ঢাকা, সোমবার, ১০ মে ২০২১, ২৭ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ঐতিহ্যের সাক্ষী পাবনার জোড় বাংলা মন্দির

মো. মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার, ০৮:০৪ এএম
ঐতিহ্যের সাক্ষী পাবনার জোড় বাংলা মন্দির

পাবনা জেলা সুপ্রাচীনকাল থেকে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। এই জেলায় অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। রয়েছে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও।বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি অন্যতম নিদর্শন পাবনা জেলা সদরের রাঘবপুরে অবস্থিত জোড় বাংলা মন্দির। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, জোড় বাংলা মন্দিরটি ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়াও এটাও প্রচলিত যে, মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন, ব্রজমোহন ক্রোড়ী নামক একজন যিনি মুর্শিদাবাদ নবাবের তহশীলদার ছিলেন। তবে মন্দিরটি আবিষ্কারের সময় কোন শিলালিপি পাওয়া না যাওয়ায় এর সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় না।

নির্মাণ কৌশলে দিনাজপুরের কান্তনগর মন্দির এর সঙ্গে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। মন্দিরটির উপরের পাকা ছাদ বাংলার দোচালা ঘরের চালের অনুরূপ। পাশাপাশি দু’টি দোচালা ঘরের ছাদকে এক সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে মন্দিরের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদের মধ্যভাগ বেশ উঁচু হলেও ছাদের ধার উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ক্রমশ ঢালু হয়ে গেছে। 

ইটের বেদীর উপর নির্মিত মন্দিরের সামনে অংশে তিনটি প্রবেশ পথ এবং পথের দুই পাশে দুটি বিশাল স্তম্ভ রয়েছে। এই প্রবেশপথ এক সময় মন্দিরের অন্য অংশের মত টেরাকোটার কারুকার্য্যে পূর্ণ ছিল। জোড় বাংলা মন্দিরের দেয়ালের নকশা এবং টেরাকোটার কাজ দিনাজপুর জেলায় অবস্থিত কান্তজীউ মন্দিরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। মন্দিরের পেছন অংশে মন্দির থেকে বের হবার রাস্তা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পাবনা জোড় বাংলা মন্দিরের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করছে।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্পে মন্দিরের যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়। তাছাড়া কালের পরিক্রমায় মন্দিরটি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।কালাচাঁদপাড়ার অবস্থান পাবনা শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্বদিকে। রাঘবপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্বকীয় সত্ত্বা নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে জোড় বাংলা মন্দির। কালাচাঁদপাড়া মহল্লায় এই মন্দিরটি আছে বলে স্থানীয়রা এই পাড়াকে জোড় বাংলা পাড়া বলেও চেনে।

পাবনার জোড় বাংলা মন্দিরে বর্তমানে পূজা অর্চনা করা হয় না। তবে কারো কারো মতে পূর্বে এখানে নিয়মিত পূজা হতো। অভ্যন্তরে গোপীনাথের মূর্তি, রাধা- কৃষ্ণের মূর্তি ছিল। অন্যমতে এই মন্দিরের অভ্যন্তরে কখনো পূজা অর্চনা হতো না। এটি কেবল পরিত্যক্ত স্থাপনা কিংবা মঠ হিসেবেই দাঁড়িয়ে ছিল খোলা স্থানে। তবে স্বীকার করতে হবে যে, এই মন্দিরটি ভাস্কর্য শিল্পের উজ্জ্বল উদাহরণ। কারণ মন্দিরটির নির্মাণশৈলী তাই বলে।

মন্দিরটি আকার আকৃতিতে ছোট হলেও পোড়া মাটির ইট দিয়ে কারুকার্য খচিত নকশা দারুণভাবে আকর্ষণ করে দর্শনার্থীদের। ইমারাতের ভেতরের রুমগুলো বেশ অপ্রশস্ত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর অনাদরে-অবহেলায় পড়ে ছিল এই মন্দির। যার ফলে মন্দিরের হাবভাব, মেজাজ, কারুকার্যের বেশ পরিবর্তন হয়ে যায়। পরবর্তীতে পাবনার জেলা প্রশাসকের প্রচেষ্টায় ১৯৬০ সালে এই মন্দিরের আমূল সংস্কার করা হয়।

পাবনার ‘জোড় বাংলা মন্দির’ গোপীনাথের মন্দির বলেও পরিচিত ছিল। এখন আর এই নামে কেউ চেনে বলে মনে হয় না। অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও মন্দিরের কারুকাজে যেন কিছু একটা নিহিত রয়েছে। এই মন্দিরটি ইতিহাস ও সময়ের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক একবারের জন্য হলেও এই মন্দির দেখতে আসে। কারণ এটি সপ্তদশ শতক কিংবা আঠারো শতকের স্থাপত্যশৈলী নিয়ে আজও উজ্জ্বল রয়েছে।

কিভাবে যাবেন:
জোড় বাংলা মন্দিরটি পাবনা শহর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটারের দূরে রাঘবপুরে অবস্থিত। দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে পাবনা এসে ২০ থেকে ২৫ টাকা রিকশা ভাড়ায় করে ঘুরে জোড় বাংলা মন্দির আসতে পারবেন।এছাড়া রাজধানী ঢাকার গাবতলি টেকনিক্যাল মোড় থেকে পাবনা আসার বেশকিছু বাস ছেড়ে যায়। এসমস্ত পাবনাগামী নন-এসি এবং এসি বাসের মানভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৪০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা।

থাকার ব্যবস্থা:
ঢাকা থেকে পাবনা গিয়ে একদিনে ফেরা কঠিন। তাই ‘জোড় বাংলা মন্দির’ দেখতে যেতে হলে সেখানে থাকতে হবে। পাবনায় কোনো আত্মীয় থাকলে তার বাসায় উঠতে পারবেন। যদি কোনো আত্মীয় না থাকে তবে পাবনা শহরের আবাসিক হোটেলে আপনি রাত্রিযাপন করতে পারবেন। পাবনায় বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেল শিলটন, হোটেল পার্ক, প্রাইম গেস্ট হাউজ, ছায়ানীড় হোটেল ইত্যাদির যেকোনো একটিকে বেছে নিতে পারবেন।

বিষয়: জোড়-বাংলা