ইনসাইড থট

নারায়ণগঞ্জের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৪ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের খাস কামাল কাটি গ্রামের আনুমানিক ৭-৮ বছরের ডানপিটে কিশোর মোঃ মেজবাহুল হক বাচ্চু সাহেবের স্মৃতিচারণ। 

‘‘২৬ মার্চ এর কালো রাতে ঢাকা আক্রান্ত যখন হইল, তারপরের দিন থেকেই আমাদের গ্রামের সামনের রাস্তা দিয়া  নারী-পুরুষ-শিশু ঢাকা থেকে বের হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে যাইতেছিল। আমরা তখন ঐ অসহায় মানুষদের হেল্প করার জন্য মুরব্বীদের নির্দেশে রাস্তার পাশে পানির কলস, মুড়ি নিয়ে বসে থাকতাম তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য, ডাইকা ডাইকা খাওয়াইতাম। আবার অনেক সময় তাদের সাথে থাকা লাগেজ, ব্যাগ ইত্যাদি মাথায় করে নিয়া যাইয়া গুদারাঘাট অর্থাৎ আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে আসতাম। বেশ কয়েকদিন এভাবে কাজ করেছি। 

তারপর মুক্তিযুদ্ধ আরম্ভ হইল। সেসময় একটু ডানপিটে ছিলাম। আমরা কিছু ছেলেপেলে এক সাথে হয়ে কলাগাছের ছোট চারা দিয়ে কেটে রাইফেল বানাইয়া (ক্ষেতের) উচা আইল সামনে রেখে পজিশন নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে এগুলো করতাম। 

মুক্তিযোদ্ধাদ্বারা তখন আমাদের গ্রামের সামনের ঐ রাস্তা দিয়েই যাইতেন। আমরা তখন তাদের রাইফেল, গুলির বাতিল অনেক সময় তাদের সাথে থাকা ব্যাগ ও বিভিন্ন মালসামানা আমরা মাথায় করে এগিয়ে দিয়ে আসতাম অনেক দূর পর্যন্ত।

আজকে আমাদের পূর্বাচল উপশহর হইতাছে। এই পূর্বাচল উপশহরটি ছিল একটি ব্যাকওয়ার্ড জায়গা, টেক টিলা জংগল। এই উপশহরের মাঝখানে একটা জায়গা ছিল, বলতো ‘ধামচির গজারী গড়‘। এখানে বিশাল বড় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা যেখানেই যাইতেন, এই গড়ে চলে আসতেন। আমরা তাদের জিনিসপত্র আগাইয়া দিয়া যাইতাম। 

আমাদের বাড়ির সামনে দিয়া শাতলশীতলক্ষ্যা নদী বইয়া গেছে। অনেক সময় আমি দেখেছি মুক্তিযোদ্ধারা নদী পার হইয়া, সাতরাইয়া পার হইয়া এই পারে চলে আসতো। পাক হানাদার আমাদের এই পারের চেয়ে ঐ পারেই অর্থাৎ ডাঙ্গা বাজার, আতলাপুর বাজার, ঐ সমস্ত এলাকায়ই তারা আসতো, হানা দিতে। আর সব সময়তো এই শীতলক্ষ্যা নদী দিয়া তারা গানবোট দিয়া তারা চইলা যাইতে। যাইহোক মুক্তিযোদ্ধাদের ...... অনেক সময় আগাইয়া দিতাম। আর আমার আব্বার সাথে থেকে গ্রাম থেকে চাল, ডাউল, মরিচ, পিয়াজ এইগুলি উঠাইতো আমার আব্বা ও সাথে থাকা লোকজন। আমি সাথে যাইতাম। মরিচের ব্যাগটাতো হালকা, মরিচের ব্যাগটা আমার কাছে দিত। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি যাইয়া এগুলি উঠাইতাম। উঠাইয়া আমার আব্বা ও অন্য লোকজন তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে দিয়া আসতো। 

আমার হৃদয় বিচারক স্মৃতি আজও মনে পড়ে। আমার এক মামা, আমার মা‘র আপন মামাতো ভাই, দুইটা ভাই। ছোট বেলাযই তাদের বাপ মারা যায়। আমার নানি তাদেরকে লালনপালন করে। ৭১‘এ একজনের বয়স ২৪ বছর, আরেকজনের বয়স ২২ বছর। একজনের নাম আব্দুস সালাম, আরেকজনের নাম আব্দুল আজিজ। দুই ভাইই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। আমার নানীকে না বলে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। তখন ছোট মামা, আজি মামা, দীর্ঘ দিন মা‘কে দেখে না। তখন নদী পার হইয়া, নৌকা দিয়া নদী পার হইয়া মায়েরে দেখার জন্য আসছিল, প্রায় ৭ মাস পর। নদীর পারটা ছিল খাড়া। নৌকা থেকে নাইমা নদীর পাড়ের উপরে উঠছে, তখন দেখে আর্মি, আর্মির সামনে পরে। এটা ছিল কালীগঞ্জে। আমার পার্শ্ববর্তী থানা কালীগঞ্জ। তখন সেনাবাহিনীর লোকজনদের দেখাইয়া দেয় রাজাকারেরা। এইডাই আব্দুল আজিজ মুক্তিযোদ্ধা। সেনাবাহিনী ধইরা নিয়া যায়। আমার নানি পিছনে পিছনে পশ্চিমা সেনাদের পায়ে ধরছে, বাবা ডাকছে। সৈন্যরা লাথ্থি দিয়া ফালাইয়া দিছে। তাই আমার মামা বলতেছিল, ‘মা, কুত্তাদের পায়ে ধরিস না‘। ঐ যে আমার মামাকে নিয়া গেল আর পাওয়া যায় নাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীগঞ্জ থানা থেকে তার জামাকাপড় গুলি পাওয়া গেল।

