ঢাকা, শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিকোলাস বার্কলের রহস্যময় প্রত্যাবর্তন- একজন সিরিয়াল ইমপোস্টারের রহস্য কাহিনী  

আহনাফ তাহমিদ 
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২১ মঙ্গলবার, ০৮:০১ এএম
নিকোলাস বার্কলের রহস্যময় প্রত্যাবর্তন- একজন সিরিয়াল ইমপোস্টারের রহস্য কাহিনী  

আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে রহস্যময় অনেক ঘটনাই ঘটে। কিছু কিছু আমরা উদঘাটন করতে পারি, কিছু উদঘাটন করতে পারি না। সমস্যাগুলো খুব ভাবায়, চিন্তার উদ্রেক করে। বছরের পর বছর ফাইলের ওপর ধুলো জমে থাকা কেস ফাইলগুলোয় আরও একটিবারের মতো চোখ বুলিয়ে যাবার পর তদন্ত অফিসারও হয়ত আক্ষেপের নিঃশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ হয়ত অবসর নেবার পর সারাজীবন মানুষের কাছে গল্প করে বেড়ায় যে জীবনের অনেকগুলো রহস্যের মাঝে এই একটি রহস্যই সে উদঘাটন করতে পারলো না হয়ত। তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে স্বপ্নে, জাগরণে। আবার কিছু কিছু কেস আছে যেগুলো উদঘাটন করবার পর মানুষ তাজ্জব হয়ে যায়। ভাবে, এও কি সম্ভব? মানুষের এই জগত কতই না বিচিত্র! 

এমনই একটি রহস্যের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব আজ। তবে চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই। রহস্যের সমাধান হয়েছিল। তবে যার জীবনে এই নিদারুণ ট্র্যাজেডিটি ঘটে যায়, তার কোনো খোঁজ পুলিশ বের করতে পারেনি। চলুন, এবারে যাওয়া যাক আমাদের রহস্যের এই অভিযানে। 

ঘটনাটি জীবন বদলে দিয়েছিল ১৩ বছরের বালক নিকোলাস বার্কলের। ১৯৯৪ সালের ১৩ই জুন নিখোঁজ হয়ে যায় ছেলেটি। স্যান এন্টোনিওতে বন্ধুদের সাথে বাস্কেটবল খেলা শেষে সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সে সন্ধ্যা বার্কলের জীবনে আর আসেনি। বার্কলে পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান নিকোলাস। তিন ভাইয়ের মধ্যে এই ছোট ছেলেটিকে যেন বিপদ কখনও পিছুই ছাড়তে চায়না। যেচে পড়ে কিংবা অযাচিতভাবেই বিপদ তার সামনে পাহাড়সমান বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও আচরণগত নানা সমস্যার কারণে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে তাকে বুলিং (Bullying)-এর শিকার হতে হয়। ঘরে বাইরে কোনো জায়গাতেই বেচারার দাম নেই। মাঝে মাঝেই স্কুল কামাই দিয়ে অসৎ সঙ্গের সাথে গিয়ে মাদকদ্রব্য সেবন করত নিকোলাস। শিক্ষকেরা নালিশ করলে বাড়ির লোকজনের সাথে খারাপ ব্যবহার, এমনকি মাঝে মাঝে গাঁয়ে হাত তুলতেও কুণ্ঠাবোধ করত না কিশোর এই ছেলেটি। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে একাধিকবার বাইরে থাকার প্রবণতাও তার মাঝে ছিল। যেদিন পিতামাতার শাসনটা একটু বেশিই হতো, শাসাত সে এই বলে, “একদিন আমি নিখোঁজ হয়ে যাব। আমাকে খুঁজলেও আর পাবেনা।”

এমনই একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সে। কয়েকদিন বাইরে থাকবার পরই বাড়ির জন্য মন কেমন কেমন করতে শুরু করেছিল। থাকতে পারছিল না ছেলেটা। বাড়িতে ফোন করে ভাইকে জানাল যে একটি গাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হোক, তাকে এসে যেন বাড়িতে নিয়ে যায়। পাত্তা দিলো না ভাই। ‘নিজের পথ নিজে দেখে নাও’- বলে ফোন রেখে দিলো সে। মা ঘুমুচ্ছিল। তাকে ডেকে তোলারও কোনো প্রয়োজন বোধ করল না সে। এই ফোনকলের পর নিকোলাস থেকে আর কোনো সংবাদ পাওয়া গেল না। যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। অনেক খোঁজাখুজি করা হয়েছিল, বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল পত্রিকায়। কোথাও কোনো খোঁজ নেই ছেলেটার। কিছুদিন পর পরিবারও যেন অমোঘ নিয়তিকে মেনে নিয়ে অনুসন্ধান বন্ধ করে দিলো। আরেকটি মিসিং কেস ফাইল জমা হয়্যে থাকল পুলিশ ডিপার্টমেন্টে। তবে ঘটনার শেষ এখানেই নয় কিন্তু! 

তিন বছর পর বার্কলে পরিবারের কাছে একটি ফোনকল এলো। যে ফোন করেছে, সে দাবী জানাচ্ছে যে তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিকোলাস ফিরে এসেছে। এতগুলো দিন সে স্পেনে ছিল, হাতবদল হকরে বারবার তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে এবং দেশ থেকে দেশে চালান করে দেয়া হয়েছে। ড্রাগ রিং, মাফিয়া কার্টেল, পাচারকারী দল- এমন কোনো অপরাধ সংঘ নেই, যেখানে সে ছিল না। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় ঘটে ইউরোপিয়ান একটি অপরাধ চক্রে, যাদের কাজ ছিল শিশু ও নারীদের পাচার করে তাদেরকে দাসব্যবসায় নিযুক্ত করা, যৌনতা সম্পর্কিত নানা কাজে যুক্ত করা, এমনকি শিশু পর্ণোগ্রাফিতেও যুক্ত হতে হয়েছিল নিকোলাস বার্কলের পরিচয় দাবী করা এই কিশোরকে। 

বার্কলে পরিবার এবার আনন্দে আটখানা! হারানো সন্তান এতদিন পর ফিরে এসেছে। যে কোনো বাবা মায়ের বুকই আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। নির্ধারিত দিনে এয়ারপোর্টে গিয়ে সবাই অপেক্ষা করতে থাকল ঘর ছেড়ে থাকা সন্তানের জন্য। তবে বিমান অবতরণ করবার পর যখন এক্সিট ডোর দিয়ে নিকোলাস বেরিয়ে এলো, সবার মাঝেই কেমন যেন একটা খটকা লাগতে শুরু হলো। কোথায় নিকোলাস? এই কি তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিকোলাস বার্কলে? চেহারার সাথে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? যারাই দেখল নিকোলাসকে, সবার মনেই একটি প্রশ্ন উঠতে শুরু করল। এবার নিকোলাসের জবার দেবার পালা। নির্দ্বিধায় এবং দ্ব্যর্থ কণ্ঠে সে বলল যে নিকোলাসের পরিচয় নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধায় থাকবার দরকার নেই। সে-ই আসল নিকোলাস। তাকে যারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, চোখ এবং চুলে রাসায়নিকভাবে নানা পরিবর্তন এনে দিয়েছিল তারা। ঠিক আছে, তা না হয় মানা গেল। কিন্তু গলার স্বরে এমন পরিবর্তনের কারণ কী? নিকোলাসের গলার স্বর এভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেল কীভাবে? নিজের মাতৃভাষায়ও যেন ঠিক নিঃসঙ্কোচে কথা বলতে পারছে না সে। রাশভারী একটা ফ্রেঞ্চ একসেন্টে কথা বলে যাচ্ছে ক্রমাগত। প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হতে শুরু করল পরিচিতদের মনে। এতদিন পর ফিরে আসা ছেলেকে নিয়ে বাবা মায়ের উৎসাহে ভাটা পড়ল যেন। তবে নিকোলাস ক্রমাগতই চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল তার পরিচয়ের সত্যতা নিয়ে। 

বার্কলে পরিবারের কনিষ্ঠ ছেলের এই রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল প্রামাণ্যচিত্র তৈরির কাজে নেমেছিল। এই প্রোডাকশন দলের সাথে কাজ করছিল একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। কাছেও অনেক জিনিস খটকা লাগা শুরু হলো। অনেকদিন ধরেই বার্কলে পরিবারকে নিয়ে তদন্ত করে যাচ্ছে সে। পরিবারের সব সদস্যদের আচার ব্যবহার, ভঙ্গি রীতিমতো মুখস্থ তার। শুনতে শুনতে নিকোলাস কেমন হবে বা হতে পারে, তেমন একটি ধারণাও করে ফেলেছিল সে। তবে এ কে ফিরে এসেছে এই পরিবারে? কারও সাথেই তো তার কোনো মিল নেই। খুঁড়তে খুঁড়তে আরও কিছু প্রমাণাদি পেয়ে গেল সে। তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিকোলাস বার্কলের শরীরে এমন কিছু জন্মদাগ ছিল, যেগুলো ফিরে আসা নিকোলাসের শরীরে নেই। শারীরিক আরও নানা অসামঞ্জস্য দেখতে পেল সে। দেরি না করে তদন্তে নামল এবার এফবিআই। নব্বইয়ের দশকের পরে বহুরূপীদের আনাগোনা তখন অনেক বেশি, পুলিশের দপ্তরেও আগের সময়ের চাইতে মিসিং ফাইল কেস যেন একটু বেশিই এসে জমা হচ্ছিল। 
নকল নিকোলাসের কাছ থেকে কৌশলে তার আঙুলের ছাপ নিতে সক্ষম হলো গোয়েন্দারা। সেটি পরীক্ষা করবার পর তাদের চক্ষু চড়কগাছ। তিন বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিকোলাসের সাথে এই বহুরুপীর কোনো ধরনের শারীরিক মিল তো নেইই, বরং আশ্চর্যের কথা হচ্ছে এতদিনে নিকোলাসের বয়স হবার কথা ছিল ১৬। সেখানে এই বহুরুপীর বয়স ২৩! আস্তে আস্তে উদঘাটিত হলো পরিচয়। 

২৩ বছর বয়সী এই বহুরুপীর আসল নাম ফ্রেডেরিখ পিয়েরে বোর্দিন, জন্মগতভাবে একজন ফ্রেঞ্চ, পেশায় সিরিয়াল ইমপোস্টার। যার মানে হচ্ছে, মানুষের পরিচয় চুরি করে পিয়েরে সে ঐ পরিচয় ধারণ করে এবং পরিবারে গিয়ে ধনসম্পদ হাতিয়ে নেয়। কার্য সমাধা হয়ে গেলে বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিয়ে নতুন আরেকটি পরিচয় গ্রহণ করে বোর্দিন। তদন্ত করতে করতে আরও কিছু তথ্য জানতে পেরে পুলিশ হকচকিয়ে যায়। বোর্দিনের এই পর্যন্ত চুরি করা পরিচয়ের সংখ্যা কমসে কম ৫০০! এদের মাঝে তিনটি শিশুর পরিচয় নিজের মাঝে ধারণ করে সে তাদের পরিবারে গিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ১৯৯৮ সালে পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে পিয়েরেকে জেলে পাঠানো হয়েছিল এবং সেখানে সে ছয় বছর কারাবাসে দণ্ডিত হয়। 

তবে আফসোসের বিষয় হচ্ছে, সত্যিকারের নিকোলাস বার্কলে কোথায় আছে কিংবা আদৌ বেঁচে আছে কিনা, সেটি আজও পুলিশের কাছে একটি অমীমাংসিত রহস্য।