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা বিদায় নেন।

এভাবে ছয় মাস আধ ভাঙ্গা হিন্দি আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে দেখা করার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করার। সেই সিদ্ধান্তে একদিন তারা বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। হোগল রহিমার পরিচয়ের আর দাম্পত্যের শুরুটা এভাবেই। বিয়ের তিন বছর পর কর্মসূত্রে ক্রিস হোগল স্ত্রী রহিমাকে নিয়ে চলে যান চীনে। সেখানে পাঁচ বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পরে ফিরে আসেন তারা কেশবপুরের মেহেরপুরে রহিমা খাতুনের বাবার ভিটায়।

মেহেরপুরে ফিরে আসার পর রহিমা খাতুনের বাবা আবুল খাঁ বার্ধক্য জনিত কারণে মা’রা যান। বাড়ির উঠানের পাশে তাকে ক’বর দেওয়া হয়। মোজাইক পাথর দিয়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ করে বাবার কবর সংরক্ষণ করেন তারা। রহিমার মা নেছারুন নেছা এখনও জীবিত। রহিমার প্রথম স্বামীর তিনটি সন্তান এখন তাদের সঙ্গেই থাকে। আর এভাবেই চলছে ক্রিস হোগল ও রহিমার সুখের সংসার।

 হোগল এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কৃষিকাজ। নিজেই নিজের জমিতে ধান চাষ করেন, ধান কাটেন, বোঝা টেনে নিয়ে ধান তোলেন ভ্যানে। এভাবেই ভালবাসায় আবদ্ধ দুটি প্রান যশোরের কেশবপুরের মেহেরপুর গ্রামে তাদের দাম্পত্য অতিবাহিত করছেন।

আর অবাক হয়ে এলাকার মানুষ দূর থেকে হোগল আর রহিমার বাঙালি অবাঙালির সুখের সংসার দেখেন। তারা আরও দেখেন একজন অবাঙালির প্রতিদিন একটু একটু করে বাঙ্গালি হয়ে ওঠার দৃশ্য। বিস্মিত হয়ে তারা আরও দেখেন ভালোবাসা মানুষকে কীভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

বিষয়: রহিমা , বিদেশি ,