তারপর আরেক আত্মীয়, ফুফাতো বোনের জামাই, দুলাভাইও মুক্তিযোদ্ধা ছিল। উনার বাড়ী ছিল ডাঙ্গা, ডাঙ্গা বাজারের সাথে। ডাঙ্গা বাজার যখন আক্রান্ত হইল, পশ্চিমা সেনাবাহিনী ডাঙ্গা বাজারে আগুন দিল। অনেক বড় বাজার ছিল। পলাশ থানার ডাঙ্গা বাজার। আগুন দিল। তখন আমার দুলাভাইসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা খবর পেয়ে দুরের থেকে আইলো, আইসা, ধান ক্ষেতের মধ্যে পজিশন নিয়া বইসা গেলো যে, পশ্চিমা সেনাবাহিনীরা যখন নদীর পাড়ে আসবে, বাজার থেকে নদীর পাড়ে আসবে স্পিড বোট বা লঞ্চে উঠার জন্য, তখন গুলি করবে। কিন্তু সেনাবাহিনীর লোকজন তাদের লঞ্চে না উঠে পিছনের দিক থেকে, ধান ক্ষেতে যারা আশ্রয় নিয়েছিল, ধান ক্ষেতের মধ্যে ব্রাশ ফায়ার মেরে তাদের হত্যা করেছিল। অনেক লোক মারা গেছিল। 

আমরা অনেক সময় দেখতাম নদীর মধ্যে একসাথে দুইটা বা চারটা লাশ বাঁধা, ফুইলা ভাইসা ভাইসা যাইতাছে। আর আমাদের সামনে দিয়া যে শীতলক্ষ্যা নদী ...চইলা গেছে, সেই পলাশ, কাপাসিয়া হইয়া ময়মনসিংহের টোক‘এ যাইয়া মিলছে ব্রক্ষ্মপুত্রের সাথে। এই শীতলক্ষ্যা নদী দিয়া গানবোটে প্রত্যেক দিন যাইতো, আমার বাড়ীর সামনে আইসা ফাঁকা গুলি করতো। সেগুলো স্মৃতিতে আজও ভাইসা উঠে। এবং এগুলি মনে হইলে গর্ববোধ করি যে , কিছু হইলেও সেই স্বাধীনতার জন্য অল্প বয়সে করতে পারছি‘‘।

মুক্তিযুদ্ধ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই

প্রকাশ: ০৭:৩১ পিএম, ২১ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

এখন রাত দুইটা বাজে। একটু আগে টেলিফোন বেজে উঠেছে। গভীর রাতে টেলিফোন বেজে উঠলে বুকটা ধ্বক করে উঠে, তাই টেলিফোনটা ধরেছি। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ফোন করেছে। পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানি সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করছে। মোটামুটি নিরীহ একটা আন্দোলন একটা বিপজ্জনক আন্দোলনে মোড় নিয়েছে। ছাত্রটি ফোনে আমাকে জানাল অনশন করা কয়েকজন ছাত্রকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, একজনের অবস্থা খুবই খারাপ, ডাক্তার বলেছে কিছু না খেলে ‘কোমায়’ চলে যেতে পারে। ফোন রেখে দেওয়ার আগে ভাঙ্গা গলায় বলেছে, ‘স্যার কিছু একটা করেন’।

আমি তখন থেকে চুপচাপ বসে আছি, আমি কী করব? আমার কি কিছু করার আছে?

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি অনেকবার অনেক ধরনের আন্দোলন হতে দেখেছি, কাজেই  আমি একটি আন্দোলনের ধাপগুলো জানি। প্রথম ধাপে যখন হলের মেয়েরা তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে গিয়েছে সেটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। আমি খুব ভালো করে জানি একটুখানি আন্তরিকতা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কঠিন দাবি দাওয়াকে শান্ত করে দেওয়া যায়। কেউ একজন তাদের ভালো-মন্দ নিয়ে মাথা ঘামায়, তারা শুধু এটুকু নিশ্চয়তা চায়। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন যদি একটুখানি জনপ্রিয়তা পায় তখন সাথে সাথে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো সেখানে ঢুকে পড়ে সেটাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেটাকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যদি সতর্ক না থাকে তখন নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আন্দোলন যদি থেমে না যায় তখন সরকারী ছাত্রদের সংগঠন (এখানে ছাত্রলীগ) তাদের উপর হামলা করে। প্রায় সবসময়ই সেটা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তা কর্তাদের শলাপরামর্শে। তারপরও যদি আন্দোলন চলতে থাকে তখন কর্তৃপক্ষকে পুলিশ ডাকতে হয়, পুলিশ এসে পিটানোর দায়িত্ব নেয়।

এই আন্দোলনে আমি এর প্রত্যেকটি ধাপ ঘটতে দেখেছি। প্রচলিত প্রক্রিয়ার বাইরে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে পুলিশের অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা। যত বড় পুলিশ বাহিনীই হোক তারা ছাত্রছাত্রীদের গায়ে হাত তোলার আগে একশবার চিন্তা করে। এখানে সেটা হয়নি, শটগান দিয়ে গুলি পর্যন্ত করা হয়েছে, বিষয়টি আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশের চৌদ্দ পুরুষের সৌভাগ্য যে সেই গুলিতে কেউ মারা যায়নি। বোঝাই যাচ্ছে সিলেটের পুলিশ বাহিনীর তেজ এখনো কমেনি, তারা দুইশ থেকে তিনশত ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে রেখেছে। যখন প্রয়োজন হবে কোনো একজনের নাম ঢুকিয়ে তাকে শায়েস্তা করা যাবে! হয়রানী কতপ্রকার ও কী কী শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম বয়সী ছাত্র ছাত্রীরা সেটা এবারে টের পাবে।

তবে একটি ব্যাপার আমি এখনো বুঝতে পারছি না। পুলিশের এই অবিশ্বাস্য আক্রমণটি ঘটার কারণ হচ্ছে ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়কে তালাবদ্ধ বিল্ডিং থেকে উদ্ধার করা। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের জন্য একটা বিল্ডিংয়ে তালাবদ্ধ হয়ে আটকে পড়া এমন কোনো বড় ঘটনা নয়। একাডেমিক কাউন্সিল কিংবা সিন্ডিকেট মিটিং চলার সময় দাবী আদায়ের জন্য বাইরে থেকে তালা মেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষকদের আটকে রাখার ঘটনা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়েই একাধিকবার ঘটেছে। তারা তখন গল্প গুজব করে সময় কাটিয়েছেন, সোফায় শুয়ে রাত কাটিয়েছেন, গোপনে কিছু খাবার আনিয়ে ভাগাভাগি করে খেয়ে হাসি তামাশা করেছেন কিন্তু পুলিশ ডাকিয়ে ছাত্রদের গায়ে হাত তুলে মুক্ত হওয়ার জন্য কখনো ব্যস্ত হননি। এইবার ভাইস চ্যান্সেলরকে উদ্ধার করার জন্যে ছাত্রছাত্রীর উপর একটি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা করা হল, এর চাইতে বড় অমানবিক কাজ কী হতে পারে আমি জানি না। স্বাভাবিক নিয়মেই আন্দোলনটি এখন ভাইস চ্যান্সেলরের পদত্যাগের দাবীতে রূপ নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটা এমন কিছু বিচিত্র দাবী নয়, আমরা প্রায়ই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের পদত্যাগ দাবী শুনে আসছি।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে ছাত্রছাত্রীদের ক্যাম্পাস থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এবারেও সেই চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়নি। এটিও নূতন একটি ঘটনা—তারা এখন কোথায় থাকে, কী খায় আমি জানি না।

আন্দোলন যতক্ষণ পর্যন্ত শ্লোগান, মিছিল, উত্তপ্ত বক্তৃতা এবং দেশাত্মবোধক গানের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকে সেটাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই কিন্তু সেটি যদি শেষ পর্যায়ে চলে যায়, যখন ছাত্রছাত্রীরা আমরণ অনশন করার সিদ্ধান্ত নেয় তখন সেটি খুবই বিপজ্জনক। তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ, এবং ক্ষোভ তখন একটা গভীর দুঃখবোধ এবং অভিমানে পাল্টে যায়। হঠাৎ করে তারা টের পায় তারা আসলে একা, তাদের পাশে কেউ নেই। “আমরণ” কথাটি থেকে ভয়ংকর কোনো কথা আমি জানি না, বড় মানুষেরা সেটাকে কৌশলী একটা শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন, কিন্তু এই বয়সী ছাত্রছাত্রীরা তাদের তীব্র আবেগের কারণে শব্দটাকে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলোর নামকরণ করা নিয়ে একবার বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল তখন আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শহীদ মিনারে অনশন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি খোলার ব্যবস্থা করেছিল। অভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের দুর্বল শরীরে যখন খিচুনি হতে থাকে সেই দৃশ্য সহ্য করার মত নয়। (পরে তারা আমাকে তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছে, দিনরাত তারা বোধ-শক্তিহীনভাবে পড়ে আছে,  অন্য কোনো অনুভূতি নেই, শুধুমাত্র এক প্লেট খাবারের স্বপ্ন দেখছে! আমি তাদের সেই কষ্টের কথাগুলো কখনো ভুলতে পারি না।) যে কারণেই হোক, আমার এককালীন ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীরা আবার সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে বিষয়টি চিন্তা করে আমি খুবই অশান্তি অনুভব করছি।

২. 
প্রায় তিন বছর আগে অবসর নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার আগের মুহূর্তে আমি বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলরকে তিন পৃষ্ঠার একটি লম্বা চিঠি লিখে এসেছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে তাকে সেই চিঠিতে বেশ কয়েকটি উপদেশ দিয়েছিলাম। তিনি যদি আমার উপদেশগুলো শুনে সেভাবে কাজ করতেন তাহলে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়টি এরকম বিপজ্জনক একটা জায়গায় পৌঁছাত না।

তিনি আমার উপদেশগুলো সহজভাবে নেবেন আমি সেটা আশা করি না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি করা শিক্ষকদের পুরস্কার হিসেবে ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। যদিও অনেক দিক দিয়েই শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অনেক আধুনিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপকরা তাদের উন্নাসিকতার কারণে সেটা মেনে নেন না। কাজেই প্রান্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার মত একজন শিক্ষকের উপদেশ তার ভালো লাগার কথা নয়।

কিছুদিন আগে আমার উপর জঙ্গি হামলার বিচারের শুনানিতে সাক্ষী দেওয়ার জন্যে আমাকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল। আমি একদিনের জন্য সিলেটে গিয়েছিলাম এবং বহুদিন পরে ক্যাম্পাসে পা দিয়েছিলাম। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমার সাথে সম্পর্ক রাখা রীতিমত অপরাধ তাই সবাই দূরে দূরে থাকলেও ছাত্রছাত্রীরা মন খুলে আমার সাথে কথা বলেছে। আমি বেশ দুঃখের সাথে আবিষ্কার করেছি আমার পরিচিত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্রটি পাল্টে যাচ্ছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া বিশেষ হয় না (এখানে শুধু পরীক্ষা হয়)। কাজেই ভালো ছাত্রছাত্রীরা চেষ্টা চরিত্র করে নিজেরা যেটুকু পারে শিখে নেয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে অন্য সবার সাথে সময় কাটিয়ে তাদের এক ধরণের মানসিক গঠন হয়, সেটার মূল্য কম নয়। সেজন্য আমি যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম, সবসময় তাদের সব রকম সংগঠন করে নানা ধরণের কাজকর্মে উৎসাহ দিয়ে এসেছি। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও বাধা নিষেধ। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা ক্যাম্পাসের রাস্তায় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে দীর্ঘ আলপনা এঁকেছিল। ছাত্রছাত্রীরা জানাল এখন তারা রাস্তায় আলপনাও আঁকতে পারে না। তাদের দুঃখের কাহিনী শোনা ছাড়া আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু তাদের ভেতরকার চাপা ক্ষোভটি অনুভব করেছি।
সেই ক্ষোভটি এখন বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।

৩. 
কিছুদিন আগে লন্ডনের একটি ওয়েবিনারে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সেটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা সংক্রান্ত একটি ওয়েবিনার। আমি বক্তব্য দেওয়ার পর সঞ্চালক উইকিপিডিয়া থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভয়ংকর দুরবস্থার বর্ণনা পড়ে শোনালেন, তারপর এই ব্যাপারে আমার বক্তব্য জানতে চাইলেন। আমি বললাম, ‘আমি এই ব্যাপারটি খুব ভালো করে জানি এবং চাইলে সেটি সম্পর্কে বলতেও পারব। কিন্তু নীতিগতভাবে আমি দেশের বাইরের কোনো অনুষ্ঠানে দেশ সম্পর্কে খারাপ কিছু বলি না। কাজেই আমি এটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না। আপনি যদি সত্যিই জানতে চান ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করলে বলতে পারি।’ সঞ্চালক বললেন, ‘তাহলে অন্তত এর সমাধান কী হতে পারে সেটা বলেন।’ আমি বললাম, ‘সমাধান খুব কঠিন নয়। যেহেতু বাংলাদেশে ভাইস চ্যান্সেলররা হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তা কর্তা বিধাতা তাই রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ না দিয়ে খাঁটি শিক্ষাবিদদের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেহারা পাল্টে যাবে।’
সেই ওয়েবিনারে আমাদের শিক্ষামন্ত্রীও ছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্য দেওয়ার সময় বললেন, একজন ভাইস চ্যান্সেলরকে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনেক কাজ করতে হয় তাই শুধু শিক্ষাবিদ সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না—তার ভেতর নেতৃত্ব দেওয়ার গুণ থাকতে হয়। সেজন্য নেতৃত্ব দিতে পারেন সেরকম ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগ দিতে হয়।

বলা যেতে পার আমি তখন প্রথমবার বুঝতে পেরেছি আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন সবসময় দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি আকস্মিক ঘটনা নয়, সেটি একটি সুচিন্তিত কিন্তু বিপজ্জনক এবং ভুল সিদ্ধান্ত! একজন শিক্ষক যদি শিক্ষাবিদ হন তাহলে তার ভেতর নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলী থাকবে না সেটি মোটেও সত্যি নয়। তাছাড়া এই দেশে দলীয় রাজনীতি করা শিক্ষক সবসময় আদর্শের জন্য রাজনীতি করেন সেটিও সত্যি নয়। যিনি এক সময় ‘জিয়া চেয়ার’ স্থাপনের প্রস্তাবক, সাদা দলের রাজনীতি করেছেন তিনি সময়ের প্রয়োজনে নীল দলের রাজনীতি করে অবলীলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হতে পারেন। সেরকম উদাহরণ কী আমাদের সামনে নেই?

৪.
কাজেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকেরা যদি আদর্শবাদী হতেন ভাইস চ্যান্সেলরদের স্বেচ্ছাচারী কিংবা একগুঁয়ে না হতে দিতেন ভুল কিংবা অন্যায় করলে প্রতিবাদ করতেন তাহলেও একটা আশা ছিল। কিন্তু সেগুলো হয় না। ভাইস চ্যান্সেলর যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তা কর্তা বিধাতা তাই তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের “জী হুজুর” করার একটি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের উপর নির্দয় আক্রমণ শুরু করেছিল তখন একজন শিক্ষকও ছুটে গিয়ে পুলিশকে থামানোর চেষ্টা করেননি! ছাত্রছাত্রী এখন শিক্ষকদের শত্রুপক্ষ। আমাদের শিক্ষকেরা সব ধোয়া তুলসীপাতা এবং ছাত্রছাত্রীরা বেয়াদব এবং অশোভন আমি সেটা বিশ্বাস করি না। শিক্ষক হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সম্মানবোধ থাকতে হবে, তাদের জন্য ভালোবাসা থাকতে হবে। সেটি এখন নেই। ভর্তি পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীদের কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয় সেটি সবাই জানো—সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সেটি চোখের পলকে দূর করে দেওয়া যায়। বহুকাল আগে একবার তার উদ্যোগ নিয়ে সেই সময়কার শিক্ষামন্ত্রী সব ভাইস চ্যান্সেলরকে ডেকেছিলেন। আমি সেখানে প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা করেছিলাম এবং তখন আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতরে রয়েছে সর্বগ্রাসী লোভ! সেটি প্রকাশ্যে ঘোষণা করতেও তারা সংকোচ অনুভব করেন না! সেই সভায় তারা এক কথায় ছাত্রছাত্রীদের জীবনকে সহজ করার সেই উদ্যোগটিকে বাতিল করে দিয়েছিলেন!

এই মুহূর্তে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি খুবই জটিল অবস্থা। আমি একমাস দেশের বাইরে ছিলাম বলে পত্রপত্রিকার খবরের বাইরে কিছু জানি না। খবরের বাইরেও খবর থাকে এবং আজকাল সামাজিক নেটওয়ার্কে বিষ উগলে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, আমি সেগুলোও জানি না। যখন একটি নিরীহ আন্দোলন একটি বিপজ্জনক আন্দোলনে পালটে যাচ্ছে আমি তখন প্লেনে বসে আছি, দেশে এসে প্রায় হঠাৎ করে জানতে পেরেছি আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভালো নেই।

এক দিকে ছাত্রছাত্রী অন্যদিকে ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে সকল শিক্ষক। ছাত্রছাত্রীদের দাবী খুবই চাঁছাছোলা। এটাকে মোলায়েম করার কোনো উপায় নেই। যেহেতু নির্দয় পুলিশি হামলা করার লজ্জাটুকু কেটে গেছে তাই যদি দ্বিতীয়বার সেটাকে প্রয়োগ করে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন বন্ধ না করা যায় এটার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের কোনো উপায় নেই।

সরকারের নিয়োগ দেওয়া ভাইস চ্যান্সেলরকে প্রত্যাহার করা সরকারের জন্য খুবই অপমানজনক একটা ব্যাপার তাই সরকার কখনই সেটা করবে না। ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের সাথে যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক আছেন, শুধু তাই নয় দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররাও আছেন, কাজেই তার নিজ থেকে পদত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।

মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের অনির্দিষ্ট কাল হাড় কাঁপানো শীতে অনশন করে খোলা রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে, কেউ তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না। যে ছাত্রজীবনটি তাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় হতে পারতো সেই সময়টি তাদের জন্যে অপমান আর অবহেলার সময় হয়ে যাচ্ছে সেই জন্য আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাই।

ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয় আমার এই লেখাটি পড়বেন কি না জানি না। যদি পড়েন তাকে বলব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শেষ দিনটিতে আমি তাকে যে চিঠিটি লিখে এসেছিলাম সেটি যেন আরও একবার পড়েন, সম্ভব হলে তার আশে পাশে থাকা শিক্ষকদেরও পড়তে দেন।

এখন যা ঘটছে সেটি যে একদিন ঘটবে আমি সেটি তিন বছর আগে তাকে জানিয়ে রেখেছিলাম। তিনি আমার কথায় বিশ্বাস করেননি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুনত্ব আনা প্রয়োজন


