ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

হন্তারক হয়ে উঠছেন চিকিৎসকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৮:০০ পিএম
হন্তারক হয়ে উঠছেন চিকিৎসকরা

বাংলাদেশে গত ১৫ দিনে অন্তত ৩০ জন মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে দেখা যায় যে, বুকে ব্যাথা নিয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও কোন চিকিৎসা পাননি।

গণমাধ্যমের খবরে আরো জানা যায় যে, জ্বর, সর্দি, কাশিতে আক্রান্ত হলে হাসপাতালে তাঁদেরকে ঢুকতে দেয়া হয়না। ৫০ ভাগ বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে চিকিৎসকদের বারবার অনুরোধ করছেন যে, তাঁরা যেন স্বাভাবিক চিকিৎসা দেয়। কিন্তু গত ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। করোনার আতঙ্কে চিকিৎসকরা ঘরে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন এবং সাধারণ রোগীদেরকেও চিকিৎসা দিচ্ছেন না।

দু-একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেয়া হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ রোগীদের বহির্বিভাগে যে চিকিৎসা দেয়া হয়, বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা যে রোগী দেখেন সেগুলোর কার্যক্রম রীতিমত বন্ধ হয়ে আছে। আর সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হলো জ্বর-কাশি থাকলে সেই রোগীকে ছুঁয়েও দেখছেন না চিকিৎসকরা। এই বিষয়টি একেবারে অমানবিক এবং চিকিৎসা পেশার নূন্যতম নৈতিকতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা এবং এই ব্যাপারে অনিতিবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে।

চিকিৎসকরা প্রথম দফায় বলেছিলেন যে, তাঁদের পিপিই নেই, পিপিই ছাড়া তাঁরা চিকিৎসা দিতে পারবেন না। এরপরে সরকারের পক্ষ থেকে বেসরকারি উদ্যোগে পিপিই দেয়া হয়েছিল। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এটা দায়িত্বের ভেতর পরে যে তাঁদের চিকিৎসকদের পিপিই দেয়া। বেসরকারী চিকিৎসকদেরকে পিপিই সরবরাহ করার দায়িত্ব কেন সরকার নেবে? সে যাই হোক না কেন, পিপিই-এর যখন ব্যবস্থা হলো, তখনও চিকিৎসকরা গো ধরে বসলেন। আমাদের চিকিৎসকদেরকে নিয়ে নজিরবিহীন অভিযোগ এবং নানারকম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কথা আমরা সব সময়ে শুনি। তবে এবার করোনা সঙ্কটের সময় তাঁরা সম্ভবত তাঁদের পেশাদারিত্বের প্রতি চরম অবমাননা করেছেন এবং অপেশাদারসুলভ আচরণের সর্বোচ্চ নজির স্থাপন করেছেন। একজন চিকিৎসক কিভাবে একজন একজন রোগীকে চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন? পৃথিবীর যেকোন দেশে এমন ঘটনা ঘটলে ঐ চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যেত কিংবা বিএমডিসি তাঁর চিকিৎসা সনদ বাতিল করার মতো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। কিন্তু বাংলাদেশে কে দেখবে কাকে?বিএমডিসি বলে একটি প্রতিষ্ঠান আছে যারা চিকিৎসকদের পেশাদার আচরণগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলে তার বিহীত ব্যবস্থা করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে যা ঘটছে তা সকলকে হতবাক করে দেয়। বিশ্বে এটা বিরল ঘটনা। আমাদের চিকিৎসকরা এ ব্যাপারে কি অজুহাত দেবেন?

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের টাকার কমতি নেই। তারা একমাস কেন, মাসের পর মাস যদি চিকিৎসা সেবা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখেন তাহলেও তাদের কোন কিছু যাবে আসবে না। কারণ তাদের জন্য ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলো কমিশন নিয়ে বসে আছে। ফার্মাসিটিক্যাল কম্পানিগুলো টাকার ব্যাগ নিয়ে বসে আছে। কাজেই চিকিৎসা দিলেই কি না দিলেই কি আসে যায়!

এই কারণেই আমাদের চিকিৎসকদের যে দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিকতা, তার মান অনেক নিচে নেমে গেছে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথাবার্তা হচ্ছিল। আমাদের চিকিৎসকগণ বেশিরভাগই টাকার পেছনে ছুঁটছেন।চিকিৎসার নামে যে বিভিন্ন সময় হয়রানী কিংবা অপচিকিৎসা হয়েছে তা নিয়ে শুধু গণমাধ্যম কেন, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভিন্ন সময় আলাপ আলোচনা ছিল এবং আছে। আর এ কারণেই যাদের একটু সাধ্য আছে তারা বাংলাদেশে চিকিৎসাকে নিরাপদ মনে করে না, ভারত কিংবা বিভিন্ন উন্নত দেশে চিকিৎসা সেবা নিতে যান। কিন্তুেএখন যে অবস্থা, সেই অবস্থায় একটা মানুষ চিকিৎসা নেবে কোথায়? যারা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করছেন তাদেরকে কি বলা যায়? বিনা চিকিৎসায় যে সমস্ত মানুষ মারা যাচ্ছে তাদেরকে কি হত্যা বলা যায় না?

বাংলাদেশের বিবেকবান নাগরিকরা এই প্রশ্ন তুলতে পারেন, কারণ চিকিৎসা দেওয়া একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব। এটাই তার পেশার অঙ্গীকার। কিন্তু সেই অঙ্গীকার পূরণ না করে তিনি যখন একজন রোগীকে দেখতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন তখন তিনি একজন হত্যাকারীর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হচ্ছেন। আমরা মনে করি সংশ্লিষ্ট সকলে এ ব্যাপারে নজর দেবে এবং এই সমস্ত হন্তারকদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এখনি উপযুক্ত সময়।