ইনসাইড থট

কার সাধ্য বাংলাদেশকে রুখে!

প্রকাশ: ০৬:০৯ পিএম, ২৪ জুন, ২০২২


Thumbnail কার সাধ্য বাংলাদেশকে রুখে!

পদ্মা যেন প্রায় সমুদ্র। একেবারে ছোটবেলায় তো আর সমুদ্র দেখিনি। গোপালগঞ্জে দাদার বাড়ি যাওয়ার সময় পাড়ি দিতে হতো পদ্মা নদী। পাড়ি দিয়ে চলে যেতাম, কিন্তু মনের মধ্যে প্রবল হয়ে জেগে থাকত তার অক্ষয় রূপ। কারণ গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পথে পদ্মা পার হওয়াটাই যেন আসল ঘটনা। স্মৃতি থেকে অন্য সবকিছু মুছে গেলেও পদ্মাকে মুছে দেয় সাধ্য কার! তার সে কী বিশালতা! এপারে দাঁড়ালে ওপার দেখা যায় না। ওই যে গানে শুনেছি ‘কূল নাই, কিনার নাই, নাই সে দরিয়ার পাড়ি’, তার সঙ্গে পদ্মার স্মৃতিই যেন একাকার হয়ে আছে। এ যেন সেই দরিয়া, সেই অপার সমুদ্র।

পদ্মা আমরা পাড়ি দিতাম রাজবাড়ি থেকে ফেরিতে করে। দুয়েকবার স্পিডবোটেও গেছি বলে মনে পড়ে। তবে ফেরিই ছিল আসল। পদ্মা পাড়ি দেওয়া কি এতই সহজ! বাংলাদেশে সব নদীর রানি সে। তার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে, দেবীর দর্শনার্থীর মতো আকুল হয়ে দীর্ঘ লাইনে ধীরে ধীরে এগোতে হবে, তবেই না মুক্তি। আবার ফেরিতে উঠেও কি যাত্রা এত দ্রুত শেষ হয়! তরঙ্গে তরঙ্গে মনের মধ্যে পদ্মার ছাপ গভীর হয়ে উঠতে থাকে। আর পদ্মার সঙ্গে মিলমিশে থাকে জেলেদের ইলিশ ধরার আনন্দ।

দীর্ঘ পথে পদ্মা মর্মে মর্মে বুঝিয়ে দেয় ওর অস্তিত্ব। বুঝিয়ে দেয়, সে আছে—সৌন্দর্যে, বিশালত্বে, আবেগে, বাংলাদেশের মূল ধমনী হয়ে, আমাদের জীবনযাত্রায়। বাংলাদেশের গহন থেকে উঠে এসে পদ্মা তার তীব্র স্রোত নিয়ে ঢুকে গেছে আমাদের জীবনের গভীরে।

সেই পদ্মা নদীর দুই পার এবার যুক্ত হলো সেতুবন্ধে। ভারতীয় পুরাণের কাহিনীতে সমুদ্রের অতল বুকে অসাধ্য এক সেতু গড়ে তুলেছিলেন রাম, সীতাকে উদ্ধারের জন্য। পদ্মা সেতুর মধ্যেও যেন লুকিয়ে আছে তার এক প্রতীকী তাৎপর্য। পদ্মার প্রকৃতির কারণে এই সেতু গড়ে তোলা ছিল দুঃসাধ্য। আর সেতুটি তো দক্ষিণবঙ্গের বিপুল জনপদকে বিচ্ছিন্নতা থেকে উদ্ধারের এক পরম পথ। পদ্মা সেতু রচনায় যে অনমনীয় নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থির প্রতিজ্ঞায় বীরের মতো সেটা দিয়ে এসেছেন। একদিন যখন তিনি থাকবেন না, এই সেতু থাকবে তাঁর দৃঢ় সংকল্পের উদাহরণ হয়ে, বাংলাদেশের অসম্ভব প্রাণশক্তির এক নিদর্শন হয়ে।

এই সেতুর গড়ে ওঠার পথে পদে পদে ছিল বাধা। প্রথমে ছিল প্রকল্পটি থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী বললেন, নিজেদের টাকা দিয়েই আমরা নিজেদের এই সেতু গড়ে তুলব। প্রথমে শুনে মনে হয়েছিল, এ একটা অসম্ভব ভাবনা। অনেকেই হাহাকার করে উঠেছিলেন। বলেছিলেন নানা আশঙ্কার কথা। নানা রকমের গুজবে আর জল্পনায় বাতাস ভারি হয়ে গিয়েছিল। এত বড় একটি প্রকল্প যে নিজেদের টাকায় করা সম্ভব, এই অটল আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রায় একাকী এগিয়ে গেলেন শেখ হাসিনা। অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখালেন। পদ্মা সেতু সম্ভবত তাঁর শ্রেষ্ঠতম অবদান, এই বঙ্গবাসীর জন্য। মানুষ নশ্বর, কিন্তু এই সেতুটি তাঁর স্মৃতি জাগিয়ে রাখবে। সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশের নিজেরই আর্থিক সামর্থ্যে যে এটি হতে পারল, সে এক চমকপ্রদ ঘটনা। পদ্মা সেতু বাঙালির ক্ষয় হতে থাকা সাহস আবার আমাদের বুকে ফিরিয়ে দিল। পদ্মা সেতু ভবিষ্যতে আমাদের কী দেবে, সেটা পরের কথা। আপাতত আমাদের হারিয়ে যাওয়া সাহস ফিরিয়ে দেওয়াই এর সবচেয়ে বড় কীর্তি।

শেখ হাসিনা এ অব্দি অনেক দুঃসহ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। ১৯৭৫ সালের নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডে হারিয়েছেন পরিবারের প্রায় সবাইকে। তাঁর প্রাণসংহারের চেষ্টা হয়েছে বারবার। একাধিকবার কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচেছেন। সেসব অন্ধকার তাঁকে ভেতর থেকে ন্যুব্জ করে ফেলারই কথা ছিল হয়তো। কিন্তু প্রতিবার তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। এগিয়ে গেছেন প্রচণ্ড ইতিবাচক এক সংকল্প নিয়ে। পদ্মা সেতু তাঁর অনমনীয় সংকল্পের এক অমোঘ চিহ্ন।

বলছিলাম ভবিষ্যতের কথা। সেসব অর্থনীতিবিদ আর বিশেষজ্ঞদের বিষয়। তবে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশের মতো নদীবহুল দেশে প্রতিটি সেতুই অসম্ভব লাভজনক হয়েছে। মানুষের জন্য, দেশের জন্য। শুধু লাভের হিসেবই বা এখানে আসবে কেন? একেকটি সেতু একেক অঞ্চলের জনপদকে যেভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, তার হিসাব শুধু নগদ টাকায় গোণা যাবে না। উত্তরাঞ্চলের প্রতি বছরের করুণ দুর্ভিক্ষ যে কর্পূরের মতো উবে গেল, তার পেছনে এক যমুনা সেতুর ভূমিকাই অসামান্য। তাই পদ্মা সেতুকে ঘিরে শুধু এই নদীটির দুই পারের মানুষদেরই নয়, সারা দেশবাসীরই বিপুল উত্তেজনা। পদ্মা সেতুর স্বপ্নের মধ্যে যেন সারা দেশের মানুষের বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন একাকার হয়ে মিশে আছে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন, এই সেতু আসছে তাদের উন্নততর জীবনের দিকে পাড়ি দেওয়ার একটি বাহন হয়ে। এই সেতুর ঘটকালিতে দুই পারের ভূখণ্ডের পরিণয়ে সারা দেশের মানুষই যেন বরযাত্রী।

পদ্মার দুই পার আলিঙ্গন করুক। সমস্ত পথে দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে উঠুক। কার সাধ্য বাংলাদেশকে রোখে!


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বাগতম-শিক্ষায় বিনিয়োগ চাই


Thumbnail জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্তকে স্বাগতম-শিক্ষায় বিনিয়োগ চাই

আজ সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সেই সংকট মোকবেলা করবার জন্য সব দেশের সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।  আমরা এমন পরিস্থিতিতে ভর্তুকি দিয়ে চলছিলাম। আর সরকারের কাঁধে ঋণের বোঝা চাপিয়ে আনন্দ ফুর্তি করছিলাম। সেই বোঝা আসলে সরকার নয় দেশের দরিদ্র মানুষদেরকে বহন করতে হয়। জ্বালানির উপর ভর্তুকি দেয়ার যুক্তি হিসেবে কৃষি, উৎপাদন, ও পণ্য সরবরাহকে   গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সেই ভর্তুকির সুবাদে আমরা সুলভ মূল্যে গাড়ি চড়ে বিলাসী জীবন যাপন করি।  বিগত বছর গুলোতে দেখছি যানজট আর যানজট।  আমরা এতো অপ্রয়জনীয় ভ্রমণ করি তা বোধহয় পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের মানুষ করে বলে মনে হয় না।  

আমাদের গাড়ি কেনার একটি যুক্তি সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, স্ত্রীকে নিউ মার্কেট পাঠানো এবং ছুটির দিনে দাওয়াত খাওয়া।  আমাদের এই কর্মকান্ড থেকে সৃষ্টি হচ্ছে অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা। সকলেই একটি গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখছি। আমরা উপলব্ধি করছি জলবায়ুর পরিবর্তন।  হাসপাশ করছি গরমে। কিন্তু আমি নির্দয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করছি। আমরা সেগুলো খুবই যত্নের সঙ্গে ব্যবহার করতে পারি। কিন্তু সেদিকে আমাদের নজর নেই। আমরা যদি বুঝতাম তবে আমাদের উন্নয়ন আরও অনেক ধাপ উপরে যেত। আমার মতে, কেবল জ্বালানির  মূল্য বৃদ্ধি করলেই চলে না।  বরং সেখানে রেশনিং করে দেয়া হোক। পাশাপাশি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট উন্নত করা হোক। পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ করা হোক।  জনগণ এসব পলিসির সুফল পাবে। 
 
আমাদের ঋণের বোঝা যত কম থাকবে ততই আমরা ভালো থাকবো। “ঋণ করে হলেও ঘি খাও” নীতি প্রকৃত সুখ বয়ে আনতে পারে না।  
সম্প্রতি লোড শেডিং দেয়ার প্রতিবাদ করে আমাদের বিরোধীদল প্রতিবাদ সভা, মিছিল ও হরতাল করেছে।  কিন্তু তাতে কেউই সাড়া দেয় নি।  জনগণ বুঝছে যে আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। সুতরাং তারা লোড শেডিং মেনে নিয়েছে। আমাদের এখন মনযোগী হওয়া কিভাবে দিনের আলো , প্রকৃতির বাতাস ব্যবহার করে ভালো জীবন যাপন করা যায়। আমাদের সীমিত সম্পদ কিভাবে সুষমভাবে বন্টন করা যায় যাতে সামাজিক বৈষম্য কমে।  আমাদের নজর দেয়া উচিত কিভাবে গ্রাম থেকে শহরে যে ব্যাপক মাইগ্রেশন চলছে সেটাকে বন্ধ করা।  

আমাদের গ্রামের সকল রাস্তা পাকা। সুতরাং একজন ডাক্তার সেখানে যেতে পারে।  রোগীদের ঢাকা পর্যন্ত ছুটতে যাতে না হয়। সেজন্য আমাদের হাসপাতালগুলোতে নজর দেয়া। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া যাতে সেখানে যত্নের সঙ্গে পড়া লেখা হয়। যাতে করে ভালো শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো যায়। যদি আমরা প্রতিটি বিদ্যালয়ে ভালো শিক্ষক দিতে পারি তাহলে কেউই মিরপুর থেকে মতিঝিল কিংবা আজিমপুর থেকে উত্তরা যাবে না।  

আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না তার অন্যতম কারণ বেতন কম এবং পদমর্যাদা কম। ফলে একজন মেধাবী ছাত্র চলে যায় ব্যাংক , বীমা কিংবা ঐরকম কোনো কাজে। আর এভাবেই শুরু হয় সংকট।  

আমাদের এক নতুন রোগ ইংলিশ মিডিয়াম। এই রোগ নিয়ে আমাদের কারও ভাবনা নেই। ফলে সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হলে যেখানে আমাদের ভর্তুকি কিংবা অপচয় হচ্ছে কিংবা যেখানে দুর্নীতি হচ্ছে সেখানে নজর দেয়া সম্ভব। আমরা   যে দুষ্ট চক্রে জর্জরিত সেটাকে ভাঙতে হলে শিক্ষাকে সবচে গুরুত্ব দিতে হবে। ভোগবাদী জীবন নয় আদর্শকে শিক্ষায় আনতে হবে।  যদি সেটা সম্ভব হয় তবে উন্নয়ন টেকসই হবে। আশা করি সকলে সেটা বুঝতে পারবে।  

আমাদের সরকার শিক্ষায় অনেক মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানে এখনও আরও অনেক কিছু করবার আছে। গুণগত মানের শিক্ষা দিতে শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবক এবং সরকারকে সদা জাগ্রত থাকতে হবে।  আমি মনে করি জ্বালানি তেলের মত আরও যেখানে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে সেগুলো বন্ধ করা যায় কিনা।  মানুষ এখন এতটাই দিশেহারা যে জীবনের মূল্য ও সুখ কোনটাই পাচ্ছে না। সে ছুটছে ছুটছে কিন্তু তার তৃপ্তি নেই।  তার মনেতে হতাশা আর হতাশা। জীবনের অপূর্ণতাকে জয় করতে হলে সঠিক শিক্ষা একান্ত উপযোগী। আমাদের শিক্ষাকে যদি মানসম্মত করতে পারি তবেই আমরা প্রকৃত উন্নয়ন অর্জন করতে পারি। আসুন আমরা শিক্ষাকে গুরুত্ব দেই। 

আমরা এখন প্রতিটি প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একটি লাইব্রেরি নির্মাণ করতে পারি। সেখানে যে নির্মাণ কাজ হবে সেখানে কর্মসংস্থান হবে।  আমাদের অর্থনীতি সচল হবে। আমাদের স্কুল গুলোতে বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক, ও পাঠের প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারি।  ফলে সারা দেশ ব্যাপী আমাদের শিশুরা আনন্দে পড়াশোনাতে মাতবে। তারা ভার্চুয়াল জগৎ থেকে বাস্তব জগতে সময় কাটাবে। আশা করি আমাদের ভাবোদয় হবে।
  
আমরা যদি ভাবি আমাদের সন্তানেরা প্রাইভেট গাড়িতে করে স্কুলে যাবে তবে কোনোদিনই আমরা টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে পারবোনা। আমাদের শিক্ষার ঘাটতি আমাদের উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতা ও সকল অসুখের কারণ।  সেজন্য শিক্ষায় মনযোগ দেয়া একান্ত জরুরি। যে উন্নয়নের ডানা আমরা মেলেছি তার জ্বালানি জোগাড় যে নেই সেটা ভুলে গেছি আর তাই উদ্বিগ্ন হচ্ছি কিভাবে ঋণ শোধ করব ভেবে। এমন একটি সময়ে জ্বালানির উপর ভর্তুকি বন্ধ একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। 



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

"দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের মূর্তপ্রতীক শেখ কামাল"


Thumbnail "দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের মূর্তপ্রতীক শেখ কামাল"

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের স্পেশাল ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট অফিসারদের অন্যতম, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি, মুক্তিবাহিনীর অন্যতম সংগঠক, সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শেখ কামাল শুধুমাত্র পিতা বঙ্গবন্ধুর পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন না। বরং সস্ত্রীক ছিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ। ছিলেন ছাত্রলীগের একজন কর্মি, জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যতম সদস্য। ৬ দফা আন্দোলনের রাজপথের কর্মি ছিলেন। ছিলেন ৬৯'র গণঅভ্যূত্থানের অন্যতম সংগঠক।

পিতা মুজিবের ভাষা আন্দোলন থেকে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মীর্জা ও জেনারেল আইয়ুব খানের "মার্শাল ল" বিরোধী আন্দোলনে বার বার গ্রেফতার ও কারাবরণ! শিশু কামাল পিতৃস্নেহ থেকে  বঞ্চিত বারবার। অবুঝ শিশু কামালের এই আত্মত্যাগই বা কম কিসের? বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের জন্ম ১৯৪৯ সালের ৫ আগষ্ট। শিশু কামালের বঞ্চনা ও আত্মত্যাগের শুরু জন্মের এক মাস না পেরোতেই। এক মাসেরও কম বয়সে ৪৯'র সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গ্রেফতার হয়ে টানা ২৭ দিন জেলবন্দী পিতা মুজিবের অবর্তমানে প্রথম পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হন সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শেখ কামাল। ৪৯'র ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় বার পিতা মুজিবের যত্ন, আদর, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত শেখ কামালের আত্মত্যাগের ইতিহাস আরেকটু দীর্ঘ। ২ মাস ২১ দিন বয়সের শেখ কামালকে এবার পিতা ছাড়া থাকতে হয় দীর্ঘ ৬৩ দিন। 

অতঃপর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি শিশু কামালের বয়স যখন মাত্র ৪ মাস ২৭ দিন, তখন তৃতীয়বারের মত পিতা মুজিব গ্রেফতার হয়ে জেলে কাটান টানা ২ বছরেরও বেশি সময়। জেলখানায় অমানবিক নির্যাতন আর টানা ১১ দিন অনশনের পর ভগ্ন শরীর নিয়ে পিতা মুজিব মুক্ত হন ৫২'র ২৭ শে ফেব্রুয়ারি। তখন পিতা মুজিব যেন শিশু কামালের কাছে নিতান্তই বাড়ির এক নতুন মেহমান, নতুন আগন্তুক, অচেনা এক মুখ! ৫২-৫৪ প্রায় দু'বছরে এই অচেনা মুখটিই যেন তার কাছে হয়ে উঠল সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ। দু'বছরের স্নেহ, মমতা, আদর, ভালোবাসায় সিক্ত শিশু কামাল কেবল একটু একটু চিনেছে পিতা মুজিবকে। পিতার প্রতি যেন এক অদৃশ্য আকর্ষণ আর নির্ভরতা জন্মেছে অবুঝ শিশু মনে। তবে হৃদয়হীন, পাষাণ স্বৈরশাসকের তাতে কি আসে যায়? ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে তাকে মুজিবকে গ্রেফতার করতেই হবে। 

৫৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ভেঙে দেওয়ার পর পুনরায় মুজিবকে করাচী থেকে ঢাকা ফেরার পর গ্রেফতার করা হল। ৫ বছরেরও কম বয়সী শেখ কামাল এবার চতুর্থবারের মত পিতার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হল। এবারের কষ্টটা একটু বেশি। কারন চেনার পর এবারই প্রথম পিতাকে ছাড়া থাকতে হল তাকে। দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস কারাভোগের পর যখন ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়ে বাড়ীতে আসলেন, ততোদিনে শিশু কামাল যেন অনেকটাই ভুলে গেছে পিতা মুজিবকে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মীর্জা কর্তৃক 'মার্শাল ল' জারির পরে ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। তখন কামালের বয়স প্রায় ৯ বছর। বুঝতে শেখার পর প্রথম আঘাত। টানা ৩ বছরেরও বেশি সময় বঙ্গবন্ধুর এই জেলজীবন ছিল সম্ভবত বালক শেখ কামালের জন্য সবচেয়ে কষ্টের।

বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দেওয়ার পর যখন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয়, তখন ১৯ বছরের টগবগে যুবক কামাল ৬ দফার পক্ষে স্কুল, কলেজে প্রচারণা চালিয়েছেন। ৬ দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছেন। পিতা মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে রাজপথে শরিক হয়েছেন। ৬৯'র গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ছিলেন শেখ কামাল। 

ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রথম ব্যাচের স্পেশাল ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেট অফিসারদের অন্যতম। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেছেন ৭১'র মহান মুক্তিযুদ্ধে। ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম পথিকৃৎ। 

বাঙালীর স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম সবখানেই যার আত্মত্যাগ তাকে করেছে মহিমান্বিত। পৃথিবীর সব পিতার জন্য ২৬ বছরের এই ক্ষণজন্মা পুরুষের জীবন যেমন অনুপ্রেরণার উৎস, তেমনি সব শিশু ও যুবকের জন্য আজীবন আত্মত্যাগ ও সাহসের প্রতীক হয়ে রবে।

৫ আগস্ট ২০২২, ৭৩ তম জন্মবার্ষিকীতে বহুগুণে গুনান্বিত জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

দেশপ্রেম   সাহস   আত্মত্যাগ   শেখ কামাল  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

শেখ কামাল: তারুণ্য যখন মানুষকে মহিমান্বিত করে


Thumbnail শেখ কামাল: তারুণ্য যখন মানুষকে মহিমান্বিত করে

শেখ কামাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রথম পুত্রসন্তান। বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো ৭৩ বছর (জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৪৯)। ঘাতকরা তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের  সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িতে হত্যা করেছিল। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন আমি বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিছু সময় কাটাচ্ছি শেখ কামালের শৈশবের বন্ধু ইফতেখার হোসেন ডালিমের সঙ্গে তার বাড়িতে। ইফতেখার আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। ১৯৭৪ সালের পর ইফতেখারের সঙ্গে দেখা হলো এবার। দীর্ঘদিন সে প্রবাসে। রাতে শেখ কামালের সঙ্গে কাটানো তার সেই শৈশবকালের স্মৃতি হাতড়ে অনেক কথা বললো। যা অনেকটা ব্যক্তিগত। ইফতেখারের বাবা প্রকৌশলী আবদুল লতিফ ছিলেন তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কমিশনার ও প্রধান প্রকৌশলী। যমুনা সেতু নির্মাণের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি। ইফতেখারের কাছে জানতে চাই কেমন মানুষ ছিলেন শেখ কামাল? ইফতেখার এক কথায় বলে, তখনকার আর দশটা তরুণের মতো প্রাণোচ্ছল। বলে, ‘নিয়মিত আমি আমাদের বেইলি রোডের সরকারি বাড়ি থেকে বিকালে সাইকেল নিয়ে কামালের বাড়িতে যেতাম। কামালেরও তখন একটা সাইকেল ছিল। দুজনে বের হতাম ধানমন্ডি এলাকায় ঘুরতে। সাথী হতো আরও কয়েক বন্ধু’। একসময় ইফতেখাররা ধানমন্ডির ৬ নম্বর রোডে নিজেদের বাড়িতে ওঠে। তখন অনেক সময় সে কামালের সঙ্গে সকাল-বিকাল আড্ডা মারতে তাদের বাড়িতে যেতো। কথা বলতে গিয়ে ইফতেখার কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে গেলো। তাকে আর প্রশ্ন করি না। ফিরে আসি নিজের স্মৃতিতে।

শেখ কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক দুই বছর নিচে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। কলাভবনের একই ভবনে আমাদের বাণিজ্য ও শেখ কামালের বিভাগ। শেখ কামাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরিচিত হতে শুরু করে প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের বড় ছেলে হিসেবে। তখন  ঊনসত্তরের গণআন্দোলন শুরু হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রতিদিন সভা আর মিছিল। মিছিলে শেখ কামাল প্রায় প্রতিদিন তার বন্ধুদের নিয়ে যোগ দেয়। তবে কোনও বক্তৃতা দিতে কখনও দেখা যায়নি। আর দশ জনের সাথে সভা শেষে আমাদের সাথে মিছিল করেছে। এখনকার দিনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা হয়তো শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনের নাম নাও শুনতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পেছনে একটি ছোট বেড়ার ঘর। ওপরে টিনের ছাউনি। ভেতরে দুটি টুলে ছয় জন বসতে পারে। এক প্লেট তেহারি আট আনা। দুই প্লেটে দুপুরের খাওয়া হয়ে যায়। বিকালে ঘিয়ের সুগন্ধিওয়ালা সিঙাড়া। শরিফ মিয়ার সহকারী রমজান। খাবার পরিবেশন করে আর কাপ-প্লেট ধুয়ে রাখে। আমার সাথে শেখ কামালের প্রথম দেখা ও কথা সেই শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে। হেঁটে এসে সে দেখে ভেতরে বসার জায়গা নেই। আমি একটু সরে বসে কামালকে পাশে বসতে বলি। জবাবে বলে সে সামনের লাইব্রেরি চত্বরে বসবে। সে তার তেহারি নিতে এসেছে। চলে যাওয়ার পর শরিফ মিয়া একটু উঁচু গলায় বলে ‘দুই টাকা’। কামাল হাত দেখান। এই হলো শেখ কামাল, যাকে আলাদা করে চেনার উপায় নেই। তবে তাকে চেনার একটা উপায় ছিল, তিনি প্রায়শ দেখতাম একটা লাল জিপ চালাতেন। পরে জেনেছি সেটি ছিল তার বন্ধু ইকবাল মাহমুদ টুকুর। পরে টুকু বিএনপিতে যোগ দিয়ে জ্বালানিমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিএনপি আমলে সুযোগ পেলেই সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে শেখ কামালের চরিত্র হনন একটি রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল। বড় বড় নেতা টিভিতে এসে বলতো, শেখ কামাল বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করতে গিয়েছিলেন। একবার এই টুকু টিভিতে সত্যটি বলেন ‘ওই দিন ওই গাড়িতে (যেটার ওপর পুলিশ গুলি ছুড়েছিল) আমিও ছিলাম। আমরা কোনও ব্যাংক ডাকাতি করতে যাইনি। পুলিশ ভুলবশত আমাদের গাড়িতে গুলি চালালে কামাল আহত হয়েছিল’। কামালকে দেখতাম মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে আসতেন। তখন আমার বিকালটা কাটতো খেলার মাঠে। সেখানে অন্য আরও অনেক ছাত্রীর সাথে সুলতানা আসতেন দৌড় প্র্যাকটিস করতে।

সুলতানা ছিলেন বেশ ফুটফুটে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছেন একজন ভালো দৌড়বিদ হিসেবে। তাকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তানের গোল্ডেন গার্ল। কামাল সুলতানার সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলে আবার চলে যেতেন। দুজনেই সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।  পরে সুলতানার সাথে তার বিয়ে হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই। মেহদির দাগ না শুকাতেই ১৫ আগস্ট সুলতানাকেও  হত্যা করেছিল ঘাতকরা।

শেখ কামালকে কেন মানুষ মনে রাখবেন? বঙ্গবন্ধুর সন্তান বলে?  সেটা তো তার জন্মগত সূত্রে পাওয়া । তা নিয়ে তার বা তার ভাইবোনদের কারও কোনও পৃথক অহমিকা কখনও ছিল বলে মনে হয় না। আমার ছোট ভাইয়ের সাথে শেখ জামাল রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে পড়তেন। জামাল বেশ দুরন্ত ছিলেন। অনেক দিন পর ছোট ভাই জেনেছে ও শেখ মুজিবের ছেলে। শেখ কামালকে মানুষ অনেক কারণে মনে রাখবেন। শেখ মুজিব বা বঙ্গবন্ধুর সন্তান বলে শেখ কামালের কোনও অহংকার কখনও ছিল, তা তার শত্রুও বলতে পারবে না। তার বন্ধুর সংখ্যা দেখেছি অগুনতি। সবসময় একসাথে ক্যাম্পাসে ঘোরাফিরা করতো। কালো ফ্রেমের মোটা চশমা। বেশ বাহারি গোঁফ। কিছুটা কোঁকড়ানো ঘন কালো চুল। বলেছি আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও কখনও নেতা হতে চায়নি বা কোনও পদপদবি দখল করতেও না। তবে একসময় তাকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য করা হয়েছিল আরও কয়েকজনের সাথে। এমন ছাত্রলীগ কর্মী কি এখন পাওয়া যাবে?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অনেকটা পরিবারের অগোচরেই চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে। বাবা তখন পাকিস্তানের কারাগারে। বঙ্গবন্ধুর সন্তান মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে কি ঘরে বসে থাকতে পারে? একইভাবে একদিন শেখ জামালও যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম সেনা অফিসার রিক্রুট আর ট্রেনিং হবে ভারতের হিমালয়ের পাদদেশে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির মূর্তি ট্রেনিং ক্যাম্পে। ৬১ জনকে বাছাই করা হলো। শেখ কামাল তাদের একজন। বঙ্গবন্ধুর সন্তান বলে সে কোনও বাড়তি সুবিধা কখনও পায়নি। ভারতের সেনা অফিসারদের প্রশিক্ষণের জন্য যেই বাছাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় এই ৬১ জনকেও তা-ই করতে হয়েছিল।

এই ৬১ জন বাঙালি তরুণের জন্য ক্যাম্পে তৈরি হলো বাঁশের ব্যারাক ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে। কোনও বিদ্যুৎ বাতি নেই। মশার উপদ্রব মারাত্মক। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও খুবই সাদামাটা। চারদিকে জোঁকে কিলবিল করছে। সেখানে ভারতীয় সেনা প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে কঠিন প্রশিক্ষণ চলছে। অক্টোবরের ৯ তারিখ বাংলাদেশের প্রথম ৬১ জন সেনা অফিসারের কমিশন হলো। কমিশন প্যারেডে সালাম নিলেন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তারপর সকলে গেলো যুদ্ধের ময়দানে। শেখ কামালকে পদায়ন করা হলো বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে।

দেশে ফিরে শেখ কামাল কিছু দিন পর ফিরে গিয়েছিলেন বেসমারিক জীবনে। নতুন দেশে কত কাজ তখন শুরুর বাকি। কামাল বুঝতেন সব কাজ সকলকে দিয়ে হয় না। তার প্রথম অগ্রাধিকার দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সংগঠিত করা। শেখ কামালের দাদা ও বাবা দুজনই ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন। শেখ কামালের একটু সুবিধা ছিল তার দেহের উচ্চতার কারণে। আমার বন্ধু ইফতেখার জানালো, শাহীন স্কুলে পড়ার সময় ভালো বাস্কেট বল আর  ক্রিকেট খেলতেন কামাল। ক্রিকেটের প্রতি তার টানটা সম্ভবত একটু বেশি ছিল। তখনকার দিনের আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে ঢাকা লীগেও খেলেছেন শেখ কামাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তহল প্রতিযোগিতায়ও নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। বাবার মতো কামালও বিশ্বাস করতেন সংগঠন ছাড়া কোনও কিছু নিয়ে সামনের দিকে বেশি যাওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের আগেই, ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালীন ১৯৬৮ সালে ধানমন্ডি ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ কামাল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী ক্লাবের গোড়াপত্তন করেন শেখ কামাল, যেটি আজ দেশের একটি সেরা ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান।

সম্ভবত শেখ কামালই এই উপমহাদেশে প্রথম একজন বিদেশি ফুটবল কোচ বিল হার্টকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন। এক কথায় বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনের আধুনিকায়নের যাত্রা শুরু হয়েছিল শেখ কামালের হাত ধরেই।

শেখ কামালের বিচরণ শুধু যে ক্রীড়াঙ্গনে সীমাবদ্ধ ছিল তাই নয়, তিনি একজন সংগীতানুরাগীও ছিলেন। বড় বোন শেখ হাসিনার মতো ভর্তি হয়েছিল দেশের ঐতিহ্যবাহী সংগীত বিদ্যালয় ছায়ানটে। তালিম নিয়েছিল সেতার বাদনে। ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শেখ কামালের ঘরে গেলে দেখা যায় তার বাজানো সেতারগুলো। একজন ব্যক্তির নিজ কক্ষ তার রুচির যে অনেক পরিচয় দেয় তা বুঝা যায় শেখ কামালের নিজ কক্ষ দেখলে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে মঞ্চনাটকের জগতে এক বিপ্লব ঘটে গেলো। আগে হতো অফিসপাড়ার নাটক। সৌখিন নাট্যচর্চা ছিল সীমিত। কামাল আর বন্ধুরা মিলে গড়ে তুলেছিল ‘ঢাকা থিয়েটার’।

এই থিয়েটারের হয়ে নাটকেও অভিনয় করেছিল শেখ কামাল। শেখ কামাল মেয়ে শিল্পীদের কতটুকু সম্মানের চোখে দেখতেন তা একদিন বলেছিলেন ঢাকা থিয়েটারের তখনকার একজন নামকরা কর্মী ডলি জহুর।

ফিরে যাই সেই পুরানো দিনের স্মৃতিতে। কি না হতে পারতেন বা করতে পারতেন শেখ কামাল, জনক যখন জাতির পিতা আর দেশের রাষ্ট্রপতি? শেখ কামালকে অন্যদের সাথে হত্যা করার পর ক্ষমতা দখলকারী জিয়া অনেক চেষ্টা করেছে শেখ কামালের কোনও ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি বা বড় ধরনের কোনও ব্যবসাপাতি আছে কিনা খুঁজে বের করতে। পাননি তো কিছুই। শুধু কিছু খেলার সরঞ্জাম আর কয়েকটি সেতার। জিয়ারও একজন সন্তান এখনও জীবিত। শেখ কামালের সাথে তার কি কোনও তুলনা কেউ করতে পারেন? অথবা বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা কি কেউ একজন শেখ কামালের পাশে নিজেদের দাঁড় করিয়ে নিজেদের পরিমাপ করতে পারবে? আমাদের এই বয়সে বলতেই হয়- না, সেই প্রজন্ম আর কোনোদিন ফেরার সম্ভাবনা দেখি না। ব্যতিক্রম ক’জন থাকতে পারেন। এখন তো সুযোগ-সুবিধা অনেক। কিন্তু তারপরও একজন শেখ কামাল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ, যুগের সাথে সাথে সবকিছু পাল্টে গেছে। এখন বিত্তবৈভব মানুষকে সমাজে সমাদর করে, চরিত্র না। প্রতিভার কদর তো অনেক দিন আগেই বিদায় নিয়েছে এই ঘুণে ধরা সমাজ হতে।

শেখ কামালের এই জন্মদিনে কোনও কেক কাটা হবে না। শেখ হাসিনা শেখ কামালকে বলবেন না ‘শুভ জন্মদিন কামাল’। মা ফজিলাতুন নেছা ছেলের জন্য ভালোমন্দ কিছু রান্না করবেন না। বাবা বলবেন না ‘জন্মদিনে বাড়িতে থেকো। মুরুব্বিরা দোয়া করতে আসবে না। ছোট বোন রেহানা আবদার করবেন না ‘ভাইয়া আমাদের খাওয়াতে হবে কিন্তু’। আর ছোট রাসেল সকলের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করবে না বাড়িতে আজ কী হচ্ছে!

এই দিনে শেখ কামালের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। প্রত্যাশা করি, এই প্রজন্ম শেখ কামালের প্রজন্মের কাছ হতে কিছুটা হলেও শিখবে।

শেখ কামাল   তারুণ্য  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

লোডশেডিং এর ক্ষেত্রে ওয়াদার বরখেলাপ কাম্য নয়


Thumbnail লোডশেডিং এর ক্ষেত্রে ওয়াদার বরখেলাপ কাম্য নয়

গত সপ্তাহে ঢাকায় ছিলাম চারদিন। বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে শুনেছি, অফিস সময়ে বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে একবার। তাও ঘণ্টা খানেকের বেশি না। পূর্ব ঘোষিত সময় অনুযায়ীই বিদ্যুৎ থাকে না। অফিস সময়ে বাইরের কাজে ছিলাম বলে হয়ত বাড়িতে বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি।

গ্রামে আছি সপ্তাহখানেক হল। অবস্থা শোচনীয়। কথা কাজে ঠিক নেই। শুধুই ওয়াদার বরখেলাপ। পল্লী বিদ্যুতের ওয়েবসাইট এ দেখাচ্ছে বিদ্যুৎ থাকবে না- এক ঘণ্টা করে। তাও দিনে একবার । কার্যত বিদ্যুৎ থাকছে না দৈনিক চার থেকে পাঁচবার। ঘোষিত সময়ে থাকে না ঘন্টাখানেক। অঘোষিত সময়ে থাকে না ত্রিশ চল্লিশ মিনিট করে। পল্লী বিদ্যুতের আঞ্চলিক প্রধানরা বলছেন, যা পাবার তা পাচ্ছি না। যদি পাওয়ার কথা থাকে ছয় মেগাওয়াট, পাচ্ছি চার মেগাওয়াট। তাই কথা রাখতে পারছি না।

বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্তাদের আর কিইবা করার আছে। যা পাচ্ছে তাই ভাগ যোগ করে দিচ্ছে সবাইকে। সুষম বণ্টন করছে। বড় কর্তারাই বা কি করবেন? উনারা ওয়েবসাইটে একটি করে পিডিএফ ফাইল আপলোড করছেন। এলাকার নামের পাশে চব্বিশ ঘণ্টার জন্য চব্বিশটা চারকোনা ঘর আঁকছেন। তার একটিতে লাল রং দিয়ে ব্লক করে দেখাচ্ছেন- ঐ সময়ে বিদ্যুৎ থাকবে না। লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা নিয়ে খুব সুন্দর একটি সমাধান! ব্যাস, দায়িত্ব শেষ। উপর মহলকে দেখাচ্ছেন, পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী লোডশেডিং হচ্ছে। বিলকুল ঠিক হায়। বাস্তবে যে কথা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না, ওয়াদার বরখেলাপ হচ্ছে তা হয়ত ওপর মহল জানেনই না।

ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কথা এতদিনে দেশবাসী জেনে গেছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা দেশবাসী বুঝে গেছে। তাই বলে জনগণের সাথে তামাশা করবেন না। দৈনিক এক ঘণ্টা নয়। প্রয়োজনে লোডশেডিং দু ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা বা চার ঘণ্টা করুন। কিন্তু ওয়েবসাইটে যেটি ঘোষণা দিবেন, সেই সময়ের ভেতর থাকুন। ওয়াদা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। বিদ্যুৎ বিহীন সময়ের কথা মানুষের জানা থাকলে, তাঁরা সে অনুযায়ী তাদের পরিকল্পনা সাজাতে পারে। বৈশ্বিক এ দুর্যোগে মানুষের চাহিদা কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নয়। তাঁদের দাবি পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী লোডশেডিং। তা সেটা যে কোন সময়কালের জন্য। এ মুহূর্তে  কথা অনুযায়ী কাজ করে, ওয়াদার বরখেলাপ না করে, লোডশেডিং দিয়েও জনগণের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু যদি ওয়েবসাইটের ঘোষণা চলে ওয়েবসাইট অনুযায়ী আর বাস্তব চলে ভিন্ন নিয়মে, তাতে  জনগণ যে কোন সময়ে ফুঁসে উঠতে পারে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

উৎপাদন বেড়েছে ফসলের; খাদ্যাভাব হবে না বাংলাদেশে

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ০৪ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail উৎপাদন বেড়েছে ফসলের; খাদ্যাভাব হবে না বাংলাদেশে

‘যে যতই বলুক বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হইয়া যাবে, কিসের শ্রীলঙ্কা? আমরা কৃষক আছি না। আমরা কৃষকরা মাঠে আছি। মাটিকে ঘুষ দিতে হয় না। মাটির সাথে পরিশ্রম করলে, মাটি আমাদের সাথে কথা বলে। আমাদের অভাব নেই। আমাদের ঘরে টাকা আছে, আমি মনে করি কৃষকের ঘরে টাকা আছে। আমরা কৃষকরা নেতৃত্ব দিব। খাদ্যের জন্য আমাদের ভিক্ষা চাওয়া লাগবে না। আমরা উৎপাদন করতে পারি। খাদ্যের অভাব হবে না বাংলাদেশে। আমাদের হাতে বল আছে, আমাদের ক্ষমতা আছে। আমি মনে করি আমরাই পারবো বাংলাদেশ জয় করতে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই পারবে বাংলাদেশ জয় করতে, আমরা কৃষকরা তাঁর সাথে আছি‘। আমরা বাড়িও চাইবো না, গাড়িও চাইবো না, টাকাও লাগবে না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অনুরোধ কৃষকদের দিকে খেয়াল রাখবেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করবেন, বিদেশে রপ্তানি করার ব্যবস্থা করবেন‘। বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত নুরুন্নাহার কৃষি খামারের স্বত্বাধিকারী মোছাঃ নুরুন্নাহার বেগম গত ২৭ জুলাই ২০২২ তারিখে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত ‘কৃষিক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (এআইপি) সম্মাননা ২০২০‘ প্রাপ্তির পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একথাগুলো বলেছেন। মোছাঃ নুরুন্নাহার বেগমের বক্তব্যে বাংলাদেশের কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র, মনোবল উৎপাদনে সক্ষমতা ও সফলতার চিত্র ফুটে উঠেছে।

তিনি বলেছেন, ‘ আমরা কৃষকরা এখন আর সেই কৃষক নাই। আমাদের  পোশাক এখন অন্যদের মতই‘...। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমীন তাঁর অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, কৃষক এখন আর পাখির রব শুনে রাত পোহানোর সঙ্গে সঙ্গে গরু আর লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ে মাঠে যান না। সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনিতে ব্যস্ত থাকেন না। অধিকাংশ কৃষকের গায়ে এখন আর ছেঁড়া লুঙ্গি দেখা যায় না। বর্তমান কালের কৃষকের পরনে থাকে ফুল প্যান্ট ও টি-শার্ট এবং পায়ে জুতা বা সেন্ডেল। চৈত্র-বৈশাখের প্রখর রৌদ্রে পুড়ে আউশ ও আমন ধান বা পাটের বীজ বপনের জন্য তাদের গরু টানা কাঠের লাঙলে জমি কর্ষণ করতে দেখা যায় না। মুগুর দিয়ে জমিতে ঢেলা ভাঙা, জমির উর্বরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাঁধে ঝুলিয়ে বা মাথায় টোপর ভর্তি গোবর-খড়কুটা পরিবহন ও তা মাঠে ছড়ানো আজ অদৃশ্য। বোরো ধানের জমিতে সেওতি দিয়ে পানি সেচের দৃশ্য কল্পনাতীত। এখন আর পাট ও আউশ এবং আমন ধানের জমিতে নিরানি দিয়ে আগাছা দমন করতে দেখা যায় না। সর্বত্র কলের লাঙল, নিড়ানি ও সেচ যন্ত্র এবং ফসল কর্তন, মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্রের সমারোহ। বিকাল ৪টার পর সাধারণত কৃষককে মাঠে দেখা যায় না। তারা বিকালে গ্রামের বাজারে গড়ে  ওঠা দোকানে বসে ফুরফুরে মেজাজে চা, বা কোমলপানীয় পান করেন, টেলিভিশন দেখেন ও রাজনৈতিক আড্ডায় লিপ্ত হন।  

গ্রামীণ কৃষাণীর ফসলের মাড়াই-ঝাড়াই, বিনিদ্র রজনীতে ধান সেদ্ধ, রোদে ধান শুকানো ও কাঠের ঢেঁকিতে ধান ভানতে হয় না। গৃহস্থালিকাজে নিয়োজিত বছরি কামলা বা ঠুকা কামলার আহার জোগাতে তাদের বিশাল পাত্রে রান্নার কাজ অদৃশ্য। কৃষাণীরা এখন আর গরু-মহিষের খাবারের চাড়ি পরিষ্কার, চাড়িতে পানি দেয়া, গোয়ালঘর ও গোশালা ঝাড়ু দেয়া ও গোবর শুকিয়ে জ্বালানি তৈরি করেন না। এমনকি খড়কুটা বা গাছের পাতা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতেও তেমন একটা দেখা যায় না। অনেক কৃষাণী এখন গ্যাসের চুলায় রান্না করেন। ভোরবেলা ও বিকালে তাদের এখন প্রাণবন্ত মনোভাবে সবুজে আচ্ছাদিত গ্রামীণ পাকা রাস্তায় পদচারী ও আড্ডায় মেতে উঠতে দেখা যায়। শীত নিবারণে কৃষক পরিবারে পুরনো ও জীর্ণ শাড়ি বা লুঙ্গি দিয়ে নির্মিত কাঁথার জায়গা দখল করে নিয়েছে জমকালো চাদর আর চিকচিকে কম্বল ও রকমারি নকশার কাঁথা। তাই কৃষাণীরা এখন আর শরতের বৃষ্টিস্নাত দিনে কাঁথা সেলাইয়ে আগ্রহী নন। গ্রীষ্মের খরতাপে বিদগ্ধ হয়ে কৃষাণীকে খেসারি, ছোলা ও মুগডাল মাড়াই-ঝাড়াইকরণ এবং ক্লান্ত-অবসন্ন দেহের ফুরসত নিতে আম্রবৃক্ষতলে বসে পান চিবোতে দেখা যায় না। প্রকারান্তরে তারা বৈদ্যুতিক পাখার সুশীতল হওয়ায় বসে টেলিভিশনে ডিশ অ্যান্টেনার সুবাদে ভারতীয় চ্যানেলে নিয়মিত সিরিয়াল দেখেন।   

কৃষকের সন্তান এখন উৎসব-আনন্দে স্কুলগামী। সরকারি উপবৃত্তির সুবাদে স্কুলের প্রতিটি শিশুর গায়ে থাকে  পোশাক, পায়ে শোভা পায় রঙিন ও ঝকঝকে জুতো। শিশুরা বই আর টিফিন বহন করে পিঠে ঝোলানো ব্যাগে। গৃহিণী মা তার সন্তানের হাত ধরে নিয়মিত স্কুলে নিয়ে যায়। তাঁরা এখন সন্তানের পড়ালেখা ও ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার কাজে ব্যতিব্যস্ত। 

কৃষি ও কৃষক পরিবারের এ উল্লেখযোগ্য কাঙ্ক্ষিত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের দিশারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর সরকারের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আজ কৃষক ও কৃষাণীর মুখে হাসি এবং প্রাণে আনন্দের উচ্ছ্বাস। পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষিবিদদের গবেষণা ও মন্ত্রনালয়ের সম্প্রসারণ কর্মসূচির প্রয়াসেই এ সাফল্য।

সোমবার ১ আগস্ট ২০২২,  ইকোনমিক টাইমস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারির মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশ আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল জোরালো। আবার চলতি বছরের শুরু থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ভুগতে শুরু করেছে বিশ্বের বহু দেশ।
তবে আঞ্চলিক ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও নিজেদের অর্থনীতি স্থিতিশীল রেখেছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় পার করে বাংলাদেশ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। উৎপাদন খাতের বিস্তৃত ভিত্তি এবং অবকাঠামো প্রকল্পে উদ্দীপনাসহ এটি এশিয়ার জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনীতি হতে পারে।

স্বাধীনতার ৫১ বছরে বাংলাদেশে কৃষির অগ্রযাত্রা সারা বিশ্বের বিস্ময়। এই সাফল্যের পরিকল্পনা তৈরি করেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, কৃষিপ্রধান দেশে কৃষির সম্পূর্ণ বিকাশ ও উৎকর্ষ ব্যতিরেকে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে তিনিই কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘... আমার মাটি আছে, আমার সোনার বাংলা আছে, আমার পাট আছে, আমার গ্যাস আছে, আমার চা আছে, আমার ফরেস্ট আছে, আমার মাছ আছে, আমার লাইভস্টক আছে, যদি ডেভেলপ করতে পারি এইদিন আমাদের থাকবে না‘।

এই ডেভেলপমেন্ট এর জন্য কৃষির গবেষণার গুরুত্ব অনুধাবন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের কৃষিশিক্ষায় আকৃষ্ট করতে ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক সমাবর্তন  অনুষ্ঠানে চাকুরী ক্ষেত্রে কৃষিবিদদের মর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করেন। জাতির জনক প্রদত্ত সেই মর্যাদা এ দেশের কৃষিবিদ সমাজে আজো সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার কাজে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে।

কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন ছাড়া কিছুতেই সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়। তাই বঙ্গবন্ধু তার শাসনামলে কৃষি খাতকে সচল ও মজবুত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন বিপুল কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ। কিন্তু 
হায়েনার দল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট কালো রাতে স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্তে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে শাহাদাত বরণ করলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘদিন নির্বাসিত জীবনযাপন করে মাতৃভূমিতে ফিরে এলেন স্বজনহারা বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্যা কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব হাতে নেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও  দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়তে কৃষির উন্নয়নে, তিনি যুগোপযোগী নীতি প্রণয়ন করেন এবং বাস্তবায়নে দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। কৃষিবিদ ও কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে কৃষিতে। এককালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্তর্জাতিক শত্রুরা যেই বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি‘ বলে বিদ্রূপ করেছিল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশে অভাবনীয় খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জনসংখ্যা আধিক্য, আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস, ইত্যাদি চ্যালেঞ্জের মুখেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে খাদ্য উৎপাদনে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ খাদ্য ও আমিষের চাহিদা পূরণে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন গবেষণায় উচ্চ ফলনশীল, লবনাক্ততা ও পরিবেশসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন করে কৃষকদের মাঝে দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বান্ধব প্রধানমন্ত্রী কৃষকের সহায়তায় আর্থিক প্রনোদনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করেছেন। সার, বীজ সহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ নামেমাত্র মূল্যে বা কখনো কখনো বিনামূল্যে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে সরকার। আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রের ব্যবহার, ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রচলন, কৃষির উন্নয়নে নবদিগন্তের সূচনা করেছে।

করোনা অতিমারীতে বিশ্ব অর্থনীতিতে যতটুকু না ঋণাত্মক প্রভাব বিস্তার করেছে তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। বৈশ্বিক এই সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের ব্যাপারে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মার্কিন ক্রেডিট রেটিং সংস্থা মিডিল ইনভেস্টরস সার্ভিস বলেছে, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ তৈরি হলেও শ্রীলঙ্কার মতো সংকট হবে না। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলমান করোনা অতিমারী এবং ছয় মাসের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।... দেউলিয়া হয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানেও সংকট তীব্র হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের তেমন পরিস্থিতিতে পরার ঝুকি কম‘। 

বৈশ্বিক সংকট রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সারাবিশ্বে সারের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও কৃষি মন্ত্রণালয় আর্থিক ভুর্তকি দিয়ে কৃষকের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সার সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ সহ বিভিন্ন সংস্থা কৃষি ভর্তুকি না দিতে পরামর্শ দিলেও কৃষকবান্ধব নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এটা ভর্তুকি নয়, বিনিয়োগ‘। বাংলাদেশে কৃষির ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে, ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার ফলে শস্য উৎপাদন অব্যাহত ছিল বলেই করোনা কালে খাদ্যাভাব দেখা দেয়নি। ২০২০ সালে বৈশ্বিক অতিমারি করোনা সংকটকালে ‘ডব্লিউএফপি’ অনুমান করে বলেছে, করোনা প্রতিরোধে লকডাউনের কারণে শুধু শিল্প নয়, কৃষিতেও উৎপাদন কম হবে, ফলে বিশ্বে ৩ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যেতে পারে। ডব্লিউএফপিএর ভবিষ্যত বানী ভুল প্রমাণিত করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসময়ে বলেছিলেন, ‘করোনা ও বন্যা যাই হোক না কেন, খাদ্য সংকট হবে না বাংলাদেশে’।


উৎপাদন   ফসল   খাদ্যাভাব   বাংলাদেশ  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন