ইনসাইড থট

"আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ পরস্পরের পরিপূরক"


Thumbnail "আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ পরস্পরের পরিপূরক"

ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গ থেকে পূর্ব বাংলা এবং পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশের দশকে পূর্ববাংলা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে রুপান্তরিত হয় আমাদের এই ভূখন্ড। তবে পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম এবং দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্রে 'বাংলাদেশ' নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ই বাঙালির গৌরবময় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। ১৭৫৭-১৯৭১ দীর্ঘ ২১৪ বছর ধরে বাঙালীর আকাঙ্খা ছিল একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখন্ড। যে আকাঙ্খার বাস্তবায়ন ঘটেছে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ' এর নেতৃত্বে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে। ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন ভাগিরথী নদীর তীরবর্তী পলাশীর আম্রকাননে বাঙালির স্বাধীনতার যে লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, অলৌকিকভাবে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার দিনটিও মিলে গিয়েছিল সেই দিনটির সাথে। ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণমানুষের সংগঠনটি।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মের সাথে মুসলিম লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুল হক নেতৃত্বাধীন ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মি শিবির ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। কর্মি শিবিরটি ছিল ঢাকার প্রভাবশালী মুসলিম লীগ নেতা শওকত আলীর মালিকানাধীন তিনতলা ভবনের নিচতলায়। কর্মি শিবিরের সকল খরচ চালাতেন শওকত আলি। তিনি ছিলেন '৪৮ এ শুরু হওয়া ভাষা আন্দোলনের প্রথম সারির কর্মি এবং কর্মি শিবিরের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে কর্মি শিবির প্রতিষ্ঠার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারন সম্পাদক প্রখ্যাত ইসলাম ধর্মীয় পন্ডিত আবুল হাশিম। এই কর্মি শিবির থেকেই ভাষা আন্দোলনের সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হত।

১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর নাজিমুদ্দিন এবং মাওলানা আকরাম খাঁর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের রক্ষণশীল অংশের নেতারা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তাদের পরোক্ষভাবে সমর্থন দেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। নাজিমুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীকে 'ভারতের এজেন্ট' এবং 'পাকিস্তানের শত্রু' হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য পদ থেকে বরখাস্ত করেন। ফলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিম নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে মুসলিম লীগের মনোনয়নে উপনির্বাচনে টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তবে মুসলিম লীগ সরকারের পূর্ব বঙ্গের স্বার্থবিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমালোচনা করতে থাকেন তিনি। এ কারনে তার নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ আখ্যায়িত করে তাকে হয়রানী করার হীন উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে মুসলিম লীগ সরকার। পূর্ব বঙ্গের গভর্ণর এক নির্বাহী আদেশ বলে তার নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে ব্যবস্থাপক সভার উক্ত আসন শূন্য ঘোষণা করেন। মাওলানা ভাসানী আসাম চলে যান। তাকে আটক করে ধুবড়ী কারাগারে রাখা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালের ২৬ শে এপ্রিল ঐ আসনে পুনরায় উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে মুসলিম লীগের ধনাঢ্য প্রার্থী জমিদার খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে ১৫০ মোগলটুলি কর্মি শিবিরের নেতাদের সিদ্ধান্তে প্রার্থী করা হয় শামসুল হককে। কর্মি শিবিরের নেতারা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে, কেউ হাতঘড়ি বিক্রি করে, কেউ বাইসাইকেল বিক্রি করে নির্বাচনী ফান্ড তৈরি করেন। বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে এই নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়ন এবং নির্বাচনী ফান্ড গঠনের বিষয়ে উল্লেখ আছে। নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীর কল্যাণে মানুষ প্রথম মাইকের ব্যবহার দেখেন। মুসলিম লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন সহ অসংখ্য মন্ত্রী এবং হেভিওয়েট নেতারা খুররম খান পন্নীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন। অন্যদিকে শামসুল হকের পক্ষে ১৫০ মোগলটুলি কর্মি শিবিরের কয়েকজন কর্মি ছাড়া উল্লেখযোগ্য তেমন কোন বড় নেতা ছিলেন না। নির্বাচনে শামসুল হক বিপুল ভোটের ব্যবধানে মুসলিম লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী খুররম খানকে পরাজিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। জমিদার খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে শামসুল হক কোন বিবেচনাযোগ্য প্রার্থী ছিলেন না বলে সবাই মনে করতেন। অথচ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হন। এই রায় যতটা না ছিল খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে তার চেয়ে ছিল মুসলিম লীগ সরকারের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। এই পরাজয়ে মুসলিম লীগ সরকারের ভীত কেঁপে যায়। ফলে ঐ উপনির্বাচনের পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আর কোন উপনির্বাচন দেয়নি প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকার। তবে বিজয়ী শামসুল হকের ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। নির্বাচনে বিপুল বিজয় মোটেও সুখকর হয়নি তার জন্য। পূর্বের ন্যায় একই কায়দায় আবারো নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এভাবে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের একের পর এক জনবিরোধী কর্মকান্ডের ফলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী সহ মুসলিম লীগ কর্মি শিবিরের নেতাদের মনে মুসলিম লীগের প্রতি বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এমনি এক সময়ে পূর্ব বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা দবিরুল ইসলামের পক্ষে "হেবিয়াস কর্পাস" মামলা লড়তে ঢাকায় আসেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এ সময় সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার পূর্ব থেকে ঘনিষ্ঠ মুসলিম লীগ কর্মি শিবিরের ব্যবস্থাপক শওকত আলীর কথা হয়। সোহরাওয়ার্দী এ সময় তাকে মুসলিম লীগ ছেড়ে নতুন দল গঠনের নির্দেশনা দেন। পরবর্তীতে শওকত আলী কর্মি শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নতুন দল গঠনে উদ্বুদ্ধ করেন।মাওলানা ভাসানী ১৯৪৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকা আসেন। ঢাকায় এসে তিনি আলী আমজাদ খানের বাসায় অবস্থান করেন। মুসলিম লীগ কর্মি শিবিরে তার পূর্বে আসা যাওয়া না থাকলেও ইয়ার মোহাম্মদ খানের সাথে তার যোগাযোগ ছিল। শওকত আলী মাওলানা ভাসানীকে আলী আমজাদ খানের বাসায় আলোচনার সময় ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ কর্মি শিবির ও মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের রাজনৈতিক কার্যক্রমের কথা অবহিত করেন। পরবর্তীতে মুসলিম লীগ কর্মি শিবিরের উদ্যোগে মুসলিম লীগের বিকল্প একটি রাজনৈতিক দল গঠনে ঐকমত্য হয়।

মুসলিম লীগ সরকার এ ধরনের উদ্যোগের বিষয়ে টের পেয়ে কর্মি শিবিরের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে শামসুল হকের টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনের ঠিক দুইদিন পূর্বে ২৪ শে এপ্রিল গ্রেফতার করে নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। অনেককে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখানো হয়। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকারের এসব অপকর্ম কোন কাজে আসে নি। দল গঠনের প্রত্যয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এক কর্মি সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সরকারি বাধার মুখে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া গেলে অবশেষে কাজী হুমায়ুন বশীর এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানের ইচ্ছায় ঢাকার কে এম দাস লেনের তাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রাসাদতূল্য বাসভবন ঐতিহাসিক "রোজ গার্ডেন" এ প্রায় ৩০০ কর্মির উপস্থিতিতে ২৩ শে জুন বিকেল তিনটায় উক্ত কর্মি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রখ্যাত আইনজীবি আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে ঐ কর্মি সম্মেলনে "পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ" নামক রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি এবং শামসুল হককে করা হয় সাধারন সম্পাদক।



ঐ সময় ভারত উপমহাদেশের সমসাময়িক কোন রাজনৈতিক সংগঠনে যুগ্ম সাধারন সম্পাদক পদ না থাকলেও কর্মি শিবিরের তরুণ জনপ্রিয় সংগঠক শেখ মুজিবুর রহমানকে যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রত্যয়ে সংগঠনে যুগ্ম সম্পাদক পদ সৃষ্টি করে ১ নং যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। কথিত আছে, শেখ মুজিবুর রহমানকে ১ নং যুগ্ম সাধারন সম্পাদক করার জন্য শওকত আলি মাওলানা ভাসানিকে অনুরোধ করেছিলেন। তবে শেখ মুজিবের চেয়ে বয়সে সিনিয়র হওয়ায় খন্দকার মোসতাক আহমদ চেয়েছিলেন ১ নং যুগ্ম সম্পাদকের পদ। এ নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানিকে অনেক অনুনয়, বিনয় করেছিলেন বলেও কথিত আছে। তবে শেখ মুজিবের সাংগঠনিক দক্ষতার কারনেই তাকে উক্ত পদে মনোনীত করেছিলেন মাওলানা ভাসানি এবং শামসুল হক। শেখ মুজিব এ সময় কারান্তরীণ ছিলেন। নতুন এ দলটির প্রতিষ্ঠার ৫-৬ দিন পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় '৫৩ সালের যে সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ঐ কমিটিতেও আওয়ামী মুসলিম লীগে কোন যুগ্ম সাধারন সম্পাদক পদ ছিল না। দলের কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছিল ঢাকার ঐ সময়ের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি ইয়ার মোহাম্মদ খানকে। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তার অনেক অবদান ছিল এবং তিনি দলকে শক্তিশালী করতে অকাতরে অর্থ ব্যয় করতেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের অনেক নেতার ঢাকায় থাকার সকল খরচ তিনি বহন করতেন।

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম কমিটির অধিকাংশ কর্মকর্তা এবং সদস্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন মাওলানা ভাসানী যাদের কারো কারো পূর্বে কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। দল গঠন এবং পরবর্তীতে সংগঠনটির বিকাশে তাদের অনেকের কোন ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে অনেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, অনেকে দল থেকে পদত্যাগ করেন। এই ঘটনায় আওয়ামী মুসলিম লীগের কমিটি গঠনে মাওলানা ভাসানীর সাংগঠনিক মুন্সিয়ানা সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে দল গঠন পরবর্তীতে তিনি যোগ্যতার সাথে নেতৃত্ব দেন। ২৩ শে জুনের কর্মি সম্মেলনে সাধারন সম্পাদক শামসুল হক পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তানের সকল ইউনিটের আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার প্রদানের দাবিসহ নতুন এ সংগঠনটির জন্য একটি সময়োপযোগী খসড়া ম্যানিফেস্টো প্রণয়ন করেছিলেন। যার ফলে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষ জানতে পেরেছিল। তবে তিনি বেশিদূর দলকে অগ্রসর করতে পারেন নি। কারন শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি তিনি এবং দলের সভাপতি মাওলানা ভাসানী কিছু দিনের মধ্যেই ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন। টানা প্রায় ২৬ মাস জেল খাটার পর ভগ্ন শরীর নিয়ে শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেলেও শামসুল হক তখনো জেলে ছিলেন।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শেখ মুজিবের শারীরিক অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে প্রায় দুই আড়াই মাস টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে থেকে চিকিৎসা ও বিশ্রাম নেন। অতঃপর ১৯৫৪ সালের ৩০ মে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই দুই বছর সময় তিনি আওয়ামী লীগকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। দলের সাধারন সম্পাদক শামসুল হক এ সময় কারাভ্যন্তরে থাকায় দলের ১ নং যুগ্ম সাধারন সম্পাদক শেখ মুজিব দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পান। দল গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে এই দুই বছরই ছিল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিস্তারকাল। যার পুরোভাগে নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ  সংগঠক মুজিব। '৫৩ সালের সম্মেলনের কিছুদিন পূর্বে শামসুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও সরকারের নির্যাতন এবং সুন্দরী স্ত্রীর দুই ফুটফুটে কন্যা সন্তানসহ তাকে ছেড়ে যাওয়ার মানসিক চাপে তার মস্তিষ্ক বিভ্রাট ঘটে। ফলে তিনি দল থেকে বহিস্কার হন এবং সম্মেলনে নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়েন। সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হন।

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগকে শুধুমাত্র মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ১৯৫৫ সালে সকল ধর্ম, বর্নের মানুষের অংশগ্রহণে একটি অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ' করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে দলের সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক আহমদ সহ অনেকেই মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। তবে শেষমেশ বঙ্গবন্ধুর জোরালো প্রচেষ্টার কারনে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতে সংগঠনের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালে দলের সাধারন সম্পাদক বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীত্ব গ্রহণ নিয়ে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদের নেতৃত্বে একটি অংশ দলের মধ্যে বলয় সৃষ্টির অপচেষ্টা চালান।সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু সংগঠনকে শক্তিশালী করার স্বার্থে ১৯৫৭ সালের ৩০ মে মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করে দলের সাধারন সম্পাদক পদে বহাল থাকেন। কারন বঙ্গবন্ধু জানতেন এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ে শক্তিশালী সংগঠনের কোন বিকল্প নেই।

পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করে দলের সাধারন সম্পাদকের পদ ধরে রাখা বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক নৈপুণ্যেরই পরিচায়ক।সেদিন বঙ্গবন্ধু ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটি আজও পেতাম কিনা সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকবে। ১৯৫৭ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারী সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি মাওলানা ভাসানীর পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল এবং পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবির প্রেক্ষিতে মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে ভূমিকা নেন। সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দলের বেশিরভাগ নেতা মাওলানা ভাসানীর প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ কারনে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ইয়ার মোহাম্মদ খান, অলি আহাদ সহ অনেক নেতা আওয়ামী লীগ থেকে ১৮ ই মার্চ পদত্যাগ করেন।

আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে মাওলানা ভাসানী 'ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি' গঠন করলেও বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটি ভাসানী সাহেবের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে নি। মাওলানা ভাসানীর পদত্যাগের পরও পরবর্তীতে ৫৭ সালের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় তাকেই আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশকে। সহ-সভাপতির তিনটি পদ এবং ইয়ার মোহাম্মদ খানের সম্মানে কোষাধ্যক্ষ পদটিও ফাঁকা রাখা হয়। রাজনীতিতে এ ধরনের নজীর বিরল। ৫৭-৬৪ দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিয়েই চলেছে আওয়ামীলীগ। এ সময় মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে থাকলেও মূলত সকল সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন দলের সাধারন সম্পাদক বঙ্গবন্ধু। ৬৬ তে ৬ দফা দেওয়ার পর দলের অনেক নেতা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে,৬ দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা তর্কবাগীশ ৬ দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ৬৬'র সম্মেলনে নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়েন। বঙ্গবন্ধু দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারন সম্পাদক হন তাজউদ্দিন আহমদ।

সেই সম্মেলনে সমাপনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন-"৬ দফার প্রশ্নে কোন আপোষ নেই। রাজনীতিতেও কোন সংক্ষিপ্ত পথ নেই। নেতৃবৃন্দের ঐক্যেও আওয়ামীলীগ আর আস্থাশীল নয়। নির্দিষ্ট আদর্শ ও সেই আদর্শ বাস্তবায়নে নিবেদিতপ্রাণ কর্মিদের ঐক্যেই আওয়ামীলীগ আস্থাশীল। আওয়ামী।লীগ নেতার দল নয়, এ প্রতিষ্ঠান কর্মিদের প্রতিষ্ঠান।"
বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন-"সাঁকো দিলাম, স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য। এই আন্দোলনে কেউ যদি নাও আসে আমরা একাই রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাব।ভবিষ্যত ইতিহাস প্রমাণ করবে আমাদের মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ।" বস্তুত ৬ দফায় ছিল বাঙালীর স্বাধীনতার বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর।
৬ দফার আন্দোলন করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বারবার কারাবরণ করেছেন। ৬ দফা দেওয়ার পর দাবি আদায়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা এবং ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধু ৩৫ দিনে ৩২ টি জনসভা করে ৮ বার গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু ৬ দফার প্রশ্নে আপোষ করেন নি। ৬ দফা আন্দোলনে আটক বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সহ রাজবন্দীদের মুক্তির আন্দোলন এক পর্যায়ে ৬৯'র গণঅভ্যুত্থানে রুপ নিয়েছিল। 
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়েছিলেন এবং তুমুল আন্দোলনে স্বৈরশাসক লৌহমানব আইয়ু্ব খানের পতন হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু জানতেন- জনরায় ছাড়া, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া বাঙালীর আকাঙ্খিত স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। এ কারনেই তিনি  নির্বাচনের দাবি করেছিলেন এবং ৭০'র নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। অথচ মাওলানা ভাসানী সহ অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ সে  নির্বাচনে অংশগ্রহণে তীব্রভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রমাণ হয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৭০'র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনতার বিপুল ম্যান্ডেট বাংলার মানুষের স্বাধীকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন যে যৌক্তিক ছিল সেটিই বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দেয়। তবে কেন্দ্র ও প্রদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ৭ ই মার্চ রেসকোর্সের ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে উপস্থিত মিলিয়ন জনতার মনের ঘোষণার সাথে সুর মিলিয়ে কবিতার ছন্দে ঘোষণা করেন তার অমর বাণী-

"এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যাতে তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে আখ্যায়িত না করতে পারে সেজন্য কৌশলে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে পাকিস্তানি শাসকের জন্য মানার অযোগ্য চারটি শর্তে আলোচনার দ্বার খোলা রাখেন। স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ঘোষণা না করে বঙ্গবন্ধু একদিকে যেমন হায়েনার মত সমাবেশে তাক করে রাখা লক্ষ বুলেটকে সুপ্তাবস্থায় অঙ্কুরে বিনষ্ট করেছিলেন, তেমনি
"তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।"
ভাষণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির সুস্পষ্ট  দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন।

পাকিস্তানের আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীত্বের শপথ না নিলেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মানতে শুরু করে। রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন জনতার অঘোষিত প্রধানমন্ত্রী। ২৩ শে মার্চ পাকিস্তান দিবসে সূর্যোদয়ের পরপরই বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের বাসভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। এদিন সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী জোরালো হয় অসহযোগ আন্দোলন। আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এমন অসহযোগ আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ২৫ শে মার্চের কালরাত্রের পৈশাচিক গণহত্যার পর নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি ফুঁসে উঠে বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের কালজয়ী ভাষণের অনুপ্রেরণায়।
"প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।" বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের মাধ্যমে নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালি সেদিন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে রুপান্তরিত হয়েছিল সশস্ত্রে।

২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন-

"হয়ত এটাই আমার শেষ বার্তা।
আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।"

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতা ঘোষণা করার অপরাধে বন্দি করে পাকিস্তানের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭০'র নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে  গঠিত হয় মুজিব নগর সরকার। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন মুজিব নগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী চার জাতীয় নেতা। প্রায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৩০ লক্ষ শহিদ এবং ২ লক্ষ মা, বোনের সম্ভ্রম, কোটি কোটি মানুষের ত্যাগ এবং পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ২৮৩ দিনের নির্মম, নিষ্ঠুর মানসিক নির্যাতন আর ঘুমহীন রাতের বিনিময়ে অবশেষে ১৬ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের অসহায় আত্মসমর্পনের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। কেবল মাত্র বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নয়, '৪৮ এবং ৫২'র ভাষা আন্দোলনে ও নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশের বিজয়ের ২৩ দিন পর ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১০ জানুয়ারি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পূনর্গঠনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে তাকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। জাতীয় চার নেতাকে কারা অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশে রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে জেল থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা এবং জেলহত্যার বিচার করা যাবে না মর্মে আইন পাশ করা হয়। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকে বন্দী করে নির্মম নির্যাতন করা হয়। দেশে আইনের শাসন ভুলুন্ঠিত হয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার সব রকম প্রচেষ্টা করা হয়। মানুষের ভোটাধিকার হরণ এবং গণতন্ত্রকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে দেশে চালু করা হয় কারফিউ গণতন্ত্র। আওয়ামী লীগ রাজপথে রুঁখে দাঁড়ায়। ১৯৮১ সালের ১৭ ই মে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অবৈধ সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশে ফিরে এসে দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু কন্যা। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভূমিধ্বস বিজয়ের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে স্বল্পোন্নত বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল বাংলাদেশে রুপান্তরিত করেন।

রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু নয়, বরং বিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটের রাষ্ট্র ও সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবিলা এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড শক্ত হাতে  প্রতিহত করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখেছেন সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। নিজ দল ও সরকারের দূর্নীতিবাজ নেতা, এমপি, মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তিনি। ১৯৮১-২০২২ দীর্ঘ ৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯ বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। বারবার তার উপর গ্রেনেড, গুলি, বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। কিন্তু নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে বাঙালির আকাঙ্খিত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশ ও জনগণের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যখন আর্টিকেলটি লিখছি, এর ঠিক দু'দিন পরেই ২৫ জুন, স্বাধীনতার পর বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল ও দৃষ্টিনন্দন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সকল অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে যেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতিকে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধু কন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে তেমনিভাবে দেশ ও জাতি সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করবে ইনশাআল্লাহ্! আজ ২৩ জুন ২০২২, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর ৭৩ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সকলকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা।

আওয়ামী লীগ   বঙ্গবন্ধু   বাংলাদেশ  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

রাজনীতি হোক গণমুখী, সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্যপূর্ণ


Thumbnail

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির পরদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। '২৫ জুন পর্যন্ত হরতাল বা নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!' দেশের সমসাময়িক রাজনীতির ধারা হিসাব করলে এমন সম্ভাবনা আসলেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারপর কি হলো? ৫ জুন পাবনার বেড়ার কিউলিন ইন্ডাস্ট্রি। ৬ জুন রাজধানীর বছিলার জুতার কারখানা। ১০ জুন রাজধানীর নর্দ্দা এলাকায় তুরাগ পরিবহন। ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের ফেরি। একই দিনে মৌলভীবাজারে পারাবত এক্সপ্রেসের তিনটি বগি। ১২ জুন রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তঃনগর ট্রেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের রুম। ২০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক। সবখানেই আগুন। সব কি দুর্ঘটনাবশত লেগে যাওয়া আগুন? কই! স্বাভাবিক সময়ে তো এত আগুন লাগে না! নাকি এটি প্রতিহিংসার আগুন! ব্যর্থতার আগুন! বুকে জ্বলা আগুন! হিসাবের আগুন! খোদ সরকারপ্রধান এসব আগুনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য আছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী তারা এমন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাবে যাতে আমরা ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে না পারি'।

আগুনের পাশাপাশি গতানুগতিক বচন অব্যাহত রয়েছে। এসব ফালতু বচন আগেও ছিল। "পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।" এসব বচন নিয়ে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল সে সময়। তখনো দৃশ্যপটে এসেছিলেন মির্জা ফখরুল সাহেব। সাফাই গাইলেন দেশনেত্রীর পক্ষে। তিনি বললেন, দেশনেত্রী ঠিক বলেছেন। তিনি ভুল বলেননি। দেশপ্রেমিকের মত কথা বলেছেন। ‘একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের ওপরে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেটা টিকবে না। তোমরা এখনো এলার্ট হও, চেঞ্জ দ্য ডিজাইন'। এসব পুরনো বচন। গতানুগতিক ধারায় আরো অনেক বচন যুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। বিএনপি'র মির্জা সাহেব বললেন, "পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাও একদিকে না, দুইদিকে।" অথচ বাস্তবতা হলো ২০০১ সালের ৪ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। মির্জা সাহেবের কি দরকার ছিল এমন একটি ভুল তথ্য দেওয়ার। অজ্ঞতাবশত যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে পারতেন। আর যদি সজ্ঞানেই বলে থাকেন, তাহলে উনার উচিত ছিল সরকারি নেতাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তথ্য প্রমাণাদিসহ জাতিকে জানানো। তিনি কোনটাই না করে নিজের দেয়া বচনকে 'ফালতু' প্রমাণ করলেন। জনগণকে ধোঁকা দিলেন, বোকা বানালেন।

সম্প্রতি মির্জা সাহেব বলেছেন, "পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু নেই। পদ্মা সেতুর প্রথম ফিজিবিলিটি রিপোর্ট করে বিএনপি ১৯৯৪/১৯৯৫  সালে। সেই সময় ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর এখন সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার হিসাব চাই।" তিনি নিশ্চয়ই জানেন, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পরে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদী পানি নিঃসরণ করে সাড়ে ৭ লাখ কিউমেক। যখন নদীতে প্রবাহিত পানি প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটারে পরিমাপ করা হয় তখন তাকে 'কিউমেক' বলে। ঘনফুটে পরিমাপ করা হলে তাকে 'কিউসেক' বলে। আটলান্টিকের প্রবেশদ্বারে আমাজনের সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কিউমেক। তার মানে আমাজনের দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ পানি পদ্মা নদী নিঃসরণ করে বর্ষা মৌসুমে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পদ্মার চেয়ে আমাজন কেন বেশি খরস্রোতা। আমাজন নদী সারা বছর প্রায় একই গতিতে পানি নিঃসরণ করে। গড় ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিউমেক। পক্ষান্তরে বর্ষার পদ্মা নদী বিশ্বের সর্বাধিক  খরস্রোতা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কিউমেক। তাতে পদ্মা নদীতে পানি নিঃসরণের গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কিউমেক। পদ্মা সেতুর স্থলে গত একশ বছরের গড় সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার কিউমেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা বা অতিবন্যার সময় সেতু অঞ্চলে পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কিউমেক পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে চিন্তা মাথায় রেখেই সেতু প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাজন বয়ে গেছে ব্রাজিল, পেরু আর কলম্বিয়ার উপর দিয়ে। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে কোন সেতু নেই। দেড় লক্ষাধিক কিউমেক পানি নিঃসরণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বে দ্বিতীয় কোন সেতু এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তাই পৃথিবীর আর কোন দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু আর কোথায় পাবেন? এত খরস্রোতা নদীতে আর তো কোন সেতু নেই। তাইতো  নদী শাসনে চলে গেছে খরচের তিন ভাগের এক ভাগ।

মির্জা সাহেব বলেছেন, ৯৪/৯৫ সালে সেতু নির্মাণে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। খুব ভালো কথা। ২৭ বছর আগের কথা। পয়লা জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৪১ দশমিক ৭৯ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণ কালে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা। এবার আসুন মুদ্রাস্ফীতি। ওয়ার্ল্ড ডাটা ডট ইনফো এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোক্তা মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার গত ৩৪ বছরে (১৯৮৭-২০২১) শতকরা ২ ভাগ থেকে সাড়ে এগারো  ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রতি বছর শতকরা ৬ দশমিক ৪। সামগ্রিকভাবে, মূল্য বৃদ্ধি ছিল শতকরা ৭২৫ ভাগ। ১৯৮৭ সালে যে পণ্যের দাম ছিল এক শ টাকা, তা চলতি বছরের শুরুতে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ টাকা। ৮৭ থেকে ৯৪ মাত্র ৭ বছরের ব্যবধান। ডলারের মূল্যমান ও মুদ্রাস্ফীতির হার অনুধাবন করতে পারলে ২৭ বছর আগের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা কেমনে ৩২ হাজার কোটি টাকা হলো সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য গড়পড়তা কথা না বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিন। কোথায় কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলুন। তাতে আমাদের মত আম জনতার বুঝতে সুবিধে হয়।

বিএনপি'র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তো সংসদে ঐকিক নিয়ম শেখালেন। কিলোমিটার প্রতি সেতুর খরচ দেখালেন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে খরচ কেন বেশি? সব কি আর ঐকিক নিয়মে চলে? সেতুর ডিজাইন দেখুন। প্রস্থ দেখুন। নদীর গতি-প্রকৃতি দেখুন। পাইলিং, পিলার, স্প্যান দেখুন। ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা সেতু। পদ্মা সেতু একটি দ্বিতল সেতু। ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে নদী শাসন করতে হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধুমাত্র নদী শাসনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুতে বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম পাইল। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর। যে হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে সেটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। হ্যামারের জন্য নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন। আর পদ্মার? ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা থেকে ১৩৬ গুণ বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মার  ৫০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতু থেকে পদ্মা সেতুর খরচ কেন বেশি - এটা বোঝার জন্য কি আর প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির সময় চট্টগ্রামবাসী সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে। আপামর জনসাধারণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মন্ত্রীরা গেলেন ঘটনাস্থলে, হাসপাতালে। অথচ ক্ষমতার বাইরের বড় বড় রাজনীতিবিদরা গেলেন না সেসব জায়গায়। তাঁরা অফিসে বসে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখিয়ে গেলেন। বড় বড় কথা বলে গেলেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর হলেন। চট্টগ্রাম না হোক, ঢাকার বার্ন ইউনিট এ যেয়ে কজন রোগী দেখে, তাঁদের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখতে পারতেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো এমন ছিল না। দুদশক আগেও তো সব রাজনৈতিক দল এমন দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। প্রতিযোগিতা হত সহযোগিতার। দুদশক আগের সেই সহমর্মিতার রাজনীতিতে যেন পচন ধরেছে। বিরোধী রাজনীতি যেন দলীয় কার্যালয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনমুখীতা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার বন্যার কথাই ধরুন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন। মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনগুলো রয়েছে মাঠে, পানিতে, ত্রাণ তৎপরতায়। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোথায়? আবারো সেই অফিসে। টিভি ক্যামেরার সামনে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। মাঠে থেকে করুন। বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে করুন। জনগণের পাশে থেকে করুন। ত্রাণ দিন, আর সমালোচনা করুন। সে সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্য সহকারে। দেশবাসী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পচন আর দেখতে চায় না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

একটুখানি ইতিহাস

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail একটুখানি ইতিহাস

আজ সূর্যোদয়ের অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠি। কর্মহীন থাকার কারনে আমি এখন কোনো রুটিনের মধ্যে বাঁধা নেই। মনেই পড়ছে না, শেষ কবে এত ভোরে উঠে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। ড্রেস আপ সেরে তাড়াতাড়ি নিচে নামি। আমার প্রিয় ও অনুজ সহকর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরী আমার জন্য একটি গাড়ি পাঠান। গাড়িতে পা রাখতেই দেখি, আমার অসুস্থ চালক এসে হাজির। তাৎক্ষণিক মত পাল্টিয়ে নিজের গাড়ি এবং ড্রাইভারকেই নিই। শর্দি জ্বরে সে তিনদিন অনুপস্থিত ছিলেন। বসেই বললাম, চল মাওয়া ঘাটে যাব। হানিফ উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ট্রাফিকহীন ও টোলমুক্ত রাস্তা পেয়ে অসংখ্য সরকারি গাড়িকে অনুসরণ করে চলেছি। আষাঢ় মাস। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের বিচ্ছিন্ন আনাগোনা। গত ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে সিক্তস্নাত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। সকালের রৌদ্রময় উজ্জ্বল আভায় রাস্তার দু'পাশের গাছপালা ঝলমল করছে। আহা! কী নয়নাভিরাম ও নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতন। আমি কী সড়ক পথে জেনেভা থেকে জুরিখে যাচ্ছি? অন্য কোনো সহযাত্রী না থাকায় চালককেই বললাম, দ্যাখো তো খোরশেদ, এটা কী আমাদের চিরকালের চিরচেনা বাংলাদেশ? নাকি ঢাকার অদূরে নতুন কোনো শহর হয়েছে? বিস্ময়কর হলেও সত্য, আজ পুরো পথটাই পদ্মা সেতু হয়ে অপরূপভাবে সেজে আছে। আসলেই ইউরোপ, আমেরিকার সুদীর্ঘ হাইওয়ের মতন এক মসৃণ সিল্কি পথ পাড়ি দিচ্ছি। আমরা পোস্তগোলা ব্রীজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, আবদুল্লাহপুর, হাসাড়া, শ্রীনগর হয়ে পদ্মাব্রীজ টোলপ্লাজা অবধি মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যাই। 

* মঞ্চের গায়ে খচিত শ্লোগানটা আমার নজর কাড়ে। 'আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু'। এ উদ্বোধনীকে কেবল একটি জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। আজ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও একটি দেশের সক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ এবং সামর্থ্যের ইতিবাচক মেসেজ। বলা যাবে না, মহা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, তবে সুন্দর গোছানো ও বাহুল্য বর্জিত অনুষ্ঠান ছিল। জানা যায়, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ৩৫০০ জন। অনুষ্ঠানে গিয়ে মনে হয়েছে, সেতুটি আজ কোনো বক্তৃতার বিষয় হয়ে উঠেনি বরং গভীর আগ্রহ ভরে অপেক্ষমান মানুষের দেখার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কথা বলেছেন মাত্র তিনজন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেতু মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আজ বাঙালিরা নিজের মাতৃভূমিতে বসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মার ওপর নির্মিত অভূতপূর্ব এক স্থাপনাকে অবলোকন করছে। এ উৎসব মুখরিত পরিবেশকে অনেকে দ্বিতীয় বিজয় দিবস বলে আখ্যায়িত করেছেন।  

* দেশে সিলেট অঞ্চলে বন্যা আছে। মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও পুনঃবৃদ্ধি পাচ্ছে। টেস্ট করালেই পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। শনাক্তের হার ১৪.১৮ হয়েছে। যা মধ্যে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। জানা যায়, গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬৮৫ জন। কাজেই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী স্থলে যাওয়ার জন্য করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। সিভিল সার্ভিসের সদ্য সাবেক এবং বর্তমান সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সংক্রমণের কারনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবও যোগদান করতে পারেননি। তবে অনুষ্ঠানটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপন করা হয়েছে। সেতু বিভাগ কর্তৃক মাস্ক, স্যানিটাইজার, লোগো সম্বলিত কোটপিন এবং স্যুভেনির ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক,শিক্ষাবিদ, আমলা, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংস্কৃতি কর্মী, অভিনেতা প্রায় সকলই আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর অংশ নেয়া চোখে পড়ার মতো ছিল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও অনেকটা ঘুরে তাঁর পাশে আসন পান। করোনা পরবর্তী বিরতিতে অনেক প্রবীন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হওয়া ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। গাড়ি পার্কিং দূরে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বৃক্ষহীন, ছায়াহীন স্থানে দাঁড়িয়ে মধ্যাহ্ন রোদের প্রখরতায় দাহ হয়েছেন অনেক অশীতিপর অতিথি। 

* তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিগত ২০০১ সালের ৪ জুলাই এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে সেতুর কাজ শুরু হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দুই স্তর বিশিষ্ট। উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ ও নিচের স্তরে রয়েছে একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিমি, পিলার নদীতে ৪০টি, উচ্চতা ১৩.৬ মিটার, প্রস্থ ২১.৬৫ মিটার, এ্যাপ্রোচ রোড মাওয়া-জাজিরা, নদী শাসন দু'পাড়ে ১৪ কিমি, পানির স্তর থেকে উচ্চতা ৬০ ফুট, জনবল ৪ হাজার। পৃথিবীতে দক্ষিণ আমেরিকার  আমাজনের পরে সবচেয়ে খরস্রোতা নদী নাকি পদ্মা। এ সেতুর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগের আওতায় এসেছে। সরাসরি উপকৃত হবে ৩ কোটি মানুষ। দুই তীরে গড়ে উঠবে আধুনিক শহর। সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে। টোল আদায় হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এ সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়েছে সাড়ে সাত বছরে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে রেল যোগাযোগও চালু হবে। এ সেতু নির্মানে ৪টি নতুন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সারা বিশ্বে প্রথমবারের মতন সম্পাদন করা হয়েছে এমন ৩টি বিষয় এবং বাংলাদেশে ৭টি নতুন বিষয় প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। সেতুর নির্মান ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। 

* ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সংযুক্তি ও সমৃদ্ধির  জনপদ। বিচ্ছিন্নতার অযুহাত এবং অবকাশ থাকবে না আর। সূর্যাস্তের আগেই কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একাকার হবে গোটা দেশ। রাজধানী কিছুটা হলেও চাপমুক্ত, ভারমুক্ত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হতে পারে। এবং রেললাইন চালু হলে সাধারণ মানুষের নিত্য যাতায়াত হবে অধিকতর সুবিধাজনক। 

* এদেশে নদী হিসেবে পদ্মা সবসময়ই আলোচিত হয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশে এ নদীর দৈর্ঘ ১২০ কিমি ও গড় প্রস্থ ১০ কিমি। ভাষায়, শিল্পে সাহিত্যে, গানের বাণীতে, গীতিতে পদ্মার ঢেউ এসেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যােপাধ্যয় বা অন্নদাশঙ্কর রায় সবাই পদ্মার রূপ- রস, প্রমত্ততা,ভাঙা-গড়া আর জেগে ওঠা চরের সিকস্তি পয়স্তি কাহিনি চিত্রায়নের অনুপম কারিগর ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান শ্লোগান মানে পদ্মা দিয়ে শুরু-- 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেতু অতিক্রম করলেই নতুন প্রশাসনিক বিভাগের নামও পদ্মা। তাই অনুষ্টান স্থল থেকে ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম, সেতুটি কেবল বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নয়, পদ্মাও যেন আমাদের ভাগ্যবতী মা। 

১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

পদ্মা সেতু   ইতিহাস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেবে পদ্মা সেতু


Thumbnail

অনেকেই বলেছিলেন- সম্ভব না। ভাঙা শব্দ দুটি জোড়া লাগিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন- সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা আজ জাতির সামনে উপস্থিত। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যার জন্যে অধীর আকুল আগ্রহে গোটা জাতি। বহুল প্রতীক্ষা, কাঙ্ক্ষিত, অনেক সাধনার পরে- ঠিক কোন বিশেষণে জাতির এই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে উপস্থাপন করা সম্ভব বুঝতে পারছি না। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় একটি কাজ করে দেখানো একইসঙ্গে আনন্দের, গর্বের এবং সামর্থ্য প্রমাণের।

খুবই কী সহজবোধ্য ছিল নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণাটি? মোটেও না। তবে মনের জোরে অনেক অসাধ্য সাধন হয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন নিজেদের টাকায় এই সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন, তখনও অনেক ‘যদি’ ‘কিন্তু’তে ঘুরপাক খাচ্ছিল জাতির এই স্বপ্নের সেতুটি। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার তেজদীপ্ত অঙ্গীকার জাতিকে এই অমূল্য উপহার এনে দিয়েছে। তাও খুব অল্প সময়ে। এমন এক সময়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে, যখন করোনাভাইরাস মহামারীতে স্থবির গোটা পৃথিবী। অথচ এই কঠিন প্রতিবন্ধকতাও পদ্মার সামনে  দাঁড়াতে পারেনি বাধার দেয়াল হয়ে। 
একেবারে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে আপাদমস্তক আস্ত সেতুটি। পদ্মা সেতুর গায়ে তুলির শেষ আঁচড়টি দেয়ার পর গত সপ্তায় জ্বলে ওঠে দুই পাশের বাতিগুলো। এতেই যেন জেগে উঠল প্রাণের সঞ্চার। তিল তিল করে গড়া আশার চিলতে যেন ধপ করেই উড়তে শুরু হলো এবার। এক সময়ের অন্ধকার পল্লী আজ জ্বলজ্বল করছে পদ্মার আলোয়। আলোকিত হয়েছে চারপাশ। ডানা মেলতে শুরু করেছে দেখা অদেখা উজ্জ্বল স্বপ্নগুলো। পদ্মা সেতুর ছবি দেখে মনে হয় যেন শিল্পীর গাঁথুনি দিয়ে একটু একটু করে বানানো একটি ক্যানভাস। এটি কেবল একটি সেতু নয়, আমাদের সামর্থ্যরে স্মারক হয়ে থাকবে। একইসঙ্গে বিশ্বকে একটি বার্তাও দিয়ে গেল, বাঙালি বরাবরের মতোই অদম্য। আমরা চাইলে সবই পারি।

তবে এই অসাধ্যটি সাধন হতো না, যদি না জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর সামনে এই অঙ্গীকার করতেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, কিভাবে অজেয়কে জয় করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি বাঙালির জাতির সামনে বহুকাল প্রেরণা হয়ে থাকবে। 

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অনেকগুলো জেলার মানুষ এ প্রথম সড়কপথে পদ্মা পারাপার তথা রাজধানীর সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করতে পারবে। শরীয়তপুরের মানুষ নিশ্চয়ই কখনও ভাবেনি উত্তাল প্রমত্ত পদ্মার ঢেউয়ে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়াও নদী পারাপারের বন্দোবস্ত হবে কোনো এক কস্মিনকালে!

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাবে, যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বঙ্গবন্ধু সেতু, যাকে ঘিরে উত্তরবঙ্গে শিল্প বিপ্লব ঘটেছে। এই সেতুর ফলে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন হয়েছে তা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২% অবদান রেখেছে।

পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এ ধরনের অবদান অনুমান করা হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যমুনার চেয়ে পদ্মা সেতুর অবদান বেশি হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পদ্মা সেতুর পথ ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসা, আরএমজি, অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট, স্টোরেজ সুবিধাসহ অনেক ছোট-বড় শিল্প গড়ে উঠবে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, এই সেতুকে ঘিরে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আঞ্চলিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। জাইকার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ভ্রমণের সময় ১০ শতাংশ হ্রাস জেলা অর্থনীতিকে ৫.৫ শতাংশে উন্নীত করবে, যা এই অঞ্চলের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করবে।

শুধু কতগুলো জেলার মানুষ সড়ক পথে ঢাকা ছোঁবার আনন্দ পাবে তা নয়, জাতীয় অর্থনীতিকেও অনেকখানি চাঙা করে তুলবে এই সেতু। এই যেমন যশোরের গদখালীর ফুল, যা বিদেশেও রপ্তানি হয়; অথচ ঢাকায় পৌঁছানোই ছিল বাস্তবতার প্রেক্ষিতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখন খুব সহজে ঢাকায় পৌঁছে যাবে ভোরে ফোটা ফুলটিও। খরচও পড়বে না আহামরি কিছু। খুলনার মাছ বলুন আর বরিশালের ধান-পান, সবই রাজধানী ছোঁবে কোনো রকমের ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই। এই পণ্য আনা-নেওয়ায় বিশাল একটি ঝামেলা থেকে মুক্তি পাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ, তা সরাসরি ঘুরিয়ে দিবে অর্থনীতির মোড়। বাড়বে জিডিপি। আর গতিশীল হবে অন্তত তিন কোটি মানুষের জীবিকার চাকা।

আজকের এই বিশেষ ক্ষণে সমগ্র জাতির মতো আমরাও আনন্দিত, আহ্লাদিত। আমাদের আনন্দটা একটু বেশিই। কেননা, স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে রয়েছে আমাদের উৎপাদিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী সিমেন্ট এবং বিটুমিন। সেতু নির্মাণে প্রয়োজনীয় সিমেন্টের ৮০ ভাগের বেশি জোগান দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ‘দেশ ও জাতির কল্যাণে’ প্রতিপাদ্যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা বসুন্ধরা গ্রুপ জাতির গর্বের সেতুর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারাটা সীমাহীন আনন্দের।

সেতুটি মসৃণ করতে ভূমিকা রেখেছে বসুন্ধরা বিটুমিন। দেশে উৎপাদিত আধুনিক ও উন্নত গ্রেডের এই বিটুমিন ব্যবহৃত হয়েছে পদ্মাসেতুর সংযোগ সড়কগুলোতেও। বসুন্ধরা বিটুমিনের কারখানা স্থাপনের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের সড়ক খাতে অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দেওয়া। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্ন গ্রেডের বিটুমিনে সড়ক টেকসই হয় না। ভেঙে যায় নতুন সড়কও। এতে ভোগান্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারকে গুণতে হয় বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা। দেশে বসুন্ধরা বিটুমিন উৎপাদন শুরু হওয়ায় বহুমুখী সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। পদ্মা সেতুর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এই বিটুমিনের ব্যবহার এর গুণগত মানকেই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

একজন বাণিজ্য সহায়ক নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যা খুবই সহায়ক বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা অন্যান্য দেশের সাথে আমদানি বৈষম্য কমাতে নতুন নতুন উৎপাদনমুখী ব্যবসা অন্বেষণ করছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আরও আশীর্বাদ দরকার যাতে আমদানি সহায়ক শিল্পগুলো দেশীয় উদ্যোক্তাদের দ্বারা সহজে বেড়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, বসুন্ধরাই একমাত্র বাংলাদেশি কোম্পানি, যাদের সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে মূল সেতুর পিলারে। মূল পিলারে আর কোনো দেশি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্পের সংযোগ সড়কের কাজ আরো আগে শেষ হয়েছে। পুরো সংযোগ সড়কের কাজ এককভাবে শতভাগ বসুন্ধরা সিমেন্ট দিয়ে হয়েছে। এ ছাড়া জাজিরা ও মাওয়া এই দুই প্রান্তে নদীশাসনের কাজে আমাদের ১৪টি সিমেন্ট সাইলো দেওয়া আছে। এটাও শতভাগ বসুন্ধরা সিমেন্ট দিয়ে হচ্ছে। পদ্মা রেলওয়ে লিংক প্রকল্প যার মাধ্যমে পদ্মা সেতু থেকে যশোর পর্যন্ত রেলপথ তৈরি হচ্ছে সেখানেও এককভাবে শুধু বসুন্ধরা সিমেন্ট ব্যবহৃত হবে। এভাবে দেশের সর্ববৃহৎ মেগাপ্রকল্প পদ্মা সেতুতে চার লাখ টন সিমেন্ট সরবরাহ করে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে বসুন্ধরা সিমেন্ট।

এতসব আনন্দের উল্টো পৃষ্ঠায় দুঃখের গল্পও কম নয়। সেই প্রারম্ভিক ষড়যন্ত্রই কিন্তু শেষ কথা নয়। বরং সেটি ছিল শুরু। এরপর সেতুর একেকটি পিলার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তার গুজব কল্পনার ডালপালা ছাড়িয়েছে হু হু করে। কোটি কোটি মানুষের আস্থা আর ভরসার এই সেতুটি থামিয়ে দিতে অযুত নিযুত মাস্টারপ্ল্যান ভেস্তে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক তদারকির কাছে কোনো অপশক্তিই ভিড়তে পারেনি। আমি মনে করি, এই সেতুটি হয়েছে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যার আন্তরিকতার কারণে। অথচ উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশের মানুষ চেয়েছে বলেই শেষপর্যন্ত পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হয়েছে।’ এই সেতুটিও হয়ে থাকুক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গণমানুষের আস্থা আর ভালোবাসার প্রতীক হয়ে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিশ্বে শেখ হাসিনা এখন সফলতার প্রতীক, আর বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক


Thumbnail বিশ্বে শেখ হাসিনা এখন সফলতার প্রতীক, আর বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক

বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আজ সারা পৃথিবীতে সফলতার মূর্ত প্রতীক, তিনি এখন বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক। এটা আজ প্রতিষ্ঠিত, গত এক যুগে বাংলাদেশ পৃথিবীতে মর্যাদার এক আকাশচুম্বী জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের এই মর্যাদার প্রতীক শেখ হাসিনা, কারণ যে সফলতার কারণে বাংলাদেশের এই মর্যাদা, সেই সফলতার মূল নায়ক তিনি।

শেখ হাসিনার সফলতার গল্প আজ শুধু জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক পর্যায়ে নয়, গোটা পৃথিবীতে তাঁর সাফল্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে নেতৃত্ব দেয়া জাতীয় নেতা। অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার মতো সফলতা পাওয়া নেতা পৃথিবীতে বিরল। গত দুই দশকে পৃথিবীর কোন জাতীয় নেতা শেখ হাসিনার মতো এরকম সফলতা দেখতে পারেনি। তাঁর সফলতার গল্প আজ বিশ্ব নেতাদের মুখে মুখে। তাঁর উন্নয়ন কৌশল আজ পৃথিবীর নানা দেশ অনুসরণ করছে। মোটা দাগে বলতে গেলে, শেখ হাসিনা সারা বিশ্বে আজ সফলতার এক প্রতীক। 

রাত পোহালে বাংলাদেশের সর্বশেষ মর্যাদার প্রতীক, বাঙালির স্বপ্নের সেতু, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য পুরো দুনিয়া এখন শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এটা সত্যি, অনেকের মতে পদ্মায় সেতু নির্মাণ বাংলদেশের জন্য এক অসাধ্য কাজ ছিল। তার উপর রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। তাই এই কাজটি বাংলাদেশের কোন নেতা করতে পারবেন- এটি এদেশের অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। অন্যদিকে,  ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ হাসিনার শক্তি- সামর্থ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেনি। তারা ভুলে গিয়েছিলো, শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবের মেয়ে, যে শেখ মুজিব তদানীন্তন বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এবং বিশ্বের পরাশক্তিদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা  নানাভাবে বলে আসছিলো, বাংলাদেশ পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো কঠিন কাজটি করতে পারবে না l পুরো পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা এই  অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। পিতার মতো শেখ হাসিনাও বিশ্ব মোড়লদের কর্তৃত্বকে  চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভৌত কাঠামো পদ্মা সেতু নির্মাণ করলেন। শেখ হাসিনা উন্নয়নশীল বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এই বিশাল কাজটি করতে পারলেন। তাঁর এই কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায়।

বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির একমাত্র কারণ পদ্মা সেতু নয়। আরও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আকাশচুম্বী সাফল্য অর্জন করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ। কৃষি বিপ্লব, পোশাক রপ্তানি, স্বাস্থ্য সেবা, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দ্রুত সময়ে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এসডিজি অর্জনে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা চিশ্চিতকরণ, সমুদ্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা, তথ্য প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক উন্নয়ন - এসকল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ মর্যাদার স্থান করে নিয়েছে। গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এই সাফল্য দেখিয়ে আসছে। তাই শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘটনাটি তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন সাফল্যের ধারাবাহিকতা l এটি বিচ্ছিন্ন কোন সাফল্য নয়। 

যে আকাশ চুম্বী স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে সেই স্বপ্নকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিলো বাংলাদেশ বিরোধী চিহ্নিত অশুভ শক্তি। তারা ভেবেছিলো, জাতির পিতার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ পথভ্রষ্ট হবে, বাংলাদেশ আর দাঁড়াতে পারবে না। তাদের এই ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নানা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সেই কমিটমেন্টের সর্বশেষ নমুনা স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ। তাই আজ জাতীয় উদযাপনের এই দিনে জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই সাফল্য দেখে আজ ভারতের সাবেক একজন সেনানায়ক জেনারেল সুজান সিং উবানের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বের একটি লেখার কথা মনে পড়ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল উবানের এক গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত  তাঁর লেখা বই Phantoms of Chittagong: The "Fifth Army" in বাংলাদেশ  এ উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে কোন যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের ভবিষ্যত যোগ্য নেতৃত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশ মেধাবী ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিবে। তখন অনেকেই বাংলাদেশকে অনুসরণ করবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও মেধাদীপ্ত নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশের বীরত্বপূর্ণ উত্থান- জেনারেল উবানের প্রায় ৪০ বছর পূর্বের লেখার সত্যতা প্রমাণ করে। 

একজন বাঙালি হিসেবে আজ আমি গর্বিত, আমরা শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পেয়েছি যিনি বাংলাদেশকে আজ বিশ্বে নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, যিনি বাঙালিকে বিশ্বজয়ের স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা পিতার মতো জাতিকে মমতা দিয়ে আগলিয়ে রেখেছেন, মহামারী- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বিপর্যয় সহ সকল বিপদ- আপদ থেকে জাতিকে রক্ষা করে চলেছেন,  দেশকে রক্ষার জন্য পিতার মতো মৃত্যুঝুঁকি কাঁধে নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এই বাংলাদেশ যতদিন বেঁচে থাকবে, কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর নানা যুগান্তরকারী অবদানের জন্য ততদিন তিনি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।


পদ্মা সেতু   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

কার সাধ্য বাংলাদেশকে রুখে!

প্রকাশ: ০৬:০৯ পিএম, ২৪ Jun, ২০২২


Thumbnail কার সাধ্য বাংলাদেশকে রুখে!

পদ্মা যেন প্রায় সমুদ্র। একেবারে ছোটবেলায় তো আর সমুদ্র দেখিনি। গোপালগঞ্জে দাদার বাড়ি যাওয়ার সময় পাড়ি দিতে হতো পদ্মা নদী। পাড়ি দিয়ে চলে যেতাম, কিন্তু মনের মধ্যে প্রবল হয়ে জেগে থাকত তার অক্ষয় রূপ। কারণ গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে পদ্মা পার হওয়াটাই যেন আসল ঘটনা। স্মৃতি থেকে অন্য সবকিছু মুছে গেলেও পদ্মাকে মুছে দেয় সাধ্য কার! তার সে কী বিশালতা! এপারে দাঁড়ালে ওপার দেখা যায় না। ওই যে গানে শুনেছি ‘কূল নাই, কিনার নাই, নাই সে দরিয়ার পাড়ি’, তার সঙ্গে পদ্মার স্মৃতিই যেন একাকার হয়ে আছে। এ যেন সেই দরিয়া, সেই অপার সমুদ্র।

পদ্মা আমরা পাড়ি দিতাম রাজবাড়ি থেকে ফেরিতে করে। দুয়েকবার স্পিডবোটেও গেছি বলে মনে পড়ে। তবে ফেরিই ছিল আসল। পদ্মা পাড়ি দেওয়া কি এতই সহজ! বাংলাদেশে সব নদীর রানি সে। তার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে, দেবীর দর্শনার্থীর মতো আকুল হয়ে দীর্ঘ লাইনে ধীরে ধীরে এগোতে হবে, তবেই না মুক্তি। আবার ফেরিতে উঠেও কি যাত্রা এত দ্রুত শেষ হয়! তরঙ্গে তরঙ্গে মনের মধ্যে পদ্মার ছাপ গভীর হয়ে উঠতে থাকে। আর পদ্মার সঙ্গে মিলমিশে থাকে জেলেদের ইলিশ ধরার আনন্দ।

দীর্ঘ পথে পদ্মা মর্মে মর্মে বুঝিয়ে দেয় ওর অস্তিত্ব। বুঝিয়ে দেয়, সে আছে—সৌন্দর্যে, বিশালত্বে, আবেগে, বাংলাদেশের মূল ধমনী হয়ে, আমাদের জীবনযাত্রায়। বাংলাদেশের গহন থেকে উঠে এসে পদ্মা তার তীব্র স্রোত নিয়ে ঢুকে গেছে আমাদের জীবনের গভীরে।

সেই পদ্মা নদীর দুই পার এবার যুক্ত হলো সেতুবন্ধে। ভারতীয় পুরাণের কাহিনীতে সমুদ্রের অতল বুকে অসাধ্য এক সেতু গড়ে তুলেছিলেন রাম, সীতাকে উদ্ধারের জন্য। পদ্মা সেতুর মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে তার এক প্রতীকী তাৎপর্য। পদ্মার প্রকৃতির কারণে এই সেতু গড়ে তোলা ছিল দুঃসাধ্য। আর সেতুটি তো দক্ষিণবঙ্গের বিপুল জনপদকে বিচ্ছিন্নতা থেকে উদ্ধারের এক পরম পথ। পদ্মা সেতু রচনায় যে অনমনীয় নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থির প্রতিজ্ঞায় বীরের মতো সেটা দিয়ে এসেছেন। একদিন যখন তিনি থাকবেন না, এই সেতু থাকবে তাঁর দৃঢ় সংকল্পের উদাহরণ হয়ে, বাংলাদেশের অসম্ভব প্রাণশক্তির এক নিদর্শন হয়ে।

এই সেতুর গড়ে ওঠার পথে পদে পদে ছিল বাধা। প্রথমে ছিল প্রকল্পটি থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী বললেন, নিজেদের টাকা দিয়েই আমরা নিজেদের এই সেতু গড়ে তুলব। প্রথমে শুনে মনে হয়েছিল, এ একটা অসম্ভব ভাবনা। অনেকেই হাহাকার করে উঠেছিলেন। বলেছিলেন নানা আশঙ্কার কথা। নানা রকমের গুজবে আর জল্পনায় বাতাস ভারি হয়ে গিয়েছিল। এত বড় একটি প্রকল্প যে নিজেদের টাকায় করা সম্ভব, এই অটল আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রায় একাকী এগিয়ে গেলেন শেখ হাসিনা। অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন। পদ্মা সেতু সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠতম অবদান, এই বঙ্গবাসীর জন্য। মানুষ নশ্বর, কিন্তু এই সেতুটি তাঁর স্মৃতি জাগিয়ে রাখবে। সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশের নিজেরই আর্থিক সামর্থ্যে যে এটি হতে পারল, সে এক চমকপ্রদ ঘটনা। পদ্মা সেতু বাঙালির ক্ষয় হতে থাকা সাহস আবার আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিল। পদ্মা সেতু ভবিষ্যতে আমাদের কী দেবে, সেটা পরের কথা। আপাতত আমাদের হারিয়ে যাওয়া সাহস ফিরিয়ে দেওয়াই এর সবচেয়ে বড় কীর্তি।

শেখ হাসিনা এ অব্দি অনেক দুঃসহ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। ১৯৭৫ সালের নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডে হারিয়েছেন পরিবারের প্রায় সবাইকে। তাঁর প্রাণসংহারের চেষ্টা হয়েছে বারবার। একাধিকবার কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচেছেন। সেসব অন্ধকার তাঁকে ভেতর থেকে ন্যুব্জ করে ফেলারই কথা ছিল হয়তো। কিন্তু প্রতিবার তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। এগিয়ে গেছেন প্রচণ্ড ইতিবাচক এক সংকল্প নিয়ে। পদ্মা সেতু তাঁর অনমনীয় সংকল্পের এক অমোঘ চিহ্ন।

বলছিলাম ভবিষ্যতের কথা। সেসব অর্থনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞদের বিষয়। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশের মতো নদীবহুল দেশে প্রতিটি সেতুই অসম্ভব লাভজনক হয়েছে। মানুষের জন্য, দেশের জন্য। শুধু লাভের হিসেবই বা এখানে আসবে কেন? একেকটি সেতু একেক অঞ্চলের জনপদকে যেভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তার হিসাব শুধু নগদ টাকায় গোণা যাবে না। উত্তরাঞ্চলের প্রতি বছরের করুণ দুর্ভিক্ষ যে কর্পূরের মতো উবে গেল, তার পেছনে এক যমুনা সেতুর ভূমিকাই অসামান্য। তাই পদ্মা সেতুকে ঘিরে শুধু এই নদীটির দুই পারের মানুষদেরই নয়, সারা দেশবাসীরই বিপুল উত্তেজনা। পদ্মা সেতুর স্বপ্নের মধ্যে যেন সারা দেশের মানুষের বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন একাকার হয়ে মিশে আছে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন, এই সেতু আসছে তাদের উন্নততর জীবনের দিকে পাড়ি দেওয়ার একটি বাহন হয়ে। এই সেতুর ঘটকালিতে দুই পারের ভূখণ্ডের পরিণয়ে সারা দেশের মানুষই যেন বরযাত্রী।

পদ্মার দুই পার আলিঙ্গন করুক। সমস্ত পথে দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে উঠুক। কার সাধ্য বাংলাদেশকে রোখে!


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন