ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

নিয়মিত হেলথ চেকআপ কেন জরুরি?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ০৩:১১ পিএম
নিয়মিত হেলথ চেকআপ কেন জরুরি?

কিছুদিন থেকেই ওজন বাড়তে শুরু করেছে হাফিজ সাহেবের। এদিকে শরীরে বেশ অবসন্নবোধ হয়, ক্লান্তিভাব আসে। হঠাৎ খেয়াল করলেন চুল পড়ছে বেশি, ত্বকও কেমন যেন রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয় পেলেন যখন টের পেলেন তার গলার নিম্নাংশ ফুলতে শুরু করেছে। প্রথমে গুরুত্ব দিলেন না। পরে স্ত্রী আর সন্তানদের চাপে যেতে হলো চিকিৎসকের কাছে। টিএসএইচ পরীক্ষা করালেন চিকিৎসক, হাফিজ সাহেবের থাইরয়েড ধরা পড়লো। হঠাৎ এমন রোগ কেন তা ভেবে কোনো কূলকিনারা পেলেন না তিনি। চিকিৎসক জানালেন তার এই সমস্যাটি অনেক আগেই শুরু হয়েছে। গুরুত্বের অভাবে রোগ এখন বেশ জটিল পর্যায়ে। তার রোগের পরীক্ষা আরও আগেই হওয়া দরকার ছিল।

ঠিক এই কারণেই নিজ উদ্যোগে আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিজেকেই করতে হবে। কোনো সামান্য উপসর্গ বা সচেতনতার খাতিরেই হেলথ চেকআপগুলো করা দরকার।  

কেন করাবেন চেকআপ

বর্তমান সময়ে আমাদের জীবনযাপনের ধরনই বদলে গেছে। আর সে কারণে শরীরে দানা বাঁধে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা। বর্তমান ব্যস্ততার যুগে আমরা নিজেদের জন্য তেমন একটা সময়ই রাখতে পারি না। ঘরের তৈরি খাবারের পরিবর্তে খেতে হয় বাইরের খাবার। সেই সঙ্গে মানুষের মধ্যে বেড়েছে উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা। আর আমরা এখন সাধারণত কায়িক পরিশ্রম খুবই কম করি, হাঁটাহাঁটিও কম করি। ফলে বিভিন্ন অসুখবিসুখ বেশি হচ্ছে। এছাড়া অসুস্থ হওয়ার কিছু বংশগত কারণও অবশ্যই রয়েছে। এই যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ইত্যাদি।

একটা কথা আমাদের মানতেই হবে যে, রোগবালাই শরীরে বাসা বাঁধার পরে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাটা অবশ্যই শ্রেয়। তাই বছরে একবার হলেও চিকিৎসকের কাছে যাবেন চেকআপ করাতে। প্রাথমিক অবস্থায় কোনো রোগ নির্ণয় সম্ভব হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তাই সুস্থ জীবন এবং দীর্ঘায়ূর জন্য নিয়মিত চেকআপ করতে হবে।

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের প্রবণতা হচ্ছে রোগ হওয়ার পর তারপর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। তবে আগে থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিৎ। যেকোনো রোগের ক্ষেত্রে মারাত্মক আকার ধারণ করার ঝুঁকি কমে যায়। এজন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থেকে সতর্ক করে দেয়। ফলে আগে থেকেই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই মানুষের ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত চেকআপ জরুরি।

 কী কী চেকআপ করবেন

আপনার রক্তচাপ, রক্তে শর্করার পরিমাপ, কিডনির কার্যক্রম এগুলো নিয়মিত চেকআপ করতে হবে। এছাড়া কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করার পরিমাণ, হিমোগ্লোবিন টেস্ট, কিডনি, আই-চেকআপ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চতা এবং ওজন দেখে ডায়েট প্রেসক্রিপশন করাতে হবে।

১. নিয়মিত আপনার শরীরের হিমোগ্লোবিন, সাদা কণিকা (সেল) এবং প্লেটলেট পরীক্ষা করান। এটা সিবিসি চেকআপ। রক্ত যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা হয়। হিমোগ্লোবিনের সর্বনিম্ন মাত্রা ১৩ গ্রাম পার ডিএল। এর নিচে নামলে রোগী অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। ভাইরাস জ্বরে প্লেটলেটের পরিমাণ বেড়ে গেলে ডেঙ্গুর আশঙ্কা তাকে।

২. ডায়াবেটিসের পরীক্ষা নিয়মিত করাতে হবে। গত তিনমাসে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কেমন ছিল জানার জন্য এইচবিএওয়ানসি (HBA1C) পরীক্ষা। এইচবিএওয়ানসির মাত্রা ছয় এর নিচে হলে ভালো হয়, সাত পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য। সাত দশমিক আট পর্যন্ত অতিরিক্ত এবং এর উপরে হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই ধরা হয়। অবশ্যই চিকিৎসকের শরনাপন্ন হন।

৩. শরীরে থাইরয়েড গ্রন্থির পরিমাপ দেখার জন্য রয়েছে টিএসএইচ (TSH) পরীক্ষা। শরীরের হাইপারথাইরোয়েডিজম আছে কি না সেটি নির্ণয়ের জন্য এই পরীক্ষা করা উচিৎ।

৪. রক্তে চর্বির পরিমাণও পরীক্ষা করানো উচিৎ। এজন্য সিরাম লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা। এর মাধ্যমে ট্রাইগ্লিসারাইট, লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল), হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রটিন (এইচডিএল) এবং সম্পূর্ণ কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখা হয়। কোলেস্টেরলের কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, তাই নিয়মিত কোলেস্টেরল পরীক্ষা করান।

৫. নিয়মিত কিডনির কার্যক্ষমতা নির্ণয় করা উচিৎ। কিডনি ফাংশন টেস্টে রক্তের ইউরিয়া, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, সিরাম ইলেকট্রোলাইটস এগুলো দেখা হয়। কিডনির রোগের ক্ষেত্রে সিরাম ইউরিয়া এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ তৈরি হয়। কিছু কারণে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে অতিরিক্ত পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন, রক্তক্ষরণ, প্রভৃতি কারণে ইউরিয়া এবং ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়তে পারে। টেস্টে অস্বাভাবিক মাত্রা দেখা দিলে নেফ্রোলোজিস্টের কাছে যেতে হবে।

৬. সিরাম ইউরিক এসিড পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তের ইউরিক এসিডের পরিমাণ দেখা হয়। ইউরিক এসিড বাড়লে শরীরে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ইউরিক এসিড বেড়ে গেলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যান। নয়তো কিডনিতে এবং গাট বা জয়েন্টে সমস্যা হতে পারে।

৭. নিয়মিত লিভার ফাংশনও পরীক্ষা করিয়ে লিভারের কার্যক্ষমতা দেখা হয়। এর মধ্যে সিরাম বিলুরুবিন, এসজিপিটি (SGPT) ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়। কেউ জন্ডিসে আক্রান্ত কি না এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়। সঙ্গে সিরাম অ্যালবুমিনও দেখা হয়। যা স্বাভাবিক তাপমাত্রার নিচে থাকলে শরীরে পানি আসতে পারে।

৮. আমাদের কাছে হেপাটাইটিস বি একটি মহামারি রোগ। এইচবিএসএজি (HBSAG) এবং অ্যান্টিএইচবিএস (HBS) পরীক্ষার মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় এটি সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় অবস্থায় ধরা পড়লে অবশ্যই গ্যাসট্রোএনটেরোলোজিস্টের কাছে যেতে হবে।

৯. নিয়মিত ইসিজি(ECG) করানো দরকার। এর মাধ্যমে হৃদপিণ্ডের অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। মূলত এরিদমা বা ইসক্যামিক হৃদরোগ আছে কি না এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নির্ণয় করা হয়।

১০. শরীর ঠিক রাখতে নিয়মিত এক্সরে চেস্ট করান। এতে বুকের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গ কী অবস্থায় থাকে সেটি দেখা যায়। শ্বাসনালীর সংক্রমণ বা নিউমোনিয়া শনাক্তকরণেও এই পরীক্ষা। এছাড়া হৃদযন্ত্র স্বাভাবিকের চেয়ে বড় কি না, ফুসফুসে পানি জমাও পরীক্ষা হয়। আর আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে পিত্তথলিতে পাথর, ভেতরের অঙ্গগুলোর সঠিক গঠন দেখা হয়। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের গঠনগত অবস্থা বোঝার জন্য নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাম করান।

 

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ/এমআর