ঢাকা, রোববার, ১৮ এপ্রিল ২০২১, ৫ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

আড়াই`শ বছরেও দেশসেরা বগুড়ার দই

মো. মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২১ রবিবার, ০৮:০৯ এএম
আড়াই`শ বছরেও দেশসেরা বগুড়ার দই

বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো। সারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে যদি কোনো বাঙালিকে বলা হয় বাংলাদেশে বগুড়া কিসের জন্য বিখ্যাত, তাহলে এক নামে বলবে বগুড়ার দই।

বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয় বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে। স্থানীয়দের মতে সনাতন ঘোষ সম্প্রদায় দই তৈরি করে বগুড়াকে দেশের সর্বত্র পরিচিত করে তুলেছিল। তবে সেই ঘোষদের হাতে এখন আর দইয়ের বাজার নেই। এটি চলে গেছে মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অধীনে।

জানা গেছে, বগুড়ার শেরপুরে প্রথম দই তৈরি হয় প্রায় আড়াইশ বছর আগে। তবে এর স্বর্ণযুগ ছিল স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে। ১৯৪৭ সালে গৌর গোপাল ভারত থেকে বগুড়া আসেন পরিবার নিয়ে। বগুড়া থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বর্তমানে শেরপুর উপজেলা সদরে তার আত্মীয়স্বজনের কাছে আশ্রয় নেন। দই বানানোর পদ্ধতিটা তারই জানা ছিল। শুরু করেন দইয়ের ব্যবসা। শেরপুর থেকে দই বানিয়ে হেঁটে ভাড়ে করে আনতেন বগুড়া শহরের বনানী এলাকায়। দইয়ের সঙ্গে তিনি বানাতেন সরভাজা। এ সরভাজা এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়, ওই সময়ের জমিদারদের বাড়িতে সরভাজা সরবরাহের অর্ডার পেতে থাকেন গৌর গোপাল। সাধারণের মধ্যেও এ সরভাজার চাহিদা যায় বেড়ে। এ সরভাজাই গৌর গোপালকে এনে দেয় খ্যাতি। একটা সময় সরভাজাই সরার দই হয়ে খ্যাতির তুঙ্গে ওঠে। যে দইয়ের খ্যাতি বগুড়াকে পরিচিত করে দেশ ছেড়ে বিদেশেও। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

তারপর শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ দই তৈরি শুরু করেন। টক দই তৈরি থেকে বংশ পরম্পরায় তা চিনিপাতা (মিষ্টি) দইয়ে রূপান্তরিত হয়। আর কালের বিবর্তনে স্বাদের বৈপরিত্যের কারণে দইয়ের বহুমুখী ব্যবহারও শুরু হয়। টক দইয়ে যেমন মেজবানের রান্না হয়, তেমনি তৈরি হয় ঘোল। আর মিষ্টি দইয়ে চলে অতিথি আপ্যায়ন।

স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে এ দইয়ের প্রস্তুত প্রণালী ছিল অতি গোপনীয়। শেরপুরের বিশিষ্ট দই ব্যবসায়ী বৈকালী দই মিষ্টি ঘরের স্বত্বাধিকারী রাম প্রসাদ রাজভর এ প্রসঙ্গে বলেন, ঘোষরা যখন দই তৈরি করত তখন এর গোপনীয়তা রক্ষা করে চলত। যে কারণে বাইরের কেউ দই তৈরি করতে পারত না। তবে সেটিকে আর তারা ধরে রাখতে পারেনি। এখন শেরপুরেই প্রায় ৫০ জনেরও বেশি ব্যবসায়ী দই তৈরী করে। এদের মধ্যে মাত্র ৯-১০ জন ঘোষ পরিবারের লোক।

স্বাধীনতার পরে ক্রমান্বয়ে প্রতিটি জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করায় এ পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। দুধের বাজার আগে যে অবস্থায় ছিল এখন আর তেমনটি নেই। জ্বালানিরও একই অবস্থা। উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে এ পেশাটি।


তারপরেও ভোজন রসিকদের পেটপুরে খাওয়ানোর পরও যে জিনিসটি না দিলে খাওয়া অসম্পূর্ণই থেকে যায়, তা হলো বগুড়ার দই । এক নামেই তাকে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের মানুষ চিনে।

বগুড়ার দই বনেদী সুখ্যাতি পেয়েছে অনেক আগেই। তারপরেও সারা দেশে বগুড়ার পরিচিতি ধরে রেখেছে এ দই; বিশেষ করে সরার দই। যদিও এখন মাটির নানা ধরনের পাত্রে এ দই বসানো হয় তারপরও সরার দইয়ের কদর আছেই এবং থাকবে।

বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি সুবিদিত। তাই অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ে বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের মেহমানদারিতে বহুকাল ধরেই বগুড়ার দই একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশের অন্য জেলা কিংবা অঞ্চলে উৎপাদিত হলেও কিছু বিশেষত্বের কারণে ‘বগুড়ার দই’-এর খ্যাতি দেশজুড়ে।

দই তৈরিতে প্রয়োজন হয় হয় গরুর দুধ, চিনি, সামান্য পরিমাণ পুরোনো দই ও মাটির একটি হাঁড়ি বা সরা। কড়াই বা পাতিলে দুধ জ্বাল দেয়ার মাধ্যমে দই তৈরি করা হয়ে থাকে।