Thumbnail

বর্তমানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেভাবে মিথ্যা প্রচারণা চলছে, সেই প্রচারণা মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশে নিয়োজিত আমাদের রাষ্ট্রদূতরা অবশ্যই যথেষ্ট দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। বিশেষ করে বিদেশি দূতাবাসগুলোতে যারা রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের দায়িত্ব বেশ ভালোই মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখন একটি বিষয়ে চিন্তা করা অত্যন্ত জরুরি। বিষয়টি হচ্ছে, বিশ্বের সব দেশেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেশাদার রাষ্ট্রদূতের বদলে রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে নিয়োজিত করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকান ক্যামেরা কোম্পানি কোডাক্ট এবং জাপানের ফুজি ক্যামেরা কোম্পানির মধ্যে একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ না হলেও কাছাকাছি পর্যায়ে চলে যায়। তখন সমস্যা নিরসনে ও জাপান-মার্কিন সম্পর্ক সুসংহত রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার মন্ডেলকে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে দেখা যায়, তাকে নিযুক্ত করে সুফল পেয়েছিল দেশটি। ১৯৭৪ সালের দিকে আমি যখন এফআরসিএস করতে ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলাম, তখন লক্ষ্য করেছি ব্রিটেন থেকে কোনো নামকরা সাংবাদিক অথবা রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান লোকদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হতো। কারণ ব্রিটেনের কাছে ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার কারণটি হচ্ছে, যারা পেশাদার কূটনীতিবিদ এবং তাদের যেভাবে ট্রেনিং দেওয়া হয়, তাতে অনেক সময় বিশেষ করে রাজনৈতিক অনেক বিষয়ে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন।

বর্তমানে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য যে ধরণের কাজ করা প্রয়োজন, যেভাবে এটি মোকাবেলা করা প্রয়োজন, বেশ কিছু ক্ষেত্রে পেশাদার কূটনীতিবিদদের দিয়ে তা মোকাবেলা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা, পেশাদার কূটনীতিবিদদের একটি সীমারেখা আছে, তারা এই সীমারেখা অতিক্রম করে না। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের বিরুদ্ধে বহির্বিশ্বে যেভাবে মিথ্যা প্রচারণাসহ ষড়যন্ত্রের রোডম্যাপ নিয়ে বিরোধী মহল চলছে, সেটি প্রতিহত করতে হলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি শুধুমাত্র পেশাদার কূটনীতিবিদদের দিয়ে হবে না। আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গভীরভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং কমপক্ষে চার-পাঁচটি দেশে কূটনৈতিক দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের জায়গায় যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডের রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের নিয়োগ করা প্রয়োজন। নেত্রী পরিষ্কারভাবে যদি তাদেরকে বুঝিয়ে দেন কিভাবে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে, তাহলে আমার মনে হয় এই মুহূর্তে দেশের অনেক উপকার হবে। পাশাপাশি এর দ্বারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও সহায়তা করা হবে। হয়তো আপাতদৃষ্টিতে পেশাদার কূটনীতিবিদরা কিছুটা নাখোশ হতে পারেন। কিন্তু আমাদের কাছে দেশের প্রয়োজন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, তাদের সীমাবদ্ধতাকে যদি ডিঙ্গাতে হয়, তাহলে এটি করা প্রয়োজন। এই কারণেই আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি, তিনি সকলকে চিনেন এবং বিভিন্ন স্তরে চিনেন। সুতরাং অন্তত চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজনে আরও কয়েকটি দেশে এই মূহুর্তে আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রদূতদের পরিবর্তন করে নতুন আঙ্গিকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা প্রয়োজন। আমার মনে হয়, এটি করতে পারলে আমাদের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। কেননা, এখন শুধুমাত্র গতানুগতিক কূটনৈতিকদের দিয়ে বিশ্বের কোনো দেশই এইসব পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারে না।

আমরা নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করতে যাচ্ছি না। যেটি অনেক দেশ অনেক সময় করেছে, আমরা সেটির দিকেই গুরুত্ব দিতে চাই। আমি মনে করি, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইসাথে আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিজ্ঞ। তিনি বহুদিনের প্রধানমন্ত্রী। তিনি অবশ্যই এসব ষড়যন্ত্র মোকাবেলার রোডম্যাপ করেছেন এবং নিশ্চয়ই তিনি সফলও হবেন। আমি ঠিক উপদেশ নয়, এই জিনিসগুলো শুধুমাত্র মনে করিয়ে দিতে চাই এই কারণে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে কাজ করছেন, সেই কাজটিকে আরেকটি ভিন্ন আঙ্গিকেও যাতে তিনি বিবেচনা করতে পারেন, তার জন্য। এটি কোনো সাজেশনও নয়, উপদেশও নয়। এটা হচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকের এই বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনা। এই মূহুর্তে আমি মনে করি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভালো ভালো কাজ করে চলেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী অবস্থানে আনার পেছনে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার ভূমিকা অপরিসীম। তিনি যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই আমাদের সফলতা আসছে। কিন্তু আমাদের প্রতিপক্ষ অর্থ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কায়দায় যেভাবে নেমেছে, ঠিক তেমনিভাবে মোকাবেলা করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছেন এবং আরও পদক্ষেপ নেবেন। যেহেতু আরও অনেক পদক্ষেপ হয়তো তিনি নেবেন, সেই কারণেই আমি এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। আমি মনে করি, আমরা সঠিক পথেই আছি এবং আমাদের অবশ্যই বিজয়লাভ হবে। এসব ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। কারণ, অগণতান্ত্রিক পথে বাংলাদেশের ক্ষতি করতে চাওয়া অথবা বিদেশি দেশগুলোকে ভুল বুঝিয়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার পদক্ষেপকে নস্যাৎ করার পরিকল্পনা পরিশেষে কারো পক্ষেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সুতরাং আমরা জয়ী হবোই।

দুই বছর পরে আমাদের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরেই সর্বপ্রকার ষড়যন্ত্র চলছে। এই কারণে নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদেরকেও সবদিক থেকে প্রস্তুত থাকতে হবে, যেভাবে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন হয়েছে এবং তাতে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা প্রমাণ হয়েছে। তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। অনেক দেশেই বেশিদিন ক্ষমতায় থাকলে কিছু লোকে পরিবর্তন চায়। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো হয়েছে। দেশে বিভিন্ন উন্নতি এবং বিভিন্ন ভালো কাজগুলো রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই হয়েছে এবং তিনি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করেছেন। জনগণের বিশ্বাস একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাই পারেন দেশকে সঠিক পথে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে। এটি দেশের অধিকাংশ জনগণই বিশ্বাস করেন এবং এটি একদমই নির্ধারিত। পাশাপাশি বিশ্ব ম্যাপেও যেন এই বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত থাকে, তার জন্যেও নিশ্চয় রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। আমরা সকলেই চাই যে, তিনি নিশ্চয়ই সফল হবেন। পাশাপাশি, আমাদের যার যখন যেটা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজনবোধ হবে, আমরা তা বলবো। এটি মনে করে নয়, তার মনে নেই অথবা তিনি জানেন না। বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে এইসব জিনিসগুলো অবশ্যই জনসম্মুখে আনা প্রয়োজন এবং তাতে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যেভাবে জিনিসগুলো বিবেচনা করবেন, জনগণও তেমনিভাবে দেখতে পাবে। তাই, আমি বিশ্বাস করি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হাত আরও শক্তিশালী করার জন্য রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা নিশ্চয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

স্বামীর সঙ্গে শোয়ার বিদ্যাও শেখানো হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে!

প্রকাশ: ০৮:০২ পিএম, ২০ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

হযরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনলেই আমার জাফর ইকবাল স্যারের কথা মনে পড়ে। জাফর ইকবাল স্যারের কারণেই এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আলাদা মর্যাদা পেয়েছিল, আলাদা একটা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে একটু ভিন্ন ধরনের এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমস্ত শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে এসেছে তারা বিভিন্নভাবে নিজেদেরকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়েছে এখন পর্যন্ত। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চলছে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে এখন এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। অনেক ছেলে-মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, অনশন ধর্মঘট করছে শিক্ষার্থীরা। এখন পর্যন্ত শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেখা যায়নি। কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম ঘটনা ঘটলো? একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দুর্যোগ কেন নেমে আসলো এ নিয়ে নানা জনের নানা মত, নানা প্রশ্ন। আমিও খোঁজার চেষ্টা করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কি এমন পরিস্থিতি হলো যে, শিক্ষার্থীরা অনশন ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হলো।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের সূত্রপাত হয় একটি মহিলা হলের একজন হল প্রভোস্টকে কেন্দ্র করে। হল প্রভোস্টের কিছু কিছু বক্তব্য এখন আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখছি এবং এই সমস্ত বক্তব্যগুলোর প্রেক্ষিতে যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখেনা। অনেকগুলো বক্তব্যই বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার মধ্যে একটি বক্তব্য দেখে আমার পিলে চমকে উঠলো। বক্তব্যটা এরকম যে, হলে থাকা মেয়েদেরকে ডাবলিং করতে হয় এবং সেখানে সিট বণ্টনের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব হয়। বাংলাদেশ যেখানে পক্ষপাতিত্বের দেশ তখন সিট বণ্টনে সেখানে পক্ষপাতিত্ব হবে এটাও স্বাভাবিক। ডাবলিংয়ে অনেক মেয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেন। তারা প্রভোস্টের কাছে গিয়ে দাবি জানিয়েছেন যে, এরকমভাবে ডাবলিং তাদেরকে কতকাল করতে হবে কিংবা এরকমভাবে ডাবলিং করাটা থেকে তারা মুক্তি চান। এর জবাবে প্রভোস্ট বলেছেন যে, তোমরা যদি এখনই দুজন এক বিছানায় না শুতে পারো, তাহলে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কিভাবে শুবে? এই বক্তব্য দেখে আমি স্তম্ভিত! শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিংবা ওই পদত্যাগী প্রভোস্ট কেউই এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি যে, এরকম বক্তব্য তিনি শিক্ষার্থীদেরকে দিয়েছেন।

একজন শিক্ষক কিভাবে এ ধরনের নিম্নমানের, অরুচিকর, কুৎসিত বক্তব্য দিতে পারেন এটা ভেবে আমার গা ঘিনঘিন করে উঠছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। তিনি শিক্ষার্থীদের শেখাবেন কিভাবে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হয়। তাছাড়া নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, নারীর মুক্তি, নারীর স্বাধীনতা নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, তখন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েরা আমাদের গর্ব। তাদেরকে আমরা মুক্তচিন্তা শেখাবো, আদর্শবাদী হতে শেখাবো এবং স্বাবলম্বী হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখাবো। অথচ তাকে যদি আমরা শেখাই যে স্বামীর সঙ্গে কিভাবে শুতে হবে এবং সেই শোয়ার অভ্যাস করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাবলিং করতে হবে, তারচেয়ে ভয়াবহ, অরুচিকর শিক্ষা কিছু হতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানভাণ্ডার, জ্ঞান কেন্দ্রের জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পাঠশালা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিকৃত রুচির চর্চা কেন্দ্র নয়। কিন্তু কিছু কিছু শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিকৃত রুচির চর্চাকেন্দ্র বানাচ্ছেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন এ ধরনের মন্তব্য করেন তখন আমাদের ভাবতে অবাক লাগে যে, আমরা কোথায় আছি। আমরা জানি যে, বিশ্ববিদ্যালয় শেখায় উদারতা, বিশ্ববিদ্যালয় শেখায় মুক্তচিন্তা। সেখানে যদি স্বামীর সঙ্গে শোয়ার বিদ্যা শেখানো হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থাকার দরকার কি আছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যখন নানারকম সংকট, শিক্ষার মান নিয়ে নানারকম প্রশ্ন, সেই সময় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি ভালো অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলো। কিন্তু এ ধরনের বক্তব্য এবং এ ধরনের বক্তব্যের পর ওই শিক্ষককে এখনো দায়মুক্তি দেওয়ার যে চেষ্টা, সেটিকে নিন্দা না জানিয়ে পারা যায়না। আমি জানিনা উপাচার্যের অপরাধ কি বা উপাচার্য কতোটুকু দোষী। কিন্তু এরকম মন-মানসিকতা যদি আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের নারী স্বাধীনতার যে বুলি আমরা এখন আওড়াই, সে বুলি আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হতে সময় লাগবে না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

উড়ে যায় পাখি,পড়ে থাকে পাখির পালক

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ২০ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail

কবি রফিক আজাদ তাঁর ‘দুঃখ-কষ্ট’ কবিতায় লিখেছেন-
‘পাখি উড়ে চলে গেলে, পাখির পালক পড়ে থাকে...’ 

পাখি উড়ে চলে গেলে, পাখির কয়েকটি পালক পূর্বের স্থানে ফেলে যায়। মানুষের মৃত্যু যেন পাখি উড়ে চলে যাওয়ার মতই। মানুষ মরে গেলে কর্মের মাধ্যমে স্মৃতি রেখে যায়। সেই স্মৃতিসমূহ স্মরণ করে মানুষ মৃতব্যক্তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়। 

এই পৃথিবী থেকে আমাদের সকলকেই চলে যেতে হবে, আগে আর পরে। কেউই থাকবো না। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়, বড় ব্যথা দেয়। কৃষিবিদ পরিবারের আত্মার আত্মীয় তিনজন বরেণ্য জননেতা কৃষিবিদ শওকত মোমেন শাজাহান; কৃষিবিদ আবদুল মান্নান এবং কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা-র চিরপ্রস্থানের শূন্যতা গ্রাস করেছে বাংলাদেশের সকল কৃষিবিদকে। 

১৯৮০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ভর্তি হতে গিয়ে তাঁদের সাথে রাজনৈতিকভাবেই আমার পরিচয়। সেই থেকে একসাথে পথ চলা। জনাব শওকত মোমেন শাহজাহান সেসময়ে বাকৃবি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ছিলেন শাহজালাল হলের (পশ্চিম) ২৪ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র, আমি (পশ্চিম) ২২ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র। আমাদের ব্যাচের নতুন ছাত্রদের ছাত্রলীগের পতাকাতলে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে প্রায়ই শাজাহান ভাইকে তাগিদ দিতাম। তিনি বলতেন, ‘I want quality, not quantity.’ তুমি পাঁচটি quality পূর্ণ ছাত্র সংগঠিত করো। দেখবে, ওরাই বৃহৎ ছাত্রলীগকে সর্ববৃহৎ ছাত্র সংগঠনে পরিণত করবে’। তাঁরা প্রত্যেকেই এমনি জনসম্পৃক্ত নেতা ছিলেন যে, তাঁদের সাথে আমাদের সকল কৃষিবিদদেরই অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। 

প্রয়াত এই তিনজন বরেণ্য কৃষিবিদের স্মরণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গত ১৬ জানুয়ারি ২০২২ স্মরণসভার আয়োজন করেছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ডঃ মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি-র সভাপতিত্বে সেই অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী সচিব ও বিভিন্ন সংস্থার চেয়ারম্যান/ ডিজি-সহ অসংখ্য বরেণ্য কৃষিবিদ স্মৃতিচারণ করেছেন।

এসকল গুণীজনদের আলোচনা ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে যে, তাঁরা শুধু একটি করে নাম নন, কৃষিবিদদের অহংকার ও আশা-ভরসার প্রতীক। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এদেশের কৃষি, কৃষক ও কৃষিবিদদের জন্য নিবেদিত প্রাণ অকুতোভয় রাজনৈতিক নেতারা আপাদমস্তক বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করেছেন । তিনজন নেতারই ছিল বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য যা প্রয়োজন-তা হচ্ছে নেতৃত্ব, মেনুফ্যাষ্টো বা আদর্শ, নিঃস্বার্থ কর্মী ও সংগঠন’। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান কৃষিবিদ ডঃ শেখ বখতিয়ার বলেছেন, উল্লিখিত সকল গুণাবলীই প্রয়াত এই তিনজন কৃষিবিদ নেতাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

মাননীয় মন্ত্রী এডভোকেট শ ম রেজাউল করিম তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, ‘প্রয়াত এই তিনজন জাতীয় কৃষিবিদ নেতা জাতির খুব ক্রান্তিকালে রাজনীতি করেছেন। ক্রান্তিকালে রাজনীতি করার মত সাহস দলের অনেকেই রাখেন না। অনেক ক্রান্তিকালে দেখা গেছে অনেকেই সামনে আসেন না, ঝুঁকিও নেন না। কিন্তু এই তিনজন কৃষিবিদ নেতার রাজনৈতিক জীবনে বর্ণাঢ্য সেই ঐতিহ্য রয়েছে। ক্রান্তিকালকে কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় সেই পরীক্ষায় তাঁরা উত্তীর্ণ’। 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রবল প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে খুনিচক্রের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সাথে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন কৃষিবিদ জনাব শওকত মোমেন শাজাহান, আব্দুল মান্নান ও বদিউজ্জামান বাদশা। এই তিনজন নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে আলোচনায় বাকৃবি ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি বরেণ্য কৃষিবিদ আবুল ফয়েজ কুতুবী বলেছেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিকূল পরিবেশে ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানে নেতৃত্ব দিলেও অদৃশ্য কারণে রাজনৈতিক অনুকূল পরিবেশে কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান ও কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা-র রাজনৈতিক জীবন সুখকর হয়নি’। 

কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা-র রাজনীতির চারণক্ষেত্র শেরপুর জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আতিউর রহমান আতিক বলেছেন, ‘সারা বাংলাদেশের কৃষিবিদদের আত্মার আত্মীয় কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা’র জানাজায় লক্ষাধিক মানুষ তারাগঞ্জ স্কুল মাঠে সমবেত হয়েছিল। বাদশা ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ সামনে রেখে স্মৃতিচারণ করার সময় সমবেত এলাকাবাসী ৫-৬ ঘন্টা পিনপতন নীরবতায় দাড়িয়েছিল। আমিও জানাজায় ছিলাম। দুর্ভাগ্য সেদিন তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রচারের জন্য স্থানীয় আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে মাইকিং করার সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয় নাই। এটা ছিল আমার দুর্ভাগ্য। আমি করতে পারি নাই। আমি (জানাজায়) গিয়েছিলাম। আমাদের অনেক নেতা গিয়েছিলেন। মানুষের চোখের পানি আর বুক চাপড়ানো ব্যথা সেদিন আমরা দেখেছি, মর্মে মর্মে আমি উপলব্ধি করেছি, ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তর পারে গারো পাহাড়ের পাদদেশে এক ক্ষণজন্মা পুরুষ ছিলেন কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা, যিনি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন’।

কৃষিবিদ পরিবারের সদস্য মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, ‘উনারা তিনজনই নিজ নিজ এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিন নেতাই নিজ নিজ সংসারের চেয়ে এলাকার উন্নয়ন, কৃষি পেশার উন্নয়ন ও কৃষিবিদদের কল্যাণে জীবনের বেশীরভাগ সময় ব্যয় করেছেন। যে যেটুকু করে, তার যদি মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে সবাই উৎসাহী হয়। সবাই এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে’।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মহান সৈনিক, কৃষিবিদ সমাজের প্রাণের নেতা এই তিনজন রাজনৈতিক নক্ষত্রের প্রয়াণে কৃষিবিদ পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা অনন্য সংগঠক ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়ে নিজেকে এক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৯৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ দুঃসময়ে তাঁদের যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে কৃষিবিদ সংগঠনে আওয়ামীলীগের সমর্থক সবচেয়ে বেশি।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে প্রয়াত এই তিনজন নেতা দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা তাঁদের আদর্শকে লালন করে যদি তাঁরই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষিতে সত্যিকার অবদান রাখতে পারি তাহলেই তাঁদের বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে।

ছাত্রলীগ   বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়   বঙ্গবন্ধু  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

হারিছ চৌধুরীর নীরব মৃত্যু ও কিছু প্রশ্ন!


Thumbnail

চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে দোর্দণ্ড প্রতাপশালীদের একজন ছিলেন আবদুল হারিছ চৌধুরী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও খালেদা জিয়া তাকে তার বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর ফিরে তাকাতে হয় নি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হন। তিনি এতটাই ক্ষমতাধর ছিলেন যে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজ বাড়িতে ডাকঘর, স্কুল, পুলিশ ক্যাম্প ও ব্যাংকের শাখা বসিয়েছিলেন। সেখানে গড়ে তুলছিলেন ব্যক্তিগত মিনি চিড়িয়াখানা। আয়ের বৈধ কোনো উৎস না থাকলেও রাতারাতি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যান হারিছ চৌধুরী। তার কানাইঘাটের বাড়িকে বলা হতো সিলেটের ‘হাওয়া ভবন’।  ১/১১ এর পট পরিবর্তনের পর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযান শুরু হলে আত্মগোপনে চলে যান হারিছ চৌধুরী। আড়ালে চলে গেলেও গণমাধ্যমে একের পর এক তার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। সম্প্রতি জানা গেল তিনি তিন মাস আগে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেছেন। 

হারিছ চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও হারিছ চৌধুরীর কন্যা ও লন্ডন বিএনপির শীর্ষ নেতারা খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রমাণ হয়েছে - ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকা কেউ চাইলে আত্মগোপনে থাকতে পারে। তিনি কবে, কিভাবে দেশ ছাড়লেন, কোথায় ছিলেন, কি করেছেন, কবে ও কিভাবে দেশে এলেন - এমন অনেক প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু এ রহস্যকে ছাড়িয়ে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে -  বিএনপির গুম দাবি করা ব্যক্তিদের সন্ধানও কি একদিন এভাবে পাওয়া যাবে?


২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন  বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। দু'মাস পর ১১ মে মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে 'উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাফেরা' করার সময় তাকে আটক করে শিলং পুলিশ। তার নামে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা হয়। বলা হয়েছিল, গোয়েন্দা পরিচয়ে তাকে তার উত্তরার বাসা থেকে তুলে একটি প্রাইভেট কারে শিলং নেওয়া হয়েছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে ছেড়ে দেয়ার দাবি হাস্যকর ও অবাস্তব একটি বিষয়। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হারিছ চৌধুরী ছিলেন আলোচিত/সমালোচিত একজন ব্যক্তি। বিএনপির শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও তখনকার পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত  "হাওয়া ভবন" - উভয় স্থানেই অবাধ বিচরণ ছিল তার। এছাড়া মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় যৌথ ব্যবসা রয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়। হারিছের বিরুদ্ধে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও শাহএএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা রয়েছে। এছাড়া দুদকের দুর্নীতি মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার যথাক্রমে তিন ও সাতবছরের জেল ও দশ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। ২০১৮ সালে ইন্টারপোলে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ ইস্যু হয়। কিন্তু তিনি সফলভাবেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে সক্ষম হন। 

জানা যায়, ২০০৭ সালে ২৯ জানুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতের করিমগঞ্জে পাড়ি জমান হারিছ চৌধুরী। সেখান থেকে পাকিস্তান হয়ে ইরানে তার ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে যান। ইরানে থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা নেন বলেও গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়। এর আগে যুদ্ধাপরাধী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ভারত হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া বিদেশে এসাইলামের জন্য পিনাকী ভট্টাচার্য নামের এক ইউটিউবার নাটক করে মিয়ানমার হয়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। তাই ধারণা করা অস্বাভাবিক নয় যে - ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে চোরাচালানে জড়িত কোনো সিন্ডিকেট হয়তো তাদেরকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

খবরে জানা যায়, নিখোঁজের ৯ বছর পর বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে নিয়ে মন্তব্য করে দলের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। তিনি ইলিয়াস আলীর ‘গুমের’ পেছনে দলের ভেতরে থাকা কয়েকজন নেতাকে দায়ী করেন। 
 
গুম অবশ্যই নিন্দনীয় ও অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতেও যে গুম নাটক হতে পারে তার নজির রয়েছে। ছাত্র অধিকার পরিষদ নেতা তারেককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সংগঠনের নেতাকর্মীরাই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে লুকিয়ে থাকার তথ্য ফাঁস করে। বিএনপির পক্ষ থেকে গত ১২ বছরে প্রায় ছয়শ নেতাকর্মীকে গুম করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু তথ্য পাওয়া যায় ৮৭ জনের। এদের মধ্যে কতজন ব্যক্তিগত কোন্দলের শিকার, কতজন স্বেচ্ছায় গা ঢাকা দিয়ে আছে - কে জানে! যেমন: একজন কাপড় বিক্রেতাকে কোনো রাজনৈতিক দল কেন প্রতিপক্ষ করবে - তার বিশ্বাসযোগ্য জবাব খুঁজে পাই নি। ব্যক্তিগত কোন্দলকে রাজনৈতিক মেরুকরণ করে পরোক্ষভাবে বিচারের পথ বন্ধ করা হয়েছে কিনা তাও বিবেচনার দাবি রাখে। তবে যেহেতু গুম ইস্যুতে সরকারকে টার্গেট করে প্রচারণা চলে আসছে, তাই সরকারের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জনগণকে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি তুলে ধরা ।

লেখক: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষক

হারিছ চৌধুরী   বিএনপি  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন