ইনসাইড থট

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

প্রকাশ: ০৮:০৬ এএম, ১৭ মে, ২০২২


Thumbnail শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

কবি আসাদ মান্নান ‘চাই তাঁর দীর্ঘ আয়ু’ কবিতায় শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মহান পিতার স্বপ্নবুকে/নিরন্তর যিনি আজ এ জাতির মুক্তির দিশারী/ঘূর্ণিঝড়ে হালভাঙা নৌকাখানি শক্ত হাতে বৈঠা ধরে টেনে/অসীম মমতা দিয়ে পৌঁছুচ্ছেন আমাদের স্বপ্নের মঞ্জিলে,…’

কবির মতে, শেখ হাসিনা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের  অনুসারী, তিনি মুক্তির দিশারি, মৃত্যুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছেন নির্ভীকভাবে, আর গভীর মমতা দিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সচেষ্ট। কবির এই কথাগুলো সত্য হতো না, যদি না ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে আসতেন। আসলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এদেশের শাসনকার্যে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় আসীন থেকে মহিমান্বিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহাকালকে স্পর্শ করতে সক্ষম। এর কারণ আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি রবীন্দ্রনাথের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি লিখেছেন ‘আমাদের অধিকাংশেরই সুখদুঃখের পরিধি সীমাবদ্ধ; আমাদের জীবনের তরঙ্গক্ষোভ কয়েকজন আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের মধ্যেই অবসান হয়।...কিন্তু পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক লোকের অভ্যুদয় হয় যাঁহাদের সুখদুঃখ জগতের বৃহৎব্যাপারের সহিত বদ্ধ। রাজ্যের উত্থানপতন, মহাকালের সুদূর কার্যপরম্পরা যে সমুদ্রগর্জনের সহিত উঠিতেছে পড়িতেছে, সেই মহান্ কলসংগীতের সুরে তাঁহাদের ব্যক্তিগত বিরাগ-অনুরাগ বাজিয়া উঠিতে থাকে। তাঁহাদের কাহিনী যখন গীত হইতে থাকে তখন রুদ্রবীণার একটা তারে মূলরাগিণী বাজে এবং বাদকের অবশিষ্ট চার আঙুল পশ্চাতের সরু মোটা সমস্ত তারগুলিতে অবিশ্রাম একটা বিচিত্র গম্ভীর, একটা সুদূরবিস্তৃত ঝংকার জাগ্রত করিয়া রাখে।’

অর্থাৎ শেখ হাসিনার ‘সুখদুঃখ জগতের বৃহৎব্যাপারের সঙ্গে বদ্ধ’। কারণ তিনি বঙ্গবন্ধু-কন্যা। অন্যদিকে বিশ্বকবির ভাবনাসূত্রে বলা যায়, শেখ হাসিনাকে কেবল ব্যক্তিবিশেষ বলে নয়, বরং মহাকালের অঙ্গস্বরূপ দেখতে হলে, দূরে দাঁড়াতে হয়, অতীতের মধ্যে তাঁকে স্থাপন করতে হয়, তিনি যে সুবৃহৎ রাজনৈতিক অঙ্গনে ৪০ বছর প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আছেন সেটা-সুদ্ধ তাঁকে এক করে দেখতে হয়। এদিক থেকে তিনি ‘ইতিহাসস্র্রষ্টা মহান ব্যক্তিত্ব’। খণ্ড ক্ষুদ্র বর্তমান কালে তাঁর কৃতিত্ব মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সঙ্গে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংগ্রামকে একীভূত করে দেখতে হবে।

২.

২০২২ সালের ১৭ মে করোনা-মহামারি পরবর্তী একটি বিশেষ দিন বলে আমাদের কাছে গণ্য হচ্ছে। কারণ অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ হাসিনার ৪১তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি ভারত থেকে ফিরে এসেছিলেন প্রিয় জন্মভূমিতে। বাংলাদেশ তারপর থেকে নতুন করে পথ চলা শুরু করে। তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর এদেশ পুনরায় ‘জয়বাংলা’র বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল। ৪১ বছর পূর্বের সেই দিনটি এখনকার মতো ছিল না। সেদিন ছিল ভারী বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ার এক অপরাহ্ণ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করেছিল। শেখ হাসিনার পদস্পর্শে সেই জল্লাদের দেশ পুনরায় সোনার বাংলা হয়ে ওঠার প্রত্যাশায় মুখরিত হয়েছিল। আজ তার প্রমাণ পাচ্ছি আমরা।

চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলা করে আজ বিশ্বে অভিনন্দিত। সবসময় সংকট মোকাবেলা করা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এজন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অবশ্য ২০২০ সালের ২২ এপ্রিল আমেরিকার জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ফোর্বসে’ প্রকাশিত কানাডিয়ান লেখক অভিভাহ ভিটেনবারগ-কক্স রচিত Ô8 (More) Women Leaders Facing The Coronavirus CrisisÕ শীর্ষক প্রবন্ধে করোনাভাইরাসের মহামারি মোকাবেলায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়। নারী নেতৃত্বাধীন সিঙ্গাপুর, হংকং, জর্জিয়া, নামিবিয়া, নেপাল, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কদের ওপর আলোকপাত করার সময় বলা হয়, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ১৬ কোটি ১০ লাখের মতো মানুষের দেশ বাংলাদেশের মহামারির সংকট মোকাবেলায় দ্রুত সাড়া দিয়েছেন, যাকে প্রশংসনীয় বলেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। কলামে বলা হয়েছে, এদেশের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন সেগুলো এক অর্থে যুক্তরাজ্যও করতে পারেনি। তবে একথা সত্য, বিশ্ব মিডিয়ায় প্রশংসা পাবার জন্য শেখ হাসিনা কাজ করেন না। তাঁর দিনপঞ্জি জুড়ে আছে মানুষের জন্য কাজে ব্যস্ত সময়ের কর্মকাণ্ড। আর তাঁর এই বর্তমান নেতৃত্ব সম্ভব হয়েছে ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে।

তিনি ধনিদের বলেছেন গরিব মানুষের পাশে দাঁড়াতে।আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার পর থেকেই তিনি গরিবের পক্ষে কল্যাণকর রাজনীতি শুরু করেন। এজন্য নিজের দলের নেতাকর্মীদের মানুষের পক্ষে কাজ করার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে কাজ করতেন। তখনকার ভয়াবহ বন্যার সময় তাঁকে সেসময়ের আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একটা চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠিতে মানুষের পাশে থাকার রাজনৈতিক অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে। চিঠিটি নিম্নরূপ

‘‘বন্ধুবরেষু গুণ, আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ‘ত্রাণ বিতরণ করছি’ এ ধরনের কোনো ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে।

ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না। ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্য দানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজরক্ষার তাগিদে, সঙ্গীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য। ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেওয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? এই ক্রেডিট নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দিবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না।

আমি মনে করি, যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত। ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াতে সেটাই গর্ব করার মতো হতো। যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখেছিলেন, সেদিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে। আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন। শুভেচ্ছান্তে, শেখ হাসিনা, ৯. ১০. ৮৮’’

স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ এই ৭ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় শেখ হাসিনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছের মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ ১৭ মে তাঁর দেশে ফেরা ছিল অতি সাধারণ, কারণ সেভাবেই তিনি দেশের জনগণের সামনে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন। সেদিন তিনি এক বৃহৎ শূন্যতার মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এদেশে তাঁর ঘর নেই; ঘরের আপনজনও কেউ নেই। তাই সারা দেশের মানুষ তাঁর আপন হয়ে উঠল। তিনি ফিরে আসার আগে ছয় বছর স্বৈর-শাসকরা বোঝাতে চেয়েছিল তারাই জনগণের মুক্তিদাতা। কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছিল, বিচার দাবি করছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের। সেনা শাসকের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকায় জনগণের শাসনের দাবি নিয়ে রাজনীতির মাঠে রাতদিনের এক অক্লান্ত কর্মী হয়ে উঠেছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি নেতা কিন্তু তারও বেশি তিনি কর্মী। কারণ দলকে ঐক্যবদ্ধ করা, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর শাসনকাল সম্পর্কে অপপ্রচারের সমুচিত জবাব দেওয়া, পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা তাঁর প্রাত্যহিক কর্মে পরিণত হলো। দেশে ফেরার প্রতিক্রিয়ায় আবেগসিক্ত বর্ণনা আছে তাঁর নিজের লেখা গ্রন্থগুলোতে। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, শেখ হাসিনা যখনই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রেখেছিলেন তখনই বুঝে নিয়েছিলেন ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু পথ।’ তাঁর ‘পথে পথে গ্রেনেড ছড়ানো’। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের (১৯৮১ সালের ১৭ মে) আগে ৫ মে বিশ্বখ্যাত নিউজউইক পত্রিকায় বক্স আইটেমে তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, জীবনের ঝুঁকি আছে এটা জেনেও তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ২৪ মার্চের সামরিক শাসন জারির দুইদিন পর স্বাধীনতা দিবসে একমাত্র শেখ হাসিনাই সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমি সামরিক শাসন মানি না, মানবো না। বাংলাদেশে সংসদীয় ধারার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করবোই করবো।’ তাই তো কবি ত্রিদিব দস্তিদার শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ’।

৩.

প্রকৃতপক্ষে ১৭ মে এদেশের ইতিহাসের মাইলফলক। সেদিন থেকেই দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে দ্রুত দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ ছিল। সেদিন থেকেই সেই স্লোগান প্রকম্পিত হয়ে উঠল আকাশে-বাতাসে; রাজপথ জনগণের দখলে চলে গেল। সেনাশাসক জিয়া এতোদিন শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের পূর্বে সেই বছরই শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং জিয়ার অভিসন্ধি ভেস্তে যায়। সেদিনের ঢাকায় লক্ষ মানুষের বাঁধ ভাঙা স্রোত তাঁকে কেন্দ্র করে সমবেত হয়েছিল। তাদের কণ্ঠে ছিল বিচিত্র ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি। শেখ হাসিনার আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম, ‘শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ আরো ছিলÑ শেখ হাসিনা আসছে, জিয়ার গদি কাঁপছে, গদি ধরে দিব টান জিয়া হবে খান খান। আবালবৃদ্ধ জনতা আবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেনÑ মাগো তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব।

সেদিনের প্রত্যয় শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারই বাস্তব করে তুলেছেন। জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের কয়েকজন খুনির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাকি পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে এনে শীঘ্রই ফাঁসি দেয়া হবে বলে আমরা মনে করি। ১৭ মে সম্পর্কে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত সংবাদ ছিল এরকমÑ ‘ঐদিন কালবোশেখির ঝড়ো হাওয়ার বেগ ছিল ৬৫ মাইল। এবং এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে লাখো মানুষ শেখ হাসিনাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় ছিল।’ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমান থেকে নেমেই তিনি দেশের মাটিতে চুমু খান। এ সময় বিপুল জনতার বিচিত্র স্লোগান মুখরিত করে তুলেছিল ঢাকার রাজপথ। যেন সূর্যোদয় হয়েছে, নতুন দিনের পথ চলা শুরু হলো। অশ্রুসজল সেই দিনের কথা আছে নানাজনের স্মৃতিচারণে। ঢাকা শহর তখন মিছিলের নগরী। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে বিকাল ৩.৩০ মিনিটের পর বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি মাটি স্পর্শ করার আগেই হাজার হাজার উৎসাহী জনতা সকল নিয়ন্ত্রণের সীমা, নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে ফেলে। নিরাপত্তা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের তৎপরতায় অবশেষে তিনি নেমে আসেন; হাত নেড়ে জনতাকে শুভেচ্ছা জানান। কিন্তু তাঁর অন্তরে ততক্ষণে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। বিকাল ৪.৩২ মিনিটে শেখ হাসিনা একটি ট্রাকে ওঠেন। এ সময় বজ্র নিনাদে জনতার স্লোগান চলছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক যখন ফুলের মালা পরিয়ে অভিবাদন জানান তখন বাঁধ ভাঙা কান্নার জোয়ার এসে ভাসিয়ে দেয় শেখ হাসিনাকে; কেঁদে ওঠেন তিনি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি কেবল পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেই তুলনীয়।

শেখ হাসিনার ফিরে আসা খুব বেশি প্রয়োজন ছিল দেশ ও জনতার স্বার্থে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি তাঁর প্রত্যাবর্তনের আগে নৈরাজ্যের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছিল মানুষ। পাকিস্তানি শাসক, দালাল-রাজাকার ও আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি দেশের বাধা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং আপামর জনগণের অংশগ্রহণে ৯ মাসের মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার প্রচেষ্টা সফল হতে দেয় নি খুনিরা। ফলে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী সামরিক শাসকদের অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করে। দেশ অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয়। দেশের প্রতিকূল এক সময়ে জননেত্রীকে আমরা রাজনীতির মঞ্চে পেলাম। তিনি দায়িত্ব নিলেন এবং লাখো জনতার সমাবেশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেনÑ ‘আজকের জনসভায় লাখো লাখো চেনামুখ আমি দেখছি। শুধু নেই আমার প্রিয় পিতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাইয়েরা এবং আরো অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোন দিন ফিরে আসবে না, আপা বলে ডাকবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। ...বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’ গত চার দশক ধরে দেশি-বিদেশী চক্রান্ত ও হাজারো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তিনি জনগণের পাশেই আছেন; ভবিষ্যতে থাকবেনও। ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৭ সালের সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল পর্যন্ত একাধিক বার বন্দি অবস্থায় নিঃসঙ্গ মুহূর্ত কাটাতে হয়েছে তাঁকে।

৪.

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশ ও জনগণের কাছে প্রত্যাবর্তনের মতো শেখ হাসিনার দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনও ছিল আমাদের জন্য মঙ্গলকর। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারির পর তাঁর দেশে ফেরার ওপর বিধিনিষেধ জারি করে সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেই চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু ১৬ জুলাই যৌথবাহিনী তাঁকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে ৩৩১ দিন কারাগারে বন্দি করে রাখে। সেসময় গণমানুষ তাঁর অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে। তাঁর সাবজেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উদ্বেগ, গ্রেফতারের সংবাদ শুনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চারজনের মৃত্যুবরণ, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের উৎকণ্ঠা আপামর জনগোষ্ঠীকে স্পর্শ করেছিল। কারণ সে সময় আদালতের চৌকাঠে শেখ হাসিনা ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চেতা; দেশ ও মানুষের জন্য উৎকণ্ঠিত; বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে সত্যকথা উচ্চারণে বড় বেশি সপ্রতিভ। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ধর্ষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে এদেশকে নরকে পরিণত করেছিল। নেত্রীকে গ্রেনেড, বুলেট, বোমায় শেষ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক; এখনো তেমনটাই আছেন। নতুন প্রজন্মকে যথার্থ ইতিহাসের পথ দেখিয়েছেন তিনি নিজের রাজনৈতিক সততার মধ্য দিয়ে।  

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালের ১৬ আগস্ট জননেত্রীর ওপর ঢাকায় গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর তাঁর বাসভবন আক্রান্ত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি- শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে একটি বিরাট মিছিল নগরীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এতে ৪০ জন নিহত হন। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টির ক্যাডাররা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে। ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচনের সময় ধানমন্ডিতে তাঁর ওপর বন্দুকধারীরা রাসেল স্কোয়ারে আক্রমণ চালায়। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর- ট্রেনে ভ্রমণকালে ঈশ্বরদী ও নাটোরে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা জননেত্রীর ওপর গুলিবর্ষণ করেছিল। এভাবেই দেশ-বিদেশে কখনো গোপনে কখনো বা প্রকাশ্যে চলেছে হত্যার ষড়যন্ত্র। ২০০০ সালের ২০ জুলাই পূর্ব নির্ধারিত জনসভাস্থল কোটালিপাড়া থেকে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ৭৬ কেজি বিস্ফোরকের বোমা উদ্ধার করা হয়। ২০০৪ সালের ৫ জুলাই তুরস্কে সফরের সময় জননেত্রীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল ভয়াবহতম দিন। অজস্র গ্রেনেড নিক্ষেপের পরও নেতাকর্মীদের মানবঢালের বেষ্টনীর কারণে প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধু কন্যা। তবে নিহত হন অনেক আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী। এছাড়া অনলাইন, ব্লগ এবং ফেসবুকে জননেত্রীকে কটাক্ষ করে খাটো করার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। হত্যার প্রচেষ্টা ও হুমকির মধ্যেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে শীঘ্রই মহামারি অতিক্রম করে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবেÑ এটা নিশ্চিত। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অশুভ শক্তির মোকাবেলা করতে হবে।

৫.

মূলত ১৯৮১ সানের ১৭ মে’র সেকাল আর ২০২২ সালের একালের মধ্যে অনেক পার্থক্য। কিন্তু সীমাবদ্ধ কালকে অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রেখেছেন সাফল্যের সুদীর্ঘ স্বাক্ষর। তিনি ২০১০ সালে নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০ নারীর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন। এছাড়া ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় সপ্তম স্থানে, ফোর্বসের করা ২০১৬ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ৩৬তম স্থানে ছিলেন। ফোর্বসের তালিকায় ২০১৮ সালে ২৬ এবং ২০১৯ সালে ক্ষমতাধর ১০০ নারীর মধ্যে তিনি ছিলেন ২৯তম। ২০১০ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেই তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা।

একটানা ১৩ বছর ক্ষমতা থাকাকালীন তাঁর আরো অনেক অর্জন রয়েছে। যেমন, ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের জন্য তিনি সাউথ সাউথ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ৭০তম অধিবেশনে পরিবেশবিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ লাভ করেনÑ এই তালিকা আরো দীর্ঘ। তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার লাভ করেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু তৈরিসহ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, নারীর অধিকার, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ধারাবাহিকতা রক্ষায় তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত। আর বাংলাদেশের প্রতীক হিসেবে তিনি জনগণের কাছে আজ নন্দিত। তাঁর প্রত্যাবর্তন আজও শেষ হয়নি। এজন্য ১৭ মে ঐতিহাসিক দিবসে ইয়াফেস ওসমান রচিত ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন : ১৭ মে ১৯৮১’ কবিতাটির একটি অংশ স্মরণ করছি-‘মনে কি পড়ে মনে কি পড়ে/বেদনার তরী বেয়ে একদিন/ছুঁয়ে ছিলে স্বদেশের মাটি।/চারিদিকে নাগিনীর বিষাক্ত নিশ্বাস/পিতার পতাকা হাতে তবু অবিচল,/খরস্রোতা নদী হয়ে অবিরাম বয়ে চলা/মানুষের মুক্তিটা গড়ে দেবে বলে।’


শেখ হাসিনার   স্বদেশ   প্রত্যাবর্তন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ড. ইউনূসের বিবৃতি অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক


Thumbnail ড. ইউনূসের বিবৃতি অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি ড. ইউনূসের পক্ষে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। এতে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কিত আইনের নানা ভুল ব্যাখ্যা এবং অসত্য তথ্য দেয়া হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক কোন বেসরকারি ব্যাংক নয়, এটি একটি statutory public authority বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ/প্রতিষ্ঠান। সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ বলতে সে সকল প্রতিষ্ঠানকে বুঝায়, যে প্রতিষ্ঠান কোন নির্দিষ্ট আইনের দ্বারা সৃষ্ট এবং আইনে উল্লেখিত বিধানাবলীর আলোকে ঐ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত অর্ডিন্যান্স The Grameen Bank Ordinance, 1983( Ordinance NO. X।VI OF 1983 ) এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। আইনটির ধারা ২ তে বলা আছে, আইনটি সেসব গ্রামীণ এলাকায় কার্যকর হবে, যে সকল এলাকা সরকার কর্তৃক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

১৯৮৩ সালের আইনের ধারা ৪(৪) এ বলা আছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাংক কোম্পানিজ আইন অথবা ব্যাঙ্ক কোম্পানিজ সম্পর্কিত অন্য কোন আইনের কোন বিধান গ্রামীণ ব্যাংকে প্রয়োগ করতে পারবে।

এই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী আইনটি একটি বিশেষ আইন। কারণ এই আইনের ধারা ৩ এ এই আইনের প্রাধান্য (overriding clause) রয়েছে। ধারা ৩ এ বলা হয়েছে, অন্যান্য আইনে বিধানাবলী যা-ই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধান কার্যকরী হবে।

৬০ বছরের বেশি বয়সে গ্রামীণ ব্যাংকার দায়িত্বে থাকা প্রসঙ্গে ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক যার ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক এর ঋণগ্রহীতারা। একটি আলাদা আইনের মাধ্যমে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সন্নিবেশ করে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ফলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনও বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিল না।’

ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতারা এর কত ভাগ মালিক, এর সাথে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) পদে নিয়োগ কিংবা ঐ পদের মেয়াদের কোন সম্পর্ক নেই । এমডি পদে নিয়োগ এবং পদের মেয়াদের ক্ষেত্রে একমাত্র আইনের বিধানই প্রযোজ্য হবে। অন্যান্য ব্যাংকের সাথে গ্রামীণ ব্যাংকের যে পার্থককের কথা বলা হচ্ছে, ব্যাংকের  এমডি'র চাকুরীর মেয়াদের সাথে এই পার্থককের কোন সম্পর্ক নেই। বরং সকল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মতো গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটি একটি পূর্ণকালীন চাকুরীর পদ এবং উক্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদটি অন্যান্য সকল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদের মতো মেয়াদ ভিত্তিক ও অপূর্ণকালীন।

ড۔ ইউনূসের পক্ষে বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনও বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিল না।’ এই বক্তব্য অসত্য। কারণ ১৯৮৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংকের অর্ডিন্যান্স এর ধারা ১৪(১) অনুযায়ী এই ব্যাংকের এমডি'র নিয়োগ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমডি পদে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য একটি সিলেকশন কমিটি থাকে এবং সেই বাছাইয়ের ভিত্তিতে ব্যাংকের বোর্ড এমডি নিয়োগ করে।  এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানও নিয়োগ করে সরকার। গ্রামীণ ব্যাংক একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান বলেই আইনে এই নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতেই রাখা হয়েছে।

১৯৮৩ সালের গ্রামীন ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যাংকের এমডি পদটি একটি সার্বক্ষণিক পদ এবং তিনি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ( সিইও)। আইনের ধারা ৯ (২) অনুযায়ী এমডি পদাধিকার বলে ব্যাংকের পরিচালক, তবে এমডি বোর্ডে ভোট প্রদান করতে পারবেন না। আইনের ধারা ১০(২) অনুযায়ী কোন কারণে চেয়ারম্যানের পদ শুন্য হলে সরকার এমডি ছাড়া অন্য যেকোনো পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।

আইনের উল্লিখিত বিধানাবলী পড়লে এটি পরিষ্কার যে, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটি একটি সার্বক্ষণিক চাকুরী। যেকোনো সার্বক্ষণিক পদের একটা মেয়াদ থাকে। ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশে এমডি পদের অবসরের সময়সীমা উল্লেখ না থাকলেও এটি নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। কারণ ১৯৮৩ সালের আইনের ধারা ৪(৪) এ বলা আছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাংক কোম্পানিজ আইন অথবা ব্যাংক কোম্পানিজ সম্পর্কিত অন্য কোন আইনের কোন বিধান গ্রামীণ ব্যাংকে প্রয়োগ করতে পারবে। সরকারের এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা ছাড়াও Interpretation of Statutes এর সাধারণ নীতি অনুযায়ী দেশের অভ্ভন্তরে অন্যান্য ব্যাংকের এমডি পদের মেয়াদের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি'র চাকুরীর মেয়াদ ধরতে হবে। অন্যান্য সকল ব্যাংকে এই মেয়াদ তখন ছিল ৬০ বছর। এছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২(১) তে আইনের যে সংজ্ঞা আছে, তাতে প্রথা বা রীতি-কেও আইন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য ব্যাংকের চাকুরীর বিধান প্রথা হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকের আইন এর ধারা ৮ (২) অনুযায়ী ব্যাংক তার কার্যাবলী পরিচালনার ক্ষেত্রে সবসময়ই জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিবে। এই বিধানের আওতায় ব্যাংকটির প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্তে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রয়োজন।

এছাড়া, The Genera। Clauses Act 1897 এর বিধান অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি এবং নিয়োগকৃত পরিচালকদের নিয়োগ সরকার বাতিল করতে পারে। কারণ Genera। Clauses Act 1897 এ বলা আছে, যে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রদান করতে পারে, সেই একই কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বাতিল করতে পারে।

ড۔ ইউনূসের বিবৃতিতে পদ্মা সেতু নিয়ে তার পক্ষ থেকে কোন ধরণের প্রভাব বিস্তার করা হয়নি মর্মে যে দাবী করা হয়, এই বিষয়ে ড۔ ইউনূসের কাছে বাংলাদেশের জনগনের প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্মের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কেন খরচ করেছিলেন ? যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম তিনি কেন নিয়োগ করেছেন - এটি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ জানে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পদ্মাসেতু: আমার মা’র আবেগ, অদম্য বাঙ্গালী জাতি ও কিছু কথা

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ৩০ Jun, ২০২২


Thumbnail পদ্মাসেতু: আমার মা’র আবেগ, অদম্য বাঙ্গালী জাতি ও কিছু কথা

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরদিন সকালে আমার আশি উর্ধো বয়সী মা’র ফোন পেলাম। সালাম বিনিময়ের পর  মা বললেন, ‘বাবা, পদ্মাসেতু দেখতে যামু’। আমি বললাম, ‘এখনতো ভীড়, কয়েকদিন পর যাই, মা’। উত্তরে মা বললেন, ‘কাইল-পরশু চলো পদ্মাসেতু দেখতে যাই। গাড়ী দিয়া পদ্মা পার হইয়া বাপের বাড়ি যামু, তোমার দাদা বাড়ি যামু’। 

আমার মা আবেগ তাড়িত হয়ে স্মৃতিপট থেকে তুলে এনে জানালেন, মা’র বিয়ের পর প্রথম যখন আমার বাবার সাথে ঢাকা আসেন তখন আমি তার কোলে, ১০ মাসের শিশু  আমার বড় ভাই আবুল হোসেন ৪ বছর বয়সে ডায়ারিয়া হয়ে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাই তড়িঘড়ি করে আমাকে নিয়ে ঢাকা আসা।

আমার নানা বাড়ি পদ্মা নদীর পাড়ে অবস্থিত মাদবরের চর ইউনিয়নে (শিবচর, মাদারীপুর)। খরস্রোতা পদ্মানদীর ভাঙ্গনে তিনবার বিলীন হয়েছে আমার নানা বাড়ী। 

মাদবরের চর থেকে  খুব সকালে লঞ্চে উঠলে, চাঁদপুর হয়ে ঘুরে, রাত ১০ টায় ঢাকার ঠিকানায় পৌঁছা যেত। আমার নানা মা-কে লঞ্চে তুলে দিয়ে যতক্ষণ লঞ্চ দেখা যায়, ততক্ষণ নদীর পাড়ে লঞ্চঘাটে বসে থাকতেন। একবার নানা আমার মা‘কে বলেছিলেন, ‘এমন দিন আইবো, বিয়ানে (সকালে) ঢাহা যাইয়া, কাম শেষ কইরা বেইল ডোবার আগেই ফিররা আইতে পারবা’। মা বললেন, ‘হেইদিন আইসা পরছে। আমারে পদ্মা সেতু দেখতে নিয়া চলো’। 

এই কথোপকথনে উল্লেখযোগ্য ছিল মায়ের মন ভরা ‘আবেগ’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ কামনা করে তিনি বললেন, ‘হাসিনা দেশটারে কত উন্নত করছে। আমার বিয়ার পর শ্বশুর বাড়ি (মোড়লকান্দি, কুতুবপুর ইউনিয়ন, শিবচর) যাওয়ার সময় খালপাড়ের চিকন রাস্তা দিয়া পালকিআলারা ঠিকমত হাটতে পারে নাই। লিটন চৌধুরী ঐ খালপাড়ের রাস্তা পাকা কইরা দিছে। খালের উপর ব্রীজ কইরা দিছে। অহন আমি  খালপাড় দিয়া  গাড়ী নিয়া যাইতে পারি। শেখ হাসিনারে আল্লাহ বাঁচাইয়া রাখুক, সুস্থ রাখুক, দোয়া করি’। 

সম্পূর্ন অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট গতিবিধি সম্পন্ন নদী পদ্মা। যার ‘একুল ভাঙ্গে অকুল গড়ে’ এমনি একটি নদীকে নিয়ন্ত্রন করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৫ জুন ২০২২ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রস্থ কারিগরি বিবেচনায় বিশ্বের এক নববিস্ময় ‘পদ্মাসেতু’ উদ্ধোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথিবীর দ্বিতীয়তম খরস্রোতা এই নদীর উপর সেতু নির্মাণে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ অনুভব করেছেন কি দুরূহ কাজ তাঁরা সম্পন্ন করেছেন। 

এই সেতু নির্মাণ কার্যক্রমের শুরুতেই বাঁধা আসে। এই পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন করতে চেয়েছিল। সম্পূর্ন কাল্পনিক কিছু দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালো। এ ঘটনার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ।  কিন্তু দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন সাহসী নেতৃত্ব থাকলে সবই সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মাথা নোয়াবার মানুষ নন। মুহূর্তেই  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে’। তখন সমালোচকরা বলছেন, ‘এটা দুঃসাহস’। মুক্তিযোদ্ধার সময়ও স্বাধীনতা বিরোধীরা বলেছেন, পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে নিরস্ত্র বাঙালি কিভাবে যুদ্ধ করবে? ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘...বাঙ্গালীরে দাবিয়ে রাখতে পারবা না‘। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেদের নিয়ে গঠিত অনিয়মিত মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানের একটি নিয়মিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে মহান স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। আন্তর্জাতিক অনেক পরাশক্তির সমন্বয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সকল ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে বাংলাদেশ নামক ভুখন্ডের জন্ম হয়েছে। ‘বাঙ্গালী‘ জাতি হিসাবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাঙ্গালী জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। 

তেমনিভাবে সকল বাঁধা পেরিয়ে শুরু হয় পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ। নির্মাণ সামগ্রী নদীতীরে জমা করা হয়। খরস্রোতা পদ্মার ভাঙ্গনে মালামাল  নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভেঙ্গে পরেননি শেখ হাসিনা। দ্বিগুন উদ্যম নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসিকতার জন্যই বাঙ্গালী জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক পদ্মাসেতু আজ বাস্তবতা। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন ঠেকাতে দেশি-বিদেশি যে সকল সংস্থা ও ব্যক্তি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, তারা পরবর্তীতে মাথা নত করে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজ্স্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। আজ পদ্মাসেতু উদ্ধোধনের পর মাথা নত করেছে সকল ষড়যন্ত্রকারীরা, তারা অভিনন্দনও জানিয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানও মাথা নত করে অভিনন্দন জানিয়েছে।

কর্নফুলী নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গ দিয়ে গাড়ি চলাচল করবে, বাংলাদেশের মানুষ কল্পনাও করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ তাও বাস্তবতা।

বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২৫৯৪ মার্কিন ডলার যা প্রতিবেশী দেশসমূহের তুলনায় অনেক এগিয়ে। আমাদের গড় আয়ু ৬০ থেকে ৭৩ বছর বয়সে উন্নিত হয়েছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এমন সময় ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতি এমন চরম খারাপ পর্যায়ে ছিল যে, লোডশেডিং লেগেই থাকত। সামাজিক অনুষ্ঠান, শপিংমলে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বের কল্যাণে দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত একমাত্র দেশ, বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কিছু দুর্গম পার্বত্য এলাকা বাদে এরই মধ্যে দেশের ৯৯.৮৫% এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ রপ্তানী করার সক্ষমতা অর্জন করবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এমনিভাবে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জন করবে।

মাথা নোয়াবে না বাঙ্গালী, মাথা নোয়াবে না বাংলাদেশ।

পদ্মাসেতু  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা


Thumbnail ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা

আমদের দেশে এখন গ্রীষ্মকাল, প্রচন্ড গরম, তার সাথে মাঝে মাঝে বর্ষাকালের বৃষ্টি যার ফলে কিছু জেলার বাসিন্দারা বিধ্বংসী বন্যা পরিস্থিতিতে দারুন অসুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন! সমস্ত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং বাধা সত্ত্বেও, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দময় মুহূর্ত অনেক আশা এবং অনুপ্রেরণা দিচ্ছে, ঠিক তখন কোভিডের কারণে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে হাতে গুনা অল্প কিছু লোক সংক্রামিত হওয়া এবং কোনো মৃত্যু না দেখে, ভাবতে শুরু করেছিলাম যে হয়ত আমরা কোভিড-১৯, মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দারুন ভোগান্তির পর কোভিডকে আমাদের পিছনে ফেলে আসতে পেরেছি। আর বার বার কোভিডের "নতুন তরঙ্গের" কারনে কোভিড সংক্রামিত মানুষের এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কথা সম্ভবত কেউ আর শুনতে চায়নি। কি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হল সাম্প্রতিক বাংলাদেশের তথ্য ইঙ্গিত করছে ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট, BA.4 এবং BA.5-এর সাবলাইনেজ, সংক্রমণ বিশ্বজুড়ে অন্যান্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও একটি নতুন তরঙ্গ শুরু করেছে।

আজকাল এখন আর কোভিডের তথ্য সংবাদপত্র বা টেলিভিশন সংবাদের বড় শিরোনাম নয়, মহামারীটি আর সংবাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছে না যেভাবে কিছুদিন আগেও তা করেছিল, তবুও আমরা কোভিড নিয়ে কোথায় আছি এবং আমাদের কী করা দরকার তা নিয়ে জরুরিভাবে আলোচনা আর মূল্যবান সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয় বরং নতুন তরঙ্গের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের জাতীয় কৌশল কী হওয়া উচিত সবাই বসে তা নিয়ে আলোচনা করা আর জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আজ ২৮শে জুন সরকার ২০৮৭ জনের সংক্রামিত হওয়ার এবং ৩ জনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। তাই বলে আতঙ্কে, আমাদের তাড়াতাড়ি এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সুসংবাদ, ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলি খুব একটা গুরুতর নয়, তবে সমস্যা হল ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলির লোকেদের পুনরায় সংক্রামিত করার সক্ষমতা রয়েছে, এমনকি যারা পূর্বে ওমিক্রনের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, বা যারা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছেন বা যারা বুস্টার ডোজও পেয়েছেন তারাও সংক্রামিত হতে পারেন। ফাইজার ভ্যাকসিনের পর পর তিনটি ডোজ পাওয়ার পরেও আমি খুবই হালকা দুই দিনের লক্ষণগুলি সহ ওমিক্রনে সংক্রামিত হয়েছি এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে "হার্ড ইমিউনিটি" (যেখানে পর্যাপ্ত লোকদের টিকা দেওয়া হয়েছে বা যারা ইতিমধ্যে সংক্রামিত হয়েছে সেখানে আরও সঞ্চালন বন্ধ করা জন্য প্রাকৃতিক অনাক্রম্যতা) পৌঁছানো সম্ভবত অসম্ভব। সাংহাই এবং বেইজিং শহরে চীনা কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত লকডাউনের পরেও ওমিক্রনের বিস্তার বন্ধ করতে সেখানে অসুবিধার কথা আমাদের ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য বিবেচনা করতে হবে।

যদিও ইদানিং বাংলাদেশে কোভিড রোগের দ্রুত সঞ্চালন উদ্বেগের কারন হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হল কোভিডের মুখোমুখি এবং যুদ্ধ জয়ে আজ আমাদের কাছে মোতায়েন করার জন্য প্রচুর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং সরঞ্জাম রয়েছে। এছাড়াও, গবেষণা বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে ওমিক্রন প্রকৃতপক্ষে হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে ডেল্টার চেয়ে হালকা। বেশিরভাগ মানুষের জন্য, কোভিড-১৯ মৌসুমী ফ্লু থেকে, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলিতে, কম প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ডেল্টার তুলনায় ওমিক্রনের তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে, কারণ সফল টিকা দেওয়ার পরে বেশিরভাগ মানুষ উচ্চ মাত্রার অনাক্রম্যতা অর্জন করেছে। তবে, বিপুল সংখ্যক লোক সংক্রামিত হওয়ার কারণে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ পরিণতি হওয়ার পরিনিতি, সফল আর সময় মত এর পরিচালনা, চিকিত্সা যত্নের প্রাপ্যতা এবং বিশাল ব্যয় সম্পর্কে আমাদের এখনি নজর দেওয়া দরকার।

অবশ্যই, এই রোগের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘকালের নেতিবাচক স্বাস্থ্যের ফলাফলের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের সকলের এবং সরকারের উচিত হবে বারবার কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। বড় চ্যালেঞ্জ হল জীবন ও জীবিকার মধ্যে আমরা কতটা বা কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি এবং কি ভাবে কোভিডকে সম্পূর্ণরূপে এড়াতে পারি? মজার বিষয় হল, এই রোগের বাহক আর সংক্রমণের কারন হল আমাদের চেনা জানা অন্যান্য লক্ষণহীন সংক্রামক মানুষ, যাদেরকে আমরা দেখতে, যাদের কাছাকাছি থাকতে, কোলাকুলি করতে, সমাজিকতা বজায় রাখতে বা কাজের কারণে তাদের সম্পর্কে আসাটা আমরা উপভোগ করি। মানুষ হল সামাজিক প্রাণী, এবং তাই অনেক লোকের জন্য আমাদের জীবনের মানের একটি বড় অংশ হল অন্যদের সাথে স্বাধীন ভাবে মেশা - যেমনটি উত্সব, উদযাপন এবং সামাজিক ইভেন্টগুলিতে দ্রুত ফিরে আসা এবং সেই সময় গুলো উপভোগ করা। আর এই কারণেই ভাইরাসটি শীঘ্রই আমাদের ছেড়ে চলে যাবে না, অদূর ভবিষ্যতেও নয়। আমরা ভাইরাসটির সাথে কীভাবে ভালো ভাবে বাঁচতে পারি তা আমাদের শিখতে হবে। কারন একই সাথে আমরা বেঁচে থাকতে এবং আমাদের জীবিকা বজায় রাখতে চাই।

মুখোশ এবং বায়ুচলাচল এখনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যা আমরা মেনে চলতে পারি। একটি মেডিকেল-গ্রেড মাস্ক পরা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়, বিশেষ করে জনাকীর্ণ সমাবেশ গুলোয়। আপনি যদি এমন একটি জায়গায় যান, বা চলাচল করেন বা যাএি হন যেখানে অনেক লোক একসাথে আপনার সাথে থাকবে, যা আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপুর্ন সেখানে যাবার আগে হয় আপনার পকেটে বা হ্যান্ডব্যাগে বা ব্রিফকেসে মাস্ক রাখবেন এবং সেখানে থাকাকালিন মুখোশ পরে থাকবেন। এখন থেকে আমরা ভবিষ্যতের বাঙ্গালী সামাজিক আদর্শ হিসাবে এটি গ্রহণ করা শিখতে পারি। আর আমাদের সঠিক এবং পর্যাপ্ত ইনডোর বায়ুচলাচল নিশ্চিত করতে হবে। যাদিও, একমাএ উপযুক্ত বায়ুচলাচল ব্যাবস্থা দ্বারা সংক্রমণের একটি তরঙ্গ বন্ধ করার সম্ভাবনা কম, তবুও আমাদের ইনডোর এবং বদ্ধ পরিবেশে উপযুক্ত পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল নিশ্চিত করা দরকার।

বাংলাদেশের চমৎকার প্রচেষ্টা এবং বিপুল ব্যয়ের জন্য ধন্যবাদ, দেশটি তার বেশিরভাগ জনসংখ্যাকে কার্যকর কোভিড ভ্যাকসিনের দুই ডোজ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ সমান সংখ্যক লোককে বুস্টার ডোজ প্রদানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে ভাল করছে। ভবিষ্যতে বিশেষ করে শুধু মাএ জনসংখ্যার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানুষকে আবারও বুস্টার ডোজ (বার্ষিক হতে পারে) প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সব রকম পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি থাকতে হবে।

কোভিড টিকা দেওয়ার প্রাথমিক অসাধারণ সাফল্য পর, ভবিষ্যতে আবারও কোভিড ভ্যাকসিনের গণ টিকা প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি আরও আলোচনার এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ করব। ধনী দেশ এবং কোম্পানিগুলোর মেধা সম্পত্তি অধিকার (intellectual Property Right) মওকুফ করতে সম্মত হওয়ার অপেক্ষায় থাকাকালীন পুনরায় এই জাতীয় সমস্ত জাতি প্রশস্ত টিকা প্রদানের বহুল ব্যয়ের কৌশলের কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে। অন্যান্য অবকাঠামোগত বিকাশ অবশ্যই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হতে হবে। আমি পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি আমঅবকাঠামোগত বিকাশে বিনিয়োগ আমাদের জীবিকা নির্বাহ এবং শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে সহায়তা করবে। আজ সমৃদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলো ধার নিতে এবং প্রচুর পরিমাণে অর্থ কোভিড প্রোগ্রামে ব্যয় করতে পারে কারণ তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমঅবকাঠামো শক্ত ভাবে তৈরি করেছে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশের সেই ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা আছে এবং তারা সল্প ব্যায়ে তা উৎপাদন করতে পারে, এবং তার ফলে টিকা প্রদানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। আসুন সেই ধনী দেশগুলি এবং সংস্থাগুলিকে দরিদ্র দেশ এবং তাদের নাগরিকদের জীবন আর জীবিকার ব্যয়ে প্রচুর মুনাফা করার বিরুদ্ধে সজাগ হই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গাভিকে অবশ্যই মেধা সম্পত্তির অধিকার মওকুফ করা নিশ্চিত করতে কঠোর হতে হবে এবং একসাথে কাজ করতে হবে এবং অপ্রাকৃত মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে তাদের আওয়াজ তুলতে হবে।

যখন আমরা আমাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি সে সময়ে আমাদের কৌশল কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমি আমার পূর্ববর্তী নিবন্ধে "পরীক্ষা এবং চিকিত্সা" কৌশল গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সমস্ত ফার্মেসি, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার জায়গা গুলোতে ফাইজার এবং মার্কের অ্যান্টিভাইরাল সরবরাহ করা উচিত, যাতে একটি "চিকিৎসা করার জন্য পরীক্ষা" স্কিম চালু করা যায়, যেখানে কোভিড পজিটিভ পরীক্ষার পরেই, সবাই বিশেষ করে যারা দুর্বল এবং বয়স্ক গোষ্ঠী, যাদের ভ্যাকসিনগুলি কম কার্যকর হতে পারে, তারা কার্যকর চিকিত্সার সেই ওষুধগুলি আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া পান। এটি কেবল হাসপাতালে ভর্তি হ্রাস করবে না তবে জীবন বাঁচাবে এবং জীবিকা নির্বাহ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখবে।

জনস্বাস্থ্য হল এমন সমস্ত বিষয় যা জনগনকে সুস্থ ও সুখী জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। জীবন এবং জীবিকার সুষম কৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেয়। যখন আমাদের "কোভিডের সাথে বাঁচতে পারি" বা “ বাঁচতে পারবো কিনা” সে বিষয়ে জোরালো মতামত প্রকাশ করা অব্যাহত রয়েছে, বাস্তবতা হল এই গ্রহের প্রায় প্রতিটি দেশই, ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এই মহামারী দ্বারা সমানভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মানুষ বা দেশ হিসাবে আমরা প্রতিদিন যে সমস্ত সমস্যাগুলির মুখোমুখি হই, অন্যান্য সমস্ত সমস্যাগুলির মধ্যেও এই ভাইরাস বিষয়ে আমরা প্রতিদিন আরও শিখছি এবং এই সংক্রমণ দ্বারা আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বিশাল সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আমাদের একমত হতে হবে, কোভিড পরিস্থিতি জটিল, এর কোনও দ্রুত এবং সহজ প্রতিকার নেই। না, আমরা এখনও কোভিড-১৯ সমাধান করি নি, তবে আমরা এই রোগটি পরিচালনা করতে আরও চৌকস এবং আরও ভাল হয়ে উঠছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষ দূত ডাঃ ডেভিড নাভারো কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে বলেছেন: “এখন আমাদের অনেকের জন্য, কোভিড-১৯ এর অসুস্থতা জীবন হুমকির পরিবর্তে একটি সাধারন অসুবিধার কারণ হবে, তবে মনে রাখবেন, কিছু লোক বিশেষত দুর্বল, যারা অন্যান্য সহ-অসুস্থতার সাথে বসবাস করছেন এবং এখনও টিকা নিতে অস্বীকার করছেন বা কোন কোভিড ভ্যাকসিন পাননি, কোভিড এখনও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।”

আসুন কোভিড নিয়ে বাঁচতে শিখি, মাস্ক ব্যবহার করি, যত সম্ভব ভিড়ের পরিবেশ এড়িয়ে চলি, যখন আমাদের কোভিডের লক্ষণ থাকে, অবিলম্বে পরীক্ষা করি এবং যদি আমাদের ইতিবাচক পরীক্ষা করা হয় তবে নিজেকে আলাদা করি, মানুষকে আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করি। আসুন জাতীর আর আমাদের প্রজন্মের উন্নত ভবিষ্যৎ আর জীবন আর জীবিকার উন্নতির জন্য এক সাথে কাজ করি। আমরা একটি গর্বিত জাতি এবং আমরা বারবার প্রমাণ করেছি যে আমরা এটি করতে পারি।

(এই নিবন্ধটি অন্যান্য প্রকাশনাগুলির সহায়তায় প্রস্তুত করা)


ওমিক্রন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

রাজনীতি হোক গণমুখী, সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্যপূর্ণ


Thumbnail

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির পরদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। '২৫ জুন পর্যন্ত হরতাল বা নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!' দেশের সমসাময়িক রাজনীতির ধারা হিসাব করলে এমন সম্ভাবনা আসলেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারপর কি হলো? ৫ জুন পাবনার বেড়ার কিউলিন ইন্ডাস্ট্রি। ৬ জুন রাজধানীর বছিলার জুতার কারখানা। ১০ জুন রাজধানীর নর্দ্দা এলাকায় তুরাগ পরিবহন। ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের ফেরি। একই দিনে মৌলভীবাজারে পারাবত এক্সপ্রেসের তিনটি বগি। ১২ জুন রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তঃনগর ট্রেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের রুম। ২০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক। সবখানেই আগুন। সব কি দুর্ঘটনাবশত লেগে যাওয়া আগুন? কই! স্বাভাবিক সময়ে তো এত আগুন লাগে না! নাকি এটি প্রতিহিংসার আগুন! ব্যর্থতার আগুন! বুকে জ্বলা আগুন! হিসাবের আগুন! খোদ সরকারপ্রধান এসব আগুনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য আছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী তারা এমন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাবে যাতে আমরা ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে না পারি'।

আগুনের পাশাপাশি গতানুগতিক বচন অব্যাহত রয়েছে। এসব ফালতু বচন আগেও ছিল। "পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।" এসব বচন নিয়ে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল সে সময়। তখনো দৃশ্যপটে এসেছিলেন মির্জা ফখরুল সাহেব। সাফাই গাইলেন দেশনেত্রীর পক্ষে। তিনি বললেন, দেশনেত্রী ঠিক বলেছেন। তিনি ভুল বলেননি। দেশপ্রেমিকের মত কথা বলেছেন। ‘একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের ওপরে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেটা টিকবে না। তোমরা এখনো এলার্ট হও, চেঞ্জ দ্য ডিজাইন'। এসব পুরনো বচন। গতানুগতিক ধারায় আরো অনেক বচন যুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। বিএনপি'র মির্জা সাহেব বললেন, "পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাও একদিকে না, দুইদিকে।" অথচ বাস্তবতা হলো ২০০১ সালের ৪ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। মির্জা সাহেবের কি দরকার ছিল এমন একটি ভুল তথ্য দেওয়ার। অজ্ঞতাবশত যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে পারতেন। আর যদি সজ্ঞানেই বলে থাকেন, তাহলে উনার উচিত ছিল সরকারি নেতাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তথ্য প্রমাণাদিসহ জাতিকে জানানো। তিনি কোনটাই না করে নিজের দেয়া বচনকে 'ফালতু' প্রমাণ করলেন। জনগণকে ধোঁকা দিলেন, বোকা বানালেন।

সম্প্রতি মির্জা সাহেব বলেছেন, "পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু নেই। পদ্মা সেতুর প্রথম ফিজিবিলিটি রিপোর্ট করে বিএনপি ১৯৯৪/১৯৯৫  সালে। সেই সময় ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর এখন সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার হিসাব চাই।" তিনি নিশ্চয়ই জানেন, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পরে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদী পানি নিঃসরণ করে সাড়ে ৭ লাখ কিউমেক। যখন নদীতে প্রবাহিত পানি প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটারে পরিমাপ করা হয় তখন তাকে 'কিউমেক' বলে। ঘনফুটে পরিমাপ করা হলে তাকে 'কিউসেক' বলে। আটলান্টিকের প্রবেশদ্বারে আমাজনের সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কিউমেক। তার মানে আমাজনের দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ পানি পদ্মা নদী নিঃসরণ করে বর্ষা মৌসুমে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পদ্মার চেয়ে আমাজন কেন বেশি খরস্রোতা। আমাজন নদী সারা বছর প্রায় একই গতিতে পানি নিঃসরণ করে। গড় ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিউমেক। পক্ষান্তরে বর্ষার পদ্মা নদী বিশ্বের সর্বাধিক  খরস্রোতা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কিউমেক। তাতে পদ্মা নদীতে পানি নিঃসরণের গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কিউমেক। পদ্মা সেতুর স্থলে গত একশ বছরের গড় সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার কিউমেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা বা অতিবন্যার সময় সেতু অঞ্চলে পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কিউমেক পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে চিন্তা মাথায় রেখেই সেতু প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাজন বয়ে গেছে ব্রাজিল, পেরু আর কলম্বিয়ার উপর দিয়ে। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে কোন সেতু নেই। দেড় লক্ষাধিক কিউমেক পানি নিঃসরণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বে দ্বিতীয় কোন সেতু এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তাই পৃথিবীর আর কোন দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু আর কোথায় পাবেন? এত খরস্রোতা নদীতে আর তো কোন সেতু নেই। তাইতো  নদী শাসনে চলে গেছে খরচের তিন ভাগের এক ভাগ।

মির্জা সাহেব বলেছেন, ৯৪/৯৫ সালে সেতু নির্মাণে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। খুব ভালো কথা। ২৭ বছর আগের কথা। পয়লা জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৪১ দশমিক ৭৯ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণ কালে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা। এবার আসুন মুদ্রাস্ফীতি। ওয়ার্ল্ড ডাটা ডট ইনফো এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোক্তা মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার গত ৩৪ বছরে (১৯৮৭-২০২১) শতকরা ২ ভাগ থেকে সাড়ে এগারো  ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রতি বছর শতকরা ৬ দশমিক ৪। সামগ্রিকভাবে, মূল্য বৃদ্ধি ছিল শতকরা ৭২৫ ভাগ। ১৯৮৭ সালে যে পণ্যের দাম ছিল এক শ টাকা, তা চলতি বছরের শুরুতে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ টাকা। ৮৭ থেকে ৯৪ মাত্র ৭ বছরের ব্যবধান। ডলারের মূল্যমান ও মুদ্রাস্ফীতির হার অনুধাবন করতে পারলে ২৭ বছর আগের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা কেমনে ৩২ হাজার কোটি টাকা হলো সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য গড়পড়তা কথা না বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিন। কোথায় কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলুন। তাতে আমাদের মত আম জনতার বুঝতে সুবিধে হয়।

বিএনপি'র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তো সংসদে ঐকিক নিয়ম শেখালেন। কিলোমিটার প্রতি সেতুর খরচ দেখালেন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে খরচ কেন বেশি? সব কি আর ঐকিক নিয়মে চলে? সেতুর ডিজাইন দেখুন। প্রস্থ দেখুন। নদীর গতি-প্রকৃতি দেখুন। পাইলিং, পিলার, স্প্যান দেখুন। ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা সেতু। পদ্মা সেতু একটি দ্বিতল সেতু। ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে নদী শাসন করতে হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধুমাত্র নদী শাসনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুতে বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম পাইল। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর। যে হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে সেটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। হ্যামারের জন্য নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন। আর পদ্মার? ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা থেকে ১৩৬ গুণ বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মার  ৫০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতু থেকে পদ্মা সেতুর খরচ কেন বেশি - এটা বোঝার জন্য কি আর প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির সময় চট্টগ্রামবাসী সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে। আপামর জনসাধারণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মন্ত্রীরা গেলেন ঘটনাস্থলে, হাসপাতালে। অথচ ক্ষমতার বাইরের বড় বড় রাজনীতিবিদরা গেলেন না সেসব জায়গায়। তাঁরা অফিসে বসে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখিয়ে গেলেন। বড় বড় কথা বলে গেলেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর হলেন। চট্টগ্রাম না হোক, ঢাকার বার্ন ইউনিট এ যেয়ে কজন রোগী দেখে, তাঁদের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখতে পারতেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো এমন ছিল না। দুদশক আগেও তো সব রাজনৈতিক দল এমন দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। প্রতিযোগিতা হত সহযোগিতার। দুদশক আগের সেই সহমর্মিতার রাজনীতিতে যেন পচন ধরেছে। বিরোধী রাজনীতি যেন দলীয় কার্যালয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনমুখীতা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার বন্যার কথাই ধরুন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন। মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনগুলো রয়েছে মাঠে, পানিতে, ত্রাণ তৎপরতায়। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোথায়? আবারো সেই অফিসে। টিভি ক্যামেরার সামনে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। মাঠে থেকে করুন। বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে করুন। জনগণের পাশে থেকে করুন। ত্রাণ দিন, আর সমালোচনা করুন। সে সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্য সহকারে। দেশবাসী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পচন আর দেখতে চায় না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

একটুখানি ইতিহাস

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail একটুখানি ইতিহাস

আজ সূর্যোদয়ের অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠি। কর্মহীন থাকার কারনে আমি এখন কোনো রুটিনের মধ্যে বাঁধা নেই। মনেই পড়ছে না, শেষ কবে এত ভোরে উঠে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। ড্রেস আপ সেরে তাড়াতাড়ি নিচে নামি। আমার প্রিয় ও অনুজ সহকর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরী আমার জন্য একটি গাড়ি পাঠান। গাড়িতে পা রাখতেই দেখি, আমার অসুস্থ চালক এসে হাজির। তাৎক্ষণিক মত পাল্টিয়ে নিজের গাড়ি এবং ড্রাইভারকেই নিই। শর্দি জ্বরে সে তিনদিন অনুপস্থিত ছিলেন। বসেই বললাম, চল মাওয়া ঘাটে যাব। হানিফ উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ট্রাফিকহীন ও টোলমুক্ত রাস্তা পেয়ে অসংখ্য সরকারি গাড়িকে অনুসরণ করে চলেছি। আষাঢ় মাস। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের বিচ্ছিন্ন আনাগোনা। গত ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে সিক্তস্নাত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। সকালের রৌদ্রময় উজ্জ্বল আভায় রাস্তার দু'পাশের গাছপালা ঝলমল করছে। আহা! কী নয়নাভিরাম ও নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতন। আমি কী সড়ক পথে জেনেভা থেকে জুরিখে যাচ্ছি? অন্য কোনো সহযাত্রী না থাকায় চালককেই বললাম, দ্যাখো তো খোরশেদ, এটা কী আমাদের চিরকালের চিরচেনা বাংলাদেশ? নাকি ঢাকার অদূরে নতুন কোনো শহর হয়েছে? বিস্ময়কর হলেও সত্য, আজ পুরো পথটাই পদ্মা সেতু হয়ে অপরূপভাবে সেজে আছে। আসলেই ইউরোপ, আমেরিকার সুদীর্ঘ হাইওয়ের মতন এক মসৃণ সিল্কি পথ পাড়ি দিচ্ছি। আমরা পোস্তগোলা ব্রীজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, আবদুল্লাহপুর, হাসাড়া, শ্রীনগর হয়ে পদ্মাব্রীজ টোলপ্লাজা অবধি মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যাই। 

* মঞ্চের গায়ে খচিত শ্লোগানটা আমার নজর কাড়ে। 'আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু'। এ উদ্বোধনীকে কেবল একটি জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। আজ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও একটি দেশের সক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ এবং সামর্থ্যের ইতিবাচক মেসেজ। বলা যাবে না, মহা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, তবে সুন্দর গোছানো ও বাহুল্য বর্জিত অনুষ্ঠান ছিল। জানা যায়, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ৩৫০০ জন। অনুষ্ঠানে গিয়ে মনে হয়েছে, সেতুটি আজ কোনো বক্তৃতার বিষয় হয়ে উঠেনি বরং গভীর আগ্রহ ভরে অপেক্ষমান মানুষের দেখার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কথা বলেছেন মাত্র তিনজন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেতু মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আজ বাঙালিরা নিজের মাতৃভূমিতে বসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মার ওপর নির্মিত অভূতপূর্ব এক স্থাপনাকে অবলোকন করছে। এ উৎসব মুখরিত পরিবেশকে অনেকে দ্বিতীয় বিজয় দিবস বলে আখ্যায়িত করেছেন।  

* দেশে সিলেট অঞ্চলে বন্যা আছে। মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও পুনঃবৃদ্ধি পাচ্ছে। টেস্ট করালেই পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। শনাক্তের হার ১৪.১৮ হয়েছে। যা মধ্যে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। জানা যায়, গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬৮৫ জন। কাজেই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী স্থলে যাওয়ার জন্য করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। সিভিল সার্ভিসের সদ্য সাবেক এবং বর্তমান সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সংক্রমণের কারনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবও যোগদান করতে পারেননি। তবে অনুষ্ঠানটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপন করা হয়েছে। সেতু বিভাগ কর্তৃক মাস্ক, স্যানিটাইজার, লোগো সম্বলিত কোটপিন এবং স্যুভেনির ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক,শিক্ষাবিদ, আমলা, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংস্কৃতি কর্মী, অভিনেতা প্রায় সকলই আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর অংশ নেয়া চোখে পড়ার মতো ছিল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও অনেকটা ঘুরে তাঁর পাশে আসন পান। করোনা পরবর্তী বিরতিতে অনেক প্রবীন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হওয়া ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। গাড়ি পার্কিং দূরে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বৃক্ষহীন, ছায়াহীন স্থানে দাঁড়িয়ে মধ্যাহ্ন রোদের প্রখরতায় দাহ হয়েছেন অনেক অশীতিপর অতিথি। 

* তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিগত ২০০১ সালের ৪ জুলাই এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে সেতুর কাজ শুরু হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দুই স্তর বিশিষ্ট। উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ ও নিচের স্তরে রয়েছে একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিমি, পিলার নদীতে ৪০টি, উচ্চতা ১৩.৬ মিটার, প্রস্থ ২১.৬৫ মিটার, এ্যাপ্রোচ রোড মাওয়া-জাজিরা, নদী শাসন দু'পাড়ে ১৪ কিমি, পানির স্তর থেকে উচ্চতা ৬০ ফুট, জনবল ৪ হাজার। পৃথিবীতে দক্ষিণ আমেরিকার  আমাজনের পরে সবচেয়ে খরস্রোতা নদী নাকি পদ্মা। এ সেতুর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগের আওতায় এসেছে। সরাসরি উপকৃত হবে ৩ কোটি মানুষ। দুই তীরে গড়ে উঠবে আধুনিক শহর। সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে। টোল আদায় হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এ সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়েছে সাড়ে সাত বছরে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে রেল যোগাযোগও চালু হবে। এ সেতু নির্মানে ৪টি নতুন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সারা বিশ্বে প্রথমবারের মতন সম্পাদন করা হয়েছে এমন ৩টি বিষয় এবং বাংলাদেশে ৭টি নতুন বিষয় প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। সেতুর নির্মান ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। 

* ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সংযুক্তি ও সমৃদ্ধির  জনপদ। বিচ্ছিন্নতার অযুহাত এবং অবকাশ থাকবে না আর। সূর্যাস্তের আগেই কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একাকার হবে গোটা দেশ। রাজধানী কিছুটা হলেও চাপমুক্ত, ভারমুক্ত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হতে পারে। এবং রেললাইন চালু হলে সাধারণ মানুষের নিত্য যাতায়াত হবে অধিকতর সুবিধাজনক। 

* এদেশে নদী হিসেবে পদ্মা সবসময়ই আলোচিত হয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশে এ নদীর দৈর্ঘ ১২০ কিমি ও গড় প্রস্থ ১০ কিমি। ভাষায়, শিল্পে সাহিত্যে, গানের বাণীতে, গীতিতে পদ্মার ঢেউ এসেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যােপাধ্যয় বা অন্নদাশঙ্কর রায় সবাই পদ্মার রূপ- রস, প্রমত্ততা,ভাঙা-গড়া আর জেগে ওঠা চরের সিকস্তি পয়স্তি কাহিনি চিত্রায়নের অনুপম কারিগর ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান শ্লোগান মানে পদ্মা দিয়ে শুরু-- 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেতু অতিক্রম করলেই নতুন প্রশাসনিক বিভাগের নামও পদ্মা। তাই অনুষ্টান স্থল থেকে ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম, সেতুটি কেবল বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নয়, পদ্মাও যেন আমাদের ভাগ্যবতী মা। 

১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

পদ্মা সেতু   ইতিহাস  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন