ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ যেসব বিশ্বনেতারা

আহনাফ তাহমিদ
প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২১ সোমবার, ০১:০০ পিএম
করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ যেসব বিশ্বনেতারা

কোথায় যেন পড়েছিলাম, বিপদে বন্ধুর পরিচয় আর সঙ্কটে সরকারের পরিচয়। বর্তমানে বিশ্ব এমন একটি টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হরদম সরকারকে সঙ্কটের মুহূর্তে কতটা সে জনগণবান্ধব, তার পরিচয় দিতে হচ্ছে। কিছু দেশ সে পরিচয় দিতে পেরেছে, কিছু দেশ তা পারেনি। যেসব দেশ পারেনি, সেসব দেশে ইসরাফিলের শিঙার মতোই সরকার পতনের ধ্বনি ফুঁকে উঠেছে। আসুন, আজ এমনই কিছু দেশ সম্পর্কে জেনে নেই, যেসব দেশের সরকার করোনা পরিস্থিতিতে নিজেদের যোগ্যতা এবং সঙ্কট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়ে গদি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

তিউনিসিয়া

প্রথমেই আসে একদম তরতাজা খবরে তিউনিসিয়ার নাম। দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদ পার্লামেন্ট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিচাম মেচিচিকে অপসারণ করা হয়েছে। মুসলিম এই দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তারওপর করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় দেশটির সরকার পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। অবধারিতভাবেই দেশটির জনগণ দায়ী করছে সরকারকে। লাগাতার বিক্ষোভকর্ম সূচির মাধ্যমে চলছিল সরকার হটাও আন্দোলন। নতুন করে যেন বিক্ষোভ আবার দানা না পাকিয়ে উঠতে পারে, সেজন্য তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেশ করে হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। দাঙ্গাবাজদের কেউ কেউ হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। তারা যাতে কোনো অরাজকতা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে দেশটিতে।

ব্রাজিল

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর নাম এক্ষেত্রে বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। পুরো করোনা পরিস্থিতিকে তিনি একেবারে লেজেগোবরে করে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগও কম নয়। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার; স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নানা জোর জবরদস্তিমূলক কর্মকাণ্ড; ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে মাস্ক পরিধান করে যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে টালবাহানা; টিকা নিয়ে নানারকমের অনিয়ম; সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা নিয়ে অনিয়ম; হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের মতো ঔষধের অপব্যবহার; জোর করে স্পা, জিম্নেশিয়াম ইত্যাদি খোলা রাখাসহ আরও নানা অপকর্মের প্রণেতা তিনি। এমনকি টিকা গ্রহণ করতেও নারাজ ছিলেন তিনি। টিকা নেয়ার ফলে কেউ যদি কুমির হয়ে যায়, তাহলে সে দায় তিনি নেবেন না- এমন অবাস্তব কথাও বেরিয়েছে তার মুখ দিয়ে। ব্রাজিলই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেটি এক বছরে চারবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বদল করেছে। এদিকে বলসোনারোর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ ব্রাজিলে লাগাতার বেড়েই চলেছে।

অস্ট্রেলিয়া

প্রায় ১৪ মিলিয়ন জনগণকে লকডাউনের আওতায় আনবার জন্য খুব সম্প্রতিই এক সংবাদ সম্মেলনে এসে ক্ষমা চেয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রেসিডেন্ট স্কট মরিসন। করোনা পরিস্থিতির প্রাক্কালে অবস্থার সামাল দেয়া এবং মৃত্যু হাজারের নিচে রাখবার জন্য স্কট এবং তার সরকার খুবই প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ এবং টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে অস্ট্রেলিয়ার সরকার জনগণের রোষের কবলে পড়ে। উন্নত বিশ্বের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া একমাত্র দেশ, যেটি তার মোট জনসংখ্যার মাত্র ১২ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে পেরেছে।

মেক্সিকো

কোভিডাক্রান্তদের মধ্যে ৯.২ শতাংশ মৃত্যুহার নিয়ে মেক্সিকো বর্তমানে শীর্ষের দিকে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬ লক্ষ ১৭ হাজার। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জনসংখ্যার সাথে বিবেচনা করলে মেক্সিকোর মৃত্যুহার অনেক বেশি। তবে এরচেয়েও বলতে হয়, মেক্সিকোতে সরকারের পুরো পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারার অপারগতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে ম্যানুয়েল লোপেজ করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার শপথ বারংবার করলেও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে কিন্তু তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। যখন দেশটিতে আশু লকডাউনের দরকার ছিল, তিনি তা করেননি। এমনকি নিজেও মাস্ক পরিধান করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

বেলারুশ

পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের যে দোর্দণ্ড প্রতাপ চলছে, তা বেলারুশের রাষ্ট্রনায়ক আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কো কখনও বুঝতেই যেন পারেননি। মহামারির একদম শুরুর দিকে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লকডাউন কার্যকর করছে, লুকাশেঙ্কো তখন বলেছেন নানা হাস্যকর কথাবার্তা। এসব কথার মধ্যে রয়েছে ভদকা পান, সউনায় গমন, ক্ষেতে কাজ করা ইত্যাদি সম্পন্ন করলে করোনায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম। তার এসব কথাবার্তার কারণে বেলারুশে ব্যক্তি ও সাংগঠনিক উদ্যোগে চলেছে মহামারীর মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা।

ভারত

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থাও কিন্তু খুব একটা ভালো ছিল না। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৈশ্বিক সম্মেলনে বলেন করোনা মোকাবিলা করে ভারত বিশ্বমানবতাকে রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু মার্চ মাসে এসে দেখা গেলো, মোদীর স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন করোনা পরিস্থিতি একদম চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছে এবং এটিকে রক্ষা করার উপায় এখন আর হাতে নেই। করোনা এবং এর নানা ভ্যারিয়েন্ট একদম পর্যুদস্ত করে তুলল ভারতকে।

এছাড়া এপ্রিল মাসে নির্বাচনী প্রচারণা, ধর্মীয় উৎসব বিরাট পরিসরে পালন করা, খেলা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে মোদী সরকার দেশের জনগণকে আরও বিভীষিকার মাঝে ফেলে দেয়। মে মাসের মধ্যে ভারতের ১.৩ বিলিয়ন জনসংখ্যার মাত্র ১.৯ শতাংশ টিকার আওতায় আসে, যদিও ভারতে টিকা উৎপাদনকারী নিজস্ব গবেষণাগার আছে।