ঢাকা, শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

দফাদার সাহেবের গরু এলো ডিজিটাল হাটে 

আহনাফ তাহমিদ
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০২১ বুধবার, ১০:০০ এএম
দফাদার সাহেবের গরু এলো ডিজিটাল হাটে 

মুখ গোঁজ করে সামনে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চেয়ে আছেন জিয়া দফাদার। কিছুক্ষণ আগেই তার ছোট ছেলে নিয়ন বাবাকে শাসিয়ে গিয়েছে বারান্দায় যেন আর না যায়। কিছুক্ষণ পর পর রাস্তা দিয়ে প্রতিবেশীরা গরু হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নইলে পিক-আপে করে নিয়ে আসছে। তা দেখে জিয়া দফাদার পারলে গলা ছেড়ে যেন একটু কেঁদে বাঁচেন। 

‘ও বাবা! একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার হাটে!’ ছেলের দিকে তাকিয়ে সুর করে কাঁদেন জিয়া। 

‘একদমই না!’ নিয়ন চোখ পাকায়। এরপর নিজেই এগিয়ে এসে ইন্টারনেটে কী যেন ঘাঁটাঘাঁটি করতে শুরু করে। একের পর এক ওয়েবসাইট যেন পসরা সাজিয়ে বসতে শুরু করে বাবা-ছেলের সামনে। 

‘আরে! মাঠে গিয়ে যদি গরু কিনতে নাই পারলাম, তাহলে ঈদের আনন্দটা কীভাবে পাই?’ অনুনয় ঝরে জিয়ার কণ্ঠে। 

‘এ বছর হাটে না গেলে কোনো সমস্যা হবে না, বাবা। এই দেখো, তোমাকে আমি গরুর ছবি দেখাচ্ছি। ভালো করে দেখে বলো কোন গরুটা কিনতে চাও। কোথা থেকে এসেছে, কোন অঞ্চল, দাম, ওজন, হাইট, সবকিছু সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়া আছে। পাশ-পেছন ফিরিয়ে ছবিও দেয়া আছে গরুর। দেখো বাবা, দেখো!’ নিয়ন বাবাকে প্রলুব্ধ করতে চায়। 

‘আরে! গরু কি তোর মোবাইল ফোন নাকি যে পেছন-পাশ দেখেই বুঝে ফেলব? হাট ছাড়া কি ঈদ জমে?’ 

‘না। এবার হাটে যাওয়া তোমার চলবে না। এমনিতেই শরীরের অবস্থা ভালো না। তার ওপর দেশে করোনা ভাইরাসের এমন উপদ্রব! না না। প্রতিবেশীরা যাচ্ছে তো গেলে যাক। আমাদের তো সচেতন হতে হবে, বাবা! সুযোগ যেহেতু আছে, কেন অহেতুক ঝুঁকি নিতে যাবো বলো?’ 

‘করোনা! করোনা!’ রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকেন জিয়া। এই করোনার জন্যই তো সব নষ্ট হলো। হাটে গিয়ে গরু কেনার মজা যে কী, তা নিয়নকে কে বোঝাবে? লুঙ্গি মালকোচা মারা ব্যাপারীদের সাথে গরু নিয়ে দামাদামি, গোবরে পা পড়ে কিনা, সেদিকে খেয়াল রেখে হাঁটা, আরেকজন কত দিয়ে গরু কিনল, সেটা ঠিক করে নিজের পশুর দাম ঠিক রাখা। এসব কিছু কি আর এই কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে দেখা দন্ত বিকশিত গরুর দিকে দেখলে পাওয়া যায়? 

এই তো কয়েকবছর আগেও পরিবারের লোকজন মিলে একসাথে গাবতলী গরুর হাটে যাওয়া হয়েছে। তখন পৃথিবী কত সুন্দর ছিল! করোনা নামের এই মারণঘাতী ভাইরাসের নাম কেউ জানতোও না। হঠাত করেই যেন বদলে গেলো চেনা পৃথিবীর সুর। ঘরে বন্দী জিয়া দফাদারের আর ভালো লাগছে না। ঈদের সময়ও যদি পছন্দ করে গরু কেনা না যায়, রাস্তা দিয়ে গরুর গলায় আটকানো দড়ি দিয়ে “হেই হট হট” বলে বাড়ি পর্যন্ত আসা না যায়, তাহলে আর কুরবানী ঈদের মজাটা রইলো কোথায়? কিন্তু ছেলেকে এসব কে বোঝাবে? 

এমন সময় আবারও বাইরে থেকে গরুর হাম্বা রব উঠলো। জিয়া করুণ দৃষ্টিতে চাইলেন নিয়নের দিকে। ইস্পাত কঠিন নিয়নের মুখ যেন একটুও বাবার প্রতি সমবেদনায় পূর্ণ নয়। অন্যদিকে নজর ফিরিয়ে আছে সে। 

অবশেষে বাধ্য হয়ে জিয়া দফাদার ছেলের কথাই মেনে নেন। কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একের পর এক গরুর ছবি স্ক্রল করতে থাকেন। মনমতো কিছু পাচ্ছেন না। বাবাকেও এদিকে মন দিতে দেখে নিয়ন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে।

হঠাত লালরঙা একটা গরুর দিকে চোখ পড়ে জিয়ার। বেশ মোটাতাজা, পা জোড়াও সুঠাম। সুন্দর টানা টানা চোখ, লেজটা এমনভাবে বাঁ দিকে হেলে আছে যেন বলতে চাইছে, ‘এসো, আমাকে জলদি কিনে নাও।’

ছেলেবেলায় বাবার সাথে গরুর হাটে গিয়ে এমনই একটা গরু কেনার স্মৃতি মনে পড়ল জিয়ার। কেন যেন অকারণেই মনটা উদাস হয়ে গেলো তার। বাবাকে একটি গরুর ছবির দিকে আনমনে চেয়ে থাকতে দেখে নিয়ন বলল,
‘বাবা, এটা পছন্দ হয়েছ?’ 

উদাস জিয়া মাথা দোলালেন। এরপর গরু কেনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলো নিয়ন। 

ঈদের দুইদিন আগে। 
পিক আপে করে জিয়া দফাদারের লালরঙা গরু এসেছে। বাড়ির সবাই বের হয়েছে গরু দেখতে। এই প্রথম ডিজিটাল হাট থেকে গরু কেনা হয়েছে, তাই সবার কাছে এটা অষ্টম আশ্চর্য বললেও অত্যুক্তি হবে না। দফাদারের ছেলেবেলার বন্ধু ফরিদ এসেছে গরু ঠিকঠাকমতো এসেছে কিনা, তা দেখতে। চারপাশ ভালো করে দেখে, দাঁত দেখে ফরিদের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। 

‘না রে ব্যাটা, একটা কাজের কাজই করেছিস তাহলে। ফিজিক্যাল হাটে না গিয়ে ডিজিটাল হাট! হাহা। কে ভেবেছিল এমন কিছুও হবে।’
‘আসলে চাচা, এই ডিজিটাল হাটের ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই নতুন না। আগেও ছিল কিন্তু এবারের করোনা ভাইরাসের কারণে ব্যাপারটা আরও বেশি প্রকাশ পেয়েছে। সুযোগ থাকতে কেন প্রাণ ঝুঁকিতে নেবো বলুন?’ নিয়ন বলে ওঠে। 

‘না না, সেটা তো অবশ্যই। আর তাছাড়া সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত হাট থেকেই তো আনা, তাই না?’ প্রশ্ন করে ফরিদ। 
‘জি, চাচা।’

এদিকে কথাবার্তা শুনে জিয়া দফাদার বারান্দা ছেড়ে বাড়ির সামনে চলে আসে তার ডিজিটাল গরু দেখবার জন্য। চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখেন সদ্য কিনে আনা কুরবানীর পশুকে। খুব একটা মন্দ যে হয়নি, তা স্বীকার করতেই হবে। মনের অজান্তেই পশ্চাতে জোরে একটা চাপড় বসিয়ে দিলেন। 

হাম্বা! রব ছেড়ে উঠলো দফাদার সাহেবের গরু। হেসে উঠলো সবাই। যাক বাবা! এবারের ডিজিটাল হাট সার্থক!