ইনসাইড থট

নাশকতাই বিএনপির একমাত্র ভরসা


Thumbnail নাশকতাই বিএনপির একমাত্র ভরসা

আগামী ২৫ জুন যখন গোটা জাতি স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের অপেক্ষায়, বাঙালি তার অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অতিক্রম করতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বিএনপি এবং তার মিত্ররা হিংসা আর ক্ষোভের আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাড়খাঁর হচ্ছে। তারা বাংলাদেশের এই মহা অর্জনের উৎসবকে ম্লান করার লক্ষ্যে নাশকতার আশ্রয় নিয়েছে। জুন মাসের শুরু থেকেই তারা পরিকল্পিতভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ করছে। অগ্নিসংযোগের ঘটনার স্থানগুলো এবং এসব অগ্নিসংযোগের সময়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট বুঝা যায়, জাতির গৌরবের এই মহা অর্জন উদযাপনের ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে নস্যাৎ করাই তাদের উদ্দেশ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ষড়যন্ত্র আর প্রতিবন্ধকতা নস্যাৎ করে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতো বিশ্ব মোড়লদের খবরদারীকে অগ্রাহ্য করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা তাঁর আকাশচুম্বী মনোবল, ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, অসীম সাহস এবং অতুলনীয় মেধা ও দক্ষতা দিয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভৌতকাঠামো পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাঙালির স্বপ্নজয় করেছেন।

এটি আজ কারো বুঝতে বাকি নেই, বাঙালির এই স্বপ্নজয়কে বিএনপি এবং তার দোসররা মেনে নিতে পারছে না। তাই তারা নাশকতার এই ঘৃণ্য পথ বেঁচে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, পদ্মা সেতু উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে তারা বড় ধরণের নাশকতার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই ধরণের তথ্য সরকারের হাতে রয়েছে। তারা আমাদের জাতীয় অর্জনগুলোকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। যেকোনো মূল্যে তারা এগুলোকে ম্লান করতে চায়। এই অপশক্তি জাতিকে কিছু দিতে পারেনি, তাদের কিছু দেযার সক্ষমতা নেই আর দেয়ার মানসিকতাও নেই। তাদের কাছে দেশের স্বার্থের কোন গুরুত্ব নেই। নিজের হীনস্বার্থে তারা জাতীয় স্বার্থ সহ যেকোনো স্বার্থ এমনকি মানবতাকেও আঘাত করতে পারে। বঙ্গবন্ধু কন্যার অর্জনগুলোকে তারা নস্যাৎ করতে চায়। এই জন্য তারা নাশকতার আশ্রয় নিয়েছে। 

জাতীয় স্বার্থ বিরোধী নানা অপকর্মের কারণে এবং মানুষের পাশে না থাকার কারণে বিএনপি আজ গণবিচ্ছিন্ন। তারা নির্বাচনকে ভয় পায়। মানুষের কাছে ভোট চাওয়ার নৈতিক অধিকার তাদের নেই। মানুষ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সেটি জানে। তাই তারা  নির্বাচন প্রতিহত করতে চায়। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করে তারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। সেই লক্ষ্যে তারা নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে।

নাশকতা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার নেই। এটিই তাদের একমাত্র পথ। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তারা নির্বাচন প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে  অসংখ্য মানুষকে তারা পুড়িয়ে মেরেছে। অনেকে এখনো যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে। এর মধ্যে অসংখ্য নারী ও শিশু রয়েছে। অপরাধের হিংস্রতা ও তীব্রতা বিবেচনায় এই ধরণের অপরাধ মানবতা বিরোধী অপরাধের পর্যায়ের। এদেশে প্রকাশ্যে এই ধরণের ঘৃণ্য অপরাধ করেও বিএনপি এখনো রাজনীতি করার নৈতিক শক্তি পায় কীভাবে, সেটি আমার প্রশ্ন। এরা দেশের শত্রু, এরা জাতীয় স্বার্থকে বিপন্ন করতে চায়, এরা বার বার মানবতার উপর আঘাত করতে চায়। সময় এসেছে এদের প্রতিরোধের। মানবতা বিরোধী এই দুষ্টচক্রকে আমাদের রুখে দিতে হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায়, মানুষের জীবন- জীবিকা রক্ষায় এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে জাতি হিসেবে আমরা যতগুলো অর্জন পেয়েছি, তার প্রত্যেকটিই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অথবা তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার কারণে। বঙ্গবন্ধু এবং শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেও এদেশের জন্য কিছু দিয়ে যেতে পারেনি। জাতির পিতা স্বাধীনতা এনেছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, স্বাধীনতাকে টেকসই করার লক্ষ্যে সফলভাবে সারা বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করেছেন, দেশের ভূখণ্ডকে নিরাপদ রাখতে সাফল্যের সাথে স্থল সীমানা চুক্তি সম্পাদন করেছেন এবং তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বার্থকে বহুলাংশে প্রাধান্য দিয়ে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশ যে অতিরিক্ত ভূমি (৪১ বর্গ কিলোমিটার ) পেয়েছে, তার আয়তন বিশ্বের ৬ টি দেশের আয়তনের চেয়ে বড়ো। শেখ হাসিনা গঙ্গা চুক্তি করে  দেশের পানির অধিকার রক্ষা করেছেন, পার্বত্য জেলাগুলোতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করার জন্য শান্তি চুক্তি করেছেন, ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ে সমুদ্রে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন, দেশকে স্বল্পোন্নত রাষ্ট্র থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত করেছেন, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, ভৌত কাঠামো নির্মাণসহ সহ সকল ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সফলতা দেখিয়ে আকাশচুম্বী উন্নয়ন করেছেন।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিবেচনায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের মডেল রাষ্ট্র। টেকসই উন্নয়নের অগ্রগতিতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে চ্যাম্পিয়ন। পুরো পৃথিবীতে এতো অল্প সময়ে অন্য কোন রাষ্ট্র এই রকম সফলতা অর্জন করতে পারেনি। এই সকল অর্জনের মূল নায়ক জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা। জাতির পিতার পর তিনিই বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন। তাঁর কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রাষ্ট্রকে  টেকসই ও নিরাপদ রাখার জন্য একশো বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছেন। সে লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় কার্যকরী প্রকল্প গুলোও বাস্তবায়ন করছেন।

বিএনপি এবং তাদের সহযোগীদের বালান্সশীটে ভালো কিছু নেই। আছে শুধু অপকর্ম। হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র, নাশকতা আর পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে নানা দেশবিরোধী কর্মকান্ড। যতদিন তারা ক্ষমতায় ছিল, দেশের জন্য কোন ইতিবাচক কাজ করতে পারেনি। বরং দেশের স্বার্থকে তারা সবসময় বিকিয়ে দিয়েছে। তাদের ঝুড়িতে একটিও সাফল্য নেই। তারা আজ বাংলাদেশ বিরোধী নানা ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অদম্য উন্নয়নে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে নাশকতাকেই তারা একমাত্র অবলম্বন মনে করছে। তবে এই অপশক্তিকে রুখে দেয়ার শক্তি ও সামর্থ আমাদের রয়েছে। এই অপশক্তিকে সামাজিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। এখন সময় এসেছে এদের বর্জন করার।

নাশকতা   বিএনপি   পদ্মা সেতু  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বেগম মুজিব বলেছিলেন ‘সাত মার্চ তোমার মনে যা আসবে তাই বলবে’


Thumbnail বেগম মুজিব বলেছিলেন ‘সাত মার্চ তোমার মনে যা আসবে তাই বলবে’

৬ মার্চ ১৯৭১। অবিস্মরণীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের ঐতিহাসিক সেই ঘোষণার মাহেন্দ্রক্ষণের আগের দিন। স্বাধীনতার পতাকা ও স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষনাকারী ছাত্রলীগের পক্ষে যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের জোর দাবি ৭ মার্চই যেন জাতির পিতা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এ প্রশ্নে আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত। নবীন নেতারা স্বাধীনতার ঘোষণা চাইলেও প্রবীন নেতারা মনে করছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা হবে চরম আত্মঘাতী। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরাও বিভক্ত। বঙ্গবন্ধুই যাদের তিল তিল করে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করেন, সেই শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে তখন একাট্টা। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতেই ২ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং ৩ মার্চ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষনা করে ফেলে।

জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা ও আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যরাও এ প্রশ্নে মতানৈক্যে জড়িয়ে পড়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হাইকমান্ড আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রাদেশিক পরিষদ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এএইচএম কামরুজ্জামান, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ (পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তাজউদ্দীনের নামটি দুই নম্বরে উঠে আসে) ও জাতীয় পরিষদ সদস্য ডঃ কামাল হোসেনও ৭ মার্চই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন।  

অনেক নেতা ভাষণের পয়েন্ট লিখেও এনেছিলেন। জাতীয় পরিষদ নেতা ও পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সকলের কথা শুনলেও সুস্পষ্ট করে নিজের মত দেয়া থেকে ছিলেন বিরত। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের আহুত জনসমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শয়ন কক্ষে ডেকে প্রিয়তমা সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মতামত জানতে চান। বঙ্গমাতা বেগম মুজিব একবাক্যে বলেন,"তোমার মন থেকে যা আসবে তাই বলবে।

বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে নেতৃত্বের ওপর বেগম মুজিবের ছিলো ব্যাপক প্রভাব। ১৯৬৮-১৯৬৯। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে পুরোদেশ। দিকবিদিকশুন্য মানুষ। ছাত্রজনতার আন্দোলন তুঙ্গে। চারদিকে কানাঘুঁষা। ঠিক সেই মুহূর্তে মুজিবের প্যারোলে পিন্ডি যাওয়ার ছড়ানো ছিটানো কথাবার্তা। তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের গণঅভ্যুত্থান তখনো সংঘটিত হয়নি। ঠিক তখনি নিজ স্বামীকে উপর্যুক্ত বার্তাটি  দিয়েছিলেন বেগম মুজিব। সত্যি প্যারোলে নয়, শেখ মুজিব মুক্তি নিয়ে ছাত্রজনতা কর্তৃক "বঙ্গবন্ধু" হয়ে ওঠেন। যাহোক স্বামী "বঙ্গবন্ধু" হয়ে ওঠার আগে একরকম বহু দূরদর্শিতার পরিচয় দেন বেগম মুজিব। কারামুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান প্রশ্নে নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্তির সময়ে কারগারে গিয়ে দেখা করে স্বামী শেখ মুজিবকে বলেন, তোমার একদিকে আইয়ুব খান, অন্যদিকে সারাদেশের মানুষ, তাই তুমি যদি এখন প্যারোলে পিন্ডি যাওয়া স্থির করো, তাহলে আমি কিন্তু ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে আত্মঘাতী হবো।  

ফজিলাতুন্নেছা রেণুর ওই অসীম সাহসী উচ্চারণের প্রতি প্রিয়তম স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের ছিলো পরম সানুগ্রহ। তাঁর সজ্ঞা স্থির চিন্তাভাবনার দ্বারা বঙ্গবন্ধু প্রভাবিতও হতেন। জগৎসংসারে নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দেবার উদাহরণ খুবই বিরল। আর তা যদি হয় স্বাধীনতার জন্যে- স্বাধীনতার মহানায়কের জন্যে তাহলে তা তো অতি বিরল! সেই অতি বিরল মানুষটি বেগম ফজিলাতুন্নেছার আজ জন্মদিন।

বেঁচে থাকলে যাঁর বয়স ৯৩ বছর হতো। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন বড় বিচিত্র, বড় ঘটনা বহুল। শেখ মুজিবের সঙ্গে তাঁর বিয়ের গল্পটাও এক রূপকথার গল্প। মুজিবের বয়স তের। রেণুর বয়স মোটে তিন।

প্রসঙ্গত, হযরত বায়েজিদ বোস্তামী পঞ্চদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে (ইসলামাবাদ)আসেন। সঙ্গীদলের অন্যতম ছিলেন দরবেশ শেখ মোহাম্মদ আউয়াল। বাগদাদের হাসানপুরে জন্মগ্রহণকারী শেখ আউয়াল বংশের অষ্টম পুরুষ হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ আউয়াল ঢাকার সোনারগাঁও এসে ঘাঁটি বাঁধেন। তিনি বিয়ে করে সোনারগাঁও বসবাস শুরু করেন। শেখ আউয়ালের পুত্র জহিরউদ্দিন কোলকাতায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। জহির উদ্দিনের পুত্র শেখ জান মাহমুদও কোলকাতা পাইকারি ব্যবসায়ী ছিলেন। শেখ জান উদ্দিন মাহমুদের পুত্র শেখ বোরহান উদ্দিন পূর্ববঙ্গে আসেন এবং এখানেই ব্যবসায় মনোযোগ দেন। এক পর্যায়ে টুঙ্গিপাড়ার কাজী পরিবারে বিয়ে করেন। শেখ বোরহান উদ্দিনের তিন পুত্র শেখ একরাম, শেখ তাজ এবং শেখ কুদরত উল্লাহ। কুদরত পিতার ন্যায় কাজী পরিবারেই বিয়ে করেন। তাঁর তিনপুত্র শেখ মজিদ, শেখ হামিদ ও শেখ রশিদ। শেখ মুজিবুর রহমানের পিতা হলেন শেখ হামিদের পুত্র। আর শেখ মুজিবের মা হলেন শেখ মজিদের কন্যা। অর্থাৎ শেখ মুজিবের পিতা-মাতা হলেন আপন চাচাতো ভাইবোন। শেখ মুজিব এবং শেখ ফজিলাতুন্নেছাও আপন চাচাতো ভাইবোন।  

ঢাকা থেকে ৬০ মাইল দক্ষিণ পশ্চিমে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া। শেখ রশিদ ভাইয়ের পুত্র শেখ লুৎফরকে একদিন বললেন, তোমার বড় ছেলের সাথে আমার নাতনী ফজিলাতুন্নেছার বিবাহ দিতে হবে। কারণ আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাবো। রেণুর দাদা শেখ লুৎফর রহমানের চাচা। মুরব্বী বলে কথা। শেখ মুজিবের সঙ্গে রেণুর বিবাহ রেজিস্ট্রি হলো। রেণুর বয়স তখন তিন বছর। পাঁচ বছর বয়সে রেণু তাঁর মা হারান। ফলে সাত বছর বয়সে রেণুকে নিয়ে আসা হয় শেখ মুজিবের মা সায়েরা খাতুনের কাছে। কন্যাস্নেহে সায়রা খাতুন ফজিলাতুন্নেছাকে লালনপালন করেন।  

১৯৪২ সালে শেখ মুজিব ও শেখ ফজিলাতুন্নেসার মধ্যে ফুলশয্যা হয়। যখন শেখ মুজিব রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন পুরোদমে। কলকাতা চলে যান এর পরপরই। পাঁচ বছরের মাথায় জীবনের এক মহামুহূর্ত হাজির হলো- ২৮ সেপ্টেম্বর -১৯৪৭। মুজিব-রেণু দম্পতির প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা ভুমিষ্ঠ হলেন। মানুষের বেদনা ভিন্ন নয়, কিন্তু বেদনার ঊর্ধ্বেও আছে মানুষের গৌরব।

দেশবিভাগের ঘোরে তন্দ্রাবেশী শেখ মুজিব ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন কলকাতায়। টেলিগ্রাম পেয়েও সন্তান হবার খবরে খুশি হলেও ছুটে আসতে পারেননি সুশীতল ছায়াচ্ছন্ন টুঙ্গীপাড়ার নিজ ভিটেমাটিতে। চেতনা, প্রতিজ্ঞা ও স্বপ্ন নিয়ে কাজ করবার দিন হয়ে উঠেছিল সেই সময়গুলো। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেঙে গিয়েছিল বাংলা বিভাগে। তাই সঙ্কুচিত কণ্ঠ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন শেখ মুজিব। "আমার নেতা" বলে সম্মোহিত করা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতার পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় ঘাট বাঁধেন শেখ মুজিব। ভালোদিন পথের বাঁকেই অপেক্ষা করছে, যেন একটু এগিয়ে যেতে হবে। দ্রুত মুজিবীয় কণ্ঠের সাবলীল উচ্চারণ মানুষের মুখে মুখে, আড্ডায়-আলাপ ছাপিয়ে রাজনীতির মাঠে ময়দানের উপাদান হয়ে উঠলো। সেবক ও সহচরের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে অজেয় শক্তিতে পরিণত করলো। আর এ ক্ষেত্রে যিনি স্বামীকে পথ বাতলে দিলেন তিনি বেগম ফজিলাতুন্নেছা।   

মহান ভাষা আন্দোলনের বীর শেখ মুজিব কারামুক্ত হলেন। ১৯৫৩ সাল। স্বামীর কাছে চিঠিতে ঢাকায় আসার ইচ্ছাপোষণ করলেন। কিন্তু শশুর বাঁধ সাধলেন। রাগস্বরে বললেন, রেণু, ওর নিজেরই কোন স্থিতি নেই এখন এ অবস্থায় তোমার যাওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু শেখ মুজিব নিজেই গিয়ে নিয়ে আসলেন পত্নীকে। উঠলেন ফুফাতো ভাই মমিনুল হক খোকার ঢাকার ৮/৩ রজনী বোস লেন, ঢাকার একটি ছোট্ট বাসায়। আওয়ামী লীগ গঠন ও তার যুগ্ম সম্পাদক হওয়ার পর শেখ মুজিবের ছোট্ট কক্ষেই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের দেনদরবার হতো। এরই মধ্যে এলো যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয়। ১৯৫৪ সালের ১৪ মে সকাল দশটায় শেরেবাংলা ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে শেখ মুজিবও মন্ত্রী হলেন। রাতে আদমজীতে সৃষ্টি করা হলো দাঙ্গা। শেখ মুজিব ওদিনই রজনী বোস লেনের বাসা ছেড়ে উঠলেন মিন্টোরোডের সরকারি বাসায়। কিন্তু দাঙ্গার পর ৯২-ক ধারা প্রয়োগ করে মন্ত্রিসভা বাতিল করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী শেরেবাংলাকে আখ্যায়িত করলেন পাকিস্তানের দুশমন হিসাবে। শেখ মুজিব বাসা ছেড়ে নাজিরা বাজারে গিয়ে উঠলেন (প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের বাসায়)। কিন্তু মুজিব পরিবার বেকায়দায় পড়ে গেলো। প্রবল বন্যায় নাজিরা বাজার ডুবে গেছে। ফলে তৎকালীন ঢাকা নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি হাফেজ মোহাম্মদ মুসার আরমানিটোলা বাড়িতে গিয়ে উঠতে হলো। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারে। শুধু তাই নয় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারেও আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিবুর রহমান শিল্প, বাণিজ্য ও দুর্নীতি দমন মন্ত্রী। এবার উঠলেন আব্দুল গণি রোডস্থ সরকারি বাসভবনে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের আরেক বিশিষ্ট ভুমিকার কথা উল্লেখ করছি। তখনো পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠেনি। ১৯৫৬ সালেও বাংলা সিনেমা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমদানি করা হতো। উত্তম-সূচিতা জুটি তখন তুমুল জনপ্রিয়। একদিন বেগম মুজিব তাঁর পতিকে বললেন, "ভারতীয় ছবিগুলো দেখানো হচ্ছে বেশ ভালো, আমরা বিনোদনের সুযোগ পাচ্ছি। তবে আমাদের দেশেও তো প্রতিভা আছে। এ দেশেও তো গড়ে উঠতে পারে সিনেমা শিল্প, কেন হচ্ছে না? পত্নীর প্রশ্নের জবাবে শেখ মুজিব বললেন, "সিনেমা করার জন্য যে অবকাশ দরকার তা কোথায় এখানে? বঞ্চনা তো সর্বক্ষেত্রেই।

পার্টিশনের আগে পশ্চিম পাকিস্তানী চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলো বোম্বেতে। কিন্তু গত ৯ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে উঠেছে চলচ্চিত্র শিল্প। কিছুূদিনের মধ্যেই শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি অর্থানুকূল্যে স্টুডিও গড়ার উদ্যোগ নিলেন। তাঁর নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পরামর্শ করলেন। কদিনের ব্যবধানে ফ্লিম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এফডিসি) নামে স্বায়ত্তশাসিত একটি সংস্থা গঠনের অনুমোদন আসলো কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে। সঙ্গে এক কোটি টাকার অনুদান। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এভাবেই বিভিন্ন ভুমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন।

ভালোদিন পথের বাঁকেই অপেক্ষা করছে, যেন একটু এগিয়ে যেতে হবে। দ্রুত মুজিবীয় কন্ঠের সাবলীল উচ্চারণ মানুষের মুখে মুখে, আড্ডায়-আলাপ ছাপিয়ে রাজনীতির মাঠে ময়দানের উপাদান হয়ে উঠলো। সেবক ও সহচরের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে অজেয় শক্তিতে পরিণত করলো। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্প্রীতির মায়াজাল তাতে ছিন্ন হলো। একজন ছিপেছিপে, দীর্ঘদেহী, ঘন ওল্টানো চুল মাথায়, খবরের কাগজ হাতে দাঁড়ানো শেখ মুজিব বক্তৃতায় বক্তৃতায় একদিন স্বপ্ন দেখলেন বাঙালি জাতির দেশ ও রাষ্ট্রস্বপ্নের কথা।  
  
১৯৫৩ সালে শেখ মুজিবের পরিবারের ঢাকায় আসা। কবি সুফিয়া কামাল যেদিন নারী শিক্ষা মন্দিরে (বর্তমান শেরে-বাংলা বালিকা বিদ্যালয়) শেখ হাসিনার হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বলে দিয়েছিলেন, সেদিনও মেয়ের পাশে ছিলেন শুধু মা। বাবা শেখ মুজিব ছিলেন কারাগারে।  

আজকের যে প্রাণবন্ত একটি মানুষ শেখ হাসিনা। তার কারিগর মা ফজিলাতুন্নেছা। যার হাসিমাখা শ্যামলীময়া মুখখানিতে মায়েরই প্রতিচ্ছবি। আত্মপরিচয় এবং আত্মস্বার্থ কতখানি বিসর্জন দিয়ে শেখ হাসিনার সেবক হয়ে ওঠাও যেনো মায়ের আদর্শ ব্রত হয়ে পাওয়া। স্বামীর নিত্য সাহচর্যে ছিলেন না ফজিলাতুন্নেছা। রয়েছে তার ঘটনা পরস্পরা ও অশ্রুতপূর্ব  বিরল বিষাদময় কত জানি ঘটনা।  
  
সর্বংসহা, ধৈর্যের প্রতিমূর্তি, শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও যাকে দেখা যায়নি এক মুহূর্তের তরে বিচলিত, সংগ্রামী স্বামীকে অহর্নিশ প্রেরণাদানকারী, মরণেও হয়েছেন যার সঙ্গী, সেই রমনী ফজিলাতুন্নেসার পরিবারের গল্পে অশ্রুসজল হয়ে ওঠে আমাদের মানবিক চোখ।   

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন সদা হাস্যোচ্ছ্বল এক প্রাণময়ী নারী। পুরুষোত্তম স্বামীর সংগ্রামী আদর্শে উজ্জীবীত মহীয়সী নারী। তাইতো  সর্বংসহা মায়ের অসীম ধৈর্যই সর্বংসহা, ধৈর্যের প্রতিমূর্তি, শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও যাকে দেখা যায়নি এক মুহূর্তের তরে বিচলিত, সংগ্রামী স্বামীকে অহর্নিশ প্রেরণাদানকারী, মরণেও হয়েছেন যার সঙ্গী, সেই রমনী ফজিলাতুন্নেসার পরিবারের গল্পে অশ্রুসজল হয়ে ওঠে আমাদের মানবিক চোখ।   

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন সদা হাস্যোচ্ছ্বল এক প্রাণময়ী নারী। পুরুষোত্তম স্বামীর সংগ্রামী আদর্শে উজ্জীবীত মহীয়সী নারী। তাইতো  সর্বংসহা মায়ের অসীম ধৈর্যই বুঝি শেখ হাসিনার জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যাবার পুঁজি। আজ পিতার সোনারবাংলা গড়ার দৃপ্ত শপথ নেয়া চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা যখন বিয়ের পিঁড়িতে, তখন পিতা শেখ মুজিব ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। '৬৭ সালের কথা। ফজলুল হক হলের ভিপি এমএ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের বন্দোবস্তটা মূলত তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারাই করেছিলেন বেগম মুজিবের পরামর্শে। আত্মীয়-পরিজনহীন বিয়ের আসরের নাটকীয় পরিবেশ হয়তো কোন দিন মুছে যাবার নয়। চট্টগ্রামে বিবাহোত্তর সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে যার মধুরেণ সমাপয়েৎ।  
 
'৬৭ সালে ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে ভিপি পদে মেয়ে শেখ হাসিনার জয়ের খবরটিও পৌঁছে দিয়েছিলেন কারাগারে অন্তরীণ স্বামীকে। আগরতলা ষষড়যন্ত্র মামলার পর একাত্তর। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর ছেড়ে ১৮ নম্বর রোডের বাসাতে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রহরায় অন্তরীণের দুঃসহ দিনগুলোর কথা।   

১ এপ্রিল থেকে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়া শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলকে নিয়ে খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায় একটি বাসায় ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই রাত আট টা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. ওয়াদুদের তত্ত্বাবধানে জন্ম হলো জয়ের। পাশে ছিলেন লিলি ফুপু বঙ্গবন্ধুর ছোট বোন এটিএম সৈয়দ হোসেনের স্ত্রী।

নানী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আদুরে নাম রাখেন স্বামীর সঙ্গে মিলিয়ে সজিব। শেখ হাসিনা তার সঙ্গে জুড়ে দেন তার স্বামীর নাম ওয়াজেদ। সেই সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। আর তার মা বাঙালির মুখে-অন্তরে "মানবতার মা"। যিনি নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন অনন্য এক উচ্চতায়, শেকড় থেকে শিখরে। ইতিহাসের এক অপূর্ব অধ্যায় , যাঁর শাসনামলে বিচার হয়েছে পিতৃহত্যা, মাতৃহত্যার,  ভাই-ভাবী হত্যার, চাচা-ফুফা হত্যার সর্বোপরি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড মামলার। বিচার হয়েছে এই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে ১৯৭১ এর পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিলো, সেই নরঘাতক যুদ্ধাপরাধীদেরও। বঙ্গবন্ধু কন্যা কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পুনর্প্রবর্তন হয়েছে বাহাত্তরের সংবিধানের মূল মন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।

গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে তাঁর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত  পদ্মাসেতু। শেখ হাসিনার জন্য ধন্য পিতা শেখ মুজিব, ধন্য মাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এমন সুযোগ্য  সন্তানের মাতা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিনে জানাই অনিঃশেষ শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিশ্চয়ই বঙ্গমাতাকে প্রিয়তম স্বামী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ন্যায় নসীব করেছেন জান্নাতুল ফেরদৌস।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ।

বেগম মুজিব   জাতির পিতা   আওয়ামী লীগ   বঙ্গমাতা   ফজিলাতুন্নেছা মুজিব  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

জননী সাহসিকা বঙ্গমাতা

প্রকাশ: ১০:০০ এএম, ০৮ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail জননী সাহসিকা বঙ্গমাতা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯৩তম শুভ জন্মদিনে তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। জাতির পিতার নাম স্বদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী পরম শ্রদ্ধায় উচ্চারিত হওয়ার নেপথ্যে ছিলেন তাঁর প্রিয় সহধর্মিণী। আমৃত্যু নেপথ্যে থেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পরম মমতায় বঙ্গবন্ধুকে আগলে রেখেছিলেন এই মহীয়সী নারী। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকগুলোতে জাতির জনককে বাস্তবোচিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ায় অনন্য ও ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৮ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জন্মগ্রহণ করেন। আজ তিনি বেঁচে থাকলে ৯৩ বছরে পদার্পণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের ১২টি বছর বঙ্গমাতা অপরিসীম দুঃখ-কষ্টে সংসার জীবন অতিবাহিত করেছেন। ’৫৪-তে তিনি ঢাকায় আসেন এবং গেন্ডারিয়ায় রজনী চৌধুরী লেনে বাসা ভাড়া নেন। ’৫৪-তে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হলে বঙ্গবন্ধু বন ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তখন গেন্ডারিয়ার বাসা ছেড়ে ৩নং মিন্টো রোডের সরকারি বাড়িতে ওঠেন। অল্প দিনের মধ্যেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ৯২-ক ধারা জারি করে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয় এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। মাত্র দুই সপ্তাহের নোটিসে বঙ্গমাতাকে বাসা খুঁজতে হয় ও নাজিরা বাজারে বাসা নেন। ’৫৫-তে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতি দমন ও গ্রাম প্রতিরক্ষা দফতরের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু পরিবার ১৫ আবদুল গণি রোডের বাসায় ছিলেন। এর কিছু কাল পর মন্ত্রিত্ব অথবা দলের দায়িত্ব গ্রহণের প্রশ্ন সামনে এলে বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে দলীয় সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বঙ্গমাতাকে বাসা বদল করতে হয়। এবার বাসা নেন সেগুনবাগিচায়। এ সময় বঙ্গবন্ধু টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হন। ’৫৮-এর ৭ অক্টোবর আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হলে ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। এবারও বঙ্গমাতা পরিবার-পরিজন নিয়ে অসহায় অবস্থায় বাসা খুঁজতে থাকেন এবং সেগুনবাগিচায় নির্মাণাধীন একটি বাড়িতে বাসা নেন। পরে সেটি পাল্টে ৭৬ সেগুনবাগিচায় অপর একটি বাড়ির দোতলায় ওঠেন। তখন বঙ্গবন্ধুর নামে ১৪টি মামলা। ’৬১-তে বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হয়ে আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি নেন। বঙ্গবন্ধু পরিবার ’৬১-এর ১ অক্টোবর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে ধানমন্ডি ৩২ নং-এর বাড়িটি হয়ে ওঠে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ঠিকানা। বঙ্গবন্ধু দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রত্যেককে দেখতেন নিজ পরিবারের সদস্যের মতো। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যগণও তাই মনে করতেন। নেতা-কর্মীদের বিপদ-আপদে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা তাদের পাশে দাঁড়াতেন পরম হিতৈষীর মতো। মমতা মাখানো সাংগঠনিক প্রয়াস নিয়ে কর্মীদের হৃদয় জয় করে নেওয়ার ব্যতিক্রমী যে ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর ছিল, সেই চেতনার আলোয় আলোকিত ছিলেন বঙ্গমাতা।

স্মৃতির পাতায় সযতনে সঞ্চিত কিছু ঘটনা আজও আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। ’৬৯-এর গণআন্দোলনে বঙ্গমাতার অবদান সবসময় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। একটা সময় ছাত্রলীগ এবং আমাদের খুব কঠিন অবস্থা গেছে। এমন দিনও গেছে আমরা ছাত্রলীগের অফিস ভাড়া দিতে পারিনি। ১৯৬৬-৬৭ সালের একটি ঘটনা মনে পড়ে। শ্রদ্ধেয় নেতা প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক তখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, জনাব মজহারুল হক বাকী সভাপতি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হলের (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি। আমি মোটরসাইকেল চালাচ্ছি, রাজ্জাক ভাই পিছনে বসা। গন্তব্য আগামাসি লেনে অবস্থিত ছাত্রলীগের অফিস। সেখানে যাওয়ার পর বাড়িওয়ালা আমাদের ডেকে বললেন, ‘আপনারা এখান থেকে চলে যান। তিন মাসের ভাড়া বকেয়া। আপনারা অফিস ভাড়া দিতে পারেন না। এখানে ছাত্রলীগ অফিস রাখা যাবে না।’ আমরা বাড়িওয়ালাকে সবিনয়ে অনুরোধ করলাম দয়া করে আমাদের কয়েক ঘণ্টা সময় দেন। তিনি আমাদের অনুরোধ রাখলেন। তখন বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ কারারুদ্ধ। আমরা সেখান থেকে ধানমন্ডি ৩২নং-এ বঙ্গমাতার কাছে গিয়ে আমাদের দুরবস্থার কথা বললে তিনি রাজ্জাক ভাইয়ের হাতে ২০০ টাকা দিলেন। এই ২০০ টাকা থেকে বাড়িওয়ালার তিন মাসের ভাড়া বাবদ মাসিক ৬০ টাকা করে ১৮০ টাকা পরিশোধ করলাম। বাকি ২০ টাকা দিয়ে আমরা একটি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেলাম। যখন গণআন্দোলন শুরু হয় তখন তিনি নিজে, আজ আমাদের যিনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে ইকবাল হলের-ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। সন্নিকটে শিক্ষকদের যে আবাসিক এলাকা, সেখানে গাড়িতে বসে থাকতেন। আমাদের ডেকে আর্থিক সাহায্য এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন।

১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ’৬৯-এর গণআন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি তথা ডাক-এর মিটিং ছিল পল্টন ময়দানে। ওইদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করায় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যেখানে বঙ্গবন্ধুর বিচারকার্য চলছিল সেখানে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। গাড়ি চালিয়েছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত স্বামী শ্রদ্ধেয় ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া। বঙ্গবন্ধু আমাকে বুকে টেনে আদর করে বলেছিলেন, ‘আজ তুই পল্টনে বক্তৃতা করিস।’ আমি বলেছিলাম, আমরা তো রাজনৈতিক দলের সভায় বক্তৃতা করি না। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকরা যেখানে বসা থাকবে তুই সেখানে থাকবি। তোকে দেখলেই মানুষ চাইবে। তুই বক্তৃতা করিস।’ একজন মানুষ প্রায় ৩৩ মাস কারাভ্যন্তরে বন্দি, অথচ তিনি যা বলেছেন অক্ষরে অক্ষরে তাই হয়েছে। জনসভা শুরু হলো, আমরা ছাত্রসমাজ গেলাম, সাংবাদিকরা যেখানে বসেন তার কাছাকাছি থাকলাম। ডাক-এর সভাপতি ছিলেন নুরুল আমিন। সভামঞ্চ থেকে নুরুল আমিনের নাম প্রস্তাব করা হলে জনসভার মানুষ সে-নাম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করল। মঞ্চ থেকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আমাকে মঞ্চে তুলে নিলেন। বঙ্গবন্ধুর ছবি বুকে ধারণ করে বলেছিলাম, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন আমাদের প্রিয়নেতা আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। উল্লেখ্য, আইয়ুব খান তখন সর্বদলীয় গোলটেবিল বৈঠক আহ্বান করেছিলেন। প্রশ্ন উঠেছিল গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়া হবে কিনা। আমরা বলেছিলাম, ‘যাওয়া হবে। তবে নেতৃত্ব দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি আমাদের প্রিয়নেতা শেখ মুজিব।’ এই পরিস্থিতি সামনে রেখে জনতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘শেখ মুজিবের মুক্তি ছাড়া আপনারা কী গোলটেবিল বৈঠক চান?’ লাখ লাখ মানুষ গগনবিদারী কণ্ঠে বলেছিল, ‘না, চাই না, চাই না।’ ইতোমধ্যে প্রিয়নেতাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে নেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল। সেই বিষয়টিও জনতার সামনে তুলে ধরে প্রশ্ন রেখেছিলাম, ‘আপনারা কী শেখ মুজিবের প্যারোলে মুক্তি চান?’ মানুষ বলেছে, ‘না না, চাই না।’ তখন নেতৃবৃন্দকে আমরা বলেছিলাম, ‘নেতৃবৃন্দ, আপনারা যাবেন। কিন্তু প্রিয়নেতা শেখ মুজিবকে ছাড়া আপনারা গোলটেবিল বৈঠকে বসবেন না।’ এটি ছিল প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যাওয়া-না যাওয়া প্রশ্নে জনতার ম্যান্ডেট।

বঙ্গবন্ধু নিজেও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে যেতেন না। বঙ্গবন্ধুকে যখন প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তিনি ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘আমি মুক্ত মানুষ হিসেবেই গোলটেবিল বৈঠকে যাব।’ তারপর ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্টে আটকাবস্থায় সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়। সারা দেশে দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি সেনারা বেয়নেট চার্জে নির্মমভাবে হত্যা করে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি রাখে। আমরা সিদ্ধান্ত নেই সান্ধ্য আইন ভাঙবো এবং শহরকে মিছিলের নগরীতে রূপান্তরিত করব। ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহারে বাধ্য করে, পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের জনসমুদ্রে প্রিয়নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা মামলায় আটক সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আমরা ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রদান করি। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় প্রিয়নেতাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়ে তাঁর বাসভবনে পৌঁছে দেওয়া হয়। দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) প্রিয়নেতাকে গণসংবর্ধনা জানিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম-তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল লাহোরে গিয়েছিল গোলটেবিল বৈঠকে। কিন্তু তাঁরা শর্তারোপ করেছিলেন, ‘আমাদের দলের নেতৃত্ব দিবেন শেখ মুজিবুর রহমান। যতক্ষণ তিনি না আসবেন, ততক্ষণ আমরা গোলটেবিল বৈঠকে বসব না।’ বঙ্গবন্ধুর জন্য গোলটেবিল বৈঠক অপেক্ষা করেছিল; ‘মুক্তমানব’ হিসেবেই বঙ্গবন্ধু সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এটিই বাংলার মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রেরণা দিয়ে তিনি ছায়ার মতো বঙ্গবন্ধুর নিত্যসঙ্গী ছিলেন। ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই দুটো লেখার পিছনেও রয়েছে বঙ্গমাতার অবদান। উনি বঙ্গবন্ধুকে বারবার অনুরোধ করেছেন, খাতাপত্র সরবরাহ করে বলেছেন যে, কারাগারে বসে তুমি এসব লেখ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠার শুরুতেই বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, ‘বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ ‘আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু-আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছেন। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।” বঙ্গমাতার অনুপ্রেরণায় তিনি লিখেছেন। সেদিনের সেই পা-ুলিপি আজ বই আকারে দেশবাসীর হাতে তুলে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা যারা ছাত্রলীগ করতাম কোনো কাজে বঙ্গমাতার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছেন। কঠিন দুঃসময়ের মধ্যেও আর্থিক সাহায্য করেছেন। আমরা ৫ টাকা, ১০ টাকা, ১০০ টাকার কুপন নিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতাম। এমন দিনও গেছে কেউ ১০০ টাকা দিলে আমরা তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ওই সময়েও বঙ্গমাতা সংগঠনের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আমাদের কর্মকান্ড সচল রেখেছেন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর যেদিন দেশ শত্রুমুক্ত হলো সেদিন আমরা বিজয়ীর বেশে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এলাম। ১৮ ডিসেম্বর আমি এবং আব্দুর রাজ্জাক-আমরা দুই ভাই হেলিকপ্টারে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পদার্পণ করি। চারদিকে ‘জয় বাংলা’ জয়ধ্বনির আনন্দ, ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না! প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শেখ রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবার যেখানে বন্দি ছিলেন সেখানে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর এডিসি ছিলেন এবং শেখ জামাল দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গমাতাকে কেউ বাসা ভাড়া দিতে চায়নি। শেখ মুজিবের স্ত্রীকে বাসা ভাড়া দিলে বাড়িওয়ালাকে পাকিস্তান আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। যদি-বা কষ্টে-সৃষ্টে পরিচয় গোপন করে বাসা ভাড়া পাওয়া গেছে, তা-ও আবার পরিচয় পাওয়ার পর কয়েক ঘণ্টার নোটিসে সেই বাসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। পরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গমাতাকে ধানমন্ডিস্থ ১৮নং-এর একটি বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখে। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বঙ্গমাতা কঠিন সময় অতিক্রম করেছেন।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী; তবু বঙ্গমাতা সরকারি বাসভবনে না, থেকেছেন ধানমন্ডির ৩২নং-এর অনাড়ম্বর বাসভবনে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দরজা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। সর্বস্তরের মানুষ যাতায়াত করত। বঙ্গমাতা সবাইকে হাসিমুখে গ্রহণ ও বরণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দলের প্রতিটি নেতা-কর্মীর খোঁজ নিতেন, সাধ্যমতো সহায়তা করতেন। স্বাধীনতার পর যখন আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব প্রতিদিন সকাল ৯টায় ৩২নং-এ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যেতাম, সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে। এরপর রাত ৯টায় বঙ্গবন্ধুকে ৩২নং-এর বাসভবনে পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরতাম। যখন বঙ্গমাতার বাসায় যেতাম তখন তিনি আমাদের নিজ সন্তানের মতো যত্ন করতেন। বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর জন্য স্বহস্তে রান্না করতেন। বঙ্গবন্ধুর সবকিছু গুছিয়ে রাখতেন। বঙ্গবন্ধু বঙ্গমাতাকে ‘রেণু’ বলে ডাকতেন। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ছিলেন আদর্শ দম্পতি, আদর্শ যুগল। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রাপ্তির ঐতিহাসিক জনসভায় জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘তোমরা যারা রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে কারাগার থেকে আমাকে মুক্ত করেছ, যদি কোনো দিন পারি নিজের বুকের রক্ত দিয়ে তোমাদের রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।’ তিনি একা রক্ত দেননি, সপরিবারে রক্ত দিয়ে সেই রক্তের ঋণ শোধ করে গেছেন। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে ঘাতকের বুলেট যখন জাতির পিতার বক্ষ বিদীর্ণ করেছিল, সে-সময় চিৎকার করে ঘাতকের দলকে বঙ্গমাতা বলেছিলেন তাঁকেও মেরে ফেলতে। জীবনসঙ্গীর মরণকালে চিরকালের জন্য তাঁর সহযাত্রী হয়েছেন। জাতির পিতা ও বঙ্গমাতা বাংলার মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে তাদের এই অকৃত্রিম সৃষ্টিশীল ভালোবাসা অম্লান হয়ে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জাতির পিতা ও বঙ্গমাতা সম্পর্কে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-

‘পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন।

বঙ্গমাতা   শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব   জাতির পিতা   বঙ্গবন্ধু  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বঙ্গমাতার জন্মদিনে সশ্রদ্ধ সালাম


Thumbnail বঙ্গমাতার জন্মদিনে সশ্রদ্ধ সালাম

৮ আগস্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন। খুবই পরিতাপের বিষয়, ঠিক তার জন্মদিনের সাতদিন পরে অর্থাৎ ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। সেদিন বঙ্গবন্ধু ছাড়াও নিহত হন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। এছাড়াও তাদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনসহ নিহত হন আরো ১৬ জন। সুতরাং আগস্ট মাসটা শোকের মাস। একই সঙ্গে এই মাসে বঙ্গমাতার জন্মদিন। সুতরাং শোকের মাসের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বঙ্গমাতার সম্পর্কে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই। বঙ্গমাতার সাথে আমার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় মাঝে মাঝে দেখা হতো। আমি সাহায্যের জন্য তার কাছে যেতাম। তিনি যেভাবে আমাকে সাহায্য করতেন, ঠিক তেমনিভাবে মাঝে মাঝে কিছু কাজও দিতেন। বঙ্গমাতাকে আসলে অনেকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। আমি প্রথমে মূল্যায়ন করবো মা হিসেবে। আগামী ১০০ বছরে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মতো কোনো দার্শনিক পাবে না। সেই দার্শনিকের মা তিনি। তার গর্ভে শুধু এই দার্শনিক শেখ হাসিনা জন্মগ্রহণ করেননি, তাকে লেখাপড়া থেকে শুরু করে রাজনীতি মূলত তিনিই শিখিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরুণী শেখ হাসিনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক বিষয়ে খোঁজ-খবর, অনেক সময় নির্দেশনা দেওয়া, অনেক সময় নির্দেশনা পাওয়া, এই কাজগুলো তিনি করিয়েছেন। যদি তার বয়সের কথা চিন্তা করেন তাহলে চিন্তা করতে হবে যে, এই বয়সের একজন তরুণীকে দিয়ে এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করিয়েছেন। যে কাজে একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশই প্রতিষ্ঠিত হতো না। অর্থাৎ তিনি এখন যে রাজনীতি করছেন সেটা এই ধরনের কাজের মাধ্যমেই শিখেছেন। বঙ্গমাতা তখনই তাকে দিয়ে এই মাপের রাজনীতি করিয়েছেন। সুতরাং একমাত্র বঙ্গমাতা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো মা এত অল্পবয়স্ক কোনো তরুণীকে এত গুরুত্বপূর্ণ এবং দায়িত্বপূর্ণ কাজ এবং যেখানে অনেকগুলি কাজের মধ্যে দার্শনিক বিষয়গুলিও পড়ে, সেগুলি করিয়েছেন। এটা চিন্তা করলে অবাক হতে হয়। তার মানে, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নিজে কতটুকু দার্শনিক চিন্তা-ভাবনা নিয়ে চলতেন এবং তিনি কীভাবে আরেকজন দার্শনিক তৈরি করেছেন।

বঙ্গবন্ধু মাঝে মাঝে যখন জেলের বাইরে থাকতেন, বড় মেয়ে হিসেবে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তিনি তার রাজনৈতিক গুরু এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি বাস্তবিক কথা বলতে হয়, তাহলে রাজনীতির অলিগলি, রাজনীতিতে দর্শনের পথ, জনগণের প্রতি ভালোবাসার পথ, কি করে কঠিন সময়ে কঠিন রাস্তায় চলতে হবে সেই পথ, এটা শিখিয়েছেন বঙ্গমাতা। এটা বঙ্গমাতার অবদান। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা একজন দার্শনিক এবং একজন দার্শনিকের কোনো মৃত্যুচিন্তা থাকে না। মৃত্যুচিন্তা থাকলে তিনি দার্শনিক হন না। যত দার্শনিক দেখা গেছে তারা সত্যের জন্য জীবন দিতে পিছপা হননি। কারণ কোনো দার্শনিককে কোনো কিছু দিয়ে কেনা যায় না। কোনো কিছু দিয়ে বশ করা যায় না। কোনো কিছু দিয়ে তার পথ থেকে সরানো যায় না। সুতরাং দার্শনিক হিসেবে শেখ হাসিনাকে প্রতিষ্ঠিত যদি না করা যেতো, যদি বঙ্গমাতা তখন থেকেই শুরু না করতেন এবং জাতির পিতা তাকে না শেখাতেন তাহলে আজ তিনি দার্শনিক হয়ে উঠতেন না। ১৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত জাতির পিতা ছিলেন দেশের সবকিছু। সেই সাথে বঙ্গমাতা তার ক্ষমতা কোনোদিন না দেখালেও সবাই জানতো যে তিনি অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। সেই সময় দার্শনিক শেখ হাসিনাকে তো কোনো রাজনৈতিক কাজে বঙ্গমাতা যোগ করেননি। বরং স্বামীর সাথে সংসার করতে পাঠিয়েছেন। এইখানেই বঙ্গমাতার সাথে বিশ্বের যেকোনো মাতার পার্থক্য। সুতরাং বঙ্গমাতাকে বিচার করতে হবে সেইভাবে। বঙ্গমাতা একজন দার্শনিককে জন্ম দিয়েছেন, তাকে লেখাপড়া থেকে শুরু করে দর্শনের জন্য যা যা প্রয়োজন সমস্তভাবে প্রস্তুত করেছেন। সুতরাং বলা চলে, জাতির পিতার মতো বঙ্গমাতাও দার্শনিক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক গুরু। সুতরাং শুধুমাত্র জাতির পিতার কথা বললে এবং বঙ্গমাতার কথা না বললে, আমার মনে হয় ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এজন্য আমাদেরকে দায়ি করবেন। আমাদের দায়িত্ব থেকে অন্তত কিছুটা হলেও মুক্তি পাওয়ার জন্য এই কথাগুলি সবাইকে জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গমাতার সাথে ১৯৬১ সালে পরিচয় হলেও সেই পরিচয়টা ঠিক অতটা গভীর ছিল না। কিন্তু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় আমার লিফলেটের টাকার প্রয়োজন ছিল, তাই একজনের বুদ্ধিতে আমি তার কাছে টাকাটা আনতে গেলাম। তিনি আমাকে ১০০ টাকা দিলেন। তখন সম্ভবত স্বর্ণের ভরি ২৫ থেকে ৩০ টাকা। তার মানে কত টাকা এটা বুঝতে হবে। সেই লিফলেটটি ছাপাতে এবং বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিতে সে সময় আমার লেগেছিল ৬৫ টাকা এবং অনেক পরে জেনেছি যে, সেই টাকাটা তিনি তার গহনা বিক্রি করে দিয়েছিলেন। তার মানে এইভাবে তিনি আগরতলা মামলার সময় দলকে চালিয়েছেন। আগরতলা মামলার আরেকটি ঘটনা আমি যেহেতু জানি, তাই বলছি। কিন্তু আমার স্মৃতি অতটা প্রখর না, সুতরাং এটা ভুলও হতে পারে। আমার যতদূর মনে আছে সালাম খানকে তিনি মামা বলতেন এবং তিনি রাজনৈতিকভাবে তখন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে সমর্থন করছেন না। কিন্তু বঙ্গমাতা তার বিবেচনায় মনে করলে যে, সালাম খান যদি এই মামলাটা পরিচালনা করেন তাতে যে আর্গুমেন্ট দিবেন তাতে দেশবাসি আগরতলা মামলা সম্বন্ধে শুধু জানবে না, দেশবাসীর কাছে একটা বার্তা যাবে এবং জনগণের ভেতরে একটা অনুভূতি হতে পারে। তিনি এটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন এবং আমি জেনে বলছি, প্রথমে সালাম খান মামলাটি পরিচালনা করতে রাজি হননি। কিন্তু বঙ্গমাতা তখন মামা বলে তাকে রাজি করিয়েছিলেন। এই বঙ্গমাতার জন্যই সালাম খান মামলাটি পরিচালনা শুরু করেন এবং যখন মামলার প্রসিডিংস ইত্তেফাকে বেরোতে থাকে, তখন তরুণ থেকে বৃদ্ধরা পর্যন্ত আগরতলা মামলায় সালাম খানের যে আর্গুমেন্ট, সেই আর্গুমেন্টও আমাদের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিল। তার সাথে আমাদের রাজনৈতিক পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাস ইতিহাসই। এই ইতিহাসের গোড়াপত্তন কে করলেন? তিনি হলেন বঙ্গমাতা।

বঙ্গমাতার আরেকটা উদাহরণ দেই, আমি ১০ দিন বা ২ সপ্তার মধ্যে একবার অবশ্যই যেতাম। তিনি কথা কম বলতেন, গম্ভীরই থাকতেন। তিনি আমাকে একদিন বললেন যে, কামালউদ্দিন যে রাজসাক্ষী বৈরি হয়েছে সে এবং তার স্ত্রীর ভাই এদের দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে একটা কেবিনে রাখা হয়েছে। তাদের এমন অত্যাচার করেছে যে, যাতে তারা বৈরি না থেকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধাচরণ করে। তোমার এতে কোনো দায়িত্ব নেই। এমনকি তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোথায় আছে না আছে, এর সম্বন্ধেও তুমি কিছু জানার চেষ্টা করবে না। আমি যে তোমাকে বললাম এইটা তুমি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু তোমার একটা দায়িত্ব আছে। দায়িত্ব হচ্ছে, কামালের স্ত্রী মগবাজারে একটি বাসায় থাকে। তুমি ঠিকানাটা বের করে তার খোঁজ-খবর নিবে। আমি তা বের করলাম, ছোট একটা দোতলা বাড়ি। দোতালায় থাকেন তিনি। আমার যতদূর মনে পড়ে তার নাম হাসিনা । এই হাসিনা আপার সাথে আগে কোনো পরিচয় ছিল না। তাকে বললাম যে, আপা কোনে প্রয়োজন আছে কিনা। বললেন না ভাই। তুমি ছোট ভাই হিসেবে এসো। এরপর আমি এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম যে প্রায় এক দিন পর পরই আপার বাসায় যেতাম। কারণ তার ব্যবহার আমার খুব ভালো লাগতো। আমি তখন জিনিসটা পুরো বুঝিনি। পরে বুঝেছি একটা কাজের মাধ্যমে। তার বাসায় একজন ১৮-১৯ বছরের তরুণী ছিলেন। তার সঙ্গে কথা না হলেও ২-১ বার দেখা হয়েছে। তো হসিনা আপা বললেন যে, এই যে মেয়েটিকে দেখছো না, ও কথা বলতে চাইলে ওর সাথে বেশি তোমার কথা বলার দরকার নেই। তুমি মেডিকেলে পর বা তুমি যে শেখ মুজিবকে চেনো এইসব কোনো রকম কোনো কথা বলবে না। কারণ ওর বাবা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে একজন সাক্ষী। তাকে এখানে আমি এনে রেখেছি। আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয় হয় তাই। হাসিনা আপা তাকে এনেছেন যাতে তাকে দিয়ে প্রভাব খাটানো যায় এবং তার বাবা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যেনো ঠিকমত সাক্ষী না দেয়। অর্থাৎ এখন বুঝি যে, এটা বঙ্গমাতা জানতেন। যদিও বঙ্গমাতা এই সম্বন্ধে দ্বিতীয় কোনদিন আমার সঙ্গে আলাপ করেন নি। অর্থাৎ আমার বিশ্বাস যে, তিনি এই সমস্ত খবরই জানতেন। বঙ্গমাতার অবদান এই জাতি কোনদিন শোধ করতে পারবে না। যেরূপ বঙ্গবন্ধুর অবদান কোনোদিন শোধ করা যাবে না।

আমার একটি ছোট্ট বিষয় আছে যার জন্য আমি নিজেকে খুব গর্বিত মনে করি, সেটা হচ্ছে গোপালগঞ্জে যে হাসপাতালটা এখন হয়েছে এটা প্রথম শুরু করি ১৯৯৬ সালে দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করেন। তিনি বললেন যে, দেখেন এটাকে কি একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া যায় কিনা। তারপর সাইড সেভার্স বা আরসিএসবি সহায়তা নিয়ে একটা কাজে আসলো। তারা চাইলো যে, তারা মোবাইল আই ক্যাম্প করতে চায় এবং এইটাতে সরকারের অনুমতি লাগবে। আমি বললাম অনুমতি দিয়ে দিতে পারবো কিন্তু একটা কন্ডিশন আছে। এই প্রোজেক্টের নাম দিতে হবে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আই ক্যাম্প প্রজেক্ট। তার রাজী হয়ে গেল। আমি এটাকে গ্রহণ করলাম। একটা সিলেটে এবং আরেকটা গোপালগঞ্জ সরকারি হাসপাতালে। প্রথম মোবাইল আই ক্যাম্পটা হলো। যাতে রোগীদের এনে একটা ক্যাম্প সিচুয়েশনে অপারেশন। কারণ নেত্রী ভাবলেন যে, স্কুলে বা যেকোনো জায়গায় ক্যাম্প করে অপারেশন করলে কিছু দৃষ্টি ফেরত পায় ঠিকই, অনেক ইনফেকশনও হয়। আর যদি অপারেশন থিয়েটারটা ভালো হয়, তাহলে তো বিষয়টা ভালো হয়। এই জিনিসটায় মূল অবদান তার এবং তার কর্মী হিসেবে আমি কাজটা করেছি। তারপরে যখন সুযোগ আসে তখন গোপালগঞ্জে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আই হাসপাতাল হয়েছে।

বঙ্গমাতার জন্মদিনে আমার একটি আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে যে, বঙ্গমাতার নামে প্রতিষ্ঠিত শেখ ফজিলাতুন্নেছা আই হাসপাতালে আই কেয়ারের হেড অফিস হবে এবং আমরা যে আই ভীষন সেন্টার করেছি, সেই হাসপাতালটাকেই আমরা হেডকোটার করবো। যেটা পরিশেষে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হবে। আমি বঙ্গমাতার আত্মার প্রতি এবং ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ যারা শহীদ হয়েছেন সকলের প্রতি সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। আমাদের দেশকে দার্শনিক শেখ হাসিনার মতো একজন দার্শনিক তৈরি করে দেওয়ার জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রতি আমরণ কৃতজ্ঞ থাকবো।

বঙ্গমাতা   জন্মদিন   সালাম   শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বাগতম-শিক্ষায় বিনিয়োগ চাই


Thumbnail জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বাগতম-শিক্ষায় বিনিয়োগ চাই

আজ সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সেই সংকট মোকবেলা করবার জন্য সব দেশের সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।  আমরা এমন পরিস্থিতিতে ভর্তুকি দিয়ে চলছিলাম। আর সরকারের কাঁধে ঋণের বোঝা চাপিয়ে আনন্দ ফুর্তি করছিলাম। সেই বোঝা আসলে সরকার নয় দেশের দরিদ্র মানুষদেরকে বহন করতে হয়। জ্বালানির উপর ভর্তুকি দেয়ার যুক্তি হিসেবে কৃষি, উৎপাদন, ও পণ্য সরবরাহকে   গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সেই ভর্তুকির সুবাদে আমরা সুলভ মূল্যে গাড়ি চড়ে বিলাসী জীবন যাপন করি।  বিগত বছর গুলোতে দেখছি যানজট আর যানজট।  আমরা এতো অপ্রয়জনীয় ভ্রমণ করি তা বোধহয় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের মানুষ করে বলে মনে হয় না।  

আমাদের গাড়ি কেনার একটি যুক্তি সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, স্ত্রীকে নিউ মার্কেট পাঠানো এবং ছুটির দিনে দাওয়াত খাওয়া।  আমাদের এই কর্মকান্ড থেকে সৃষ্টি হচ্ছে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা। সকলেই একটি গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখছি। আমরা উপলব্ধি করছি জলবায়ুর পরিবর্তন।  হাসপাশ করছি গরমে। কিন্তু আমি নির্দয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করছি। আমরা সেগুলো খুবই যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু সেদিকে আমাদের নজর নেই। আমরা যদি বুঝতাম তবে আমাদের উন্নয়ন আরও অনেক ধাপ উপরে যেত। আমার মতে, কেবল জ্বালানির  মূল্য বৃদ্ধি করলেই চলে না।  বরং সেখানে রেশনিং করে দেয়া হোক। পাশাপাশি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট উন্নত করা হোক। পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হোক।  জনগণ এসব পলিসির সুফল পাবে। 
 
আমাদের ঋণের বোঝা যত কম থাকবে ততই আমরা ভালো থাকবো। “ঋণ করে হলেও ঘি খাও” নীতি প্রকৃত সুখ বয়ে আনতে পারে না।  
সম্প্রতি লোড শেডিং দেয়ার প্রতিবাদ করে আমাদের বিরোধীদল প্রতিবাদ সভা, মিছিল ও হরতাল করেছে।  কিন্তু তাতে কেউই সাড়া দেয় নি।  জনগণ বুঝছে যে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। সুতরাং তারা লোড শেডিং মেনে নিয়েছে। আমাদের এখন মনযোগী হওয়া কিভাবে দিনের আলো , প্রকৃতির বাতাস ব্যবহার করে ভালো জীবন যাপন করা যায়। আমাদের সীমিত সম্পদ কিভাবে সুষমভাবে বন্টন করা যায় যাতে সামাজিক বৈষম্য কমে।  আমাদের নজর দেয়া উচিত কিভাবে গ্রাম থেকে শহরে যে ব্যাপক মাইগ্রেশন চলছে সেটাকে বন্ধ করা।  

আমাদের গ্রামের সকল রাস্তা পাকা। সুতরাং একজন ডাক্তার সেখানে যেতে পারে।  রোগীদের ঢাকা পর্যন্ত ছুটতে যাতে না হয়। সেজন্য আমাদের হাসপাতালগুলোতে নজর দেয়া। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া যাতে সেখানে যত্নের সঙ্গে পড়া লেখা হয়। যাতে করে ভালো শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো যায়। যদি আমরা প্রতিটি বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষক দিতে পারি তাহলে কেউই মিরপুর থেকে মতিঝিল কিংবা আজিমপুর থেকে উত্তরা যাবে না।  

আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না তার অন্যতম কারণ বেতন কম এবং পদমর্যাদা কম। ফলে একজন মেধাবী ছাত্র চলে যায় ব্যাংক , বীমা কিংবা ঐরকম কোনো কাজে। আর এভাবেই শুরু হয় সংকট।  

আমাদের এক নতুন রোগ ইংলিশ মিডিয়াম। এই রোগ নিয়ে আমাদের কারও ভাবনা নেই। ফলে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হলে যেখানে আমাদের ভর্তুকি কিংবা অপচয় হচ্ছে কিংবা যেখানে দুর্নীতি হচ্ছে সেখানে নজর দেয়া সম্ভব। আমরা   যে দুষ্ট চক্রে জর্জরিত সেটাকে ভাঙতে হলে শিক্ষাকে সবচে গুরুত্ব দিতে হবে। ভোগবাদী জীবন নয় আদর্শকে শিক্ষায় আনতে হবে।  যদি সেটা সম্ভব হয় তবে উন্নয়ন টেকসই হবে। আশা করি সকলে সেটা বুঝতে পারবে।  

আমাদের সরকার শিক্ষায় অনেক মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে এখনও আরও অনেক কিছু করবার আছে। গুণগত মানের শিক্ষা দিতে শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক এবং সরকারকে সদা জাগ্রত থাকতে হবে।  আমি মনে করি জ্বালানি তেলের মত আরও যেখানে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করা যায় কিনা।  মানুষ এখন এতটাই দিশেহারা যে জীবনের মূল্য ও সুখ কোনটাই পাচ্ছে না। সে ছুটছে ছুটছে কিন্তু তার তৃপ্তি নেই।  তার মনেতে হতাশা আর হতাশা। জীবনের অপূর্ণতাকে জয় করতে হলে সঠিক শিক্ষা একান্ত উপযোগী। আমাদের শিক্ষাকে যদি মানসম্মত করতে পারি তবেই আমরা প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন করতে পারি। আসুন আমরা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেই। 

আমরা এখন প্রতিটি প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি লাইব্রেরি নির্মাণ করতে পারি। সেখানে যে নির্মাণ কাজ হবে সেখানে কর্মসংস্থান হবে।  আমাদের অর্থনীতি সচল হবে। আমাদের স্কুল গুলোতে বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক, ও পাঠের প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারি।  ফলে সারা দেশ ব্যাপী আমাদের শিশুরা আনন্দে পড়াশোনাতে মাতবে। তারা ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তব জগতে সময় কাটাবে। আশা করি আমাদের ভাবোদয় হবে।
  
আমরা যদি ভাবি আমাদের সন্তানেরা প্রাইভেট গাড়িতে করে স্কুলে যাবে তবে কোনোদিনই আমরা টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারবোনা। আমাদের শিক্ষার ঘাটতি আমাদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও সকল অসুখের কারণ।  সেজন্য শিক্ষায় মনযোগ দেয়া একান্ত জরুরি। যে উন্নয়নের ডানা আমরা মেলেছি তার জ্বালানি জোগাড় যে নেই সেটা ভুলে গেছি আর তাই উদ্বিগ্ন হচ্ছি কিভাবে ঋণ শোধ করব ভেবে। এমন একটি সময়ে জ্বালানির উপর ভর্তুকি বন্ধ একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। 



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

"দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের মূর্তপ্রতীক শেখ কামাল"


Thumbnail "দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের মূর্তপ্রতীক শেখ কামাল"

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের স্পেশাল ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট অফিসারদের অন্যতম, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি, মুক্তিবাহিনীর অন্যতম সংগঠক, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শেখ কামাল শুধুমাত্র পিতা বঙ্গবন্ধুর পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন না। বরং সস্ত্রীক ছিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ। ছিলেন ছাত্রলীগের একজন কর্মি, জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যতম সদস্য। ৬ দফা আন্দোলনের রাজপথের কর্মি ছিলেন। ছিলেন ৬৯'র গণঅভ্যূত্থানের অন্যতম সংগঠক।

পিতা মুজিবের ভাষা আন্দোলন থেকে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মীর্জা ও জেনারেল আইয়ুব খানের "মার্শাল ল" বিরোধী আন্দোলনে বার বার গ্রেফতার ও কারাবরণ! শিশু কামাল পিতৃস্নেহ থেকে  বঞ্চিত বারবার। অবুঝ শিশু কামালের এই আত্মত্যাগই বা কম কিসের? বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ আগষ্ট। শিশু কামালের বঞ্চনা ও আত্মত্যাগের শুরু জন্মের এক মাস না পেরোতেই। এক মাসেরও কম বয়সে ৪৯'র সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রেফতার হয়ে টানা ২৭ দিন জেলবন্দী পিতা মুজিবের অবর্তমানে প্রথম পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হন সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শেখ কামাল। ৪৯'র ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় বার পিতা মুজিবের যত্ন, আদর, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত শেখ কামালের আত্মত্যাগের ইতিহাস আরেকটু দীর্ঘ। ২ মাস ২১ দিন বয়সের শেখ কামালকে এবার পিতা ছাড়া থাকতে হয় দীর্ঘ ৬৩ দিন। 

অতঃপর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শিশু কামালের বয়স যখন মাত্র ৪ মাস ২৭ দিন, তখন তৃতীয়বারের মত পিতা মুজিব গ্রেফতার হয়ে জেলে কাটান টানা ২ বছরেরও বেশি সময়। জেলখানায় অমানবিক নির্যাতন আর টানা ১১ দিন অনশনের পর ভগ্ন শরীর নিয়ে পিতা মুজিব মুক্ত হন ৫২'র ২৭ শে ফেব্রুয়ারি। তখন পিতা মুজিব যেন শিশু কামালের কাছে নিতান্তই বাড়ির এক নতুন মেহমান, নতুন আগন্তুক, অচেনা এক মুখ! ৫২-৫৪ প্রায় দু'বছরে এই অচেনা মুখটিই যেন তার কাছে হয়ে উঠল সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ। দু'বছরের স্নেহ, মমতা, আদর, ভালোবাসায় সিক্ত শিশু কামাল কেবল একটু একটু চিনেছে পিতা মুজিবকে। পিতার প্রতি যেন এক অদৃশ্য আকর্ষণ আর নির্ভরতা জন্মেছে অবুঝ শিশু মনে। তবে হৃদয়হীন, পাষাণ স্বৈরশাসকের তাতে কি আসে যায়? ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে তাকে মুজিবকে গ্রেফতার করতেই হবে। 

৫৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙে দেওয়ার পর পুনরায় মুজিবকে করাচী থেকে ঢাকা ফেরার পর গ্রেফতার করা হল। ৫ বছরেরও কম বয়সী শেখ কামাল এবার চতুর্থবারের মত পিতার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হল। এবারের কষ্টটা একটু বেশি। কারন চেনার পর এবারই প্রথম পিতাকে ছাড়া থাকতে হল তাকে। দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস কারাভোগের পর যখন ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়ে বাড়ীতে আসলেন, ততোদিনে শিশু কামাল যেন অনেকটাই ভুলে গেছে পিতা মুজিবকে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক 'মার্শাল ল' জারির পরে ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। তখন কামালের বয়স প্রায় ৯ বছর। বুঝতে শেখার পর প্রথম আঘাত। টানা ৩ বছরেরও বেশি সময় বঙ্গবন্ধুর এই জেলজীবন ছিল সম্ভবত বালক শেখ কামালের জন্য সবচেয়ে কষ্টের।

বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দেওয়ার পর যখন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ১৯ বছরের টগবগে যুবক কামাল ৬ দফার পক্ষে স্কুল, কলেজে প্রচারণা চালিয়েছেন। ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছেন। পিতা মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে রাজপথে শরিক হয়েছেন। ৬৯'র গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ছিলেন শেখ কামাল। 

ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের স্পেশাল ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট অফিসারদের অন্যতম। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেছেন ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধে। ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ। 

বাঙালীর স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম সবখানেই যার আত্মত্যাগ তাকে করেছে মহিমান্বিত। পৃথিবীর সব পিতার জন্য ২৬ বছরের এই ক্ষণজন্মা পুরুষের জীবন যেমন অনুপ্রেরণার উৎস, তেমনি সব শিশু ও যুবকের জন্য আজীবন আত্মত্যাগ ও সাহসের প্রতীক হয়ে রবে।

৫ আগস্ট ২০২২, ৭৩ তম জন্মবার্ষিকীতে বহুগুণে গুনান্বিত জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

দেশপ্রেম   সাহস   আত্মত্যাগ   শেখ কামাল  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন