ইনসাইড থট

ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

প্রকাশ: ০৯:২৫ এএম, ২৪ জানুয়ারী, ২০২২


Thumbnail ঊনসত্তরের অগ্নিঝরা দিনগুলি

আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন। প্রত্যেক মানুষের জীবনে উজ্জ্বলতম দিন আছে। আমার জীবনেও কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে। ’৬৯ আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কালপর্ব। এই পর্বে আইয়ুবের লৌহ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় জীবনে যখন জানুয়ারি মাস ফিরে আসে তখন ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলি স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। জীবনের সেই সোনালি দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তের কথা মনে পড়ে। অনেক সময় ভাবি, কী করে এটি সম্ভব হয়েছিল!

’৬৬-৬৭তে আমি ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি এবং ’৬৭-৬৮তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ তথা ডাকসুর সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূতিকাগার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ষাট দশকের গুরুত্ব অনন্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ’৪৮ ও ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ছয় দফা ও ’৬৯-এর ১১ দফা আন্দোলন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন ছয় দফা দিয়েছিলেন আমি তখন ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সহসভাপতি। ইকবাল হলের সহসভাপতির কক্ষ ছিল ৩১৩ নম্বর। এই কক্ষে প্রায়শই অবস্থান করতেন শ্রদ্ধেয় নেতা সর্বজনাব শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাক। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দেওয়ার পর দেশব্যাপী ঝটিকা সফরে ৩৫ দিনে ৩২টি জনসভা করেন এবং বিভিন্ন জেলায় বারবার গ্রেফতার হন। ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ অর্থাৎ এই ছয় দফার সিঁড়ি বেয়ে তিনি স্বাধীনতায় পৌঁছবেন। বিচক্ষণ নেতা ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে রাজনীতি করেছেন। স্বাধীনতার লক্ষ্য সামনে নিয়েই ’৪৮-এ ছাত্রলীগ ও ’৪৯-এ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার বীজ রোপণ করে ছয় দফায় বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার জাতির সামনে পেশ করেন। ছয় দফা দেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে ১০টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিটি মামলায় জামিন পেলেও শেষবার নারায়ণগঞ্জ থেকে সভা করে ঢাকা আসার পর ‘পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে’ তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের ডাকে ৭ জুন সর্বাত্মক হরতালে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ’৬৮-এর ১৮ জানুয়ারি জেল থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেলেও পুনরায় জেল গেটেই গ্রেফতার করে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে আমরা জানতাম না প্রিয়নেতা কোথায় কেমন আছেন। ’৬৮-এর ১৯ জুন আগরতলা মামলার বিচার শুরু হলে আমরা বুঝতে পারি আইয়ুব খান রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যুদন্ড দেবে। আইয়ুব খান প্রদত্ত মামলার নামই ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য।’ আমরা ছাত্রসমাজ এই গ্রেফতারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলি, যা পরে তীব্রতর হয়।

স্মৃতিকথা লিখতে বসে মনে পড়ছে, ডাকসুসহ চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ঐতিহাসিক ১১ দফার ভিত্তিতে ’৬৯-এর ৪ জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠার কথা। মনে পড়ে ১১ দফা আন্দোলনের প্রণেতা-ছাত্রলীগ সভাপতি প্রয়াত আব্দুর রউফ ও সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী; ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) সভাপতি প্রয়াত সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক ও সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দোহা; ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল্লাহ এবং এনএসএফের একাংশের সভাপতি প্রয়াত ইব্রাহিম খলিল ও সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম মুন্সীর কথা। ছাত্রনেতাদের প্রত্যেকেই ছিলেন খ্যাতিমান। আমি ডাকসু ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করি। আমার সঙ্গে ছিলেন ডাকসু জি এস নাজিম কামরান চৌধুরী। ’৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১১ দফা প্রণয়নের পর এটাই প্রথম কর্মসূচি। ডাকসু ভিপি হিসেবে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গভর্নর মোনায়েম খান ১৪৪ ধারা জারি করেন। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব ছিল সিদ্ধান্ত দেওয়ার ১৪৪ ধারা ভাঙব কি ভাঙব না। উপস্থিত ছাত্রদের চোখে-মুখে ছিল ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দৃঢ়তা। ১৪৪ ধারা ভঙের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে শ পাঁচেক ছাত্র নিয়ে রাজপথে এলাম। পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুর রউফ ঘটনাস্থলে আহত হন। আমরা ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। পরদিন ১৮ জানুয়ারি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মঘট কর্মসূচি দিই। ১৮ জানুয়ারি বটতলায় জমায়েত। যথারীতি আমি সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ছিল বিধায় সকালে বটতলায় ছাত্র জমায়েতের পর খন্ড খন্ড মিছিল এবং সহস্র কণ্ঠের উচ্চারণ, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই।’ গতকালের চেয়ে আজকের সমাবেশ বড়। সেদিনও ১৪৪ ধারা বলবৎ ছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজপথে নেমে এলাম। দাঙ্গা পুলিশ লাঠিচার্জ আর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। ফিরে এলাম ক্যাম্পাসে। কর্মসূচি নেওয়া হলো ১৯ জানুয়ারি আমরা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল করব এবং ১৪৪ ধারা ভাঙব। সেদিন ছিল রবিবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল। আমরা মিছিল শুরু করি। শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল নিক্ষেপ। কিন্তু কিছুই মানছে না ছাত্ররা। শঙ্কাহীন প্রতিটি ছাত্রের মুখ। গত দুদিনের চেয়ে মিছিল আরও বড়। পুলিশ গুলি চালাল। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রলীগ কর্মী আসাদুল হক, বাড়ি দিনাজপুর, গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। পুলিশের নির্যাতন ও গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি সোমবার আবার বটতলায় সমাবেশের কর্মসূচি দিই। ২০ জানুয়ারি ’৬৯-এর গণআন্দোলনের মাইলফলক। এ দিন ১১ দফা দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট পালিত হয়। সভাপতির আসন থেকে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার পরিসর সমাবেশের তুলনায় ছোট। ৩ দিনে সাধারণ ছাত্র ও বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের আস্থা অর্জনে আমরা সক্ষম হয়েছি। যখন সভাপতির ভাষণ দিচ্ছি তখন মিল-কারখানা, অফিস-আদালত থেকে দলে দলে মানুষ আসছে বটতলা প্রাঙ্গণে। সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে সভাপতির ভাষণে সেদিন বলেছিলাম, ‘যতদিন আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্র কার্যকলাপ ধ্বংস করে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্ত করতে না পারব, ততদিন আন্দোলন চলবে। স্বৈরশাসক আইয়ুব-মোনায়েম শাহীর পতন না ঘটিয়ে বাংলার ছাত্রসমাজ ঘরে ফিরবে না।’ পুনরায় ১৪৪ ধারা ভঙের ঘোষণা দিলাম। লাখ মানুষের মিছিল নেমে এলো রাজপথে। কোথায় গেল ১৪৪ ধারা! আমরা ছিলাম মিছিলের মাঝখানে। মিছিল যখন আগের কলাভবন বর্তমান মেডিকেল কলেজের সামনে ঠিক তখনই গুলি শুরু হয়। আমি, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী ও আসাদুজ্জামান একসঙ্গে ছিলাম। আমাদের লক্ষ্য করে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর গুলি ছোড়ে। গুলি লাগে আসাদুজ্জামানের বুকে। সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে আসাদ। আসাদকে ধরাধরি করে মেডিকেল কলেজের দিকে নেওয়ার পথে আমাদের হাতের উপরেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। একজন শহীদের শেষনিঃশ্বাস স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। মৃত্যু এত কাছে হাতের ওপর! মেডিকেলের সিঁড়িতে আসাদের লাশ রাখা হয়। তাঁর গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত শার্টটি সংগ্রামের পতাকা করে আমরা আসাদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিয়ে সমস্বরে বলি, ‘আসাদ তুমি চলে গেছ। তুমি আর ফিরে আসবে না আমাদের কাছে। তোমার রক্ত ছুঁয়ে শপথ করছি, আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ এরপর ছুটে গেলাম শহীদ মিনার চত্বরে। আসাদের মত্যুর খবর ঘোষণা করলাম শোকার্ত জনতার মাঝে। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট সামনে রেখে সমাবেশের উদ্দেশে বললাম, ‘আসাদের এই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেব না’ এবং ২১ জানুয়ারি পল্টনে আসাদের গায়েবানা জানাজা ও ১২টা পর্যন্ত হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করি। আমাদের সত্তা ও অস্তিত্ব আসাদের রক্তের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। শহীদ মিনার থেকে শুরু হলো শোক মিছিল। শোক মিছিল মুহূর্তেই লক্ষ মানুষের বিক্ষোভ মিছিলে পরিণত হলো। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। শোক মিছিলের সম্মুখভাগ যখন তিন নেতার সমাধির কাছে তখন সেনাসদস্যরা মাইকে বলছে, ‘ডোন্ট ক্রস, ডেঞ্জার-ডেঞ্জার, ডোন্ট ক্রস!’ কিন্তু শোক মিছিল ক্ষোভে উত্তাল। ‘ডেঞ্জার’ শব্দের কোনো মূল্যই নেই মিছিলের কাছে। মিছিল নির্ভয়ে এগিয়ে গেল। ২১ জানুয়ারি পূর্বঘোষিত হরতাল কর্মসূচি পালিত হলো। চারদিক থেকে মানুষের ঢল নামলো পল্টন ময়দানে। মাইক, মঞ্চ কিছুই ছিল না। পল্টনে চারাগাছের ইটের বেষ্টনীর উপর দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখতে হলো। বক্তৃতার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে ৩ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করি : ২২ জানুয়ারি শোক মিছিল, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, পরে কালো পতাকাসহ শোক মিছিল। ২৪ জানুয়ারি বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল। ২২ জানুয়ারি ঢাকা নগরীতে এমন কোনো লোক দেখিনি যার বুকে কালো ব্যাজ নেই। বাড়িতে, অফিসে সর্বত্রই কালো পতাকা উড়ছে। একমাত্র ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া ঘৃণা প্রকাশের এই প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল সর্বত্র। ২৩ জানুয়ারি শহরের সমস্ত অলিগলি থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হয় মশাল মিছিল। সমগ্র ঢাকা পরিণত হয় মশালের নগরীতে। সে-এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে লিখে বোঝানো যাবে না। ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। সর্বত্র মানুষের একই প্রশ্ন, ‘শেখ মুজিব কবে মুক্তি পাবে?’ ‘কবে আগরতলা মামলা তুলে নেওয়া হবে?’ ঢাকায় এ ধরনের আলোচনাই চলছিল। হরতালের পরও মিছিলের বিরাম নেই। সমগ্র জনপদ গণঅভ্যুত্থানের প্রবল বিস্ফোরণে প্রকম্পিত, অগ্নিগর্ভ। জনরোষ নিয়ন্ত্রণ করে নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রাখা যে কত কঠিন সেদিন মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী, ইপিআর এবং পুলিশ মরিয়া হয়ে ওঠে বিক্ষোভ দমনে। যত্রতত্র গুলি চালাতে থাকে। সে গুলিতেই শহীদদের তালিকায় যুক্ত হয় মতিউর, মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেক নাম। লক্ষ মানুষ নেমে আসে ঢাকার রাজপথে। মানুষের পুঞ্জীভূত ঘৃণা এমন ভয়ঙ্কর ক্ষোভে পরিণত হয় যে, বিক্ষুব্ধ মানুষ ভয়াল গর্জন তুলে সরকারি ভবন ও সরকার সমর্থিত পত্রিকাগুলোয় আগুন ধরিয়ে দেয়। ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘মর্নিং নিউজ’ এবং ‘পয়গাম’ পত্রিকা অফিস ভস্মীভূত হয়। আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি এস রহমান তার বাসভবন থেকে এক বস্ত্রে পালিয়ে যায়। নবাব হাসান আসকারি, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য এনএ লস্কর এবং রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধকারী খাজা শাহাবুদ্দীনসহ আরও কয়েক মন্ত্রীর বাসভবনে আগুন দেওয়া হয়।

ঢাকার নবকুমার ইন্সটিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানের লাশ নিয়ে আমরা পল্টনে যাই। লাখ লাখ মানুষ পল্টনে সমবেত হয়। জানাজা অনুষ্ঠিত হয় পল্টন ময়দানে। বিক্ষুব্ধ জনতা গভর্নর হাউস আক্রমণ করতে উদ্যত। বিনামাইকে বক্তৃতা করে সংগ্রামী জনতাকে শান্ত করে মতিউরের লাশ নিয়ে পল্টন ময়দান থেকে গণমিছিল নিয়ে আমরা ইকবাল হলের মাঠে আসি। যে মাঠে এসেছিলেন সদ্য সন্তানহারা শহীদ মতিউরের পিতা আজহার আলী মল্লিক। তিনি ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই। কিন্তু আমার ছেলের এই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ যখন ইকবাল হলে পৌঁছলাম তখনই রেডিওতে ঘোষণা করা হলো ঢাকা শহরে কারফিউ। মতিউরের পকেটে নাম-ঠিকানাসহ এক টুকরো কাগজে লেখা ছিল, ‘মা-গো, মিছিলে যাচ্ছি। যদি ফিরে না আসি মা, মনে করো তোমার ছেলে বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য জীবন দিয়েছে। ইতি- মতিউর রহমান, ১০ম শ্রেণি, নবকুমার ইন্সটিটিউশন। পিতা- আজহার আলী মল্লিক, ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনি, মতিঝিল।’ কারফিউর মধ্যেই আমরা মতিউরের লাশ নিয়ে গেলাম ন্যাশনাল ব্যাংক কলোনিতে। আমরা পিতামাতার আকুল আর্তনাদের আশঙ্কা করছিলাম। কিন্তু মা শুধু আঁচলে চোখ মুছে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে চলে গেছে দুঃখ নাই! আজ থেকে তুমি আমার ছেলে। মনে রেখ, যে জন্য আমার ছেলে রক্ত দিয়ে গেলো, সেই রক্ত যেন বৃথা না যায়।’

ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি গণআন্দোলন-গণবিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয় গণঅভ্যুত্থান। কারফিউর মধ্যে একদিনও থেমে থাকেনি আমাদের সংগ্রাম। দেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানি প্রশাসন বর্জন করেছে। কলকারখানা, অফিস-আদালত, সচিবালয় সর্বত্র প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। সরকারি কর্মকর্তাগণ জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য ধরনা দিতেন ইকবাল হলে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের কাছে। কিছুদিনের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ইকবাল হল। ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ১১-দফার প্রতি ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীসহ বাংলার সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিলাম। এরপর সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার হলে ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ‘শপথ দিবস’ পালন করে। শপথ দিবসে আমার সভাপতিত্বে সভা শুরু হয় এবং আমরা ১০ ছাত্রনেতা ‘জীবনের বিনিময়ে হলেও ১১-দফা দাবি বাস্তবায়ন করব’ জাতির সামনে এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করার শপথ নিয়ে সেøাগান তুলি, ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো, শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’ আজ ভাবতে ভালো লাগে, ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি প্রিয় নেতাকে মুক্ত করে সেøাগানের প্রথম অংশ এবং ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে মুক্ত করে সেøাগানের দ্বিতীয় অংশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছি। ১৪ ফেব্রুয়ারি হরতাল পালন ও ডাকের জনসভায় জনতার দাবির মুখে প্রিয় নেতার ছবি বুকে ঝুলিয়ে বক্তৃতা করি। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার হত্যাকান্ডের পর পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। সংগ্রামী ছাত্র-জনতা আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও প্রিয়নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের মুক্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে। মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণে উদ্যত হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা থেকে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে আলটিমেটাম প্রদান করে বলি, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদের প্রিয়নেতা শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।’ ২২ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত লৌহমানব আইয়ুব খান আমাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি প্রদানে বাধ্য হয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠদিন। সেদিন সদ্য কারামুক্ত প্রিয় নেতাকে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে দিনটির ছবি। এমন একজন মহান নেতার গণসংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেদিনের রেসকোর্স ময়দান কানায় কানায় পরিপূর্ণ, জনসমুদ্র। চিরাচরিত প্রথা ভঙ্গ করে আগেই সভাপতির ভাষণ দেওয়ার জন্য লাখ লাখ মানুষকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম। ১০ লক্ষাধিক লোক দুই হাত তুলে সম্মতি জানিয়েছিল। বক্তৃতায় আমি বঙ্গবন্ধুকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করে বলেছিলাম, ‘প্রিয় নেতা, তোমার কাছে আমরা ঋণী, বাঙালি জাতি চিরঋণী। কারণ তুমি জেল-জুলুম অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছ। তোমার জীবন তুমি বাঙালি জাতির জন্য উৎসর্গ করেছ প্রিয় নেতা। এই ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না। তাই কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ চিত্তে তোমাকে একটি উপাধি দিয়ে সেই ঋণের বোঝাটা আমরা হালকা করতে চাই।’ ১০ লক্ষাধিক লোক দুই হাত উত্তোলন করে সম্মতি জানানোর পর সেই নেতাকে-যিনি জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে সেদিন এই প্রস্তাব গ্রহণ করে বাংলার মানুষ লাখ লাখ কণ্ঠে ধ্বনি তুলেছিল, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’।

সেদিন ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে বাংলার মানুষ সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম করেছে। সোনালি সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে গর্বে বুক ভরে ওঠে। আমরা মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়েছি। শহীদ মতিউরের মা ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন, ‘আমার সন্তানের রক্ত যেন বৃথা না যায়।’ শহীদ মতিউরের রক্ত আমরা বৃথা যেতে দিইনি। ২০ জানুয়ারি আসাদের বীরোচিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে আন্দোলন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই আন্দোলনের সফল পরিণতি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রাপ্তি, ’৭০-এর নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ এবং পরিশেষে ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহত্তর বিজয় অর্জন। আর এসব অর্জনের ড্রেস রিহার্সেল ছিল ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলি-যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে চিরদিন।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

tofailahmed69@gmail.com

আওয়ামী লীগ   গণঅভ্যুত্থান   বঙ্গবন্ধু   জেল  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের কথা


Thumbnail দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের কথা

আমি আমার লেখায় প্রথমেই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উল্লেখ করলাম। এর কারণ হচ্ছে এই যে, নেত্রীকে যখন আওয়ামী লীগের সভাপতি করা হয়, তিনি তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং কিছু লোক তাকে আসতে বললেও অনেক বিজ্ঞ লোক তাঁকে খুব গভীর চিন্তা করে নিষেধ করেছিলেন এই কারণে যে, দেশে আসলে তাঁকে জীবন দিতে হবে। তাহলে বলা চলে যে, তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশে আসলেন। কী জন্য আসলেন? আসলে একটি দার্শনিক চিন্তা নিয়ে; একটি দর্শনকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য। সেই দর্শন হচ্ছে দেশপ্রেম। সেদিন কী ঘটেছিল সেই ঘটনা সবাই জানেন। তিনি যেদিন আসেন সে দিনকার ব্যাপারে আমি আলাদা কিছু বলতে চাই না। কারণ অনেক পত্র-পত্রিকায়ই লিখবেন এবং অনেকেই লিখবেন। সুতরাং ওই বিষয়ে আমি যাব না। আমি শুধু তার দর্শনের মধ্যেই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। এই যে দেশপ্রেম, এটা কিন্তু শুধু মুখে বললে হবে না। তার একটি উদাহরণ দেই। ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা দেশের বাইরে গিয়েছিলেন, তখন তাকে আসতে নিষেধ করা হলো। আবার তাঁর বিরুদ্ধে মামলাও করা হলো। যে কোনো সাধারণ লোকেরা দেশে মামলা-মোকদ্দমায় ভোগেন তারা বাইরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যান। কিন্তু নেত্রী উল্টো হলেন। তিনি দেশে আসার জন্য পাগল হয়ে গেলেন। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের মতো বিমান তাকে টিকিট দেয়নি। সরকার বলল, যে প্লেন তাকে আনবে সেই প্লেনের ল্যান্ডিং পারমিশন বাতিল হয়ে যাবে। অন্যভাবে বলা হলো, আসার পরে অজ্ঞাতভাবে তাকে হত্যা করা হবে। তিনি কোনো কিছুর তোয়াক্কা করলেন না। তিনি ওখানে অনেক আন্দোলন হওয়ার পরে দেশে এলেন। তার জোরটা কোথায়? কী জন্য তিনি তা পেরেছেন? পেরেছেন এ কারণে যে, একজন দার্শনিকের যে মূল দর্শন থাকে, দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দর্শন হচ্ছে দেশপ্রেম। দেশপ্রেমের জন্যই তিনি এসেছেন। সুতরাং জীবন এখানে তাঁর কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। এখন নেত্রী অনেক কিছু করে চলেছেন এবং সবকিছুর ভিতর দেখা যায়, তাঁর আসল ব্যাপার হচ্ছে দেশপ্রেম। একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক যার বিদেশে কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। তিনি সততার একটি প্রতীক। 

আমি শুধু আমার নিজের স্বরভক্তির মতো বলছি যে, টুঙ্গিপাড়ার খোকা, তারপর মুজিবভাই, তারপর বঙ্গবন্ধু, তারপরে তিনি হলেন জাতির পিতা। এই যে পর্যায়ক্রমে হলেন। আর আমাদের দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা, তিনি প্রথম ছিলেন ছাত্রনেত্রী হিসেবে সেই স্কুল জীবন থেকে শুরু। তারপরে তাঁর বিবাহ হলো। তিনি স্বামীর সঙ্গে জার্মানি গেলেন। সেই অবস্থায় তাঁরা দুই বোন বাইরে থাকায় তাঁরা বেঁচে গেলেও সবাইকে মেরে ফেলা হলো। তারপর তিনি এলেন। তখন তিনি হলেন আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান। আওয়ামী লীগের প্রধান থেকে তারপর অনেক সংগ্রাম করে তিনি তাঁর আসল অবস্থায় এলেন। প্রতিটি স্তরে তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। সংগ্রাম করে তিনি সরকারপ্রধান হলেন বাংলাদেশের। তারপরও তাঁর সংগ্রাম চলল। তারপরে তিনি রাষ্ট্রনায়ক হলেন। এখন আমরা তাঁর বিভিন্ন কাজ, বিশেষ করে কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়ে এনালাইসিস করতে গিয়ে দেখেছি, তাঁর দর্শনটা কী? তাঁর দর্শন হলো দেশপ্রেম থেকে। একটি বিষয় বলতে হয়, আমাদের দেশের যারা নিজেদের সিভিল সোসাইটির গুরু মনে করেন, যারা নিজেদের সততার প্রতীক মনে করেন তারা অনেকেই অনেক উপদেশ দেন এবং আমি মোটামুটি বেশ কয়েকজনকে চিনি, যারা আসলেই সৎ বলেই আমার বিশ্বাস। এখন দেশপ্রেমের বিষয়টি আমি আনতে চাই।

এই যে করোনাকালীন কঠিন সময়ে নেত্রী এ দেশের জীবন এবং জীবিকা দুটোই বাঁচালেন। বাঁচালেন কী জন্য? মূলত দেশপ্রেমের জন্য। এখন দেশপ্রেমের আসল বিষয়টি সম্বন্ধে একটু বলতে চাই। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে অনেকেই ঘুষ খেত, অনেকেই টাকা বিভিন্নভাবে অনৈতিক পথে আয় করত। কিন্তু তারা দেশের ভিতরে খরচ করত। কিন্তু এখনকার যারা টাকা-পয়সা আয় করতে পারে, তারা বিদেশে নিয়ে যায়। ধনী-দরিদ্র সম্পর্কে এই সিভিল সোসাইটি থেকে এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক লেখা পাই। পত্রিকা খুললেই বড় বড় লেখা পাই। কিন্তু যে জিনিসটা খুবই কম নজরে পড়ে সেটি হচ্ছে, এই যে শুধু টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে এতে ধনী-দরিদ্রের শূন্যস্থান বাড়ছে। এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাষ্ট্রনায়ক। শেখ হাসিনার দর্শন, দেশপ্রেম। এতে একটা জিনিস আমাদের সবার লক্ষ্য করতে হবে, যারা বিদেশে টাকা নিচ্ছে তাদের কোনো দেশপ্রেম নেই। আসল গোড়ায় হাত দিতে হবে। এই জন্যই তো তিনি দার্শনিক। তিনি গোড়ায় হাত দিয়েছেন। যাতে করে যারা দেশপ্রেমিক তারা টাকা-পয়সার কিছুতেই বিদেশে নিতে পারে না এবং এগুলোতে রাজনীতিবিদের যেগুলো সেগুলো নিয়ে অনেক হইচই হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, দেখা গেল যে আমলারাই বিদেশে বেশি টাকা পাচার করেছেন। কিন্তু একজন আমলার বিষয়েও তো ঠিকমতো ইনভেস্টিগেশন হলো না। যারা ইনভেস্টিগেশন করবে এবং এগুলো দেখবে তারা (আমি জেনে বলছি) এতে আগ্রহী নয়। 

আমার জানামতে যারা এটা করতে পারে তাদেরও কিন্তু বিদেশে টাকা পয়সা নেওয়ার মতো সে রকম কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু তারা তাদের কলিগদের বিষয়ে হাত দিতে চায় না (শকুনের মাংস শকুন খায় না)। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অনেককে বসিয়েছেন। আমি শুরু করতে চাই একটা লোকের উদাহরণ হিসেবে বলে, সেটা হচ্ছে আমাদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব। উনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনোদিন আলাপও হয় নাই এবং আমি দেখিও নাই। যখন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন অনেকে দাড়ি দেখে বলেছিলেন উনি তো জামায়াত-বিএনপি। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল যে, তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করেন এবং তার পরিবার মুক্তিযোদ্ধা এবং সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধে একজন আত্মাহুতিও দিয়েছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা যে দার্শনিক তার প্রমাণ হলো, তিনি কে দেশপ্রেমিক সেটা কিন্তু বের করতে ভুল করেননি। তার কোনো ভুলভ্রান্তি নেই। এ রকম অনেক উদাহরণ আছে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে দর্শন দেপ্রেম, তার থেকে বাইরে যান না। এখনো প্রধানমন্ত্রীর ওপরে যাদের ছায়া পড়ে, তাদের কার কার বিদেশে বাড়ি আছে সেটাও তো আমাদের দেখা দরকার। কারণ না হলে এদের দেশপ্রেম যদি না থাকে তাহলে নেত্রী যেহেতু রাজনীতিতে আছেন, তিনি তার জীবনের কোনো মায়া করেন না এবং তিনি যাকে দিয়ে যে কাজ করান তিনি সেটিই করেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে তার কাজ তো বেড়ে যায়। তার তো দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আরও অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল সেই সময়টাতো নষ্ট হচ্ছে।


দার্শনিক   রাষ্ট্রনায়ক  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ: ০৮:০৬ এএম, ১৭ মে, ২০২২


Thumbnail শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

কবি আসাদ মান্নান ‘চাই তাঁর দীর্ঘ আয়ু’ কবিতায় শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মহান পিতার স্বপ্নবুকে/নিরন্তর যিনি আজ এ জাতির মুক্তির দিশারী/ঘূর্ণিঝড়ে হালভাঙা নৌকাখানি শক্ত হাতে বৈঠা ধরে টেনে/অসীম মমতা দিয়ে পৌঁছুচ্ছেন আমাদের স্বপ্নের মঞ্জিলে,…’

কবির মতে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের  অনুসারী, তিনি মুক্তির দিশারি, মৃত্যুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন নির্ভীকভাবে, আর গভীর মমতা দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট। কবির এই কথাগুলো সত্য হতো না, যদি না ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে আসতেন। আসলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এদেশের শাসনকার্যে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আসীন থেকে মহিমান্বিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহাকালকে স্পর্শ করতে সক্ষম। এর কারণ আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি লিখেছেন ‘আমাদের অধিকাংশেরই সুখদুঃখের পরিধি সীমাবদ্ধ; আমাদের জীবনের তরঙ্গক্ষোভ কয়েকজন আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের মধ্যেই অবসান হয়।...কিন্তু পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক লোকের অভ্যুদয় হয় যাঁহাদের সুখদুঃখ জগতের বৃহৎব্যাপারের সহিত বদ্ধ। রাজ্যের উত্থানপতন, মহাকালের সুদূর কার্যপরম্পরা যে সমুদ্রগর্জনের সহিত উঠিতেছে পড়িতেছে, সেই মহান্ কলসংগীতের সুরে তাঁহাদের ব্যক্তিগত বিরাগ-অনুরাগ বাজিয়া উঠিতে থাকে। তাঁহাদের কাহিনী যখন গীত হইতে থাকে তখন রুদ্রবীণার একটা তারে মূলরাগিণী বাজে এবং বাদকের অবশিষ্ট চার আঙুল পশ্চাতের সরু মোটা সমস্ত তারগুলিতে অবিশ্রাম একটা বিচিত্র গম্ভীর, একটা সুদূরবিস্তৃত ঝংকার জাগ্রত করিয়া রাখে।’

অর্থাৎ শেখ হাসিনার ‘সুখদুঃখ জগতের বৃহৎব্যাপারের সঙ্গে বদ্ধ’। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা। অন্যদিকে বিশ্বকবির ভাবনাসূত্রে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষ বলে নয়, বরং মহাকালের অঙ্গস্বরূপ দেখতে হলে, দূরে দাঁড়াতে হয়, অতীতের মধ্যে তাঁকে স্থাপন করতে হয়, তিনি যে সুবৃহৎ রাজনৈতিক অঙ্গনে ৪০ বছর প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আছেন সেটা-সুদ্ধ তাঁকে এক করে দেখতে হয়। এদিক থেকে তিনি ‘ইতিহাসস্র্রষ্টা মহান ব্যক্তিত্ব’। খণ্ড ক্ষুদ্র বর্তমান কালে তাঁর কৃতিত্ব মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংগ্রামকে একীভূত করে দেখতে হবে।

২.

২০২২ সালের ১৭ মে করোনা-মহামারি পরবর্তী একটি বিশেষ দিন বলে আমাদের কাছে গণ্য হচ্ছে। কারণ অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ হাসিনার ৪১তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি ভারত থেকে ফিরে এসেছিলেন প্রিয় জন্মভূমিতে। বাংলাদেশ তারপর থেকে নতুন করে পথ চলা শুরু করে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর এদেশ পুনরায় ‘জয়বাংলা’র বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল। ৪১ বছর পূর্বের সেই দিনটি এখনকার মতো ছিল না। সেদিন ছিল ভারী বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ার এক অপরাহ্ণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করেছিল। শেখ হাসিনার পদস্পর্শে সেই জল্লাদের দেশ পুনরায় সোনার বাংলা হয়ে ওঠার প্রত্যাশায় মুখরিত হয়েছিল। আজ তার প্রমাণ পাচ্ছি আমরা।

চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলা করে আজ বিশ্বে অভিনন্দিত। সবসময় সংকট মোকাবেলা করা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এজন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অবশ্য ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল আমেরিকার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ফোর্বসে’ প্রকাশিত কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবারগ-কক্স রচিত Ô8 (More) Women Leaders Facing The Coronavirus CrisisÕ শীর্ষক প্রবন্ধে করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়। নারী নেতৃত্বাধীন সিঙ্গাপুর, হংকং, জর্জিয়া, নামিবিয়া, নেপাল, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের ওপর আলোকপাত করার সময় বলা হয়, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ১৬ কোটি ১০ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশের মহামারির সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে প্রশংসনীয় বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। কলামে বলা হয়েছে, এদেশের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন সেগুলো এক অর্থে যুক্তরাজ্যও করতে পারেনি। তবে একথা সত্য, বিশ্ব মিডিয়ায় প্রশংসা পাবার জন্য শেখ হাসিনা কাজ করেন না। তাঁর দিনপঞ্জি জুড়ে আছে মানুষের জন্য কাজে ব্যস্ত সময়ের কর্মকাণ্ড। আর তাঁর এই বর্তমান নেতৃত্ব সম্ভব হয়েছে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে।

তিনি ধনিদের বলেছেন গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে।আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই তিনি গরিবের পক্ষে কল্যাণকর রাজনীতি শুরু করেন। এজন্য নিজের দলের নেতাকর্মীদের মানুষের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে কাজ করতেন। তখনকার ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁকে সেসময়ের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একটা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে মানুষের পাশে থাকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে। চিঠিটি নিম্নরূপ

‘‘বন্ধুবরেষু গুণ, আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ‘ত্রাণ বিতরণ করছি’ এ ধরনের কোনো ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে।

ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না। ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্য দানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজরক্ষার তাগিদে, সঙ্গীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেওয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? এই ক্রেডিট নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দিবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না।

আমি মনে করি, যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত। ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াতে সেটাই গর্ব করার মতো হতো। যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখেছিলেন, সেদিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে। আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন। শুভেচ্ছান্তে, শেখ হাসিনা, ৯. ১০. ৮৮’’

স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ এই ৭ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছের মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ ১৭ মে তাঁর দেশে ফেরা ছিল অতি সাধারণ, কারণ সেভাবেই তিনি দেশের জনগণের সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। সেদিন তিনি এক বৃহৎ শূন্যতার মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এদেশে তাঁর ঘর নেই; ঘরের আপনজনও কেউ নেই। তাই সারা দেশের মানুষ তাঁর আপন হয়ে উঠল। তিনি ফিরে আসার আগে ছয় বছর স্বৈর-শাসকরা বোঝাতে চেয়েছিল তারাই জনগণের মুক্তিদাতা। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছিল, বিচার দাবি করছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের। সেনা শাসকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকায় জনগণের শাসনের দাবি নিয়ে রাজনীতির মাঠে রাতদিনের এক অক্লান্ত কর্মী হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি নেতা কিন্তু তারও বেশি তিনি কর্মী। কারণ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা তাঁর প্রাত্যহিক কর্মে পরিণত হলো। দেশে ফেরার প্রতিক্রিয়ায় আবেগসিক্ত বর্ণনা আছে তাঁর নিজের লেখা গ্রন্থগুলোতে। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, শেখ হাসিনা যখনই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রেখেছিলেন তখনই বুঝে নিয়েছিলেন ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু পথ।’ তাঁর ‘পথে পথে গ্রেনেড ছড়ানো’। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৭ মে) আগে ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চের সামরিক শাসন জারির দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসে একমাত্র শেখ হাসিনাই সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানবো না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবোই করবো।’ তাই তো কবি ত্রিদিব দস্তিদার শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’।

৩.

প্রকৃতপক্ষে ১৭ মে এদেশের ইতিহাসের মাইলফলক। সেদিন থেকেই দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে দ্রুত দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ ছিল। সেদিন থেকেই সেই স্লোগান প্রকম্পিত হয়ে উঠল আকাশে-বাতাসে; রাজপথ জনগণের দখলে চলে গেল। সেনাশাসক জিয়া এতোদিন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পূর্বে সেই বছরই শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং জিয়ার অভিসন্ধি ভেস্তে যায়। সেদিনের ঢাকায় লক্ষ মানুষের বাঁধ ভাঙা স্রোত তাঁকে কেন্দ্র করে সমবেত হয়েছিল। তাদের কণ্ঠে ছিল বিচিত্র ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি। শেখ হাসিনার আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম, ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ আরো ছিলÑ শেখ হাসিনা আসছে, জিয়ার গদি কাঁপছে, গদি ধরে দিব টান জিয়া হবে খান খান। আবালবৃদ্ধ জনতা আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেনÑ মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব।

সেদিনের প্রত্যয় শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারই বাস্তব করে তুলেছেন। জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের কয়েকজন খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে এনে শীঘ্রই ফাঁসি দেয়া হবে বলে আমরা মনে করি। ১৭ মে সম্পর্কে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদ ছিল এরকমÑ ‘ঐদিন কালবোশেখির ঝড়ো হাওয়ার বেগ ছিল ৬৫ মাইল। এবং এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে লাখো মানুষ শেখ হাসিনাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় ছিল।’ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমান থেকে নেমেই তিনি দেশের মাটিতে চুমু খান। এ সময় বিপুল জনতার বিচিত্র স্লোগান মুখরিত করে তুলেছিল ঢাকার রাজপথ। যেন সূর্যোদয় হয়েছে, নতুন দিনের পথ চলা শুরু হলো। অশ্রুসজল সেই দিনের কথা আছে নানাজনের স্মৃতিচারণে। ঢাকা শহর তখন মিছিলের নগরী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে বিকাল ৩.৩০ মিনিটের পর বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি মাটি স্পর্শ করার আগেই হাজার হাজার উৎসাহী জনতা সকল নিয়ন্ত্রণের সীমা, নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে ফেলে। নিরাপত্তা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় অবশেষে তিনি নেমে আসেন; হাত নেড়ে জনতাকে শুভেচ্ছা জানান। কিন্তু তাঁর অন্তরে ততক্ষণে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। বিকাল ৪.৩২ মিনিটে শেখ হাসিনা একটি ট্রাকে ওঠেন। এ সময় বজ্র নিনাদে জনতার স্লোগান চলছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক যখন ফুলের মালা পরিয়ে অভিবাদন জানান তখন বাঁধ ভাঙা কান্নার জোয়ার এসে ভাসিয়ে দেয় শেখ হাসিনাকে; কেঁদে ওঠেন তিনি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি কেবল পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেই তুলনীয়।

শেখ হাসিনার ফিরে আসা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল দেশ ও জনতার স্বার্থে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি তাঁর প্রত্যাবর্তনের আগে নৈরাজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছিল মানুষ। পাকিস্তানি শাসক, দালাল-রাজাকার ও আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি দেশের বাধা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং আপামর জনগণের অংশগ্রহণে ৯ মাসের মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার প্রচেষ্টা সফল হতে দেয় নি খুনিরা। ফলে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী সামরিক শাসকদের অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে। দেশ অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়। দেশের প্রতিকূল এক সময়ে জননেত্রীকে আমরা রাজনীতির মঞ্চে পেলাম। তিনি দায়িত্ব নিলেন এবং লাখো জনতার সমাবেশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেনÑ ‘আজকের জনসভায় লাখো লাখো চেনামুখ আমি দেখছি। শুধু নেই আমার প্রিয় পিতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাইয়েরা এবং আরো অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোন দিন ফিরে আসবে না, আপা বলে ডাকবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। ...বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ গত চার দশক ধরে দেশি-বিদেশী চক্রান্ত ও হাজারো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি জনগণের পাশেই আছেন; ভবিষ্যতে থাকবেনও। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পর্যন্ত একাধিক বার বন্দি অবস্থায় নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে তাঁকে।

৪.

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশ ও জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের মতো শেখ হাসিনার দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনও ছিল আমাদের জন্য মঙ্গলকর। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারির পর তাঁর দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৬ জুলাই যৌথবাহিনী তাঁকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে ৩৩১ দিন কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেসময় গণমানুষ তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাঁর সাবজেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেফতারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের উৎকণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছিল। কারণ সে সময় আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে এদেশকে নরকে পরিণত করেছিল। নেত্রীকে গ্রেনেড, বুলেট, বোমায় শেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক; এখনো তেমনটাই আছেন। নতুন প্রজন্মকে যথার্থ ইতিহাসের পথ দেখিয়েছেন তিনি নিজের রাজনৈতিক সততার মধ্য দিয়ে।  

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ১৬ আগস্ট জননেত্রীর ওপর ঢাকায় গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর বাসভবন আক্রান্ত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি- শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে একটি বিরাট মিছিল নগরীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ৪০ জন নিহত হন। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টির ক্যাডাররা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচনের সময় ধানমন্ডিতে তাঁর ওপর বন্দুকধারীরা রাসেল স্কোয়ারে আক্রমণ চালায়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর- ট্রেনে ভ্রমণকালে ঈশ্বরদী ও নাটোরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা জননেত্রীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছিল। এভাবেই দেশ-বিদেশে কখনো গোপনে কখনো বা প্রকাশ্যে চলেছে হত্যার ষড়যন্ত্র। ২০০০ সালের ২০ জুলাই পূর্ব নির্ধারিত জনসভাস্থল কোটালিপাড়া থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি বিস্ফোরকের বোমা উদ্ধার করা হয়। ২০০৪ সালের ৫ জুলাই তুরস্কে সফরের সময় জননেত্রীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল ভয়াবহতম দিন। অজস্র গ্রেনেড নিক্ষেপের পরও নেতাকর্মীদের মানবঢালের বেষ্টনীর কারণে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা। তবে নিহত হন অনেক আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী। এছাড়া অনলাইন, ব্লগ এবং ফেসবুকে জননেত্রীকে কটাক্ষ করে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। হত্যার প্রচেষ্টা ও হুমকির মধ্যেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে শীঘ্রই মহামারি অতিক্রম করে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেÑ এটা নিশ্চিত। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অশুভ শক্তির মোকাবেলা করতে হবে।

৫.

মূলত ১৯৮১ সানের ১৭ মে’র সেকাল আর ২০২২ সালের একালের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কিন্তু সীমাবদ্ধ কালকে অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রেখেছেন সাফল্যের সুদীর্ঘ স্বাক্ষর। তিনি ২০১০ সালে নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০ নারীর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন। এছাড়া ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় সপ্তম স্থানে, ফোর্বসের করা ২০১৬ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ৩৬তম স্থানে ছিলেন। ফোর্বসের তালিকায় ২০১৮ সালে ২৬ এবং ২০১৯ সালে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর মধ্যে তিনি ছিলেন ২৯তম। ২০১০ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা।

একটানা ১৩ বছর ক্ষমতা থাকাকালীন তাঁর আরো অনেক অর্জন রয়েছে। যেমন, ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের জন্য তিনি সাউথ সাউথ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ৭০তম অধিবেশনে পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ লাভ করেনÑ এই তালিকা আরো দীর্ঘ। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার লাভ করেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু তৈরিসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, নারীর অধিকার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। আর বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে তিনি জনগণের কাছে আজ নন্দিত। তাঁর প্রত্যাবর্তন আজও শেষ হয়নি। এজন্য ১৭ মে ঐতিহাসিক দিবসে ইয়াফেস ওসমান রচিত ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : ১৭ মে ১৯৮১’ কবিতাটির একটি অংশ স্মরণ করছি-‘মনে কি পড়ে মনে কি পড়ে/বেদনার তরী বেয়ে একদিন/ছুঁয়ে ছিলে স্বদেশের মাটি।/চারিদিকে নাগিনীর বিষাক্ত নিশ্বাস/পিতার পতাকা হাতে তবু অবিচল,/খরস্রোতা নদী হয়ে অবিরাম বয়ে চলা/মানুষের মুক্তিটা গড়ে দেবে বলে।’


শেখ হাসিনার   স্বদেশ   প্রত্যাবর্তন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

এ শহর প্রান্ত-কলকাতা প্রান্ত

প্রকাশ: ০২:০০ পিএম, ১৬ মে, ২০২২


Thumbnail এ শহর প্রান্ত-কলকাতা প্রান্ত

চেন্নাই থেকে দু'দিন পরেই সোজা কলকাতায়। এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীন ফ্লাইট ছিল এটা। রাত আটটায় অবতরণ করি। নেতাজী সুভাসচন্দ্র বোস এয়ারপোর্ট থেকে শহরের দিকে আসতে চোখে পড়লো অনেকগুলো নতুন ফ্লাইওভার। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সপরিবারে এসেছিলাম। এবার কলকাতাকে বেশ গোছানো ও পরিবর্তিত মনে হল। শহরের দিকে যেতে যেতে দু'পাশের জনজীবনের স্বস্তি ও পরিচ্ছন্নতা নজরকাড়ে। আমি আর মামুন পুরনো কলকাতার মারকুইস স্ট্রিটের একটা মাঝারি মানের হোটেলে গিয়ে উঠি। পায়ে হেঁটে নিউমার্কেট, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করর্পোরেশ, বিখ্যাত গ্র্যান্ড হোটেলসহ যে দিকে মন চায় যাওয়া যাবে। পা বাড়ালেই হোটেল রেস্তোরাঁর কোনো অভাব নেই। ভাত, বিরিয়ানি, রুটি,পরোটা ডালমাখানি, ফলমূল সবই নাগালে। আলোকোজ্জ্বল ও জনাকীর্ণ রোড। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, শিখ, মারোয়ারী কারা নেই এ ঐতিহাসিক শহরে? শত শত বছরের পুরনো নগরী কলকাতার মাটিতে এবার পা রাখতেই মনে একটি অদৃশ্য শিহরণ জাগে। ভেতর থেকে সাড়া আসে এ যে আমাদেরই জনপদ। চল্লিশ পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত এখানে আমাদের পূর্বপুরুষ, আত্মীয় স্বজন অনেকেই ছিলেন, তাদের রকমারি ব্যবসা-বাণিজ্য কতকিছুই না ছিল। বিশেষ করে মা'র মুখে আমার নানাদের জৌলুশপূর্ণ কত গল্প শুনেছি। এমনকি আমার জন্মের সময় অবধি কলকাতার সাবেক মুসাফির হিসেবে নানাজি ধূতি পরিহিত হয়ে ঘোড়া চালিয়ে আমাকে দেখতে এসেছিলেন। সুদীর্ঘ কাল তাঁরা এ স্বপ্নের শহরে বসবাস করে বিপুল অর্থ বিত্তের মালিকও হয়েছিলেন। মূলতঃ অভিশপ্ত দেশ ভাগই তাঁদেরকে গ্রামে বসিয়ে কর্মহীন ভদ্রলোকে পরিণত করেছিল। পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে মধ্য ষাটের দশকেই তাঁরা ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে নেমে এসে খানিকটা দারিদ্র্যের সাথে বসবাস করছিলেন। 

২) কলকাতা একটি মেগা মেট্রোসিটি। কোটি কোটি মানুষের বসবাস। প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষের বাস। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী হলেও কলকাতা বৃটিশদের নজরে পড়ে সর্বপ্রথম। শহরতলীর সুতানটির কাছে একদিন ইস্ট- ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগলদের দ্বারস্থ হয়েছিল, তারা কেবল সামান্য একটু জায়গায় ব্যবসার অনুমতি নিয়েছিল। পরবর্তীতে এদের মানদণ্ড কিভাবে রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছিল তা এখন ইতিহাস। কলকাতা প্রাচীন বন্দর, ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শহর, দিল্লি, মুম্বাইয়ের পর তৃতীয় জনসংখ্যারও শহর এটি। শত শত স্ট্রিট, লেন, রোড, বাজার, পার্কের শহর। প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ নামই আজোবধি বৃটিশ কর্মকর্তা, বড়লাট বা তৎকালীন পরিচিত আধিকারিকদের নামে রয়ে গেছে। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের নাম, শিক্ষাবিদের নাম, আত্মাহুতি দেয়া বিপ্লবীদের নামও কম নয়। পুরনো বাস, ট্রাম ত্রিহুইলার, রিকশা, ঠেলাগাড়ি, টানা সবই একরাস্তায়। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অপূর্ব নিদর্শন শহর কলকাতা। মানুষের সংগ্রামী জীবন, শ্রেনী বৈষম্য, বাঁচার আকুতি ও প্রতিযোগিতা সর্বত্র বিদ্যমান। 
  
৩) আমি যেহেতু ঘোরাঘুরির লক্ষে আছি, সব ধরনের অভিজ্ঞতা নিতে হবে। রোববার সরকারি ছুটির দিন। তবুও বেরোলাম। সঙ্গে অশোক নগরের ভোলানাথ সাহা। ভোলা মামুনের বন্ধু। আমরা হাঁটছি , রাস্তা ক্রস করে এপার-ওপার যাচ্ছি। বাম পাশে দেখি মৌলানা আবুল কালাম আজাদ কলেজ। বলাবাহুল্য, বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা মৌলানা আজাদ স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। ভেতরে গেলাম, কিছু ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষক আছেন। বেকার হোস্টেলের লোকেশন জানার চেষ্টা করি। এটা আসলে সাবেক ইসলামিয়া কলেজ। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চল্লিশের দশকের মাঝামাঝিতে এখানকার ছাত্র ছিলেন। চলে গেলাম বেকার হোস্টেলের গেইটে। লেখা আছে ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত। জানা যায়,  আবাসন সমস্যা নিয়ে সেসময় কলকাতার মুসলিম ছাত্রদের প্রবল আন্দোলনের ফলে তৎকালীন লেঃ গভর্নর এ্যাডওয়ার্ড নরম্যান বেকার এ হোস্টেল নির্মাণ করেন। তবে আজ বন্ধ বলে কর্তব্যরত কর্মচারি আমাকে প্রবেশ করতে দেয়নি। বরং পরদিন আসতে পরামর্শ দিলেন। ঘন্টার চুক্তিতে একটি রিকশা নিলাম। তরুণ চালক। আজ কোথাও তার বাধা নেই। সোজা চলেছে সে। হঠাৎ দেখি জায়গাটার নাম বউ বাজার। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে নামটি বহুবার পড়েছি। এগিয়ে যাচ্ছি এই তো কলেজ স্ট্রিট, ডানে বাঁয়ে বিখ্যাত দুই প্রতিষ্টান। কফি হাউস আর প্রেসিডেন্সী কলেজ। কোনটায় আগে যাব, কফি হাউসেই ঢুকে যাই, একটু বসি এবং ফটো তুলি। উভয় ফ্লোরে তরুণ তরুণীদের জমজমাট আড্ডা চলছে। নেমে প্রেসিডেন্সী কলেজের তোরণে। এখানেও বন্ধ বলে ঢুকতে বারণ। ছবি তুললাম, ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজ। এখন লেখা আছে প্রেসিডেন্সী ইউনিভার্সিটি। একটু এগিয়ে গিয়ে  দেখি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে কয়েকজন দারোয়ান। ভেতরে যাওয়া নিষেধ, বলে, ক্যামেরা আছে। ভোলানাথ এবার মিষ্টি খাওয়াবে। 'ভীম চন্দ্র নাগ' এর মিষ্টি এটা নাকি  কলকাতার সেরা রসগোল্লা। খেলাম এবং ছবি তুললাম। ঠিকানা ৫, নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট কলকাতা ৭০০০১২। কলেজ স্ট্রিটের একপ্রান্তে গিয়ে বাংলাদেশের বইয়ের দোকান 'পাঠক সমাবেশ' খোঁজে বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু পাই নি। তবে আদি মোহন কান্জিলাল বস্রালয় ঠিকই পেয়েছি। 

৪) ফিরে এসে গ্র্যান্ড হোটেলের লবিতে বসি। খানিকটা জিরিয়ে নেয়া এবং শীতল হওয়া। কি করা যাবে ছুটির ফাঁদে পড়েছি। বৃটিশদের প্রিয় হোটেল এটি। হোটেলের অবকাঠামো ও নির্মাণশৈলী আজো পর্যটকদের দারুণ ভাবে আকৃষ্ট করে। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি   মহানায়ক উত্তম কুমারও এ হোটেলের ভক্ত ছিলেন। লবিতে বসে শাহজাহান হোটেলের খোঁজ নিই। এ প্রজন্ম বলতে পারে না। তবু জানলাম, হোটেলটি এখন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কথা সাহিত্যেক শংকর এর উপন্যাস চৌরঙ্গী'র চলচ্চিত্রায়ন হয় শাহজাহান হোটেলকে কেন্দ্র করে। এতেও উত্তম কুমার। এবারই প্রথম দেখার জন্য গ্র্যান্ড হোটেলের অভ্যন্তরে ও দোতলায় যাই। বিদেশি শ্বেতাঙ্গ বা ইউরোপীয়ান গেস্টও একেবারে কম নয়। এবার  হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরে আসি। 

৬) সন্ধ্যার আগে বিজু'র কলকাতার প্রতিনিধি আবদুল রশীদ আসেন আমার হোটেলে। তিনি কলকাতার মানুষ। স্হানীয় চেনা জানা মানুষ। আমাকে বলেন, কোথায় যাবেন স্যার? কোথায় আবার চলুন হাঁটি। ট্রামে চড়ার খুব শখ আমার। যদিও কবি জীবনানন্দ দাশ এতে দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। তিনি চেষ্টা করেও পারেন নি কারণ ছুটির দিনে ট্রামও তেমন চলছে না। তাই ট্যাক্সি নিয়ে শিয়ালদহ রেলস্টেশন। রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুর লেখায় শিয়ালদহ এসেছে বারবার। কতক্ষণ আনমনে ঘুরাফেরা করি। প্ল্যাটফর্ম সংখ্যা গুনে দেখি। বের হয়ে বলি চলুন হাওড়া স্টেশনে। বেচারা না বলতে পারেন নি। পাবলিক বাসে চড়ে বসি দু'জন। মানুষ উঠছে মানুষ নামছে। কন্ডাকটর টিকিট দিচ্ছে। মিনিট পঁচিশের মধ্যে পুরনো রবীন্দ্র ব্রীজ পার হয়ে পৌঁছে যাই । হাওড়া স্টেশনেও আমার একই কাজ, উদ্দেশ্যবিহীন হাঁটাহাঁটি। তখন আমার মাথায় শুধু একটাই ভাবনা, এগুলোই  অখণ্ড বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাওড়া থেকে  বিদ্যাসাগর ব্রীজ হয়ে ফিরে আসি। হোটেলে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে যায়। 

৬) আজ পঁচিশ বৈশাখ। বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবি ও ঋষিতুল্য মনীষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর ১৬২তম জন্মদিন। কলকাতায় বৃষ্টি আর বৃষ্টি। বাইরে বের হওয়ার উপায় পাচ্ছি না। হোটেল মার্কের নিচতলা বৃষ্টির জলে ভেসে যাচ্ছে। এটি খুব পুরনো হোটেল। তবু বাণিজ্যিক কারণে  বাসযোগ্য করে রাখা হয়েছে। ভাবছি, চাকরির রেশটুকু তো এখনো আছে। বর্ণ গন্ধ একদম ফুরিয়ে যায়নি। আমাদের মিশন অফিসের একটু সহযোগিতা বা অনুকম্পা পেতে ক্ষতি কী? ফোন দিই ডেপুটি হাইকে। তাঁকে চিনি না তবে জানি। তিনি বাংলা-ভাষার অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী 'চিলেকোঠার সেপাই'র লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পুত্র আন্দালিব ইলিয়াস। মনে পড়ে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাপ্তাহিক সন্ধানীতে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল 'চিলেকোঠার সেপাই'। আমার পরিচয় পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্হা নিল সে। ঘন্টাখানিক বাদে গাড়ি আসে। সবকিছু সঙ্গে নিয়ে সোজা রবীন্দ্র সরণী হয়ে  জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি। বৃষ্টিস্নাত  জন্মদিনের অনুষ্ঠান। মঞ্চের সাজসজ্জার ওপর বৈশাখী জলের স্পর্শ। আলোচনা পর্ব তখন  শেষ। শত শত মানুষের কোলাহল। ভেতরে বাহিরে ঘুরে দেখছি, আগেও এসেছি তবে এত পরখ করে দেখি নি। বাড়ির পেছনটায়ও গেলাম, ভবনগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়েছে। সামনের অংশে রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের তোরণ। এক ঘন্টার মত সময় থাকি, যদিও ফটো তোলার জন্য মাঝেমধ্যে কাউকে অনুরোধ করতে হয়েছে। স্মরণীয় হলো, তাঁর জন্মদিনে তাঁরই জন্মভিটায়। 

৭) ঠাকুর বাড়ি হতে বেকার হোস্টেলে যাব। গতকাল বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্যটি দেখার অনুমতি পাই নি। আজ মিস করা যাবে না কারণ সন্ধ্যায় আমাকে কলকাতা ছাড়তে হবে।  মেঘলা আকাশ, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি লেগেই আছে। ট্রাফিক যানজট থাকলেও অসহনীয় বলা যাবেনা। তবে এটা ২২শে শ্রাবণ হলে মেনে নেয়া যেত। গাড়ি চলছে ধীর গতিতে, তথাপি চিন্তামুক্ত আমি। আমার হাতে অনেকটা সময়। চলে এসেছি বেকার হোস্টেলের নিচে। একই গার্ড আমাকে চিনতে পেরেছে। বললো, আপনার জন্য হাই কমিশন থেকে বলেছেন, চলুন তৃতীয় তলায়। তিন তলার শেষ প্রান্তের ২৪ নম্বর কক্ষটিতে বঙ্গবন্ধু থাকতেন। তাঁর কক্ষটির সামনেই আবক্ষ ভাস্কর্য স্হাপন করা হয়েছে। জাতির পিতার স্মৃতিস্মারক চিহ্ন দেখে ভীষণ ভালো লেগেছে। সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০১১ সালে উন্মোচন করেন। 

৮) এবার বিমানবন্দরের পথে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ছোট্ট মাটির পেয়ালার এক কাপ চা খেলাম। পরিমাণে এত কম আমাদের এক কাপের একতৃতীয়াংশ হবে। চালককে বললাম, একটা ভালো শপিংমলে নিয়ে যাও। আমার কোনো কেনাকাটা নেই। চাহিদাও নেই। তবে মাত্র ১৬ মাস বয়সী আমার প্রিয়তমা তো বাদ যেতে পারে না। চালক বললো, সামনেই 'কোয়েস্টমল' এখানকার বড় অভিজাত মার্কেট। তবে প্রবেশ করতেই মন খারাপ হয়ে গেল, ২০১৫ সালে সস্ত্রীক এ মলে এসেছিলাম। ২০২০ সালের জুনে সে করোনায় পৃথিবী ছেড়ে  যায়। এক্সেলেটরে পা রাখতেই আমার বিষন্ন হৃদয় হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। ধপাস করে ওঠে ভেতরটা। সে এক্সেলেটর ব্যবহার করতে পারত না। তাঁকে সিঁড়ি দিয়ে উঠাতে হয়েছিল। এ নিয়ে বাচ্চাদের মজা করার কথাও মনে পড়ছিল। এ সবই যেন নিয়তি। খুব কম সময়ের মধ্যে দুটো জামা নিই এবং শপিংমল ত্যাগ করি। দমদমের পথে পথে উড়ালসেতু হওয়ায় বেশি সময় লাগেনি। সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টা হবে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে আগরতলা যাচ্ছি। 

চলবে...

কলকাতা   ফ্লাইট   এয়ারপোর্ট   চেন্নাই  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

মহাসড়কের ঘাতক ‘খড় কুটা’র যাবজ্জীবন কারাবাস চাই


Thumbnail মহাসড়কের ঘাতক ‘খড় কুটা’র যাবজ্জীবন কারাবাস চাই

১৯৯৫ সাল। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। স্বপ্না (ছদ্মনাম) ইন্টার্নি করতো বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে। এক সকালে সে শুনলো সে নিঃস্ব, এতিম। তাঁর বাবা মা ফিরছিলো যশোর থেকে ঢাকা। সাথে একমাত্র ভাই। মাগুরার কাছে কারটি দুর্ঘটনা কবলিত হয়। বাবা মা ঘটনাস্থলে নিহত। ভাই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, পিজি হাসপাতালে। পরদিন লাশ এলো তাঁদের গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের স্বরূপকাটিতে। স্পষ্ট মনে আছে, হরতাল ছিল সেদিন। যানবাহন বন্ধ। একটি ওষুধ কোম্পানি বরিশাল থেকে শুভানুধ্যায়ীদের জন্যে কিছু মোটর সাইকেল এর ব্যবস্থা করেছিল। আমি ছিলাম সে দলে। গিয়েছিলাম জানাজায়। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় গ্রামবাসী স্তম্ভিত, শোক বিহ্বল। সেদিন জেনেছিলাম, প্রাইভেট কারটি যেখানে দুর্ঘটনা কবলিত হয় সেখানে পাট বিছানো ছিল। গ্রামবাসী ওই দুর্ঘটনার জন্য রাস্তায় বিছানো পাটকেই দুষছিল।

ঘটনাটি ২৭ বছর আগের। গত তিন দশকে ক্ষমতায় অনেকবার অদল বদল হয়েছে। একবার এ দল, আরেকবার ও দল। পালা বদলের এ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। গত তেরো বছরে দেশ অনেক এগিয়েছে। দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু সড়কে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের মিছিল এখনো কমেনি। শুধু বিয়োগান্তক এ কাহিনীগুলোতে কিছু পাত্র পাত্রীর পরিবর্তন। দিনক্ষণের পরিবর্তন। দুর্ঘটনার কারণের মধ্যে কোন অমিল নেই। ১৯৯৫ এর স্থলে ২০২২। বিএনপির জায়গায় আওয়ামী লীগ। স্বপ্নার জায়গায় শর্মিলা। কিন্তু মিল একটাই, রাস্তায় কিছু একটা শুকাতে দেয়া হয়েছে। হয়তো পাটের জায়গায় ধান, শুধু এটুকুই পরিবর্তন। পর্দার পেছনের লোকগুলো একই। যারা ধান বা পাট শুকাতে দিচ্ছে তারা মহাসড়ক সংলগ্ন গ্রামবাসী, কৃষক । নির্দ্বিধায়, নির্বিঘ্নে তারা এ কুকর্মটি করে যাচ্ছে। প্রকান্তরে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করছে।

বলছিলাম, শর্মিলার কথা। শর্মী নামেই সবাই জানে। ৯৫ সালের স্বপ্নার মতই সে মেডিকেল পড়ুয়া। সপ্তাহখানেক পরে তার এম বি বি এস ফাইনাল পরীক্ষা। দাদি অসুস্থ। বাসায় সবাই গোপালগঞ্জ যাচ্ছে তাঁকে দেখতে। সবাই মানে বাবা ডা. বাসুদেব সাহা, মা আর ছোট ভাই। পরীক্ষার জন্য সে ঢাকায় থেকে গেলো। সবাই সকালে ঢাকার বাসা থেকে গন্তব্যে বেরিয়ে গেলো। তখনো তার সব ছিল। দুপুর গড়াতেই সে জানলো, সে নিঃস্ব, এতিম; স্বপ্নার মতই। পরিবারের সবাই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। সে দুর্ঘটনায় তিন দম্পতিসহ প্রায় দশ জন নিহত হয়। গত শনিবার গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানায় এক চতুর্মুখি সড়ক দুর্ঘটনাটি ঘটে। শর্মিলার বাবা আমার সহকর্মী। একই বিষয়ের সতীর্থ আমরা। দূরদেশে বসে দুর্ঘটনার সাথে সাথে করুণ মৃত্যুর খবরটি জেনে যাই সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, প্রায় সাথে সাথে। ফেসবুক জুড়ে আহাজারি। সহকর্মী হবার সুবাদে চোখ ছিল ফেসবুকে। পল্লব সাহা নামে এক জুনিয়র চিকিৎসকের একটি পোস্ট পেলাম সেখানে। তিনি লিখেছেন, "এক্সিডেন্ট হওয়া বাসের প্রায় ৫০ গজ পেছনে ছিল আমাদের বাসটা। একচুয়ালি আমাদের বাসটা কাউন্টারে স্লো করার পরেই এক্সিডেন্ট হওয়া বাসটা ওভারটেক করে, তার দু মিনিট পরেই এক্সিডেন্ট। বাসের গতি অতটাও বেশি ছিল না, দুই লেনের রাস্তার মাঝ বরাবর ছিল।" পল্লব আরো জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত চার গাড়িই হার্ড ব্রেক করছিল। কিন্তু একটার ব্রেকও কাজ করে নাই, কারণ হল রাস্তায় ধান মাড়াই ৷ এই ধান মাড়াই এর জন্যই এক্সিডেন্টের সময় দুইটা গাড়ি মুখোমুখি ছিল কারণ দুই পাশেই ধান রাখা ৷" যারা দুর্ঘটনার স্থিরচিত্র দেখেছেন, তারা খেয়াল করবেন, চূর্ণ বিচূর্ণ হওয়া কারটির নিচে ধানের বিচালীর স্তূপ, খড় কুটা।

মহাসড়কে ধান পাট, এমনকি সেদ্ধ ধান শুকানোর এ চিত্র সারা দেশে বিদ্যমান। উত্তরবঙ্গে বেশি, দক্ষিণ বঙ্গে একটু কম। এ চিত্র সর্বকালে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি -সব আমলে। কেউ কিছু বলে না। সমস্যার সমাধানও করে না, উদ্যোগও নেয় না। গ্রামবাসীদেরও সমস্যা রয়েছে। আসলে কৃষকরা ধান পাট দ্রুত শুকানোর জন্য এটি করে। পিচের রাস্তার উপরিভাগ সূর্যের তাপ শোষণ করে, যা ধান পাট দ্রুত শুকায়। ভেজা মৌসুমে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে এগুলো দ্রুত শুকাতে। যারা শুকাতে দেয় তাদেরকে কিছু বললে তারা বলে রাস্তা কি কারো বাপের? রাস্তার মালিক সরকার। যারা রাস্তায় ধান পাট শুকাতে দিয়ে মানুষ খুন করে তাদেরকে কোন সরকার কোনোকালেই বিচারের আওতায় আনে না। তাই তাদের কাছে বিচার চেয়ে লাভ নেই। আমি শুধু ওই ঘাতক ‘খড় কুটা’র যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাই। সরকার চাইলে এগুলোকে যাবজ্জীবন কারাবাসের ব্যবস্থা করতে পারে। মহাসড়কের পাশে ফুটপাথের আদলে ‘খড় কুটা পথ’ নির্মাণ করে সেখানে ধান পাট শুকানোর ব্যবস্থা করতে পারে। যাতে কৃষকদের আর মহাসড়কে না উঠতে হয়। দ্বিতীয় বিকল্প হিসাবে গ্রামের ঈদগাহ, মসজিদ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন স্থানে ধান পাট শুকানোর মত বিকল্প ব্যবস্থা চিন্তা করা যায়। এভাবেই মহাসড়কের উপর অবস্থানরত ঘাতক ‘খড় কুটা’দের যাবজ্জীবন কারাবাসের ব্যবস্থা করা যায়। ধান পাট খড় কুটা গুলোকে ‘খড় কুটা পথে’ বন্দি করে রাখা যায়!


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

শ্রীলংকায় বহুদলীয় সরকার হচ্ছে না!


Thumbnail শ্রীলংকায় বহুদলীয় সরকার হচ্ছে না!

প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বিরোধী দল এসজেবি-কে দলীয় রাজনীতি বাদ দিয়ে জ্বলন্ত সমস্যা সমাধানের জন্য নতুন সরকারের সাথে হাত মেলাতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা সজিথ প্রেমাদাসার কাছে একটি চিঠিতে, প্রধানমন্ত্রী জনগণের জ্বলন্ত সমস্যা গুলো অবিলম্বে সমাধান করতে এবং বৈদেশিক সহায়তা পেয়ে দেশকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবে স্থিতিশীল করতে তাদের যৌথ প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

দেশের ভবিষ্যৎ দিন দিন ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার ইতিবাচক ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া চেয়েছেন। বিরোধী দলের নেতা সজিথ প্রেমাদাসা প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের জবাবে একটি চিঠিতে বলেছেন যে তিনি শুধুমাত্র একটি বহুদলীয় সরকারে সম্মত হবেন।

ইউএনপি উপনেতা রুয়ান উইজেবর্ধনে শুক্রবার বলেছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে জাতিকে বাঁচাতে ইউএনপি সরকার নয়, একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করবেন যা সংসদের সকল দলকে নিয়ে গঠিত হবে । তিনি বলেন, আশাকরি সব দল সরকারে যোগ দেবে এবং জনগণের অর্থনৈতিক সংকট সমাধান করবে। বৈদেশিক রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাওয়ায় শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি একটি গুরুতর পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, যখন মানুষ অপরিহার্য পণ্য ছাড়াই কষ্ট পাচ্ছে। এই সংকট সমাধান করা এবং জনগণের বোঝা লাঘব করা অপরিহার্য, উইজ বর্ধন লংকান পত্রিকা ডেইলি মিরর কে বলেন।

দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম সাক্ষাৎকারে, বিক্রমাসিংহে বিবিসিকে বলেছিলেন যে তিনি নিশ্চিত করবেন যে পরিবারগুলি দিনে তিন বেলা খাবার পাবে। বিক্রমাসিংহে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাকসে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলে হয়, তাঁর নিয়োগটি মূলত হতাশার সাথে দেখা হয়েছে, কারণ তাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রাজাপাকসে পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ হিসাবে দেখা হয়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের অধীন নিযুক্ত নতুন সরকারের চার মন্ত্রী শনিবার সকালে শপথ নিয়েছেন। এরা হলেন দীনেশ গুণ বর্ধন জনপ্রশাসন, জি এল পেইরিস পররাষ্ট্র, প্রসন্ন রানাতুঙ্গা নগর উন্নয়ন ও আবাসন ও কাঞ্চনা ইউজেস কারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি।


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন