ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

তোতলামিতে দ্বিধা নয়, সচেতন হোন

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০১৯ মঙ্গলবার, ০১:৩৭ পিএম
তোতলামিতে দ্বিধা নয়, সচেতন হোন

সাধারণভাবে কথা বলতে গিয়ে আটকে যায়, এক কথা বার বার বলে অথবা একটা শব্দ টেনে অনেক লম্বা করে বলতে থাকে, এমন অনিচ্ছাকৃত ভাবকে আমরা তোতলামি বলি। কথা বলার এই প্রতিবন্ধকতাটা শারীরিক ব্যাধি। তোতলামির কারণে মানুষ কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না, নিজেকে গুটিয়ে রাখে, সবাই তাদের নিয়ে উপহাসও করে। আজ আন্তর্জাতিক তোতলামি সচেতনতা দিবস। এইদিনে আপনাদের জন্য তোতলামি বিষয়ে কিছু সচেতনতার কথাই জানাচ্ছি-

তোতলামির কারণ

তোতলামি জন্মগত সমস্যা নয়। তোতলামির একাধিক কারণ রয়েছে। জেনেটিক কারণে তোতলামি সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাবা-মায়ের যদি তোতলামি সমস্যা থেকে থাকে সেক্ষেত্রে সন্তানেরও হতে পারে।

অনেক সময় সন্তানের হাতের ডিরেকশন উলটা হয়। অনেকে ডান হাত ব্যবহার না করে বাঁ হাতে কাজ করে। সে ক্ষেত্রে যদি ছোটবেলা থেকে জোর করে হাতের ডিরেকশন চেঞ্জ করার চেষ্টা হয় তবে তোতলামি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ছোটবেলায় বেশিরভাগ শিশুরই কথায় তোতলামো ভাব থাকে। যা পরবর্তীতে ঠিক হয়ে যায়। যদি ছোট থেকে সঠিক উচ্চারণের জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয় তাহলে তার ফলাফল উলটা হতে পারে। শিশুটি তোতলা হয়ে যেতে পারে।

যদি একইসঙ্গে দুটি বাচ্চা বড় হয় এবং তোতলা কোনো বাচ্চাকে অনুকরণ করতে থাকে তাহলে এক সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়। এ ক্ষেত্রে সে তোতলামি সমস্যায় পড়তে পারে।

তোতলামি নিউরোজেনিক কারণেও হতে পারে। ছোটবেলায় যদি কেউ মাথায় গুরুতর আঘাত পায়, তা থেকেও কথা বলার সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশি বয়সেও এই সমস্যা হতে পারে।

শিশুকে ছোটবেলায় যদি কথা বলার জন্য বেশি চাপ সৃষ্টি করা হয়, সেক্ষেত্রে শিশুটির মধ্যে তোতলামো ভাব আসতে পারে। তাই শিশু তার স্বাভাবিক নিয়মেই কথাবার্তা শিখবে। তার উপর চাপসৃষ্টি করা উচিত নয়।

যাদের তোতলামি বেশি দেখা যায়

মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে বেশি তোতলামি দেখা যায়। অনুপাতের দিক থেকে ৫ বছর বয়সি ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে ২:১ এবং বড়দের ক্ষেত্রে ৪:১ অনুপাত।

তোতলামি দূর করার প্রচলিত ভুল পদ্ধতি

তোতলামি দূর করতে অনেকে মুখে পয়সা বা মার্বেল দেয়, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মুখে পয়সা দিলে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে কথা বলার সমস্যা হতে পারে।

স্বাভাবিক স্বাস্থ্যকর খাবার শরীরে পুষ্টিতে সাহায্য করে। তোতলামির জন্য খাদ্যাভাসে পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।

মডার্ন মেডিসিন, হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদ, কোনও ওষুধেই স্ট্যামারিং বা তোতলামি কমানো সম্ভব নয়।

যোগব্যায়াম শরীর গঠনে ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ঠিকই। কিন্তু তোতলামি কমাতে এর কোনও ভূমিকা নেই।

কোনো অপারেশনেই সাধারণত তোতলামো সারানো সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলে এমনকি শহরেও কোনো হাতুড়ে ডাক্তার তোতলামি সারানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে নানা ওষুধ দিয়ে থাকেন, বিভিন্ন পরীক্ষাও করান। এসব কিছুতে তোতলামো সারে না। বরং ঝুঁকির ভয় থাকে।

মনে রাখবেন তোতলামো একমাত্র থেরাপির মাধ্যমেই সারানো সম্ভব। অভিজ্ঞ স্পিচ থেরাপিস্টের কাছ থেকে চিকিৎসা নিন।

অভিভাবকের করণীয়

সন্তানের যেকোনো সমস্যা সমাধানে মা-বাবার পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে। তোতলামোর উপসর্গ দেখা দিলে আগে বাবা-মা বুঝতে পারেন। সেক্ষেত্রে তখনই তাদের নিজেদের দ্বারা কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ স্পিচ থেরাপিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। ছোটবেলা থেকে যদি নজর না দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বড় কোনও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। যে কোনও মানসিক চাপই তোতলামি বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বাবা-মাকে সব সময় সতর্ক থাকা উচিত।

বাবা-মায়ের তোতলামি থাকলে সন্তানেরও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বাবা মাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যদি বাবার তোতলামি থাকে তাহলে ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তানেরও একই সমস্যা হয়। বাবা-মা দু’জনেরই যদি এই সমস্যা থাকে, সে ক্ষেত্রে ৫০-৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে সন্তানেরও একই সমস্যা দেখা দেয়।

সন্তানের বয়স যখন দুই থেকে তিন বছর, তখন থেকেই তার বাবা-মাকে এ বিষয়ে সজাগ হতে হবে। কারণ এই বয়সে চিকিৎসা শুরু হলে ভালো ফল পাওয়া যায়। পুরোপুরি সমস্যা সমাধানের সুযোগ থাকে এই বয়সে।

তোতলামির চিকিৎসা

সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে প্রথম থেকেই চিকিৎসা শুরু করলে তোতলামি ১০০ শতাংশ সারানো সম্ভব। তবে চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলেও তোতলামো কমানো সম্ভব। এক্ষেত্রে রোগের লক্ষণগুলি প্রকট হওয়ার ৩-৬ মাসের মধ্যে যদি চিকিৎসা শুরু হয়, তাহলে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশুর তোতলামি ১০০ শতাংশ সারিয়ে তোলা যায়। পাশাপাশি বড়দের ক্ষেত্রেও তোতলামো ৬০-৮০ শতাংশ কমানো সম্ভব। বড়দের অবশ্যই বাড়িতে প্র্যাকটিস করতে হবে। প্রতিদিন এক-দুই ঘণ্টা অভ্যাস প্রয়োজন।

তোতলামি সারানোর একমাত্র চিকিৎসা ‘থেরাপি’। সঠিক সময়ে থেরাপির মাধ্যমে একজন অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট সম্পূর্ণভাবে তোতলামো সারিয়ে তুলতে পারেন। থেরাপির তিনটি ভাগ রয়েছে— ইন্ডিভিজুয়াল থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি এবং কাউন্সেলিং থেরাপি । প্রথম দুটি স্পিচ থেরাপির অংশ।

বাংলা ইনসাইডার/এসএইচ