ইনসাইড থট

বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবসূত্র


Thumbnail

আমার এক পিতৃব্য আবদুল খালেক বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ছিলেন। আজ ১০ জুন তাঁর নবম মৃত্যুবার্ষিকী। জনাব খালেক ১৯২৭ সালের ১ মার্চ কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানাধীন জিরুইন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দেবিদ্বার গঙ্গামন্ডল রাজ ইনস্টিটিউটের ছাত্র ছিলেন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি শাস্ত্রে সম্মান সহ ১৯৫০ সালে এম এ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। জনাব খালেক সিভিল সার্ভিস অফ পাকিস্তান (সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৫১ সালে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি মুজিবনগর সরকারের একই দায়িত্বের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বও পালন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ছিল তাঁর কর্ম-জীবনের এক মহোত্তম পর্যায়। দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও জ্ঞানী এই মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুরও ছিল অবিচল আস্থা। যে কারণে তিনি অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে স্বাধীনতাউত্তর দেশ পুনর্গঠনে অবদান রাখার সুযোগ পান। ‘৭৫ পরবর্তীকালের সরকারের সাথে মতদ্বৈততার কারণে আবদুল খালেক সরকারি চাকুরী থেকে পদত্যাগ করে আইন শিক্ষা ও আইন পেশায় মনোনিবেশ করেন।

মরহুম আবদুল খালেক ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধে “গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ” অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার তাঁকে মরণোত্তর এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন। 

পারিবারিক সূত্রে আমার জানা ও দেখা যে একজন মানুষ কুমিল্লার এক অজো পাড়াগাঁ থেকে কেমন করে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলেন। বয়সে বড়ো ও সম্পর্কে ভাই হলেও তিনি ছিলেন আমার পিতারও শিক্ষক। ১৯৪৩ সালে আমার আব্বা যখন প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষা দেন, আমাদের ব্রাহ্মণপাড়ার বাড়ি থেকে চৌদ্দ মাইল হেঁটে চান্দিনা কেন্দ্রে খালেক চাচা তাঁকে নিয়ে যান ও পরীক্ষা চলাকালীন সেখানেই ছিলেন। তিনি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। চান্দিনায় আমার দাদার পরিচিত এক বাড়িতে একটি রুমে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। সেখানে ছোট ভাইকে চৌকিতে শুতে দিয়ে তিনি একটি কাঁথা বিছিয়ে কাঁচা মেঝেতে শুতেন। আব্বার পড়াশুনা থেকে চাকুরী এমনকি বিয়ে পর্যন্ত সকল সিদ্ধান্ত আমার দাদা ও আর এক চাচা কংগ্রেস কর্মী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট আবদুল লতিফ ভুঁইয়া (আবদু ভুঁইয়া নামে সুবিশেষ পরিচিত) নিলেও খালেক চাচাই সেসব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতেন। সত্তুরের দশকে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা, কোন হলে থাকবো সেসবের ব্যবস্থা সবই করেছিলেন খালেক চাচা। প্রায়ই বিকেলে বিকেলে তিনি ফজলুল হক হলে এসে আমাকে নিয়ে পুকুর পাড়ে হেঁটে বেড়াতেন আর তাঁর অভিজ্ঞতার গল্প শুনাতেন। পরামর্শ দিতেন আর একটি কথা প্রায় প্রতিদিনই বলতেন, ‘জীবনে যা করবি তাতে যেন মানুষের উপকার হয়’। আর বলতেন, ‘আমরা যে গ্রাম থেকে এসেছি সেটা একটা সারপ্রাইজ, এই কথাটা সব সময় মনে রাখবি’। তখন মাঝে মাঝেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যেতেন। যাবার পথে আমাকে দেখে যেতেন।

আবদুল খালেক তাঁর নিজ গুণে, বিদ্যায় ও চৌকস পারদর্শিতায় বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক হয়েছিলেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে পুলিশ বাহিনীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি নিয়মিত বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি অপরিসীম কষ্ট করেছেন যা তাঁর জীবনী গ্রন্থ ছাড়াও সে সময়ের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত খুঁজলে পাওয়া যায়। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে তিনি গবেষণা করতেন ও একটি আধুনিক বাহিনী হিসেবে একে গড়ে তুলতে নানারকম সংস্কার প্রস্তাবনা তৈরি করেন। দুর্ভাগ্যবশত বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্রোত উল্টোপথে ঘুরপাক খাওয়ার ফলে মুক্তিযুদ্ধের সুফল হিসেবে যেসব ক্ষেত্রে স্বা্ধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক আধুনিকায়নের সম্ভাবনা ছিল সেগুলো থেমে যায়। ফলে পুলিশ বাহিনীর কর্মক্রিয়ায় প্রথমে ভাগ বসায় সামরিক বাহিনী ও পরে রাজনৈতিক শক্তির তোষন-পোষণ এসে এই বাহিনীকে নানাভাবে বিতর্কিত করে। অথচ নিবেদিত প্রাণ এই বাহিনীই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা কি না সরকারী প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি মানুষের পাশে থেকে কাজ করে। এই বাহিনীর গুণগত উন্নয়ন তো দূরের কথা এর পরিচালন পদ্ধতি পর্যন্ত এখনও চলছে সেই ১৮৬১ সালের আইনের কাঠামোর মধ্যেই। নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় একে যুগোপযোগী করা যাচ্ছেনা।

ফলে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী চলছে তার নিবেদিতপ্রাণ অফিসারদের ত্যাগের ফলশ্রুতিতে। কিছুদিন আগে এক ঘরোয়া আড্ডায় সাবেক আইজিপি নূরুল হূদা ও বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খানের সাথে আমার আলাপচারিতার সুযোগ ঘটেছিল। সেখানেও এই বিষয়গুলোর অবতারণা হয়। বর্তমান সরকারের নানা পদক্ষেপ পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করেছে সন্দেহ নেই কিন্তু যেসব জটিলতা পুলিশকে উপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব থেকে সরিয়ে আনতে দিচ্ছেনা সেগুলোর সুরাহা হওয়া দরকার। একটি বিষয়ে আমরা সবাই সেদিন একমত হয়েছিলাম নেতিবাচক কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুলিশের মৌলিক ভূমিকার তেমন কোন ক্ষতি করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু পুলিশকে রাজনৈতিক ক্রীড়াচক্রের হাত থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে চলতে দেবার ও একীভূত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দেয়া এখন জরুরী। বিশেষ করে পুলিশের নীচের দিকে অনিয়ম ও ব্যাপক দুর্নীতির যেসব সংবাদ আমরা পাই তাতে উদ্বিগ্ন হবার কারণ আছে কিন্তু এসবের সমাধান কীসে সেগুলোও ভেবে দেখা দরকার।

আমাদের জানা যে পুলিশের যেসব কর্মী নীচের দিকে কর্মরত তাদের অধিকাংশ স্বল্পশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের। ঐতিহাসিক সত্য যে ব্রিটিশ বেঙ্গল পুলিশের আমল থেকে এদের বেতন ভাতাদি অত্যন্ত অনুল্লেখ্য পর্যায়ের যা তাদের কাউকে কাউকে বাধ্য করেছে অসাধু পথে চালিত হতে। এখন সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, দেশের মানুষের আয়ের পথ সুগম হয়েছে ও পরিবারগুলো দারিদ্র্য সীমার নিম্ন অবস্থান থেকে প্রায় বের হয়ে এসেছে। পরিবারের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা পুলিশে চাকুরী পাচ্ছে যেখানে একসময় একটি দরিদ্র পরিবারের স্বল্প শিক্ষিত কাউকে কনস্টেবল বা উপ-পরিদর্শক পদে চাকুরী পেতে কয়েক লক্ষ টাকা দালাল চক্রকে দিতে হতো, গত কিছুদিন যাবত সে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। ঘোষণা দিয়ে এখন দালাল ও বাড়তি টাকামুক্ত নিয়োগের প্রতিশ্রুতি স্বয়ং পুলিশের উচ্চ মহল থেকেই জেলায় জেলায় জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে এখন আমাদের ভাবা দরকার শিক্ষিত কিন্তু দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের পুলিশের নীচের দিকের কোন পদে চাকুরী পেলে যে সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে তা কেমন করে তারা মোকাবেলা করবে, সমাজই বা কেমন করে তা নিরূপণ করবে যে, নির্বিবাদে যে চাকুরী করতে গেছে সে লেখাপড়া জানা ও তার কাছ থেকে কোন অন্যায় কাজ আদায় করা আর যাবে না।

পুলিশের উচ্চ মহল যদি এই সাংস্কৃতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাহলে নিচের দিকে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। বাকী থাকে প্রশাসনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক চাপ। একটি জেলায় বা উপজেলায় যিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাঁর মূল কাজ উন্নয়ন তদারকী, ভূমি ব্যবস্থার বিন্যাস ও কর আদায় অপরদিকে আইন শৃঙ্খলার দায় পুলিশের। প্রধানতঃ পুলিশ সেখানে সহায়ক ভূমিকা পালনে কাজ করে। বিচারিক ক্ষমতা প্রশাসনের কাছ থেকে আলাদা হবার পরে ও কালে কালে, বিশেষ করে সামরিক শাসনের আমল থেকে পুলিশকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য করা হয়েছে। এইরকম একটি জটিল মিথস্ক্রিয়া পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে অস্থির করে তুলেছে। ফলে এখন যে করেই হোক, পুলিশকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ করে দেয়া দরকার। কেউ কেউ ভয় পান পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে গেলে সরকারের নীতিবিরুদ্ধ কাজে সে তার শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। এই চিন্তা অমূলক কারণ পুলিশ বা যে কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেই একটি রেজিমেন্টেড প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, না হলে এতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে এরা টিকে থাকতে পারতো না। দেশে রাজকতা প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝতেও পুলিশকে সুযোগ করে দেয়া দরকার। আমদের সকলের জানা আছে বাংলাদেশে পুলিশ কখনও কোন রাজনৈতিক শক্তিকে উৎখাত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি, সংবিধানের কোন অনুশাসনও পুলিশ বাহিনী কখনও অসম্মান করেনি। ফলে যেনতেন প্রকারে পুলিশকে হাতে রাখার যে রাজনৈতিক প্রবণতা তার অবসান হওয়া দরকার।

পুলিশের সাম্প্রতিক বেশ কিছু নিয়োগে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হয়নি এমন অনেক তথ্য সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। আমার জানামতে, শতভাগ স্বচ্ছ এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে নিঃসন্দেহে পুলিশ বিভাগ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী একই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলার পুলিশ সুপারগণ। এতে প্রমাণিত হয় পুলিশ বিভাগের সকল পর্যায়ে একটি গুণগত পরিবর্তনের শুভ সূচনা হ’তে যাচ্ছে।

সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে পুলিশের সকল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া ঢেলে সাজানো। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেখানে একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলবার স্বপ্ন বাস্তবরূপ নিচ্ছে সেখানে দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষঘনিষ্ট পেশায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীকে অবশ্যই মানবিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যেখানে বাংলাদেশের পুলিশের ভূমিকা প্রশংসিত সেখানে দেশে কেন এরা সমালোচিত হবে?

আশার কথা শেখ হাসিনার সরকার এই বাহিনীকে স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে মানবিক করে গড়ে তুলতে সব প্রতিশ্রুতি পালন করছে, শুধু পুলিশ কর্মকর্তাদের সাহসের সাথে এখন সে স্বপ্ন এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশের সব মানুষ তাঁদের পাশে থাকবে ও পুলিশের সাফল্যে গৌরববোধ করবে।  

ইমেইল: rezasalimag@gmail.com


পুলিশ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ড. ইউনূসের বিবৃতি অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক


Thumbnail ড. ইউনূসের বিবৃতি অসত্য এবং বিভ্রান্তিমূলক

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি ড. ইউনূসের পক্ষে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠানো হয়েছে। এতে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কিত আইনের নানা ভুল ব্যাখ্যা এবং অসত্য তথ্য দেয়া হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক কোন বেসরকারি ব্যাংক নয়, এটি একটি statutory public authority বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ/প্রতিষ্ঠান। সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ বলতে সে সকল প্রতিষ্ঠানকে বুঝায়, যে প্রতিষ্ঠান কোন নির্দিষ্ট আইনের দ্বারা সৃষ্ট এবং আইনে উল্লেখিত বিধানাবলীর আলোকে ঐ প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়।

গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত অর্ডিন্যান্স The Grameen Bank Ordinance, 1983( Ordinance NO. X।VI OF 1983 ) এর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। আইনটির ধারা ২ তে বলা আছে, আইনটি সেসব গ্রামীণ এলাকায় কার্যকর হবে, যে সকল এলাকা সরকার কর্তৃক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

১৯৮৩ সালের আইনের ধারা ৪(৪) এ বলা আছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাংক কোম্পানিজ আইন অথবা ব্যাঙ্ক কোম্পানিজ সম্পর্কিত অন্য কোন আইনের কোন বিধান গ্রামীণ ব্যাংকে প্রয়োগ করতে পারবে।

এই আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী আইনটি একটি বিশেষ আইন। কারণ এই আইনের ধারা ৩ এ এই আইনের প্রাধান্য (overriding clause) রয়েছে। ধারা ৩ এ বলা হয়েছে, অন্যান্য আইনে বিধানাবলী যা-ই থাকুক না কেন, এই আইনের বিধান কার্যকরী হবে।

৬০ বছরের বেশি বয়সে গ্রামীণ ব্যাংকার দায়িত্বে থাকা প্রসঙ্গে ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক এমন একটি ব্যাংক যার ৭৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক এর ঋণগ্রহীতারা। একটি আলাদা আইনের মাধ্যমে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য সন্নিবেশ করে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ফলে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনও বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিল না।’

ব্যাংকের পেইড-আপ ক্যাপিটাল বা পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের ক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতারা এর কত ভাগ মালিক, এর সাথে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) পদে নিয়োগ কিংবা ঐ পদের মেয়াদের কোন সম্পর্ক নেই । এমডি পদে নিয়োগ এবং পদের মেয়াদের ক্ষেত্রে একমাত্র আইনের বিধানই প্রযোজ্য হবে। অন্যান্য ব্যাংকের সাথে গ্রামীণ ব্যাংকের যে পার্থককের কথা বলা হচ্ছে, ব্যাংকের  এমডি'র চাকুরীর মেয়াদের সাথে এই পার্থককের কোন সম্পর্ক নেই। বরং সকল সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের মতো গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটি একটি পূর্ণকালীন চাকুরীর পদ এবং উক্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদটি অন্যান্য সকল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদের মতো মেয়াদ ভিত্তিক ও অপূর্ণকালীন।

ড۔ ইউনূসের পক্ষে বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় এর পরিচালনা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে একটি চুক্তির অধীনে। এই নিয়োগের জন্য কোনও বয়সসীমা আইনে বা পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে উল্লেখ ছিল না।’ এই বক্তব্য অসত্য। কারণ ১৯৮৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংকের অর্ডিন্যান্স এর ধারা ১৪(১) অনুযায়ী এই ব্যাংকের এমডি'র নিয়োগ চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমডি পদে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য একটি সিলেকশন কমিটি থাকে এবং সেই বাছাইয়ের ভিত্তিতে ব্যাংকের বোর্ড এমডি নিয়োগ করে।  এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানও নিয়োগ করে সরকার। গ্রামীণ ব্যাংক একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান বলেই আইনে এই নিয়োগের ক্ষমতা সরকারের হাতেই রাখা হয়েছে।

১৯৮৩ সালের গ্রামীন ব্যাংক আইন অনুযায়ী ব্যাংকের এমডি পদটি একটি সার্বক্ষণিক পদ এবং তিনি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ( সিইও)। আইনের ধারা ৯ (২) অনুযায়ী এমডি পদাধিকার বলে ব্যাংকের পরিচালক, তবে এমডি বোর্ডে ভোট প্রদান করতে পারবেন না। আইনের ধারা ১০(২) অনুযায়ী কোন কারণে চেয়ারম্যানের পদ শুন্য হলে সরকার এমডি ছাড়া অন্য যেকোনো পরিচালককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে।

আইনের উল্লিখিত বিধানাবলী পড়লে এটি পরিষ্কার যে, গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটি একটি সার্বক্ষণিক চাকুরী। যেকোনো সার্বক্ষণিক পদের একটা মেয়াদ থাকে। ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশে এমডি পদের অবসরের সময়সীমা উল্লেখ না থাকলেও এটি নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। কারণ ১৯৮৩ সালের আইনের ধারা ৪(৪) এ বলা আছে, সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাংক কোম্পানিজ আইন অথবা ব্যাংক কোম্পানিজ সম্পর্কিত অন্য কোন আইনের কোন বিধান গ্রামীণ ব্যাংকে প্রয়োগ করতে পারবে। সরকারের এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা ছাড়াও Interpretation of Statutes এর সাধারণ নীতি অনুযায়ী দেশের অভ্ভন্তরে অন্যান্য ব্যাংকের এমডি পদের মেয়াদের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি'র চাকুরীর মেয়াদ ধরতে হবে। অন্যান্য সকল ব্যাংকে এই মেয়াদ তখন ছিল ৬০ বছর। এছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫২(১) তে আইনের যে সংজ্ঞা আছে, তাতে প্রথা বা রীতি-কেও আইন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য ব্যাংকের চাকুরীর বিধান প্রথা হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকের আইন এর ধারা ৮ (২) অনুযায়ী ব্যাংক তার কার্যাবলী পরিচালনার ক্ষেত্রে সবসময়ই জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিবে। এই বিধানের আওতায় ব্যাংকটির প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্তে সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি প্রয়োজন।

এছাড়া, The Genera। Clauses Act 1897 এর বিধান অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি এবং নিয়োগকৃত পরিচালকদের নিয়োগ সরকার বাতিল করতে পারে। কারণ Genera। Clauses Act 1897 এ বলা আছে, যে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রদান করতে পারে, সেই একই কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বাতিল করতে পারে।

ড۔ ইউনূসের বিবৃতিতে পদ্মা সেতু নিয়ে তার পক্ষ থেকে কোন ধরণের প্রভাব বিস্তার করা হয়নি মর্মে যে দাবী করা হয়, এই বিষয়ে ড۔ ইউনূসের কাছে বাংলাদেশের জনগনের প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্মের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কেন খরচ করেছিলেন ? যুক্তরাষ্ট্রে লবিস্ট ফার্ম তিনি কেন নিয়োগ করেছেন - এটি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ জানে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পদ্মাসেতু: আমার মা’র আবেগ, অদম্য বাঙ্গালী জাতি ও কিছু কথা

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ৩০ Jun, ২০২২


Thumbnail পদ্মাসেতু: আমার মা’র আবেগ, অদম্য বাঙ্গালী জাতি ও কিছু কথা

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পরদিন সকালে আমার আশি উর্ধো বয়সী মা’র ফোন পেলাম। সালাম বিনিময়ের পর  মা বললেন, ‘বাবা, পদ্মাসেতু দেখতে যামু’। আমি বললাম, ‘এখনতো ভীড়, কয়েকদিন পর যাই, মা’। উত্তরে মা বললেন, ‘কাইল-পরশু চলো পদ্মাসেতু দেখতে যাই। গাড়ী দিয়া পদ্মা পার হইয়া বাপের বাড়ি যামু, তোমার দাদা বাড়ি যামু’। 

আমার মা আবেগ তাড়িত হয়ে স্মৃতিপট থেকে তুলে এনে জানালেন, মা’র বিয়ের পর প্রথম যখন আমার বাবার সাথে ঢাকা আসেন তখন আমি তার কোলে, ১০ মাসের শিশু  আমার বড় ভাই আবুল হোসেন ৪ বছর বয়সে ডায়ারিয়া হয়ে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তাই তড়িঘড়ি করে আমাকে নিয়ে ঢাকা আসা।

আমার নানা বাড়ি পদ্মা নদীর পাড়ে অবস্থিত মাদবরের চর ইউনিয়নে (শিবচর, মাদারীপুর)। খরস্রোতা পদ্মানদীর ভাঙ্গনে তিনবার বিলীন হয়েছে আমার নানা বাড়ী। 

মাদবরের চর থেকে  খুব সকালে লঞ্চে উঠলে, চাঁদপুর হয়ে ঘুরে, রাত ১০ টায় ঢাকার ঠিকানায় পৌঁছা যেত। আমার নানা মা-কে লঞ্চে তুলে দিয়ে যতক্ষণ লঞ্চ দেখা যায়, ততক্ষণ নদীর পাড়ে লঞ্চঘাটে বসে থাকতেন। একবার নানা আমার মা‘কে বলেছিলেন, ‘এমন দিন আইবো, বিয়ানে (সকালে) ঢাহা যাইয়া, কাম শেষ কইরা বেইল ডোবার আগেই ফিররা আইতে পারবা’। মা বললেন, ‘হেইদিন আইসা পরছে। আমারে পদ্মা সেতু দেখতে নিয়া চলো’। 

এই কথোপকথনে উল্লেখযোগ্য ছিল মায়ের মন ভরা ‘আবেগ’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ কামনা করে তিনি বললেন, ‘হাসিনা দেশটারে কত উন্নত করছে। আমার বিয়ার পর শ্বশুর বাড়ি (মোড়লকান্দি, কুতুবপুর ইউনিয়ন, শিবচর) যাওয়ার সময় খালপাড়ের চিকন রাস্তা দিয়া পালকিআলারা ঠিকমত হাটতে পারে নাই। লিটন চৌধুরী ঐ খালপাড়ের রাস্তা পাকা কইরা দিছে। খালের উপর ব্রীজ কইরা দিছে। অহন আমি  খালপাড় দিয়া  গাড়ী নিয়া যাইতে পারি। শেখ হাসিনারে আল্লাহ বাঁচাইয়া রাখুক, সুস্থ রাখুক, দোয়া করি’। 

সম্পূর্ন অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট গতিবিধি সম্পন্ন নদী পদ্মা। যার ‘একুল ভাঙ্গে অকুল গড়ে’ এমনি একটি নদীকে নিয়ন্ত্রন করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। গত ২৫ জুন ২০২২ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০ ফুট প্রস্থ কারিগরি বিবেচনায় বিশ্বের এক নববিস্ময় ‘পদ্মাসেতু’ উদ্ধোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথিবীর দ্বিতীয়তম খরস্রোতা এই নদীর উপর সেতু নির্মাণে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ অনুভব করেছেন কি দুরূহ কাজ তাঁরা সম্পন্ন করেছেন। 

এই সেতু নির্মাণ কার্যক্রমের শুরুতেই বাঁধা আসে। এই পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন করতে চেয়েছিল। সম্পূর্ন কাল্পনিক কিছু দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালো। এ ঘটনার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ।  কিন্তু দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন সাহসী নেতৃত্ব থাকলে সবই সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মাথা নোয়াবার মানুষ নন। মুহূর্তেই  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিলেন, ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে’। তখন সমালোচকরা বলছেন, ‘এটা দুঃসাহস’। মুক্তিযোদ্ধার সময়ও স্বাধীনতা বিরোধীরা বলেছেন, পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর সাথে নিরস্ত্র বাঙালি কিভাবে যুদ্ধ করবে? ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘...বাঙ্গালীরে দাবিয়ে রাখতে পারবা না‘। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার দামাল ছেলেদের নিয়ে গঠিত অনিয়মিত মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানের একটি নিয়মিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে মহান স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। আন্তর্জাতিক অনেক পরাশক্তির সমন্বয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সকল ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করে বাংলাদেশ নামক ভুখন্ডের জন্ম হয়েছে। ‘বাঙ্গালী‘ জাতি হিসাবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাঙ্গালী জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। 

তেমনিভাবে সকল বাঁধা পেরিয়ে শুরু হয় পদ্মাসেতু নির্মাণ কাজ। নির্মাণ সামগ্রী নদীতীরে জমা করা হয়। খরস্রোতা পদ্মার ভাঙ্গনে মালামাল  নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভেঙ্গে পরেননি শেখ হাসিনা। দ্বিগুন উদ্যম নিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসিকতার জন্যই বাঙ্গালী জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক পদ্মাসেতু আজ বাস্তবতা। পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন ঠেকাতে দেশি-বিদেশি যে সকল সংস্থা ও ব্যক্তি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অভিযোগ উত্থাপন করেছিল, তারা পরবর্তীতে মাথা নত করে পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজ্স্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। আজ পদ্মাসেতু উদ্ধোধনের পর মাথা নত করেছে সকল ষড়যন্ত্রকারীরা, তারা অভিনন্দনও জানিয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানও মাথা নত করে অভিনন্দন জানিয়েছে।

কর্নফুলী নদীর তলদেশে সুড়ঙ্গ দিয়ে গাড়ি চলাচল করবে, বাংলাদেশের মানুষ কল্পনাও করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ তাও বাস্তবতা।

বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২৫৯৪ মার্কিন ডলার যা প্রতিবেশী দেশসমূহের তুলনায় অনেক এগিয়ে। আমাদের গড় আয়ু ৬০ থেকে ৭৩ বছর বয়সে উন্নিত হয়েছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত হয়েছে। এমন সময় ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতি এমন চরম খারাপ পর্যায়ে ছিল যে, লোডশেডিং লেগেই থাকত। সামাজিক অনুষ্ঠান, শপিংমলে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার বাধ্য হয়েছিল। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বের কল্যাণে দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত একমাত্র দেশ, বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, কিছু দুর্গম পার্বত্য এলাকা বাদে এরই মধ্যে দেশের ৯৯.৮৫% এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ রপ্তানী করার সক্ষমতা অর্জন করবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এমনিভাবে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জন করবে।

মাথা নোয়াবে না বাঙ্গালী, মাথা নোয়াবে না বাংলাদেশ।

পদ্মাসেতু  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা


Thumbnail ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা

আমদের দেশে এখন গ্রীষ্মকাল, প্রচন্ড গরম, তার সাথে মাঝে মাঝে বর্ষাকালের বৃষ্টি যার ফলে কিছু জেলার বাসিন্দারা বিধ্বংসী বন্যা পরিস্থিতিতে দারুন অসুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন! সমস্ত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং বাধা সত্ত্বেও, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দময় মুহূর্ত অনেক আশা এবং অনুপ্রেরণা দিচ্ছে, ঠিক তখন কোভিডের কারণে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে হাতে গুনা অল্প কিছু লোক সংক্রামিত হওয়া এবং কোনো মৃত্যু না দেখে, ভাবতে শুরু করেছিলাম যে হয়ত আমরা কোভিড-১৯, মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দারুন ভোগান্তির পর কোভিডকে আমাদের পিছনে ফেলে আসতে পেরেছি। আর বার বার কোভিডের "নতুন তরঙ্গের" কারনে কোভিড সংক্রামিত মানুষের এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কথা সম্ভবত কেউ আর শুনতে চায়নি। কি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হল সাম্প্রতিক বাংলাদেশের তথ্য ইঙ্গিত করছে ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট, BA.4 এবং BA.5-এর সাবলাইনেজ, সংক্রমণ বিশ্বজুড়ে অন্যান্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও একটি নতুন তরঙ্গ শুরু করেছে।

আজকাল এখন আর কোভিডের তথ্য সংবাদপত্র বা টেলিভিশন সংবাদের বড় শিরোনাম নয়, মহামারীটি আর সংবাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছে না যেভাবে কিছুদিন আগেও তা করেছিল, তবুও আমরা কোভিড নিয়ে কোথায় আছি এবং আমাদের কী করা দরকার তা নিয়ে জরুরিভাবে আলোচনা আর মূল্যবান সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয় বরং নতুন তরঙ্গের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের জাতীয় কৌশল কী হওয়া উচিত সবাই বসে তা নিয়ে আলোচনা করা আর জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আজ ২৮শে জুন সরকার ২০৮৭ জনের সংক্রামিত হওয়ার এবং ৩ জনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। তাই বলে আতঙ্কে, আমাদের তাড়াতাড়ি এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সুসংবাদ, ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলি খুব একটা গুরুতর নয়, তবে সমস্যা হল ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলির লোকেদের পুনরায় সংক্রামিত করার সক্ষমতা রয়েছে, এমনকি যারা পূর্বে ওমিক্রনের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, বা যারা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছেন বা যারা বুস্টার ডোজও পেয়েছেন তারাও সংক্রামিত হতে পারেন। ফাইজার ভ্যাকসিনের পর পর তিনটি ডোজ পাওয়ার পরেও আমি খুবই হালকা দুই দিনের লক্ষণগুলি সহ ওমিক্রনে সংক্রামিত হয়েছি এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে "হার্ড ইমিউনিটি" (যেখানে পর্যাপ্ত লোকদের টিকা দেওয়া হয়েছে বা যারা ইতিমধ্যে সংক্রামিত হয়েছে সেখানে আরও সঞ্চালন বন্ধ করা জন্য প্রাকৃতিক অনাক্রম্যতা) পৌঁছানো সম্ভবত অসম্ভব। সাংহাই এবং বেইজিং শহরে চীনা কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত লকডাউনের পরেও ওমিক্রনের বিস্তার বন্ধ করতে সেখানে অসুবিধার কথা আমাদের ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য বিবেচনা করতে হবে।

যদিও ইদানিং বাংলাদেশে কোভিড রোগের দ্রুত সঞ্চালন উদ্বেগের কারন হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হল কোভিডের মুখোমুখি এবং যুদ্ধ জয়ে আজ আমাদের কাছে মোতায়েন করার জন্য প্রচুর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং সরঞ্জাম রয়েছে। এছাড়াও, গবেষণা বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে ওমিক্রন প্রকৃতপক্ষে হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে ডেল্টার চেয়ে হালকা। বেশিরভাগ মানুষের জন্য, কোভিড-১৯ মৌসুমী ফ্লু থেকে, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলিতে, কম প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ডেল্টার তুলনায় ওমিক্রনের তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে, কারণ সফল টিকা দেওয়ার পরে বেশিরভাগ মানুষ উচ্চ মাত্রার অনাক্রম্যতা অর্জন করেছে। তবে, বিপুল সংখ্যক লোক সংক্রামিত হওয়ার কারণে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ পরিণতি হওয়ার পরিনিতি, সফল আর সময় মত এর পরিচালনা, চিকিত্সা যত্নের প্রাপ্যতা এবং বিশাল ব্যয় সম্পর্কে আমাদের এখনি নজর দেওয়া দরকার।

অবশ্যই, এই রোগের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘকালের নেতিবাচক স্বাস্থ্যের ফলাফলের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের সকলের এবং সরকারের উচিত হবে বারবার কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। বড় চ্যালেঞ্জ হল জীবন ও জীবিকার মধ্যে আমরা কতটা বা কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি এবং কি ভাবে কোভিডকে সম্পূর্ণরূপে এড়াতে পারি? মজার বিষয় হল, এই রোগের বাহক আর সংক্রমণের কারন হল আমাদের চেনা জানা অন্যান্য লক্ষণহীন সংক্রামক মানুষ, যাদেরকে আমরা দেখতে, যাদের কাছাকাছি থাকতে, কোলাকুলি করতে, সমাজিকতা বজায় রাখতে বা কাজের কারণে তাদের সম্পর্কে আসাটা আমরা উপভোগ করি। মানুষ হল সামাজিক প্রাণী, এবং তাই অনেক লোকের জন্য আমাদের জীবনের মানের একটি বড় অংশ হল অন্যদের সাথে স্বাধীন ভাবে মেশা - যেমনটি উত্সব, উদযাপন এবং সামাজিক ইভেন্টগুলিতে দ্রুত ফিরে আসা এবং সেই সময় গুলো উপভোগ করা। আর এই কারণেই ভাইরাসটি শীঘ্রই আমাদের ছেড়ে চলে যাবে না, অদূর ভবিষ্যতেও নয়। আমরা ভাইরাসটির সাথে কীভাবে ভালো ভাবে বাঁচতে পারি তা আমাদের শিখতে হবে। কারন একই সাথে আমরা বেঁচে থাকতে এবং আমাদের জীবিকা বজায় রাখতে চাই।

মুখোশ এবং বায়ুচলাচল এখনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যা আমরা মেনে চলতে পারি। একটি মেডিকেল-গ্রেড মাস্ক পরা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়, বিশেষ করে জনাকীর্ণ সমাবেশ গুলোয়। আপনি যদি এমন একটি জায়গায় যান, বা চলাচল করেন বা যাএি হন যেখানে অনেক লোক একসাথে আপনার সাথে থাকবে, যা আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপুর্ন সেখানে যাবার আগে হয় আপনার পকেটে বা হ্যান্ডব্যাগে বা ব্রিফকেসে মাস্ক রাখবেন এবং সেখানে থাকাকালিন মুখোশ পরে থাকবেন। এখন থেকে আমরা ভবিষ্যতের বাঙ্গালী সামাজিক আদর্শ হিসাবে এটি গ্রহণ করা শিখতে পারি। আর আমাদের সঠিক এবং পর্যাপ্ত ইনডোর বায়ুচলাচল নিশ্চিত করতে হবে। যাদিও, একমাএ উপযুক্ত বায়ুচলাচল ব্যাবস্থা দ্বারা সংক্রমণের একটি তরঙ্গ বন্ধ করার সম্ভাবনা কম, তবুও আমাদের ইনডোর এবং বদ্ধ পরিবেশে উপযুক্ত পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল নিশ্চিত করা দরকার।

বাংলাদেশের চমৎকার প্রচেষ্টা এবং বিপুল ব্যয়ের জন্য ধন্যবাদ, দেশটি তার বেশিরভাগ জনসংখ্যাকে কার্যকর কোভিড ভ্যাকসিনের দুই ডোজ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ সমান সংখ্যক লোককে বুস্টার ডোজ প্রদানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে ভাল করছে। ভবিষ্যতে বিশেষ করে শুধু মাএ জনসংখ্যার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানুষকে আবারও বুস্টার ডোজ (বার্ষিক হতে পারে) প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সব রকম পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি থাকতে হবে।

কোভিড টিকা দেওয়ার প্রাথমিক অসাধারণ সাফল্য পর, ভবিষ্যতে আবারও কোভিড ভ্যাকসিনের গণ টিকা প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি আরও আলোচনার এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ করব। ধনী দেশ এবং কোম্পানিগুলোর মেধা সম্পত্তি অধিকার (intellectual Property Right) মওকুফ করতে সম্মত হওয়ার অপেক্ষায় থাকাকালীন পুনরায় এই জাতীয় সমস্ত জাতি প্রশস্ত টিকা প্রদানের বহুল ব্যয়ের কৌশলের কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে। অন্যান্য অবকাঠামোগত বিকাশ অবশ্যই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হতে হবে। আমি পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি আমঅবকাঠামোগত বিকাশে বিনিয়োগ আমাদের জীবিকা নির্বাহ এবং শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে সহায়তা করবে। আজ সমৃদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলো ধার নিতে এবং প্রচুর পরিমাণে অর্থ কোভিড প্রোগ্রামে ব্যয় করতে পারে কারণ তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমঅবকাঠামো শক্ত ভাবে তৈরি করেছে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশের সেই ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা আছে এবং তারা সল্প ব্যায়ে তা উৎপাদন করতে পারে, এবং তার ফলে টিকা প্রদানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। আসুন সেই ধনী দেশগুলি এবং সংস্থাগুলিকে দরিদ্র দেশ এবং তাদের নাগরিকদের জীবন আর জীবিকার ব্যয়ে প্রচুর মুনাফা করার বিরুদ্ধে সজাগ হই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গাভিকে অবশ্যই মেধা সম্পত্তির অধিকার মওকুফ করা নিশ্চিত করতে কঠোর হতে হবে এবং একসাথে কাজ করতে হবে এবং অপ্রাকৃত মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে তাদের আওয়াজ তুলতে হবে।

যখন আমরা আমাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি সে সময়ে আমাদের কৌশল কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমি আমার পূর্ববর্তী নিবন্ধে "পরীক্ষা এবং চিকিত্সা" কৌশল গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সমস্ত ফার্মেসি, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার জায়গা গুলোতে ফাইজার এবং মার্কের অ্যান্টিভাইরাল সরবরাহ করা উচিত, যাতে একটি "চিকিৎসা করার জন্য পরীক্ষা" স্কিম চালু করা যায়, যেখানে কোভিড পজিটিভ পরীক্ষার পরেই, সবাই বিশেষ করে যারা দুর্বল এবং বয়স্ক গোষ্ঠী, যাদের ভ্যাকসিনগুলি কম কার্যকর হতে পারে, তারা কার্যকর চিকিত্সার সেই ওষুধগুলি আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া পান। এটি কেবল হাসপাতালে ভর্তি হ্রাস করবে না তবে জীবন বাঁচাবে এবং জীবিকা নির্বাহ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখবে।

জনস্বাস্থ্য হল এমন সমস্ত বিষয় যা জনগনকে সুস্থ ও সুখী জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। জীবন এবং জীবিকার সুষম কৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেয়। যখন আমাদের "কোভিডের সাথে বাঁচতে পারি" বা “ বাঁচতে পারবো কিনা” সে বিষয়ে জোরালো মতামত প্রকাশ করা অব্যাহত রয়েছে, বাস্তবতা হল এই গ্রহের প্রায় প্রতিটি দেশই, ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এই মহামারী দ্বারা সমানভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মানুষ বা দেশ হিসাবে আমরা প্রতিদিন যে সমস্ত সমস্যাগুলির মুখোমুখি হই, অন্যান্য সমস্ত সমস্যাগুলির মধ্যেও এই ভাইরাস বিষয়ে আমরা প্রতিদিন আরও শিখছি এবং এই সংক্রমণ দ্বারা আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বিশাল সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আমাদের একমত হতে হবে, কোভিড পরিস্থিতি জটিল, এর কোনও দ্রুত এবং সহজ প্রতিকার নেই। না, আমরা এখনও কোভিড-১৯ সমাধান করি নি, তবে আমরা এই রোগটি পরিচালনা করতে আরও চৌকস এবং আরও ভাল হয়ে উঠছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষ দূত ডাঃ ডেভিড নাভারো কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে বলেছেন: “এখন আমাদের অনেকের জন্য, কোভিড-১৯ এর অসুস্থতা জীবন হুমকির পরিবর্তে একটি সাধারন অসুবিধার কারণ হবে, তবে মনে রাখবেন, কিছু লোক বিশেষত দুর্বল, যারা অন্যান্য সহ-অসুস্থতার সাথে বসবাস করছেন এবং এখনও টিকা নিতে অস্বীকার করছেন বা কোন কোভিড ভ্যাকসিন পাননি, কোভিড এখনও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।”

আসুন কোভিড নিয়ে বাঁচতে শিখি, মাস্ক ব্যবহার করি, যত সম্ভব ভিড়ের পরিবেশ এড়িয়ে চলি, যখন আমাদের কোভিডের লক্ষণ থাকে, অবিলম্বে পরীক্ষা করি এবং যদি আমাদের ইতিবাচক পরীক্ষা করা হয় তবে নিজেকে আলাদা করি, মানুষকে আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করি। আসুন জাতীর আর আমাদের প্রজন্মের উন্নত ভবিষ্যৎ আর জীবন আর জীবিকার উন্নতির জন্য এক সাথে কাজ করি। আমরা একটি গর্বিত জাতি এবং আমরা বারবার প্রমাণ করেছি যে আমরা এটি করতে পারি।

(এই নিবন্ধটি অন্যান্য প্রকাশনাগুলির সহায়তায় প্রস্তুত করা)


ওমিক্রন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

রাজনীতি হোক গণমুখী, সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্যপূর্ণ


Thumbnail

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির পরদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। '২৫ জুন পর্যন্ত হরতাল বা নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!' দেশের সমসাময়িক রাজনীতির ধারা হিসাব করলে এমন সম্ভাবনা আসলেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারপর কি হলো? ৫ জুন পাবনার বেড়ার কিউলিন ইন্ডাস্ট্রি। ৬ জুন রাজধানীর বছিলার জুতার কারখানা। ১০ জুন রাজধানীর নর্দ্দা এলাকায় তুরাগ পরিবহন। ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের ফেরি। একই দিনে মৌলভীবাজারে পারাবত এক্সপ্রেসের তিনটি বগি। ১২ জুন রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তঃনগর ট্রেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের রুম। ২০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক। সবখানেই আগুন। সব কি দুর্ঘটনাবশত লেগে যাওয়া আগুন? কই! স্বাভাবিক সময়ে তো এত আগুন লাগে না! নাকি এটি প্রতিহিংসার আগুন! ব্যর্থতার আগুন! বুকে জ্বলা আগুন! হিসাবের আগুন! খোদ সরকারপ্রধান এসব আগুনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য আছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী তারা এমন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাবে যাতে আমরা ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে না পারি'।

আগুনের পাশাপাশি গতানুগতিক বচন অব্যাহত রয়েছে। এসব ফালতু বচন আগেও ছিল। "পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।" এসব বচন নিয়ে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল সে সময়। তখনো দৃশ্যপটে এসেছিলেন মির্জা ফখরুল সাহেব। সাফাই গাইলেন দেশনেত্রীর পক্ষে। তিনি বললেন, দেশনেত্রী ঠিক বলেছেন। তিনি ভুল বলেননি। দেশপ্রেমিকের মত কথা বলেছেন। ‘একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের ওপরে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেটা টিকবে না। তোমরা এখনো এলার্ট হও, চেঞ্জ দ্য ডিজাইন'। এসব পুরনো বচন। গতানুগতিক ধারায় আরো অনেক বচন যুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। বিএনপি'র মির্জা সাহেব বললেন, "পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাও একদিকে না, দুইদিকে।" অথচ বাস্তবতা হলো ২০০১ সালের ৪ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। মির্জা সাহেবের কি দরকার ছিল এমন একটি ভুল তথ্য দেওয়ার। অজ্ঞতাবশত যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে পারতেন। আর যদি সজ্ঞানেই বলে থাকেন, তাহলে উনার উচিত ছিল সরকারি নেতাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তথ্য প্রমাণাদিসহ জাতিকে জানানো। তিনি কোনটাই না করে নিজের দেয়া বচনকে 'ফালতু' প্রমাণ করলেন। জনগণকে ধোঁকা দিলেন, বোকা বানালেন।

সম্প্রতি মির্জা সাহেব বলেছেন, "পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু নেই। পদ্মা সেতুর প্রথম ফিজিবিলিটি রিপোর্ট করে বিএনপি ১৯৯৪/১৯৯৫  সালে। সেই সময় ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর এখন সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার হিসাব চাই।" তিনি নিশ্চয়ই জানেন, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পরে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদী পানি নিঃসরণ করে সাড়ে ৭ লাখ কিউমেক। যখন নদীতে প্রবাহিত পানি প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটারে পরিমাপ করা হয় তখন তাকে 'কিউমেক' বলে। ঘনফুটে পরিমাপ করা হলে তাকে 'কিউসেক' বলে। আটলান্টিকের প্রবেশদ্বারে আমাজনের সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কিউমেক। তার মানে আমাজনের দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ পানি পদ্মা নদী নিঃসরণ করে বর্ষা মৌসুমে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পদ্মার চেয়ে আমাজন কেন বেশি খরস্রোতা। আমাজন নদী সারা বছর প্রায় একই গতিতে পানি নিঃসরণ করে। গড় ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিউমেক। পক্ষান্তরে বর্ষার পদ্মা নদী বিশ্বের সর্বাধিক  খরস্রোতা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কিউমেক। তাতে পদ্মা নদীতে পানি নিঃসরণের গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কিউমেক। পদ্মা সেতুর স্থলে গত একশ বছরের গড় সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার কিউমেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা বা অতিবন্যার সময় সেতু অঞ্চলে পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কিউমেক পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে চিন্তা মাথায় রেখেই সেতু প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাজন বয়ে গেছে ব্রাজিল, পেরু আর কলম্বিয়ার উপর দিয়ে। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে কোন সেতু নেই। দেড় লক্ষাধিক কিউমেক পানি নিঃসরণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বে দ্বিতীয় কোন সেতু এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তাই পৃথিবীর আর কোন দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু আর কোথায় পাবেন? এত খরস্রোতা নদীতে আর তো কোন সেতু নেই। তাইতো  নদী শাসনে চলে গেছে খরচের তিন ভাগের এক ভাগ।

মির্জা সাহেব বলেছেন, ৯৪/৯৫ সালে সেতু নির্মাণে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। খুব ভালো কথা। ২৭ বছর আগের কথা। পয়লা জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৪১ দশমিক ৭৯ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণ কালে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা। এবার আসুন মুদ্রাস্ফীতি। ওয়ার্ল্ড ডাটা ডট ইনফো এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোক্তা মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার গত ৩৪ বছরে (১৯৮৭-২০২১) শতকরা ২ ভাগ থেকে সাড়ে এগারো  ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রতি বছর শতকরা ৬ দশমিক ৪। সামগ্রিকভাবে, মূল্য বৃদ্ধি ছিল শতকরা ৭২৫ ভাগ। ১৯৮৭ সালে যে পণ্যের দাম ছিল এক শ টাকা, তা চলতি বছরের শুরুতে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ টাকা। ৮৭ থেকে ৯৪ মাত্র ৭ বছরের ব্যবধান। ডলারের মূল্যমান ও মুদ্রাস্ফীতির হার অনুধাবন করতে পারলে ২৭ বছর আগের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা কেমনে ৩২ হাজার কোটি টাকা হলো সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য গড়পড়তা কথা না বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিন। কোথায় কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলুন। তাতে আমাদের মত আম জনতার বুঝতে সুবিধে হয়।

বিএনপি'র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তো সংসদে ঐকিক নিয়ম শেখালেন। কিলোমিটার প্রতি সেতুর খরচ দেখালেন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে খরচ কেন বেশি? সব কি আর ঐকিক নিয়মে চলে? সেতুর ডিজাইন দেখুন। প্রস্থ দেখুন। নদীর গতি-প্রকৃতি দেখুন। পাইলিং, পিলার, স্প্যান দেখুন। ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা সেতু। পদ্মা সেতু একটি দ্বিতল সেতু। ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে নদী শাসন করতে হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধুমাত্র নদী শাসনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুতে বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম পাইল। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর। যে হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে সেটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। হ্যামারের জন্য নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন। আর পদ্মার? ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা থেকে ১৩৬ গুণ বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মার  ৫০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতু থেকে পদ্মা সেতুর খরচ কেন বেশি - এটা বোঝার জন্য কি আর প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির সময় চট্টগ্রামবাসী সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে। আপামর জনসাধারণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মন্ত্রীরা গেলেন ঘটনাস্থলে, হাসপাতালে। অথচ ক্ষমতার বাইরের বড় বড় রাজনীতিবিদরা গেলেন না সেসব জায়গায়। তাঁরা অফিসে বসে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখিয়ে গেলেন। বড় বড় কথা বলে গেলেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর হলেন। চট্টগ্রাম না হোক, ঢাকার বার্ন ইউনিট এ যেয়ে কজন রোগী দেখে, তাঁদের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখতে পারতেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো এমন ছিল না। দুদশক আগেও তো সব রাজনৈতিক দল এমন দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। প্রতিযোগিতা হত সহযোগিতার। দুদশক আগের সেই সহমর্মিতার রাজনীতিতে যেন পচন ধরেছে। বিরোধী রাজনীতি যেন দলীয় কার্যালয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনমুখীতা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার বন্যার কথাই ধরুন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন। মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনগুলো রয়েছে মাঠে, পানিতে, ত্রাণ তৎপরতায়। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোথায়? আবারো সেই অফিসে। টিভি ক্যামেরার সামনে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। মাঠে থেকে করুন। বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে করুন। জনগণের পাশে থেকে করুন। ত্রাণ দিন, আর সমালোচনা করুন। সে সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্য সহকারে। দেশবাসী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পচন আর দেখতে চায় না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

একটুখানি ইতিহাস

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail একটুখানি ইতিহাস

আজ সূর্যোদয়ের অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠি। কর্মহীন থাকার কারনে আমি এখন কোনো রুটিনের মধ্যে বাঁধা নেই। মনেই পড়ছে না, শেষ কবে এত ভোরে উঠে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। ড্রেস আপ সেরে তাড়াতাড়ি নিচে নামি। আমার প্রিয় ও অনুজ সহকর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরী আমার জন্য একটি গাড়ি পাঠান। গাড়িতে পা রাখতেই দেখি, আমার অসুস্থ চালক এসে হাজির। তাৎক্ষণিক মত পাল্টিয়ে নিজের গাড়ি এবং ড্রাইভারকেই নিই। শর্দি জ্বরে সে তিনদিন অনুপস্থিত ছিলেন। বসেই বললাম, চল মাওয়া ঘাটে যাব। হানিফ উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ট্রাফিকহীন ও টোলমুক্ত রাস্তা পেয়ে অসংখ্য সরকারি গাড়িকে অনুসরণ করে চলেছি। আষাঢ় মাস। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের বিচ্ছিন্ন আনাগোনা। গত ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে সিক্তস্নাত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। সকালের রৌদ্রময় উজ্জ্বল আভায় রাস্তার দু'পাশের গাছপালা ঝলমল করছে। আহা! কী নয়নাভিরাম ও নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতন। আমি কী সড়ক পথে জেনেভা থেকে জুরিখে যাচ্ছি? অন্য কোনো সহযাত্রী না থাকায় চালককেই বললাম, দ্যাখো তো খোরশেদ, এটা কী আমাদের চিরকালের চিরচেনা বাংলাদেশ? নাকি ঢাকার অদূরে নতুন কোনো শহর হয়েছে? বিস্ময়কর হলেও সত্য, আজ পুরো পথটাই পদ্মা সেতু হয়ে অপরূপভাবে সেজে আছে। আসলেই ইউরোপ, আমেরিকার সুদীর্ঘ হাইওয়ের মতন এক মসৃণ সিল্কি পথ পাড়ি দিচ্ছি। আমরা পোস্তগোলা ব্রীজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, আবদুল্লাহপুর, হাসাড়া, শ্রীনগর হয়ে পদ্মাব্রীজ টোলপ্লাজা অবধি মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যাই। 

* মঞ্চের গায়ে খচিত শ্লোগানটা আমার নজর কাড়ে। 'আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু'। এ উদ্বোধনীকে কেবল একটি জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। আজ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও একটি দেশের সক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ এবং সামর্থ্যের ইতিবাচক মেসেজ। বলা যাবে না, মহা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, তবে সুন্দর গোছানো ও বাহুল্য বর্জিত অনুষ্ঠান ছিল। জানা যায়, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ৩৫০০ জন। অনুষ্ঠানে গিয়ে মনে হয়েছে, সেতুটি আজ কোনো বক্তৃতার বিষয় হয়ে উঠেনি বরং গভীর আগ্রহ ভরে অপেক্ষমান মানুষের দেখার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কথা বলেছেন মাত্র তিনজন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেতু মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আজ বাঙালিরা নিজের মাতৃভূমিতে বসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মার ওপর নির্মিত অভূতপূর্ব এক স্থাপনাকে অবলোকন করছে। এ উৎসব মুখরিত পরিবেশকে অনেকে দ্বিতীয় বিজয় দিবস বলে আখ্যায়িত করেছেন।  

* দেশে সিলেট অঞ্চলে বন্যা আছে। মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও পুনঃবৃদ্ধি পাচ্ছে। টেস্ট করালেই পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। শনাক্তের হার ১৪.১৮ হয়েছে। যা মধ্যে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। জানা যায়, গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬৮৫ জন। কাজেই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী স্থলে যাওয়ার জন্য করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। সিভিল সার্ভিসের সদ্য সাবেক এবং বর্তমান সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সংক্রমণের কারনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবও যোগদান করতে পারেননি। তবে অনুষ্ঠানটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপন করা হয়েছে। সেতু বিভাগ কর্তৃক মাস্ক, স্যানিটাইজার, লোগো সম্বলিত কোটপিন এবং স্যুভেনির ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক,শিক্ষাবিদ, আমলা, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংস্কৃতি কর্মী, অভিনেতা প্রায় সকলই আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর অংশ নেয়া চোখে পড়ার মতো ছিল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও অনেকটা ঘুরে তাঁর পাশে আসন পান। করোনা পরবর্তী বিরতিতে অনেক প্রবীন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হওয়া ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। গাড়ি পার্কিং দূরে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বৃক্ষহীন, ছায়াহীন স্থানে দাঁড়িয়ে মধ্যাহ্ন রোদের প্রখরতায় দাহ হয়েছেন অনেক অশীতিপর অতিথি। 

* তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিগত ২০০১ সালের ৪ জুলাই এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে সেতুর কাজ শুরু হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দুই স্তর বিশিষ্ট। উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ ও নিচের স্তরে রয়েছে একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিমি, পিলার নদীতে ৪০টি, উচ্চতা ১৩.৬ মিটার, প্রস্থ ২১.৬৫ মিটার, এ্যাপ্রোচ রোড মাওয়া-জাজিরা, নদী শাসন দু'পাড়ে ১৪ কিমি, পানির স্তর থেকে উচ্চতা ৬০ ফুট, জনবল ৪ হাজার। পৃথিবীতে দক্ষিণ আমেরিকার  আমাজনের পরে সবচেয়ে খরস্রোতা নদী নাকি পদ্মা। এ সেতুর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগের আওতায় এসেছে। সরাসরি উপকৃত হবে ৩ কোটি মানুষ। দুই তীরে গড়ে উঠবে আধুনিক শহর। সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে। টোল আদায় হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এ সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়েছে সাড়ে সাত বছরে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে রেল যোগাযোগও চালু হবে। এ সেতু নির্মানে ৪টি নতুন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সারা বিশ্বে প্রথমবারের মতন সম্পাদন করা হয়েছে এমন ৩টি বিষয় এবং বাংলাদেশে ৭টি নতুন বিষয় প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। সেতুর নির্মান ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। 

* ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সংযুক্তি ও সমৃদ্ধির  জনপদ। বিচ্ছিন্নতার অযুহাত এবং অবকাশ থাকবে না আর। সূর্যাস্তের আগেই কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একাকার হবে গোটা দেশ। রাজধানী কিছুটা হলেও চাপমুক্ত, ভারমুক্ত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হতে পারে। এবং রেললাইন চালু হলে সাধারণ মানুষের নিত্য যাতায়াত হবে অধিকতর সুবিধাজনক। 

* এদেশে নদী হিসেবে পদ্মা সবসময়ই আলোচিত হয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশে এ নদীর দৈর্ঘ ১২০ কিমি ও গড় প্রস্থ ১০ কিমি। ভাষায়, শিল্পে সাহিত্যে, গানের বাণীতে, গীতিতে পদ্মার ঢেউ এসেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যােপাধ্যয় বা অন্নদাশঙ্কর রায় সবাই পদ্মার রূপ- রস, প্রমত্ততা,ভাঙা-গড়া আর জেগে ওঠা চরের সিকস্তি পয়স্তি কাহিনি চিত্রায়নের অনুপম কারিগর ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান শ্লোগান মানে পদ্মা দিয়ে শুরু-- 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেতু অতিক্রম করলেই নতুন প্রশাসনিক বিভাগের নামও পদ্মা। তাই অনুষ্টান স্থল থেকে ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম, সেতুটি কেবল বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নয়, পদ্মাও যেন আমাদের ভাগ্যবতী মা। 

১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

পদ্মা সেতু   ইতিহাস  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন