ইনসাইড আর্টিকেল

সুবিধা পেয়েও কেন আদিম জীবনাচরণে অভ্যস্ত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা?

প্রকাশ: ০৮:১০ এএম, ০৯ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail সুবিধা পেয়েও কেন আদিম জীবনাচরণে অভ্যস্ত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা?

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, দেশে তৃতীয় লিঙ্গের সংখ্যা ১৩ হাজার। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তাদের জন্য দেওয়া হয়েছে আরও সুযোগ সুবিধা। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের  কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক আত্তীকরণের লক্ষ্যে বর্তমানে চালু করা বিশেষ কর প্রণোদনা আরও প্রসারিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু তার পরও তারা সেই সুযোগ যথাযথ ভাবে কাজে লাগাচ্ছেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায় সাধারণ মানুষের মনে। 

বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন মানুষের মনে তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে নানা ধরণের ট্যাবু আছে। যা আদিম কাল থেকেই মানুষ লালন করছে। নিজেদের মধ্যে এই সকল চিন্তাভাবনা পোষণ করার জন্য অনেক সময় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বেড়ে যায়। যা তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে বিমুখ করে তোলে এবং শেষমেশ  নিজেদের পরিচিত পেশায় থাকতে বাধ্য হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সমাজ থেকে আলাদা করে দেখা না হলেই তাদের জীবন স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব। তাদের আলাদা ভাবে দেখা হয় বলেই তাদের বাসস্থান,  কর্মসংস্থান এমনি জীবনধারা পর্যন্ত একদম ভিন্নধর্মী। তাদের জীবিকার যেটুকু কাজ করা প্রয়োজন সেটুকুও তারা করার মতো যথেষ্ট সুযোগ পাই না বলে, চাঁদাবাজি কিংবা মানুষের থেকে খুঁজে তাদের জীবিকা চালাতে হয়। 

তাদের বাসস্থান এবং সমাজ সম্পূর্ণ বিছিন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সমাজ দ্বারা যথেষ্ট স্বীকৃতি না পাওয়া। সমাজ কর্তৃক যদি যথেষ্ট সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে তাদের জীবনের উন্নতি হওয়া সম্ভব। সমাজে পাঁচটি মৌলিক অধিকার যথাযথ পূরণ না হওয়ার কারণেই তাদের পুরাতন পেশা বেছে নিতে হয় বলে ধারণা অনেক বিশেষজ্ঞদের৷ তবে সমাজে অনেকেই এখন এসব ক্ষেত্রে সচেতন,  নিজেদের মতো সহানুভূতি এবং সাহায্য তারা করতে এগিয়ে আসছেন। তবুও কমে আসছে না পুরাতন পেশার জন্য তাদের প্রীতি। 

দেশের অনেক সংগঠন আছে যারা কেবলই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অধিকার আদায়ের জন্য কাজ করে থাকে। তাছাড়া সরকার কতৃক ভোটের অধিকার, পেশাগত স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে, করমুক্তির অনুমোদন পাশ এবং বিশেষ ঋণ গ্রহণের সুযোগও তৈরি হয়েছে দেশে। বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলে কাজ করছে তাদের স্বাস্থ্য উন্নয়ন,  অধিকার,  সরকাএই এবং রাজনৈতিক বিভিন্ন অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে৷ সেক্ষেত্রে বেশিরভাগই ভালো উদ্যোগ এবং তাদের বাস্তবায়নের দৃষ্টান্ত।  কিন্তু, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মধ্যে শতকার ১৫ শতাংশ কেবল তাদের পুরাতন পেশা বাতিল করে অন্য দিকে মন দিতে পেরেছেন। 

সাইকোলজিক্যাল টার্ম থেকে সাইকোলজিস্ট রা এর কারণ হিসেবে মনে করেন, তাদের প্রথাগত জীবনব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা নিয়ে তাদের ভেতর চলতে থাকা নানা ধরনের সংশয়ের কারণেই মুলত তারা আদিম জীবন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ তাদের মধ্যে এই ভীতি কাজ করতে থাকে যে নানা ধরণের বৈষম্যের স্বীকার হতে হবে, যা তারা জন্মের পর থেকেই দেখে আসছে। সেক্ষেত্রে সরকারের আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যেখানে তাদের শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ দেওয়ার মতো উদ্যোগ থাকবে। 

অনেকেই সাহস করে নিজেদের জীবনের চাকার চলন পরিবর্তন করার জন্য বেরিয়ে এসেছেন তাদের আদিম সমাজ এবং আদিম জীবন ধারা থেকে। নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলেছেন শিক্ষা এবং নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে। কিন্তু অনেকেই শেকল ভাঙ্গার মতো সেই মানসিক দৃঢ়তা এখনো গড়ে তুলতে পারেননি। যা তাদের আষ্টেপৃষ্টে ধরে রেখেছেন তাদের পুরাতন জীবন ধারায়।  তবে প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা গুলোকে আতংক ঝেড়ে যদি কাজে লাগাতে পারে তবে জীবন পরিবর্তন এবং অধিকার আদায়ের দাবী করা সম্ভব বলে আআশাবাদী বিশেষজ্ঞরা। 

আদিম জীবনাচরণ   তৃতীয় লিঙ্গ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় বাংলার ‘ভাষা আন্দোলন'

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ভাষা আন্দোলনের শুরু ১৯৪৮ সালে। ঢাকায় তখন প্রধান দৈনিক পত্রিকা আজাদ এবং ইংরেজি মর্নিং নিউজ। দুটিই ছিল মুসলিম লীগের সমর্থক সংবাদপত্র। ভাষা আন্দোলন, বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা করার জন্য ছাত্র প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর (তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমউদ্দীন) চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর- ইত্যাদি খবর মুসলিম লীগ সমর্থক কাগজগুলোতে ছাপা হতো, কিন্তু তেমন গুরুত্ব ও সমর্থন পেতো না। বড় দুটি দৈনিকের সমর্থন ও সাহায্য না পেলেও ১৯৪৯, ১৯৫০, ১৯৫১ এই তিন বছর ভাষা আন্দোলনকে জিইয়ে রেখেছে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থেকে প্রকাশিত কয়েকটি সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা।

১৯৪৮ সালে ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের শুরুতেই দৈনিক ইত্তেহাদ এই আন্দোলনে জোরালো সমর্থন দেয়। পত্রিকাটি তখনও কলকাতা থেকে প্রকাশিত হচ্ছিল এবং আজাদের মতো, ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার কাগজটির ঢাকায় আসা নিষিদ্ধ করে দেন। এই কাগজের উদ্যোক্তারা ঢাকা থেকে সাপ্তাহিক হিসেবে ইত্তেহাদ প্রকাশের চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকারের বাধার ফলে ব্যর্থ হয়। পরে তারা সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন। এই সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ভাষা আন্দোলনে জোরালো সমর্থন জানায়। 

ইতিহাস বলছে, পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই ভাষা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। ‘বাংলা’ নাকি ‘উর্দু’- কী হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা! পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিষয়টি পূর্ব বাংলার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত প্রশ্নে রূপ নেয়। এ নিয়ে সে সময়কার সংবাদপত্রগুলোতে এই ভাষা বিতর্কের মতামত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। সংবাদপত্রগুলোতে এর পক্ষে-বিপক্ষে নানান সংবাদ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশ হতে দেখা যায়। সংবাদপত্রগুলোতে এই ভাষার ইস্যুটি নিয়ে লাগাতার লেখা প্রকাশ- বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সে সময়ে দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেহাদ, সাপ্তাহিক মিল্লাত, মাসিক সওগাত, মাসিক মোহাম্মদীতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

দেশভাগের আগে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা- এমন মনোভাব প্রকাশ করতে থাকে। ফলে তার বিপরীতে বাংলা ভাষাভাষী সংবাদপত্রগুলো রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। এ সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত মুসলিম লীগ সমর্থিত পত্রিকাগুলোয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ প্রসঙ্গে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হতে দেখা যায়- যে প্রবন্ধগুলো মূলত উর্দু ভাষাকে সমর্থন করে। অন্যদিকে বাংলা ভাষার পক্ষে তখন প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে দৈনিক ইত্তেহাদ, দৈনিক আজাদ। এই পত্রিকা দুটোতে বাংলা ভাষার সমর্থনে বেশ কিছু প্রবন্ধ ছাপা হয়। 

দেশভাগের আগে ভাষার প্রশ্নে দৈনিক আজাদে বেশ কিছু প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও এ ব্যাপারে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি শুরু থেকেই ছিল রহস্যঘেরা। আজাদে কখনো বাংলা ভাষার পক্ষে, কখনো বিপক্ষে বক্তব্য প্রকাশিত হতে দেখা যায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত ভাষার প্রশ্নে পত্রিকাটির কোনো সুনির্দিষ্ট অবস্থান ছিল না। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ভাষার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা-না উর্দু?’- শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। পুস্তিকায় ইত্তেহাদ সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের প্রবন্ধও সে সময় ছাপা হয়েছিল।

দেশভাগের প্রথম থেকেই মর্নিং নিউজ বাংলা ভাষার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করে পত্রিকাটিতে অব্যাহতভাবে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ও খবর নিয়মিত প্রকাশিত হতো। ১৯৪৭ সালে ১৭ ডিসেম্বর মর্নিং নিউজের সম্পাদকীয় কলামে উর্দু-সমর্থকদের একটি তাত্ত্বিক বক্তব্যও প্রকাশিত হয়- যা বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে লেখা। এই পত্রিকাটি সে সময় বাংলা ভাষার দাবিতে যে আন্দোলন- সে আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করে।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের একচোখা নীতির বিষয়ে তমদ্দুন মজলিসের কয়েকজন নেতা তৎকালীন মন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করতে যান। মন্ত্রী এসব বিষয়কে ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ বলে দায় এড়ান। তাঁর এই বক্তব্যের ওপর ইত্তেহাদ ‘ভুলের পুনরাবৃত্তি’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে।


১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার দাবি তোলেন। ১৯৪৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আনন্দবাজার পত্রিকা এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি অমৃত বাজার পত্রিকা এই খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গণপরিষদে খাজা নাজিমুদ্দিন বলেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীর মনোভাব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে। তাঁর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদকীয়র বক্তব্য সে সময় বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো সমর্থন করে। কিন্তু একই বছর মার্চ মাসে ভাষা আন্দোলনের সময় পত্রিকাটিকে সর্বতোভাবে উর্দুকেই সমর্থন করতে দেখা যায়।

সে সময়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বাংলার ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অংশগ্রহণ করে। ভাষা আন্দোলনকে সাংগঠনিক রূপ দিতে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদে ‘ইনসাফ’, ‘জিন্দেগী’ ও ‘দেশের দাবী’ পত্রিকা থেকে তিনজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়।

১৯৪৮-৪৯ সালে ভাষা আন্দোলনে সবচাইতে বেশি শক্তিশালী সমর্থন জোগায় সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকা। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন তখনকার প্রগতিশীল যুব নেতা মাহমুদ আলী। নওবেলালের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় ঢাকা থেকে প্রকাশিত তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক সীমান্ত পত্রিকাটিও। এই সীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক মাহবুব আলম চৌধুরীই প্রথম ভাষা শহীদদের ওপর কবিতা লেখেন, আমি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি, কাঁদতে আসিনি।

পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সমাবর্তনে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। ছাত্ররা ‘না’, ‘না’ বলে প্রতিবাদ জানান। 

১৯৪৮ সালের পর বাংলা ভাষা আন্দোলন কিছুটা স্থিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের বাংলা ভাষাবিরোধী ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। বাংলা ভাষায় আরবি হরফ প্রবর্তনের চেষ্টা ছিল এই ষড়যন্ত্রের একটি রূপ। ১৯৫০ সালের ২৪ মে দৈনিক আজাদ- এ বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের খবর বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করে।

১৯৫১ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস উপলক্ষে সংগ্রাম পরিষদের পুরোনো কমিটি পুনর্গঠন করে ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি গঠন করা হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ৪ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ৩০ দিনের জন্য শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। এ পরিস্থিতিতে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব খবরগুলো বেশ জোড়ালোভাবেই প্রকাশ করে ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ ‘দৈনিক আজাদ’। 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালেই ছাত্রছাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। তৎকালীন আমতলায় বসে সভা। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে-বিপক্ষে চলে তর্ক-বিতর্ক। একপর্যায়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা আসে। স্লোগান ওঠে, ‘১৪৪ ধারা ভাঙতে হবে’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন একদল ছাত্রছাত্রী। এরপর দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ হয়। বিকেলে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ছাত্রজনতার ওপর নির্বিচারে গুলি করে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট পুলিশ বাহিনী। শহীদ হন সালাম-বরকত-রফিকসহ নাম না-জানা অনেকেই। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনার পর ভাষার প্রশ্নে আগের রহস্যের জাল ছিন্ন করে ‘দৈনিক আজাদ’। 

এদিন সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করে বিশেষ টেলিগ্রাম। ব্যানার হেডলাইন করা হয়, ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। মুসলিম লীগ সরকার দৈনিক আজাদের এই সংখ্যা সে সময় বাজেয়াপ্ত করে। পুলিশের গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঘটনার প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরবর্তী কয়েক দিন দৈনিক আজাদ প্রচুর সংবাদ ছাপে। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা নেয়।

মর্নিং নিউজ ছিল উর্দু ভাষার সমর্থক একটি পত্রিকা। পত্রিকাটি সে সময় ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও উগ্র প্রচারণা চালায়। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকেও তারা বিকৃত করে ২২ ফেব্রুয়ারি খবর প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতা ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে অবস্থিত মর্নিং নিউজের প্রেস ও অফিস জ্বালিয়ে দেয়। বাংলা ভাষাপ্রেমী জনতার ক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় মর্নিং নিউজ পত্রিকার অফিস।

সংবাদ-এ কর্মরত অধিকাংশ সাংবাদিকই ছিলেন বাংলা ভাষার সমর্থক। কিন্তু মালিকানার কারণে পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। ২১ ফেব্রুয়ারির খবরও পত্রিকাটি খুব কম গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। ২২ ফেব্রুয়ারি ক্ষুব্ধ জনতা রথখোলা মোড়ে সংবাদ অফিসে হামলা চালায়। ভাষা আন্দোলনবিরোধী ভূমিকার জন্য পত্রিকাটি থেকে তরুণ সাংবাদিক মুস্তফা নূরউল ইসলাম ও ফজলে লোহানী পদত্যাগ করেন। 

আগে বাঙালি মুসলমান পরিচালিত সংবাদপত্রের নাম রাখা হতো উর্দু, ফার্সি অথবা আরবিতে। যেমন-সোলতান, তকবির, আজাদ, সওগাত ইত্যাদি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের প্রভাবেই সম্ভবত বাঙালি মুসলমান তাদের সংবাদপত্র ও সাময়িকীর নাম বাংলায় রাখা শুরু করেন। ১৯৫১ সালে ক্ষমতাসীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী যে দৈনিক সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেন, তার নাম রাখা হয় ‘সংবাদ’। মুসলিম লীগ সমর্থক পত্রিকা ‘দৈনিক আজাদ’ এই নামকরণের প্রতিবাদ জানান। ‘আজাদের’ সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, পত্রিকাটির নামকরণে হিন্দুয়ানি বাংলাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। মুসলমানি বাংলায় পত্রিকাটির নাম রাখা উচিত ছিল ‘খবর’।

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন খবর পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হতো। এ কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অবজারভারের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সম্পাদক আবদুস সালাম ও মালিক হামিদুল হক চৌধুরীকে সে সময় গ্রেপ্তার করা হয়। 

সাপ্তাহিক সৈনিক ২১ ফেব্রুয়ারির বিশেষ সংখ্যা বের করে। পত্রিকাটি লাল কালিতে ব্যানার করে, ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত, মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণ’। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ সৈনিক অফিস ঘেরাও করে। সম্পাদক আবদুল গফুর ও প্রকাশক প্রিন্সিপাল আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক ইনসাফ ও দৈনিক আমার দেশ। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় দৈনিক মিল্লাত ব্যানার শিরোনাম করে: ‘রাতের আঁধারে এত লাশ যায় কোথায়?’। ঘটনার পর মিল্লাত সম্পাদক মো. মোদাব্বেরের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। ভাষা আন্দোলনে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকও জোরালো ভূমিকা পালন করে।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

ভাষা বিতর্কের উৎপত্তি এবং বাংলার ‘ভাষা আন্দোলন’

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ভাষা মূলত একটি মাধ্যম। যে শব্দগুলোর বিনিময়ে একে অপরকে কাছে টানে, বুঝতে পারে, জানতে পারে। এই শব্দ মাধ্যমগুলোর সমষ্টিই হচ্ছে ভাষা। সৃষ্টির আদিতে মানুষ ভাষার ব্যবহার করতে জানতো না। বিভিন্ন গোত্র, উপ-গোত্র বা সম্প্রদায় ইশারা-ইঙ্গিতে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করতো। সভ্যতার বিবর্তনে মানুষ ভাষার ব্যবহার করতে শিখে, এর পর শুরু হয় অক্ষর বিন্যাস অর্থাৎ লেখার চর্চা।

মূলত মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে ভাষা ব্যবহারের প্রচলণ করেছিল। একেকটি অঞ্চলের একেকটি সম্প্রদায়ের ভাষা একেক রকম হয়ে থাকে। উচ্চারণগত ভিন্নতার কারণেও বাংলাদেশেই বাংলা ভাষাভাষি বিভিন্ন মানুষের ভাষাগত ভিন্নতাও পরিলক্ষিত হয়। ইতিহাসবিদ এবং ভাষাবিদদের মতে, বাংলা ভাষা একটি আদি ভাষা। এর রয়েছে প্রায় ১৪শ’ বছরের ঐতিহ্য। বাংলা গদ্য সাহিত্য কিংবা  দৈনিক পত্রিকাতেও পাকিস্তান আমলে সাধু ভাষার প্রচলণ লক্ষ্য করা গেছে। এটিও  বাংলা ভাষা,  লেখ্য বা সাধু ভাষা এবং আবার এর রয়েছে কথ্য বা চলিত ভাষা। বাংলাতে এমন ভাষার ব্যবহার খুব বেশি দিন আগের নয়। দিনে দিনে পরিমার্জন, পরিশোধন এবং পরিচর্যার কারণে সমসাময়িক সময়ে বাংলা ভাষার একটি প্রমিত রূপ ধারণ করেছে বলেই মনে করছেন ভাষাবিদরা।

ভাষাবিদরা বলছেন, এর মূলে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের অবদান। বাংলা সহিত্যের কথা সাহিত্যিকেরা তাদের রচিত বিভিন্ন বইয়ে শুদ্ধ বাংলা ভাষা বা প্রমিত বাংলা ভাষার প্রয়োগ ঘটিয়ে আজকের বাংলা ভাষার রূপ সৃষ্টি করেছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির আগে বাংলা ভাষারও অন্য একটি ভিন্ন রূপ ছিল। ব্যাকরণগত দিক থেকে যাকে বলা হতো সাধু ভাষা, তবে সে সময় কথ্য বা চলিত ভাষার ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়।

পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই উর্দু বনাম বাংলা নিয়ে ভাষা বিতর্ক দেখা দেয়। ১৯০৬ সালে যখন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসলিম লীগের এক অধিবেশনেও এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে তখন পর্যন্ত এ সমস্যাটি তত প্রকট হয়নি। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগ সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে দলের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রবর্তনের একটি উদ্যোগ নিলে ফজলুল হকের বিরোধিতায় তা সফল হয়নি। তৎকালীন বাংলা সরকারের সময়ও ভাষা নিয়ে তেমন সমস্যা হয়নি। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের প্রাক্কালে এই বিতর্ক মৃদুভাবে দেখা দেয়।

কংগ্রেস নেতারা হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে পাল্টা ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দ উর্দু ভাষাকে সমগ্র ভারতের রাষ্ট্রভাষা দাবি করেন। এ প্রসঙ্গে খুব ক্ষুদ্র হলেও বাংলার পক্ষে দাবি ওঠে। তবে ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় তখন ভাষা বিতর্ক নতুন রূপ নেয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মাসে  মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান এবং জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য দেন।

এ সময় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বাঙালি লেখক, বুদ্ধিজীবী এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলার পক্ষে বক্তব্য দেন। পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষিত সমাজ রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে পত্র-পত্রিকায় মতামত প্রকাশ করতে শুরু করেন। এ সময় পূর্ববঙ্গে গঠিত বিভিন্ন সংগঠনও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখে। ১৯৪৭ এর জুলাই মাসেই কামরুদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় ‘গণআজাদী লীগ' নামে একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠন। এই সংগঠন স্পষ্টভাবে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করে। পরের মাসে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভাষা বিতর্ক আরো প্রকাশ্য রূপ লাভ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত ‘তমদ্দুন মজলিস’ সভা-সমিতি ও  লেখনীর মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলে। এই সংগঠনের উদ্যোগে ডিসেম্বর মাসে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ যার আহ্বায়ক মনোনীত হন নূরুল হক ভূঁইয়া। পরবর্তীকালে এ উদ্দেশে কয়েকটি কমিটি গঠিত হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তমদ্দুন মজলিসের গঠিত প্রথম সংগ্রাম পরিষদটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ববঙ্গের বুদ্ধিজীবী সমাজ, সাংবাদিক সংঘ বিভিন্ন সভা ও স্মারকলিপির মাধ্যমে বাংলাকে পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান।

তবে পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি ও আশা-আকাঙ্খাকে উপেক্ষা করে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সরকারি কোন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। ঢাকার বাইরেও এ আন্দোলনের প্রসার ঘটে। ঢাকায় ৬ ডিসেম্বর প্রতিবাদ মিছিল শেষে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করেন। যদিও এ পর্যায়ে সরকার যড়যন্ত্রের পাশাপশি উর্দুভাষী মোহাজেরদের বাংলা ভাষার পক্ষে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। ১২ ডিসেম্বর এমনি একটি বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষে বেশ কযেকজন বাঙালি ছাত্র আহত হন।

ভাষা সৈনিক নূরুল হক ভূঁইয়া এ ঘটনার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, “বাঙালিদের ওপর অবাঙালিদের এটা যে অন্যায় হামলা ছিল- তা সবার কাছে বেশ পরিষ্কার হয়। বাঙালির মাঝে নিজেদের অস্তিত্ব, জাতীয় সত্তা ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে ভাষা আন্দোলন দ্রুত জনসমর্থন লাভ করে।”

এই ঘটনার প্রতিবাদে ১৩ ডিসেম্বর সচিবালয়ের কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করে। সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে এবং ১৫ দিনের জন্য সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪৮ সালের প্রথম থেকেই ভাষা প্রশ্নে বাঙালি জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত অংশ বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার হয়। ১৯৪৮ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক অধিবেশনে নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে গ্রহণের প্রস্তাব গ্রহণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন। কিন্তু মুসলিম লীগের সকল সদস্যের ভোটে তা অগ্রাহ্য হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এর প্রতিবাদ করে প্রথমে ছাত্র সমাজ।

২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ২ মার্চ ছাত্রসমাজ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে। এ পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। নব গঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল আহ্বান করে। ওইদিন হরতালকালে পুলিশের লাঠি চার্জে অনেকে আহত হন। শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল আলম সহ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩-১৫ মার্চ ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। শুধু ঢাকা নয় ঢাকার বাইরে সর্বত্র ১১ মার্চ হরতাল ও অন্যান্য দিনের কর্মসূচি পালিত হয়। আন্দোলনের তীব্রতার প্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ৮ দফা চুক্তিতে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, তদন্ত কমিটি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম বাংলা ও ব্যবস্থাপক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বিষয় উত্থাপনে রাজি হন।

তড়িঘড়ি করে তাঁর চুক্তি সম্পাদনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফর যেন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। ১৯ মার্চ জিন্নাহও ঢাকা সফরে এসে ২১ মার্চ রেসকোর্সে নাগরিক সংবর্ধনা, ২৪ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে বৈঠক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে মতামত দেন। জিন্নাহর ২৪ মার্চ বক্তৃতার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে উপস্থিত ছাত্ররা ‘না’ ‘না’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশনে নাজিমুদ্দিন সংগ্রাম পরিষদের সাথে ১৫ মার্চের চুক্তি ভঙ্গ করে উর্দুকে পূর্ববঙ্গের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব করেন। পরিষদে বিরোধী দল এর প্রতিবাদ করলেও নাজিমুদ্দিন তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাহার করেন নি। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিষদে উত্থাপিত এই প্রস্তাবটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

১৯৪৮ সাল জিন্নাহর মৃত্যুর পর বিশেষত মার্চ মাসের পর হতে ভাষা আন্দোলন কিছু দিনের জন্য স্থিমিত থাকলেও বাংলার অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন সংগঠিত হয়। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে ৮ এপ্রিল থেকে ১৮ দিন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারীদের ধর্মঘট, মেডিকেল ছাত্রদের ধর্মঘট, জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন চলে। ১৪ জুলাই পুলিশ ধর্মঘট হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে গুলি চলাকালে ২ জন পুলিশ নিহত হয়।

এই অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত খান আলী ঢাকা এলে ছাত্র সমাজ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানায়। লিয়াকত আলী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া বক্তৃতায় সুকৌশলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে ছাত্রদের মধ্য থেকে আবারও ‘না’ ‘না’ ধ্বনিত প্রতিবাদ মুখরিত হয়ে ওঠে।


ভাষা আন্দোলন   ভাষা বিতর্ক   উৎপত্তি   ইতিহাস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

বাংলা ভাষার বিপদ সঙ্কেত ইংরেজি মাধ্যম!

প্রকাশ: ০৮:০১ এএম, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail বাংলা ভাষার বিপদ সঙ্কেত ইংরেজি মাধ্যম!

দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলণ হওয়ার কথা থাকলেও- কথা কেবল কথাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। বাংলা ভাষার সর্বস্তরে ব্যবহারের বিভিন্ন রকম বুলি কেবলমাত্র আমরা এই মাসেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি এলেই শুনে থাকি। প্রকৃতপক্ষে বাঙালির ভাষা চেতনার মাস ফ্রেব্রুয়ারি চলে গেলেই এসব আওড়ানো বুলি সময়ের বিবর্তণে বৃহদ্রন্ত্রের গহ্বরে হারিয়ে যায় এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সেই কথাও আমরা ভুলে যাই। ফলে বাংলা ভাষার জন্য একটি বিপদ সঙ্কেত বিরাজ করে।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সকল ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের জয়জয়কার আমরা দেখে থাকি। কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য বলীদান দেওয়ার যে ইতিহাস, তা বিশ্বের আর কোনো দেশের ইতিহাসে নেই। তথাপিও সর্বক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলা ভাষার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাংলা ভাষার জন্য বিপদ সঙ্কেত ইংরেজি মাধ্যম।

এই ফেব্রুয়ারি মাসেই সর্বক্ষেত্রে বাংলাকে প্রকৃত অর্থেই প্রচলিত করার উদ্দেশ্যে জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিজীবি, প্রথিতযশা নেতা, আমলা, ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী- সকলের বাচনে নানামুখী অঙ্গীকার আমরা প্রত্যক্ষ রূপেই শ্রবণ করি। এসব ভাষাগত শৌর্য-বীর্যের বাংলা শব্দভাণ্ডারের কথামালা কেবল এ মাসেই- এই ফেব্রুয়ারিতেই। কিন্তু প্রায়োগিক ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্লেষণ এখন সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। যেসব পণ্ডিত ব্যক্তিরাই এ মাসে ফাঁকা বুলি আওরে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন, তারাই আবার নিজের কৃতিত্ব প্রকাশের জন্য আপন সন্তানকে ভর্তি করছেন ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে। আবার বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজনের সামনে নিজের স্ট্যাটাস প্রকাশের জন্য বলছেন, ‘আমার ছেলেকে তো অক্সফোর্ডে ভর্তি করেছি। সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ!

২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ‘বাংলা ভাষা প্রচলণ উদ্যোগ নামে একটি সংগঠন বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে নামফলকের উপরে ৬০ ভাগ বাংলা ও নিচে ৪০ ভাগ অন্য যে কোনো ভাষা ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছিল। এ ধরনের বাংলা ভাষার প্রচলণ কাসুন্দি আর কতদিন পর্যালোচনার বিষয় হবে- এটাই আজ দেশবাসীর প্রশ্ন।

এটি সর্বজনবিদিত যে, ভাষাভিত্তিক জাতি হিসেবে বাঙালির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে হাজার বছরের বহু আগে। ইংরেজি, ফরাসি বা জার্মান ভাষার মতো বাংলা ভাষার ইতিহাস প্রায় দশম শতক থেকেই ঐতিহ্যমণ্ডিত। মূলত মানব সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদান সৃষ্টির পটভূমিতে রয়েছে অবস্তুগত জ্ঞান-বিজ্ঞানেরই ধ্যানধারণা। অবস্তুগত সংস্কৃতির প্রধান উপকরণ হিসেবে ভাষা মানুষের মনোজগতের ভাব-কল্পনা, সাহিত্য-শিল্পকলা ইত্যাদির অপার্থিব ঐতিহ্যের ধারক-বাহকরূপে চিহ্নিত।

যেহেতু অন্য প্রাণীর কোনো ভাষা নেই, তাই তাদের সংস্কৃতিও নেই। একমাত্র ভাষার কারণে মানুষ সংস্কৃতিমান হতে পেরেছে, সাহিত্য সংস্কৃতির অনুসারী হতে পেরেছে। বিজ্ঞজনের মতানুসারে, এ উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ভাষা বাংলা এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন করার লক্ষ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এ উপমহাদেশে দ্বিতীয় নবজাগৃতির সূচনা করেছিল।

বাঙালি জাতির মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে বিশাল আত্মত্যাগের মহিমা শুধু বাঙালি জাতির, তাই ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে গ্রহণ করে সমগ্র বিশ্ব আজ গৌরবদীপ্ত হয়েছে। খ্যাতিমান ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতানুসারে- ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে এর প্রকাশকালকে যদি চিহ্নিত করা হয়, তাহলে এ ভাষার সমৃদ্ধির ইতিহাস প্রায় চৌদ্দ শ বছরের। বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসারে এ ভাষার অবদান শুধু ঐতিহ্যমণ্ডিত নয়, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে জাতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ ভাষার অবদান এক অসাধারণ চেতনায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে দীর্ঘ সংগ্রামের পথপরিক্রমায় প্রাণশক্তিতে পরিপুষ্ট হয়ে মাতৃভাষা বাংলা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শক্ত ভিত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। একুশের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক নীতিগুলো তথা জাতিসত্তার সংবিধানসম্মত প্রধান চার স্তম্ভ- জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে জাতি তাদের সামগ্রিক আর্থসামাজিক- সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির সনদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

মাতৃভাষা বাংলাকে প্রায়োগিক অর্থে যথাযথ মূল্যায়ন না করে এবং সর্বত্র এর বিকাশমানতাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে শুধু একুশে ফেব্রুয়ারি অথবা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে আমাদের তৎপরতা কোনোভাবেই জাতির সামষ্টিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না। মাতৃভাষার মাধ্যমে সব স্তরে এবং সব জনপদে শিক্ষাকে যদি কার্যকরভাবে জনপ্রিয় করা না যায়, তাহলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং এর প্রাসঙ্গিক উন্নয়ন নিয়ামকগুলোর তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

বাংলা ভাষা বিপদগ্রস্ত, বাংলা ভাষার জন্য বিপদ সঙ্কেত ইংরেজি মাধ্যম- এ রকম একটা কথা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুব শোনা যাচ্ছে। তবে ইংরেজি ভাষা বা অন্য ভাষাকে আমরা শিক্ষার আওতায় আনবো না, ঠিক তেমনটি নয়। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু বাংলাদেশ হিসেবে, প্রাধান্যতার দিক বিবেচনা থেকে বাংলা ভাষার ব্যবহার এদেশের সকল ক্ষেত্রে হওয়া অত্যাবশ্যকীয়। আমার সন্তান ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়াশোনা করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, কিন্তু বাংলা তার শেকড়, সেই শেকড়কেই সে ভুলে গেছে। ভুলে গেছে গর্বিত বাঙালির ভাষা অর্জনের ইতিহাস, তবে এই বলীদানের মূল্য কি?

বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য পুরোধা ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিও বাংলা ভাষার বিপদ নিয়ে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এটি একটি অত্যন্ত পুরোনো উদাহরণ। বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘বাঙালি ভদ্রলোক সন্তানরা পরস্পর কথা বলে ইংরেজিতে, চিঠিপত্র লেখে ইংরেজিতে এবং হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন লোকে দুর্গাপূজার আমন্ত্রণপত্রও ইংরেজিতে লিখবে।

ঔপনিবেশিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি সে সমাজে প্রতাপশালী ছিল। দেশীয় অভিজাতরা সে প্রতাপ কার্যত মেনে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ইংরেজির প্রভাব-প্রতিপত্তি আজকের দিনে বঙ্কিমের সময়ের চেয়ে সম্ভবত কম নয়। এখন ঔপনিবেশিক শাসন না থাকলেও উপনিবেশিত মন আছে। বাইরের টানের চেয়ে মনের টান সাধারণত শক্তিশালী হয়। তবে ভাষা প্রশ্নে সে যুগের সঙ্গে আমাদের- এ কালের পার্থক্যও আছে। বঙ্কিমচন্দ্ররা বাংলায় বিচার-সালিস করতে পারতেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতেন না। কিন্তু তাঁরা মনে করতেন, বাংলায় এ কাজগুলো করা যায় এবং করা দরকার। আজকাল বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক মহলগুলো বিপরীত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাঁরা মনে করছেন, বাংলায় এ কাজগুলো কোনোমতে করা হয়তো যায়, কিন্তু করাটা ভালোও নয়, লাভজনকও নয়। এই যে ধারনাটা মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে ওপরের শ্রেণিগুলোতে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, যাচ্ছে, তা-ই আসলে বাংলা ভাষার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সঙ্কেত।

কিন্তু বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের যে বড় অংশটা বাংলা ভাষার সাম্প্রতিক অবস্থা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তাঁরা এ কথাটা বলেন না। তাঁরা প্রধানত ভাষা-মিশ্রণের কথা বলেন, ‘উচ্চারণ-বিকৃতির কথা বলেন এবং বিশেষভাবে বলেন, ‘প্রমিত-বিচ্যুতির কথা। তাঁরা এসব ‘দুরবস্থাকেই বাংলা ভাষার বিপদ বলে সাব্যস্ত করেছেন। ফরাসি ভাষার অধ্যাপক ও ভাষাতাত্ত্বিক শিশির ভট্টাচার্য্য ২০১৭ সালের দিকে ‘বাংলা ভাষা: প্রকৃত সমস্যা ও পেশাদারি সমাধান- বইয়ে বাংলা ভাষার বিপদ সঙ্কেতের এই ব্যাপারটার পর্যালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা-মিশ্রণ এবং ভাষার বিবর্তন যে কোনো ভাষার খুব স্বাভাবিক নিয়তি। যদি বিশেষ শ্রেণি-পেশার স্বেচ্ছাকৃত-আরোপিত বিকৃতি সমস্যার কারণ হয়ও, তা খুবই গৌণ, মুখ্য নয়। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের একটা গৌণ ব্যাপারকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ বড় বিপদ হিসেবে দেখছে কেন?

প্রকৃতপক্ষে ভাষার বিবর্তন এখানে মুখ্য বিষয় নয়। বাচনভঙ্গি এবং উচ্চারণগত দিক থেকে অন্যান্য ভাষার বিবর্তন হলেও বাংলা ভাষার বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে ভাষার বিবর্তনটা খুবই অপ্রাসঙ্গিক। কেননা এখানে ভাষার ব্যবহারটা প্রাসঙ্কিক বিষয়। অঞ্চলভেদে ভাষার বিবর্তন দেখা গেলেও বাংলাকে মূলত মায়ের মুখের ভাষা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। কিন্তু মা যদি সন্তানকে জন্মের পর থেকে মাম্মি, পাপা, ডেডিতে অভ্যস্থ করে তুলে বিলেতি কায়দায় বড় করে তুলতে চায়, তাহলে বাংলা ভাষা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে এবং তাই হচ্ছে। যে কারণেই বাংলা ভাষার বিপদ সঙ্কেত ইংরেজি মাধ্যম।   

বিন্দু থেকে বৃত্ত। যদি বিন্দুটাই না থাকে তবে বৃত্তটা হবে কিভাবে? ভাষার বিপদ আসলে মানুষেরই বিপদ। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা। দ্বিতীয় ভাষা রপ্ত করে কাজ চালানোর জন্য শ্রম দিতে হয়। বিপুল সময় ব্যয় করতে হয়। যে শ্রেণির পক্ষে তা করা সম্ভব, তা তারা করছে। করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে তো এ পরিমাণ সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের ভাষানীতি বিদ্যমান শ্রেণিগত অসাম্যকে রীতিমতো জোরালো করেছে। এটা গণতন্ত্রবিরোধী এবং রাষ্ট্রের সুষম উন্নয়নের অন্তরায়ও বটে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা প্রচলনের পক্ষে যাঁরা সাফাই গান এবং তৎপরতা চালান, তাঁরা রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সামগ্রিক দিক থেকে ভাষাকে দেখেন না। যদি দেখতেন তবে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এবং বিচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করতাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনাকে অক্ষুন্ন রাখতে হলে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। বাংলা ভাষার বিপদ সঙ্কেত মুছে দিতে হলে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে বাধ্যতামূলক করাসহ তা পর্যবেক্ষণের সুনিশ্চিত ব্যবস্থা করা উচিত বলেই মনে করছেন বিজ্ঞজনরা।


বাংলা ভাষা   ইংরেজি মাধ্যম   বিপদ সঙ্কেত  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

আগুনঝড়া ফেব্রুয়ারি শুরু, প্রতিরোধ ও জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষকাল

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

আজ ১লা ফ্রেব্রুয়ারি, শুরু হলো ভাষার মাস। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানী ঢাকার রাজপথ ছিল উত্তাল। ঢাকার রাজপথে সেদিন যারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাদের অমলিন স্মৃতি স্মরণের মাস এই ফেব্রুয়ারি। বাঙালি জাতির কাছে এই মাস ভাষার মাস, এই মাস দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস, এই মাস মায়ের মুখের ভাষা ছিনিয়ে আনার মাস। যে কারণেই বাঙালি জাতি নানা আয়োজনে পুরো ফ্রেব্রুয়ারি মাসজুড়েই ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা জানায় মহান ভাষা শহীদদের প্রতি।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’- আজ থেকে শুরু হলো রক্তে রাঙানো সেই ভাষা আন্দোলনের মাস। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষকাল। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির সেই আন্দোলনে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি পায় মাতৃভাষার মর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেরণা। তারই পথ ধরে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। 

ফেব্রুয়ারি মাস একদিকে যেমন শোকের মাস, অন্যদিকে তেমনি গৌরবোজ্জ্বল মাস। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালি একমাত্র জাতি, যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে বাংলা এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। ভাষার জন্য বাংলার দামাল সন্তানদের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এর মধ্যদিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এখন বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই শুরু হচ্ছে নানা কর্মসূচি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আবার হয়ে উঠবে জমজমাট।

অন্যদিকে মহান একুশের এ মাসের সবচেয়ে বড় কর্মযজ্ঞ মাসব্যাপী বইমেলাও শুরু হচ্ছে আজ।

আদি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবন এবং ক্রমবিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাঙালির শৌর্য-বীর্য যেন ধপ করে জ্বলে উঠে এ মাসেই। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফাগুনের আগুনঝড়া দিনগুলোতে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উন্মাতাল গণমানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায়। ভাষার জন্য প্রথম বলীদান বিশ্ববাসীর কাছে অবাক বিস্ময় হয়ে ওঠে। সেই থেকে শুরু হয়ে যায় বাঙালির শেকল ভাঙার লড়াই। পাকিস্তানিদের সঙ্গে হিসেব-নিকেশের হালখাতার শুরুতেই রক্তের আঁচড় দিয়ে বাঙালি শুরু করে তার অস্তিত্বের লড়াই। পলাশীর আম্রকাননে হারিয়ে যাওয়া সেই সিরাজদ্দৌলা আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রূপে এ লড়াইয়ে সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৫২ সালে যে আগুন রাজধানী ঢাকার বুকে জ্বলে উঠেছিল, তা ক্রমান্বয়ে শহর থেকে গ্রাম, সে আগুন যেন ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে সবখানে। প্রাণে প্রাণে ধ্বনিত হতে থাকে, যে আগুন জ্বলেছিল মোর প্রাণে, সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে- সবখানে- সবখানে। বাঙালির বুকের ভেতর জ্বলে ওঠা আগুন যেন সহস্র- লক্ষ-কোটি বাঙালির মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে বিদ্যুৎগতির মতো, যেন ত্বরিৎ প্রবাহ শুরু হয় বাঙালির শিরা-উপশিরা আর ধমনীতে। যার প্রবাহ এসে শেষ হয় ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম নতুন এক বাংলাদেশ।

বায়ান্নর আগুনঝরা সে দিনগুলো বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে, থাকবে এবং অমলিন হয়ে রবে সেই ভাষা শহীদদের স্মৃতি। কি এক তেজোদ্দীপ্ত  প্রেরণা, ভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিল বাঙালি ছাত্র-জনতা! প্রতি বছরের মতো আবারও এসেছে ভাষার মাস। ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি এই দেশের মানুষের চেতনায় এক অনির্বাণ বাতিঘর। এই আলোর স্পর্শে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার এবং প্রবল দেশাত্মবোধের অন্যরকম এক আবেগ ও উদ্দীপনায় জেগে ওঠেছিল সর্বস্তরের মানুষ।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি:

পাকিস্তানের জন্মের সাত মাস পরে, ১৯৪৮ সালের মার্চে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন তার জীবনের প্রথম ও শেষবারের মত পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন- তিনি হয়তো ভাবেন নি যে, সেখানে তার উচ্চারিত কিছু কথা এক সময় তারই প্রতিষ্ঠিত নুতন দেশটির ভাঙন ডেকে আনতে ভুমিকা রাখবে। জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি এবং মুসলিম লীগেরও সভাপতি ছিলেন।

নয় দিনের পূর্ববঙ্গ সফরে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি সভায় বক্তব্য দেন। ঢাকায় প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে- যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হিসেবে পরিচিত। এই বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু - অন্য কোন ভাষা নয়।

ইংরেজিতে দেয়া সেই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “আমি খুব স্পষ্ট করেই আপনাদের বলছি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, এবং অন্য কোন ভাষা নয়। কেউ যদি আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে, তাহলে সে আসলে পাকিস্তানের শত্রু।”

কয়েকদিন পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সামনে আরো একটি ভাষণ দেন। সেখানেও একই কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রদেশগুলো নিজেদের সরকারি কাজে যে কোন ভাষা ব্যবহার করতে পারে- তবে রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে একটিই এবং তা হবে উর্দু। ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘উর্দু এণ্ড উর্দু সেল বি স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ 

এই কথাটি বলার সাথে সাথেই কার্জন হলের কয়েকজন ছাত্র 'না' 'না' বলে চিৎকার করে সে সময় প্রতিবাদ করেছিলেন। ফলে এ সময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর তিনি আবারও বক্তব্য শুরু করেছিলেন।

জিন্নাহ ঢাকায় এসব কথা বলেছিলেন বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে। তার ঢাকা সফরের আগেই পূর্ববঙ্গে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেখা যায়, নতুন দেশের ডাকটিকিট, মুদ্রা, মানি-অর্ডার বা টাকা পাঠানোর ফর্ম, ট্রেনের টিকেট, পোস্টকার্ড- এগুলোতে শুধু উর্দু ও ইংরেজি ব্যবহৃত হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীরা বিক্ষোভ সমাবেশও করেছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত উর্দুভাষী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ আচরণের অভিযোগ ওঠে। একই রকম মনোভাবের শিকার হন পশ্চিম পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তারাও। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও সরকারি চাকরিতেও ছিল অবাঙালিদের প্রাধান্য। পরে দেখা যায়, পূর্ব পাকিস্তান থেকে নৌবাহিনীতে লোক নিয়োগের ভর্তি পরীক্ষাও হচ্ছে উর্দু ও ইংরেজিতে। সে সময় এ নিয়ে আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত পত্রিকা ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’-এ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল।

জিন্নাহ যেদিন কার্জন হলে ভাষণ দেন- সেদিনই বিকেলে তার সাথে দেখা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি দল । এ সময় ভাষা নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক প্রায় ঝগড়াঝাটির স্তরে পৌঁছে যায়। এ সময় জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপিও দেয় ছাত্রদের দলটি। তাতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয় এবং কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের মত একাধিক রাষ্ট্রভাষা আছে এমন কিছু দেশের উদাহরণ দেয়া হয়। এই ছাত্র নেতারা অনেকেই ছিলেন জিন্নাহর দল মুসলিম লীগের। কিন্তু ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বঙ্গের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশ কেন্দ্রীয় নেতাদের চাইতে ভিন্ন ভূমিকা নিয়েছিল।


ভাষা আন্দোলন   পটভূমি   ফেব্রুয়ারি   ভাষা   ভাষার মাস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড আর্টিকেল

চমেক হাসপাতালে সেবা, শয্যা বাড়লেও বাড়েনি জনবল

প্রকাশ: ০৮:০০ এএম, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

৬৬ বছরের পুরনো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ছয় দশকে ধীরে ধীরে শয্যা বাড়লে ও জনবল কাঠামো রয়ে গেছে ৫ দশকের আগের মতো। সেই পাঁচশো শয্যার জনবল দিয়েই চলছে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। সেখানেও রয়েছে ঘাটতি। ৫শ’ শয্যার জন্য চমেকের অনুমোদিত ২ হাজার ৩৪৭ পদের বিপরীতে শূন্যপদ রয়েছে ৩২৮টি। চিকিৎসক, নার্সের ঘাটতি ছাড়াও হাসপাতালে রয়েছে পর্যাপ্ত সংখ্যক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর অভাব। তবে লোকবলের ঘাটতি থাকলেও গত দুই বছরে বেড়েছে সেবার পরিমাণ। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে হাসপাতালের লোকবল বাড়াতে একের পর পদক্ষেপ নিচ্ছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রতিবারই আড়ালে রয়ে যাচ্ছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পদের শূন্যতার বিষয়টি। 

চমেক সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছর অর্থাৎ ২০২১ ও ২০২২ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর হার বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। বড় অপারেশনের হার বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ছোট অপারেশনের হার বেড়েছে ২৩২ দশমিক ৯৬ শতাংশ। বর্হিবিভাগে রোগীর হার বেড়েছে ৩৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। একইসঙ্গে জরুরি বিভাগে রোগী বেড়েছে ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। কিন্তু সে অনুপাতে হাসপাতালে লোকবল রয়েছে ২ হাজার ১৯ জন। অর্থাৎ ২ হাজার ১৯ জন লোকবল দিয়ে চলছে ২ হাজার ২০০ শয্যার চমেক হাসপাতাল। যেখানে এ শয্যার বিপরীতে লোকবলের প্রয়োজন ছিল আরও চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। তারমধ্যেও পাঁচশো শয্যার বিপরীতে থাকা লোকবলেও ঘাটতি রয়েছে।  

চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৬০টি আর লোকবল রয়েছে ৩৩০ জন। পদ খালি রয়েছে ৩০টি যা ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দন্ত চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ২৪টি। লোকবল আছে ২০টি। এখনো চার জন দন্ত চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে। যা শতকরায় ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। নার্সের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১ হাজার ২৫৩টি। আর হাসপাতালে নার্স রয়েছে ১ হাজার ২০১ জন। আরও ৫২ জন নার্সের ঘাটতি রয়েছে হাসপাতালটিতে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে ৪৪টি কিন্তু লোকবল রয়েছে ৩৩টিতে। আরও ২৫ শতাংশ বা ১১টি পদ খালি রয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য অনুমোদিত ৫৬৫টি পদের মধ্যে ১৮৫টি শূন্য রয়েছে। এছাড়াও প্রশাসনিক ও অন্যান্য পদের অনুমোদিত পদসংখ্যা ২৪৮টি। কিন্তু শূন্যপদ রয়েছে ১৯৩টি। তারমধ্যে অফিস সহায়কের পদ খালি রয়েছে ১১৭টি ও ক্লিনারের ২২টি। অর্থাৎ এখনো পর্যন্ত চট্টগ্রামের সরকারি এ হাসপাতালের পদ খালি রয়েছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। 

এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২১ সালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৯ হাজার ৯১২ জন। প্রতিমাসে ১৭ হাজার ৪৯৩ জন। ২০২২ সালে সে হার ১৭ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়ে ভর্তি রোগীর সংখ্যা হয় ২ লাখ ৪৭ হাজার ১২২ জন। আর প্রতি মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ৫৯৪ জন। ২০২১ সালে বড় অপারেশন করা হয়েছে ১৫ হাজার ৪২৫টি। প্রতি মাসে অপারেশন হয় ১ হাজার ২৮৫টি। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে বড় অপারেশনের হার ৭৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪৯২টি। যা প্রতি মাসে গড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৯১টিতে। একইভাবে ২০২১ সালে চমেকে ছোট অপারেশন হয় ১৯ হাজার ১৪৪টি। প্রতি মাসে ছোট অপারেশন হয় ১ হাজার ৫৯৫টি। এর পরের বছর ২০২২ সালে ছোট অপারেশনের হার বেড়েছে ২৩২ দশমিক ৯৬ শতাংশ যা সংখ্যায় ৬৩ হাজার ৭৪২টি। প্রতি মাসে ছোট অপারেশনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৩১২ জনে। গত দুই বছরে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি বর্হিবিভাগেও বেড়েছে রোগীর হার। ২০২১ সালে বর্হিবিভাগে রোগী ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার ৯৮৯ জন। প্রতিমাসে ৫০ হাজার ৭৪৯ জন রোগী হাসপাতালের বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নেয়। পরের বছর ৩৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ রোগীর হার বেড়ে বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নেয় ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫৮ জন। প্রতি মাসে যা ছিল ৭০ হাজার ৫৩০ জনে। একইসঙ্গে জরুরি বিভাগেও রোগী বেড়েছে ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২১ সালে জরুরি বিভাগে রোগী ছিল ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯২২ জন। যা প্রতি মাসে ১৯ হাজার ৯৯৩ জন রোগী। ২০২২ সালে সে সংখ্যা প্রতি মাসে ২৪ হাজার ৪৮২ জন করে বছরে ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ জন। 

অন্যদিকে, গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন ৬৮৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এছাড়াও বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে প্রতিদিন ২ হাজার ৩৫১ জন। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেয় প্রতিদিন ৮১৬ জন করে। তারমধ্যে প্রতিদিন বড় অপারেশন করা হয়েছে ৭৬ জন রোগীর এবং ছোট অপারেশন করা হয়েছে ১৭৭ জনের। 

জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম হাসান  বলেন, ‘পাঁচশো শয্যার জনবল দিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়াটা কঠিন হয়ে যায় আমাদের জন্য। তারপরেও আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আরও চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ দিতে হলে অর্গানোগ্রাম পরিবর্তন করতে হবে। আমরা একটি নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ করছি।'

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর ঘাটতি রয়েছে বেশি। এরপরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টের ঘাটতি রয়েছে। এখন যে কম  আছে সেটা আমাদের পাঁচশো শয্যার জনবলের হিসেবে। এখন আমাদের হাসপাতাল ২২শ’ শয্যার অনুমোদন পেয়েছে। কিন্তু জনবল বাড়েনি। বিষয়গুলো আমরা মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। এর বাইরে আমরা চাইছি যে আমাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির যেসকল কর্মচারীরা আছেন তারা যদি প্রশিক্ষিত হয় তাহলে হাসপাতালের পরিবেশ আরও সুন্দর হবে। আমরা আরও উন্নত সেবা দিতে পারবো রোগীদের।’

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৯৫৭ সালে আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম শহরের কেবি ফজলুল কাদের রোড অর্থাৎ বর্তমান ঠিকানায় এটি স্থানান্তরিত হয়। যেখানে শুরুতে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল মাত্র ১২০। পরবর্তীতে হাসপাতালটিকে ১৯৬৯ সালে ৫০০ শয্যায়, ১৯৯৬ সালে ৭৫০ শয্যায়, ২০০১ সালে ১ হাজার ১০ শয্যায়, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৩১৩ শয্যায় এবং ২০২২ সালের জুনে ২ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।


চট্টগ্রাম মেডিকেল   জনবল   সেবা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন