ঢাকা, সোমবার, ১০ মে ২০২১, ২৭ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

ফুটো জাল ও কুমিরের গল্প

মাহাবুব মোর্শেদ রিফাত
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২১ রবিবার, ০৮:০৪ এএম
ফুটো জাল ও কুমিরের গল্প

বৃহস্পতিবার রাত। সারা সপ্তাহের নানান কাজের চাপ সামলে লাইট নিভিয়ে বেডরুমে বসলেন জম্পেস এক সিনেমা দেখতে। হাতে পপকর্ন, কফিসহ যাবতীয় আয়োজন। সিনেমা শুরু হলো। জনৈক এক দেশের স্বাধীনতা দিবস আগামীকাল। দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ব্যস্ত স্বাধীনতা দিবসের অতিথীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের সব আয়োজনে। গোটা দেশের সব স্থাপনা আর ভিভিআইপিদের ঢেকে দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তার চাঁদরে। পরদিন স্বাধীনতা দিবসের সূর্য উঠলো। দেশ সেজেছে উৎসবের সাজে। স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে গোটা দেশে। 

ঘড়িতে তখন সকাল ০৬.৪৫। দেশটির পুলিশ কন্ট্রোল রুমে একের পর এক কল আসতে শুরু করলো। ঘটনা বেশ ভয়াবহ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন অস্ত্রধারী দুইজন মুখোশ পরিহিত অজ্ঞাত লোক অস্ত্রের মুখে বাড়ির বাসিন্দাদের জিম্মি করে লুটে নিয়েছেন টাকা পয়সা, সোনাদানা সহ সব সম্পদ। কন্ট্রোল রুমে কল বাড়তেই থাকলো। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে ১০,২০,৩০ ছাড়িয়ে ডাকাতির অভিযোগের সংখ্যা গিয়ে দাড়ালো হাজারে। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে দেশজুড়ে ১০০০ ডাকাতি। পুলিশ প্রধান ডাকলেন সবাইকে, একে একে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন ঘটনার সময় কে কোথায় কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। জানা গেলো সবাই কোনো না কোনো ভিভিআইপি আর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ছিলেন। এই সুযোগটাই নিয়েছে ডাকাতরা। দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারীরা বড় জাল বিছিয়ে রেখেছিলেন ঠিকই কিন্তু ছেড়া জালের ফাক দিয়ে ঢুকে গেছে বিশাল কুমির। লুটে নিয়েছে ১০০০ মানুষের সবকিছু।

এটা ছিলো সিনেমার একটি বানানো গল্প, এবার বাস্তবতায় আসা যাক। গত বছরের মার্চের ১৮ তারিখ প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ধরা পড়ে বাংলাদেশে। এরপরে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার একে একে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে থাকে এবং করোনার বিস্তার রোধে সরকার অনেকটাই সফলতার মুখ দেখে। সারাদেশে দ্রুতমত সময়ের মধ্যে কোভিড হাসপাতাল স্থাপন, করোনা শনাক্তের ব্যবস্থা গ্রহণ সহ ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের নিরলস পরিশ্রমে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করে করোনা মহামারীর বিস্তার। 

এসবের পাশাপাশি ছিলো অব্যবস্থাপনাও। ভুয়া করোনার সার্টিফিকেট, করোনার সময়ে গরিবের খাবার লুট, ভুয়া টেস্ট রেজাল্ট, করোনা নিয়ন্ত্রণের সার্বিক অব্যবস্থাপনায় আসতে পারে আরো অনেক ঘটনা। করোনায় ক্ষতগ্রস্থ মানুষদের জন্য নানান প্রণোদনা আর আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি ওই সময়টাতে সরকার চেষ্টা করেছে করোনা নির্মুলেও। অন্য অনেক দেশের চাইতেও দ্রুততম সময়ে সরকার করোনা ভাইরাসের টিকার ব্যবস্থা করেছে। প্রথম ডোজ শেষে দেশে চলছে দ্বিতীয় ডোজ প্রদান। সরকার এতো এতো ব্যবস্থার জাল বিছিয়ে করোনাকে আটকে রাখার চেষ্টা করলেও ফোঁকর রয়েই গিয়েছিলো। এই জালের ফুটো হচ্ছি আমরা, দেশের সকল জনগণেরা। গত বছরের লকডাউনের সময় পুলিশ, আর্মি থেকে শুরু করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সবাই মিলে চেষ্টা করেছে মানুষকে ঘরে রাখতে, মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে। কিন্তু ওই সময়টাতেও আমরা দেখেছি মানুষের উদাসীনতা, মানুষ সাধারণ ছুটি পেয়ে ঘরে থেকে করোনার বিস্তার ঠেকানোর পরিবর্তে ছুটে গিয়েছে বিভিন্ন টুরিস্ট স্পটে, মানুষ লাইন ধরেছে সাজাকের পাহাড়ি রাস্তায়। একইসাথে দেশজুড়ে লেগেছিলো বিয়ের ঢেউ, সভা সমাবেশ আর সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে নানা ধরনের আয়োজন তো ছিলোই। 

প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই বলতেন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সম্পর্কে। সেভাবে সেফটি প্ল্যান সাজানো ছিলো হয়তো সরকারের। কিন্তু ঢাল তলোয়ার রেডি রেখে যাদের রক্ষায় এই আয়োজন তারাই ডেকে আনলাম সর্বনাশ। করোনা সংক্রমণ একটু কমতে শুরু করলে মানুষ আবারো মেতে উঠলো যেন উৎসবে। ধীরে ধীরে মানুষের মুখ থেকে সরতে লাগলো মাস্ক, স্যানিটাইজার আর সাবান ব্যবহার তো ভুলেই গেলাম আমরা। একপক্ষ আবার করোনার টিকা আগমনে শক্তিশালী হয়ে উঠলো আওয়াজে আর গর্জনে। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো জালের ফুটো, আমরা শক্তিশালী হবার পরিবর্তে শক্তিশালী হয়ে উঠলো করোনা। অপেক্ষা করতে লাগলো মরণ কামড় দেবার।

অবশেষে আসলো সেই মরণ কামড়। শুরুতে বলা সিনেমার সেই গল্পটার মতোই অল্প সময়েই কাজের কাজটা সেরে ফেললো করোনা ভাইরাস। মৃত্যু আর আক্রান্তের ভীড়ে দিশেহারা দেশ আবার পড়লো লকডাউনের কবলে। যেই লকডাউন অবশ্যই অর্থনীতি আর খেটে খাওয়া মানুষের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। কিন্তু যদি আমরা একটু সচেতন থাকতাম, সহায়তা করতাম করোনা মোকাবেলায়, মেনে চলতাম সঠিক স্বাস্থ্যবিধি তাহলেই হয়তো করোনা পুরোপুরি নির্মুল করে দেশের সবাই মিলে হাসতে পারতাম বিজয়ীর হাসি। অবহেলা, উদাসীনতায় ডেকে আনা কুমিরের সাথে একই জালে আটকে যাওয়া এই জাতিকে হয়তো এখন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে রক্ষা করতে পারেন।