ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩০ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মহাস্থানগড়ের ঐতিহ্যবাহি খাবার কটকটি

মো: মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২১ বুধবার, ০৮:০২ এএম
মহাস্থানগড়ের ঐতিহ্যবাহি খাবার কটকটি

মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। এক সময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা হয়। মহাস্থানগড়ের অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় ।বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কি.মি. উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গেলে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। 

বগুড়ার এই প্রাচীন পুরাকীর্তির একটি ঐতিহ্যবাহি খাবারও রয়েছে। আর তা হলো মহাস্থানগড়ের কটকটি। এটি কটকটি শুধু বগুরাবাসী নয় সারা দেশের মানুষের কাছেই অনেক পছন্দের একটি খাবার। বিশেষ করে যারা মহাস্থানগড়ে ঘুড়তে যান তারা কোনো সময় এই কটকটি নিয়ে আসতে ভুল করেন না। 

কটকটি মূলত চারকোনা বিস্কুট আকৃতির শুকনো মিষ্টান্নজাতীয় খাবার। বগুড়ার দই-এর যেমন খ্যাতি রয়েছে ঠিক তেমনি মহাস্থানগড়ের এই খাবারটির রয়েছে আলাদা খ্যাতি। উনিশ শতকের দিকে গুড়ের তৈরী এই মিষ্টান্নজাতীয় খাবারের যাত্রা শুরু হয়ে আজও তার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। 

খাবারটির নাম কেন কটকটি রাখা হলো এর সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও খেতে কটকট শব্দ হয় বলে এর নাম কটকটি হয়েছে বলেই অনেকে মনে করেন। আগে কটকটি বেশ শক্ত ছিল। এখন অনেকটাই নরম করে বানানো হয়। তাই কটকটি খেতে গিয়ে এখন আগের মতো তেমন কটকট শব্দও পাওয়া যায় না।

উনিশ শতকের দিকে বগুড়া সদর উপজেলার গোকূল ইউনিয়নের পলাশবাড়ী উত্তরপাড়া গ্রামের জয়নাল আলী মন্ডল, ভোলা মন্ডল ও গেদা মন্ডলের হাতেই কটকটির জন্ম বলে অনেকে জানান। জীবিকার তাগিদে নিজ বাড়িতে একেবারে সাধারণভাবে গমের আটা দিয়ে কটকটি বানিয়ে মহাস্থান, শিবগঞ্জ, মোকামতলাসহ এলাকার বিভিন্ন হাটে বিক্রি করতে শুরু করেন তারা। ধীরে ধীরে এই সুস্বাদু মিষ্টিজাতীয় খাবারটি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। 

প্রথম দিকে কটকটি বানানো হতো গমের আটা দিয়ে। পরে স্বাদ ও মান বাড়াতে বানানোর পদ্ধতি ও উপকরণে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আগে কটকটি ভাজাতে তেল ব্যবহার হলেও এখন ঘি বা ডালডা ব্যবহার করা হয়। কটকটি তৈরি হয় কয়েক ধাপে। এর প্রধান উপকরণ সিদ্ধ সুগন্ধি চাল। চাল পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। একেবারে নরম হলে সেই চাল ছেঁকে শুকানোর জন্য রেখে দিতে হয় প্রায় পনেরো মিনিট। পানি শুকিয়ে গেলে ঢেঁকি, মেশিন বা অন্য উপায়ে একেবারে মিহি আটায় রূপান্তর করা হয়। এই আটার সঙ্গে মেশাতে হয় বিভিন্ন মসলা, সয়াবিন তেল। ভালোভাবে মিশিয়ে গাঢ় করে খামির করা হয়। এরপর আকৃতির জন্য আগে থেকে তৈরি করে রাখা ছাঁচ দিয়ে কেটে নিতে হয়। এরপর বড় কড়াইয়ে ভোজ্য তেল, ঘি বা ডালডার সংমিশ্রণে ভাজা হয়। লালচে রং ধরা পর্যন্ত চলে ভাজাভাজির পর্ব। ভাজা হয়ে গেলে গুড়ের রসে ভাজা কটকটি ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর ঠান্ডা হয়ে গেলেই খাওয়ার উপযোগী হয় স্বাদের কটকটি।

মহাস্থান বাজারে কটকটিকে কেন্দ্র করে প্রায় এক’শ টির বেশি দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকানের কোনোটিতে প্রতিদিন দুই থেকে সাত মণ কটকটি বিক্রি হয়। আকৃতিতে খুব একটা পার্থক্য দেখা না গেলেও স্বাদে একটির সঙ্গে আরেক দোকানের তফাত রয়েছে। অবশ্য উপাদানের ভিন্নতার জন্য যেমন স্বাদে আলাদা, তেমনি দামেও রয়েছে রকমফের। ৮০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় কটকটি।

প্রাচীনতম রাজধানী মহাস্থান গড়, বেহুলার বাসর ঘর, শাহ সুলতান বলখির মাজার সংলগ্ন দোকান সমুহে প্রসিদ্ধ কটকটি পাওয়া যায়। তাছাড়া বগুড়া শহরের চেলোপাড়ায় মহাস্থানের কটকটি পেতে পারেন। স্বাদে দারুণ এই কটকটি আপনার মুখে লেগে থাকবে এটি নিশ্চিত।