ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

চসিকের আইসোলেশন সেন্টারে রোগী প্রতি ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০১:১১ পিএম
চসিকের আইসোলেশন সেন্টারে রোগী প্রতি ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ

 

করোনা চিকিৎসার নাম দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে (চসিক) পুকুরচুরির ঘটনা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছে।  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে সাধারণ উপসর্গ নিয়ে আসা একেকজন করোনারোগীর পেছনে ব্যয়  দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অথচ তুলনামূলক জটিল করোনা রোগী সামাল দিয়েও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা আরেক আইসোলেশন সেন্টারে একেকজন করোনারোগীর পেছনে খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ১৭৮ টাকা!

অবিশ্বাস্য ব্যায়ের ঘটনা তদন্তে চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে আইসোলেশন সেন্টারের ব্যায়ে অনিয়মের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

গত ২১ জুন চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এক্সেস রোডের সিটি কনভেনশন হলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে একটি আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়।

কাঙ্খিত রোগী না পাওয়ায় ৫৫ দিনের মাথায় আড়াইশ শয্যার আইসোলেশন সেন্টারটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ওই ৫৫ দিনে ১২০ জন রোগীর জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ হিসেবে মাথাপিছু প্রতিজন রোগীর পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা। অথচ চিকিৎসাখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামান্য ওষুধ ও অক্সিজেন সেবায় এর ভগ্নাংশও খরচ হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে এর বিপরীতে তুলনামূলক জটিল করোনা রোগী সামাল দিয়েও হালিশহরে কিছু তরুণের উদ্যোগে পরিচালিত ‘আইসোলেশন সেন্টার চট্টগ্রামে’ রোগীপ্রতি খরচ হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ১৭৮ টাকা। তিন মাসে অনুদাননির্ভর ওই প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়েছে ৭৬৫ জন রোগী। সবমিলিয়ে সেখানে খরচ হয়েছে ৪৭ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। আইসোলেশন সেন্টারের মুখপাত্র জিনাত সোহানা চৌধুরী এই তথ্য জানিয়েছেন। অনেকটা হেলাফেলায় গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নামমাত্র আইসোলেশন সেন্টারে মাত্র ৫৫ দিনে জনপ্রতি রোগীর খরচ কিভাবে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা হতে পারে— এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসাখাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই টাকায় একজন করোনা রোগী উন্নতমানের প্রাইভেট ক্লিনিকে আইসিইউ ভেন্টিলেটর সুবিধাসহ অন্তত ১৫ দিনের চিকিৎসাসেবা নিতে পারতেন।

চট্টগ্রাম নগরজুড়ে হাসপাতালে-ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে হাহাকার, এমনকি চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর একাধিক ঘটনার মধ্যে চসিকের আইসোলেশন সেন্টারটি চালু করা হয়। তবুও ১৩ জুন উদ্ধোধনের পর বিস্ময়করভাবে নিদারুণ রোগী সংকটে পড়ে আইলোশন সেন্টারটি।  

চসিকের হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ দিনে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে মাত্র ১২০ জন রোগী। এতো রোগী আদৌ সেখানে চিকিৎসা নিয়েছিল কিনা— এ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও চসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ২ জন রোগী সেখানে সেবা পেয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদের এক্সেস রোডে সিটি কর্পোরেশনের ওই আইসোলেশন সেন্টারের সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন যান্ত্রিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক শুরুতেই দরপত্রবিহীন ২ কোটি টাকার বেশি খরচ দেখানো ছাড়াও হিসাবের গরমিলসহ নানা অভিযোগ ওঠে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সেলিম আক্তার চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সিটি কর্পোরেশনের আইসোলেশন সেন্টারে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এতে যান্ত্রিক শাখার ভারপ্রাপ্ত তত্ত্ববধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক, ডা. সুশান্ত বড়ুয়া, প্রকৌশলী সালমা, বিদ্যুৎ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ঝুলন কুমার, স্টোরের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রকৌশলী ও নেজারত শাখার একজনসহ সবার কাছ লিখিত আকারে আইসোলেশন সেন্টারের কেনাকাটা ও খরচের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেকেই লিখিত আকারে দিয়েছেন এসব তথ্য।’

সেলিম আক্তার চৌধুরী আরও বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে নেওয়া এসব তথ্য বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কিনা তদারকি করা হবে। একই সঙ্গে বাজার কমিটির সঙ্গে তাদের তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখা হবে। পরবর্তীতে এসব যাচাইবাচাই করার পর রিপোর্ট দেওয়া হবে। শিগগিরই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদুল আলম সুজন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইসোলেশন সেন্টারের খরচ ও কেনাকাটার বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সেখানে টেন্ডার ছাড়াই কিভাবে ৩-৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গঠিত কমিটি তদন্তের কাজ ইতিমধ্যে অনেকটা সম্পন্ন করেছে। তদন্তের প্রমাণ পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’