ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

Bangla Insider

করোনা চিকিৎসায় বেসরকারী হাসপাতালের ব্যাক গিয়ার কেন?

সায়েদুল আরেফিন
প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল ২০২০ শুক্রবার, ০৯:৫৮ পিএম
করোনা চিকিৎসায় বেসরকারী হাসপাতালের ব্যাক গিয়ার কেন?

বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্ধ ভক্ত ডাক্তার আর কিছু ভীতুর ডিম সরকারী চিকিৎসকের ভূমিকা নিয়ে জনমনে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তাঁরা ক্ষোভে ফুঁসছেন। সাধারণ মানুষ শুধু ডাক্তারদের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন। বিশ্রী ভাষায় গালি দিচ্ছেন, খিস্তি চলছে মুখে মুখে, সোশ্যাল মিডিয়া আর পোর্টালে ও প্রিন্ট মিডিয়া আর ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায়। তবে সোশ্যাল মিডিয়া ছাড়া অন্য মিডিয়ার প্রতিবাদ বা সমালোচনা গা ছাড়া ভাবের, না করলেই না, তাই। কারণ হচ্ছে বড় বড় বিজ্ঞাপনের টাকা। অন্য দিকে কিছু মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট ব্যবসায়ী আর রি এজেন্ট আমদানীকারকের এখন রমরমা ব্যবসা, সাথে আছেন নষ্ট পচা আমলাদের কিছু অংশ। হাসপাতালে পণ্য ক্রয়ে দুর্নীতি তো ওপেন সিক্রেট। ১ টাকার পণ্য দুইটা শূন্য বসিয়ে বিশেষ শ্রেণীর  একদল মেডিক্যাল পণ্য ও যন্ত্রপাতি আমদানি কারক রাতারাতি বনে গেছেন কোটিপতি, সাথে কিছু ওষুধ কোম্পানি। করোনাভাইরাস চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, উপকরণ ও রি-এজেন্ট আমদানি উপলক্ষে সেটা দেখার এখন আর সময় নেই মানুষ বাঁচাতে হবে, তাই।      

এখানে সব মোটা অংকের টাকার খেলা আর এই সিস্টেমে ‘পাঠা বলি’ হচ্ছেন অধিকাংশ নিরীহ ডাক্তার, যারা চাকরী করেন বেসরকারি হাসপাতালে। এদের মধ্যে আছেন কিছু উদ্যোক্তাও। আর সরকারী হাসপাতালে চাকরী করে বেসরকারি হাসপাতালে ‘খ্যাপ’ মারেন, তাঁদের কথা বাদ দিয়েই বলি।    

বিল্ডিং ছাড়াও বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় লাগে অনেক যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার জন্য রি-এজেন্ট, নামকরা কিছু ডাক্তার, ওষুধ, হাসপাতালের কিছু পেইড এজেন্ট যাঁদের কাজ হচ্ছে কর্পোরেট হাউজগুলোকে তাঁদের কাস্টমার বানানো, ইত্যাদি। সারা দুনিয়ায় মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি তৈরির যেমন অনেক কোম্পানি আছে তেমনি আছে রি-এজেন্ট আর ওষুধ তৈরির কোম্পানি। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার জন্য রি-এজেন্ট, ইত্যাদি বিক্রি করতে মোটা অংকের ছাড় বা কমিশন না দিলে তাঁরা অন্য আমদানি কারকের কাছে থেকে যন্ত্রপাতি, রি-এজেন্ট নেন। ফলে ব্যবসা টিকাতে রি-এজেন্ট কোম্পানি মাল দেন ৩ বা ৫ নং, যাতে পরীক্ষার ফল আসে উলটাপালটা। মেডিক্যাল ইক্যুপমেন্টের দশাও তাই একই ধরণের নকল মেশিনে আসল মেশিনের নামের স্টিকার লাগিয়ে সরবরাহ করা হয়, ফলাফল গোলমেলে বা শূন্য। ফলে পুরা চিকিৎসা ভুল, বদনাম পুরটাই ডাক্তারের। এখানে যে রোগ ক্যান্সার হিসেবে সনাক্ত করা হয় বিদেশে গেলে দেখা যায় তা ভুল, অসুখ ভিন্ন।   

টাকার বিনিময়ে যে সেবা দেওয়া হয় তাকেই আমরা পরিষেবা বুঝি। সেবার ক্ষেত্রে টাকা নেওয়াটা মুখ্য নয়। সেই অর্থে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো পরিষেবার নামে কী করছেন তা খুলে বলতে একটা ডিকশনারির মত বই লিখেও শেষ করা যাবে না। এখানে ব্যবসার নামে চলে ডাকাতি, অসুস্থ মানুষের অসহায়ত্বকে পূঁজি করে। 

আগে ক্লিনিকের সত্য ঘটনার একটা উদাহরণ দিই। একজন সিনিয়র ডাক্তারের চেম্বারে পায়ের ব্যথার জন্য এক ভদ্র মহিলা ৭ দিন পরে পরে একটা করে ইনজেকশন নেন। ডাক্তার সাহেব ইনজেকশনের নাম বলেন না। শুধু ইনজেকশন পুষ করার পরে ৫ হাজার টাকা চার্জ নেন। একদিন ইনজেকশন করার পরে হঠাত জরুরী কাজে ডাক্তার সাহেব ইনজেকশনের এম্পুলটির  খালি অংশটি পাশের ওয়েস্ট বিনে ফেলে রেখে দ্রুত বাইরে গেলেন। ভদ্রমহিলা দেখে ওটা তুলে নিয়ে এসে তাঁর স্বামীকে দিলেন। স্বামী ওষুধের দোকানে গিয়ে দেখেন ঐ ইনজেকশনের দাম ৩৫ টাকা মাত্র।        

এবার ক্লিনিকের টেস্টের একটা উদাহরণ দিই। বড় ডাক্তার সাহেব তাঁর চেম্বার থেকে রোগীকে দেখে ওষুধ না দিয়ে রক্ত, পেশাব, পায়খানা পরীক্ষার জন্য একটা ছাপা কাগজ ধরিয়ে একটা নির্দিষ্ট ল্যাবের কথা বলে দিলেন। ওখানে উনি লাল কালিতে কয়েকটা টেস্ট যেন অবশ্যই করা হয় তার জন্য বার বার বলে দিলেন। কিন্তু ডাক্তার জানেন না যে, রোগী ঐ প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালকের বন্ধু। পরীক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুকে খোঁজ করার পরে সব ফাঁস হয়ে গেল। লাল কালি মানে ঐ টেস্টগুলোতে একটা ষ্ট্যাণ্ডার্ড ভ্যালু বসিয়ে দিতে হবে। ফলে তিনি যে ৩৫% কমিশন পান তাঁর সাথে লাল কালির গুলোর টেস্টের জন্য তাঁকে আলাদা ৮০% দিতে হবে, গুনে গুনে হিসেব করে।     

আরেকটি সত্য ঘটনার কথা বলি। গত ডিসেম্বরে ভারতের চেন্নাইতে একটা নামকরা হাসপাতালে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ী। তাঁর বোনের হাঁটুর অপারেশনের জন্য। প্রথমে ঢাকায় একই নামের হাসপাতালে গেলে বলা হয় প্রায় ২৪ লাখ টাকা লাগবে এই অপারেশন করতে। তিনি সব কাগজ নিয়েছিলেন এমন ভাব দেখিয়ে যে ২/৩ দিনের মধ্যেই টাকা যোগাড় করে উনি চলে আসবেন অপারেশন করাতে। তিনি চেন্নাইতে একই নামের হাসপাতালে গিয়ে এই অপারেশনে খরচ জিজ্ঞাসা করে হতবাক। তাঁরা বললেন যা তা হচ্ছে ঢাকার চেয়ে অর্ধেক টাকায় হবে একই অপারেশন। উনি ঢাকার কাগজ দেখালে বললেন। এক পর্যায়ে কর্তৃপক্ষের একজন এসে বললেন, ঢাকার এই হাসপাতাল আর তিন মাস পরে আমাদের নাম ব্যবহার করে আর মানুষ ঠকাতে পারবেন না, তাঁদের সাথে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। শর্ত অনুযায়ী তাঁরা সময় পাবেন তিন মাস। কারণ তাঁরা সেবার নামে ডাকাতি করেন। গত ১লা এপ্রিল ঢাকার ঐ হাসপাতালের নাম বদলে গেছে।      

একই ঘটনা ঢাকার অন্য হাসপাতালগুলোতেও। সেখানেই সেবার নামে চলে চরম ডাকাতি। গুলশানের একটা হাসপাতালে বাইপাস করতে নেয় ৪ লাখ টাকা, আগে মোটা অংকের টাকা জমা দিলে তার পরে অপারেশন শুরু। ধানমণ্ডি  বা অন্য এলাকায় ঠুনকো অজুহাতেই ভর্তি করে নেওয়া হয় আইসিইউতে, যার বিল দেবার ক্ষমতা এ দেশের ১০% মানুষের আছে কি না সন্দেহ। ডেঙ্গু রোগী নিতে প্রাইভেট হাসপাতাল খুব আগ্রহী; এতে ব্যবসাটা খুব ভালো, নিজের রিস্ক নেই। কিন্তু করোনাভাইরাসের রোগী! ওরে বাপরে বাপ টাকা লাগবে না, ডাক্তার সাহেবগন সব ছুটিতে। সর্দি কাশি জ্বরের রোগী গেলে হাসপাতালে লোক পাওয়া যায় না। ডাক্তার ১ বা দুইজন জুনিয়র, বাকীরা লুকিয়ে থাকেন গোপন কক্ষে। বাইপাস বা বড় অপারেশনের খবর থাকলে বাইরে আসেন। কিন্তু এরা যখন প্রাইভেট হাসপাতালের লাইসেন্স নিয়েছিলেন, সে সময় শর্ত কিন্তু ছিল ভিন্ন। সেটার প্রয়োগ করতে হলে মহা সংকট। কারণ চোরে চোরে মাসতুতো ভাই, সব শিয়ালের এক ডাক।       

প্রাইভেট হাসপাতালের  এমন সব গুনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। লিখলে বই লিখতে হবে’যে গল্পের শেষ নেই’।