ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ডায়াবেটিস নিয়ে যত ভুল ধারণা

শাহরিনা হক
প্রকাশিত: ১৪ নভেম্বর ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ এএম
ডায়াবেটিস নিয়ে যত ভুল ধারণা

দেশে যে কয়টি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে ডায়াবেটিস তার মধ্যে অন্যতম। ডায়াবেটিস নির্দিষ্ট মাত্রার বাইরে গেলে তা শরীরের ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর নিয়ন্ত্রণে রাখাই সর্বোত্তম পস্থা। এজন্য প্রয়োজন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা। আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে নীরব রোগটি নিয়ে থাকছে আমাদের বিশেষ আয়োজন-

১. ডায়াবেটিস ধরা পড়লে স্টার্চ বা শর্করা জাতীয় খাবার একেবারেই খাওয়া যাবে না, এমনটাই ধারণা বেশিরভাগ মানুষের। তবে বাস্তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, ডায়েটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্টার্চ বা শর্করা জাতীয় খাবার। তাই কখনোই শর্করা জাতীয় খাবার খাদ্য তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত নয়।  বরং কম পরিমাণে খাওয়া উচিত।

২. বেশিরভাগ মানুষেরই এটা ধারণা যে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মিষ্টি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়। বাস্তবে এ ধারণা মোটেই সঠিক নয়। কারণ নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে মিষ্টি সকলেই খেতে পারেন। বরং চিকিত্সকদের মতে, শুধু ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেই নয়, বেশি মিষ্টি খাওয়া যেকোনো মানুষের পক্ষেই ক্ষতিকর।

৩. ডায়াবেটিসে আক্রান্তরা কখনোই রক্তদান করতে পারেন না, এমনটাই ধারণা বেশিরভাগ মানুষের।  তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ শুধু যারা নিয়মিত ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নেন, তারাই শুধু রক্তদান করতে পারেন না।  বাকিদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকলে রক্তদানে কোনো সমস্যা নেই।

৪. অনেকেই মনে করেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সবসময় উচিত খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণে রেখে যতটা সম্ভব কম পরিশ্রম করা। তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। কারণ নিয়ম মেনে চললে আর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকলে ডায়াবেটিকরাও বাকিদের মতোই স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারেন।

৫. অনেকেই মনে করেন, চিকিত্সক ইনসুলিন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মানেই রোগী মোটেও নিয়ম মেনে চলছেন না।  বাস্তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফলে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সত্ত্বেও একটা সময়ের পর ইনসুলিন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে সারাজীবনই ইনসুলিন নিতে হবে। যেমন বাচ্চাদের ডায়াবেটিস হলে ( টাইপ- ১), মুখে খাওয়ার ওষুধ সর্বোচ্চ মাত্রায় দেওয়ার পরও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না আসলে। আবার কিছুক্ষেত্রে ইনসুলিন বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন: গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বাচ্চা প্রসব করার পর, বড় কোন অপারেশনের পরবর্তী পর্যায়ে যখন রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হবে। আবার কিছুক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের প্রথম অবস্থায় যদি ডায়াবেটিস খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে সেক্ষেত্রে কিছুদিন ইনসুলিন নিয়ে শর্করার মাত্রা কমিয়ে এনে মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। তবে সেটা অবশ্যই হতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

ডায়াবেটিস যদি হয়েই যায়, শৃঙ্খলা তো আপনাকে কিছু মানতেই হবে। কিছুটা শৃঙ্খলে থাকার জন্য মাথায় রাখুন এই বিষয়গুলো-

১. প্রতিদিন কমপক্ষে ৪০ মিনিট হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে। হাঁটার ক্ষেত্রে টানা ৪০ মিনিট একটানা হাঁটলে উত্তম ফল পাওয়া যায়।

২. এমন ব্যায়াম বা পরিশ্রম করতে হবে, যাতে শরীর থেকে ঘাম ঝরে যায়।হঠাৎ খুব কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে প্রথমে ওয়ার্কআপ বা হালকা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করতে হবে। ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে হবে।

৩. দেহের ওজন বাড়তে দেয়া হবে না। যাদের ওজন ইতোমধ্যে বেড়েছে, তারা ওজন কমাতে ব্যবস্থা নিন (যেমন-খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম, দৌড়ানো, হাঁটা ইত্যাদি)।

৪. প্রতিদিন শাকসবজি রাখুন খাদ্য তালিকায়। আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান। কার্বোহাইড্রেট-জাতীয় খাবার, যেমন-ভাত, আলু কম খান।

৫. বেশি গরু বা ছাগলের গোশত খাবেন না। আইসক্রিম, পনির, ফাস্টফুড, কোল্ড ড্রিঙ্কস ও কৃত্রিম জুস এড়িয়ে চলুন। ঘি বা মাখন কম খান বা বাদ দিন। দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।

৬. ২৪ ঘন্টায় অন্তত ৬ ঘন্টা ঘুমান। টেনশন কমাতে হবে।

মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। পরিবারের একজনের ডায়াবেটিস হলে তার সংস্পর্শে এলে অন্যদের কখনো ডায়াবেটিস হবে না। তবে বাবা মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে পরবর্তীতে সন্তানদের ডায়াবেটিস হতে পারে।

ডায়াবেটিস নিরাময়যোগ্য নয়। তবে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা এবং সঠিক ওষুধের মাধ্যমে  আপনি এই রোগের লাগাম রাখতে পারবেন নিজের হাতেই। এজন্য নিয়মিত ব্যবধানে ডাক্তার দেখাতে হবে, বছরে অন্তত চারবার তো বটেই। বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি রোগীদের রেজিস্ট্রেশন করার সময় একটি বইও দেয়, যাতে ডায়াবেটিস নিয়ে সাধারণ তথ্যগুলো দেওয়া থাকে খুব গুছানোভাবে এবং সেই সাথে তারা একটি নোটবই দেন। কি খেতে পারবেন আর কি পারবেন না, রোজ কতোটুকু ব্যায়াম কিভাবে করা প্রয়োজন, কার কি ওষুধ কতোটুকু মাত্রায় কখন খেতে হবে সব নির্ধারণ করা থাকে রোগীর নোটবইয়ে।