ইনসাইড থট

রাজনীতি হোক গণমুখী, সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্যপূর্ণ


Thumbnail

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির পরদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। '২৫ জুন পর্যন্ত হরতাল বা নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!' দেশের সমসাময়িক রাজনীতির ধারা হিসাব করলে এমন সম্ভাবনা আসলেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারপর কি হলো? ৫ জুন পাবনার বেড়ার কিউলিন ইন্ডাস্ট্রি। ৬ জুন রাজধানীর বছিলার জুতার কারখানা। ১০ জুন রাজধানীর নর্দ্দা এলাকায় তুরাগ পরিবহন। ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের ফেরি। একই দিনে মৌলভীবাজারে পারাবত এক্সপ্রেসের তিনটি বগি। ১২ জুন রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তঃনগর ট্রেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের রুম। ২০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক। সবখানেই আগুন। সব কি দুর্ঘটনাবশত লেগে যাওয়া আগুন? কই! স্বাভাবিক সময়ে তো এত আগুন লাগে না! নাকি এটি প্রতিহিংসার আগুন! ব্যর্থতার আগুন! বুকে জ্বলা আগুন! হিসাবের আগুন! খোদ সরকারপ্রধান এসব আগুনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য আছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী তারা এমন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাবে যাতে আমরা ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে না পারি'।

আগুনের পাশাপাশি গতানুগতিক বচন অব্যাহত রয়েছে। এসব ফালতু বচন আগেও ছিল। "পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।" এসব বচন নিয়ে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল সে সময়। তখনো দৃশ্যপটে এসেছিলেন মির্জা ফখরুল সাহেব। সাফাই গাইলেন দেশনেত্রীর পক্ষে। তিনি বললেন, দেশনেত্রী ঠিক বলেছেন। তিনি ভুল বলেননি। দেশপ্রেমিকের মত কথা বলেছেন। ‘একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের ওপরে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেটা টিকবে না। তোমরা এখনো এলার্ট হও, চেঞ্জ দ্য ডিজাইন'। এসব পুরনো বচন। গতানুগতিক ধারায় আরো অনেক বচন যুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। বিএনপি'র মির্জা সাহেব বললেন, "পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাও একদিকে না, দুইদিকে।" অথচ বাস্তবতা হলো ২০০১ সালের ৪ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। মির্জা সাহেবের কি দরকার ছিল এমন একটি ভুল তথ্য দেওয়ার। অজ্ঞতাবশত যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে পারতেন। আর যদি সজ্ঞানেই বলে থাকেন, তাহলে উনার উচিত ছিল সরকারি নেতাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তথ্য প্রমাণাদিসহ জাতিকে জানানো। তিনি কোনটাই না করে নিজের দেয়া বচনকে 'ফালতু' প্রমাণ করলেন। জনগণকে ধোঁকা দিলেন, বোকা বানালেন।

সম্প্রতি মির্জা সাহেব বলেছেন, "পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু নেই। পদ্মা সেতুর প্রথম ফিজিবিলিটি রিপোর্ট করে বিএনপি ১৯৯৪/১৯৯৫  সালে। সেই সময় ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর এখন সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার হিসাব চাই।" তিনি নিশ্চয়ই জানেন, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পরে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদী পানি নিঃসরণ করে সাড়ে ৭ লাখ কিউমেক। যখন নদীতে প্রবাহিত পানি প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটারে পরিমাপ করা হয় তখন তাকে 'কিউমেক' বলে। ঘনফুটে পরিমাপ করা হলে তাকে 'কিউসেক' বলে। আটলান্টিকের প্রবেশদ্বারে আমাজনের সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কিউমেক। তার মানে আমাজনের দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ পানি পদ্মা নদী নিঃসরণ করে বর্ষা মৌসুমে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পদ্মার চেয়ে আমাজন কেন বেশি খরস্রোতা। আমাজন নদী সারা বছর প্রায় একই গতিতে পানি নিঃসরণ করে। গড় ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিউমেক। পক্ষান্তরে বর্ষার পদ্মা নদী বিশ্বের সর্বাধিক  খরস্রোতা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কিউমেক। তাতে পদ্মা নদীতে পানি নিঃসরণের গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কিউমেক। পদ্মা সেতুর স্থলে গত একশ বছরের গড় সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার কিউমেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা বা অতিবন্যার সময় সেতু অঞ্চলে পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কিউমেক পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে চিন্তা মাথায় রেখেই সেতু প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাজন বয়ে গেছে ব্রাজিল, পেরু আর কলম্বিয়ার উপর দিয়ে। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে কোন সেতু নেই। দেড় লক্ষাধিক কিউমেক পানি নিঃসরণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বে দ্বিতীয় কোন সেতু এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তাই পৃথিবীর আর কোন দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু আর কোথায় পাবেন? এত খরস্রোতা নদীতে আর তো কোন সেতু নেই। তাইতো  নদী শাসনে চলে গেছে খরচের তিন ভাগের এক ভাগ।

মির্জা সাহেব বলেছেন, ৯৪/৯৫ সালে সেতু নির্মাণে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। খুব ভালো কথা। ২৭ বছর আগের কথা। পয়লা জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৪১ দশমিক ৭৯ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণ কালে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা। এবার আসুন মুদ্রাস্ফীতি। ওয়ার্ল্ড ডাটা ডট ইনফো এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোক্তা মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার গত ৩৪ বছরে (১৯৮৭-২০২১) শতকরা ২ ভাগ থেকে সাড়ে এগারো  ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রতি বছর শতকরা ৬ দশমিক ৪। সামগ্রিকভাবে, মূল্য বৃদ্ধি ছিল শতকরা ৭২৫ ভাগ। ১৯৮৭ সালে যে পণ্যের দাম ছিল এক শ টাকা, তা চলতি বছরের শুরুতে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ টাকা। ৮৭ থেকে ৯৪ মাত্র ৭ বছরের ব্যবধান। ডলারের মূল্যমান ও মুদ্রাস্ফীতির হার অনুধাবন করতে পারলে ২৭ বছর আগের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা কেমনে ৩২ হাজার কোটি টাকা হলো সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য গড়পড়তা কথা না বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিন। কোথায় কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলুন। তাতে আমাদের মত আম জনতার বুঝতে সুবিধে হয়।

বিএনপি'র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তো সংসদে ঐকিক নিয়ম শেখালেন। কিলোমিটার প্রতি সেতুর খরচ দেখালেন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে খরচ কেন বেশি? সব কি আর ঐকিক নিয়মে চলে? সেতুর ডিজাইন দেখুন। প্রস্থ দেখুন। নদীর গতি-প্রকৃতি দেখুন। পাইলিং, পিলার, স্প্যান দেখুন। ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা সেতু। পদ্মা সেতু একটি দ্বিতল সেতু। ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে নদী শাসন করতে হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধুমাত্র নদী শাসনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুতে বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম পাইল। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর। যে হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে সেটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। হ্যামারের জন্য নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন। আর পদ্মার? ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা থেকে ১৩৬ গুণ বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মার  ৫০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতু থেকে পদ্মা সেতুর খরচ কেন বেশি - এটা বোঝার জন্য কি আর প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির সময় চট্টগ্রামবাসী সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে। আপামর জনসাধারণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মন্ত্রীরা গেলেন ঘটনাস্থলে, হাসপাতালে। অথচ ক্ষমতার বাইরের বড় বড় রাজনীতিবিদরা গেলেন না সেসব জায়গায়। তাঁরা অফিসে বসে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখিয়ে গেলেন। বড় বড় কথা বলে গেলেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর হলেন। চট্টগ্রাম না হোক, ঢাকার বার্ন ইউনিট এ যেয়ে কজন রোগী দেখে, তাঁদের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখতে পারতেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো এমন ছিল না। দুদশক আগেও তো সব রাজনৈতিক দল এমন দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। প্রতিযোগিতা হত সহযোগিতার। দুদশক আগের সেই সহমর্মিতার রাজনীতিতে যেন পচন ধরেছে। বিরোধী রাজনীতি যেন দলীয় কার্যালয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনমুখীতা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার বন্যার কথাই ধরুন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন। মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনগুলো রয়েছে মাঠে, পানিতে, ত্রাণ তৎপরতায়। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোথায়? আবারো সেই অফিসে। টিভি ক্যামেরার সামনে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। মাঠে থেকে করুন। বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে করুন। জনগণের পাশে থেকে করুন। ত্রাণ দিন, আর সমালোচনা করুন। সে সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্য সহকারে। দেশবাসী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পচন আর দেখতে চায় না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

সুশীলদের মাইনাস ফর্মুলা সফল হবে কি?


Thumbnail সুশীলদের মাইনাস ফর্মুলা সফল হবে কি?

আগস্ট মাস শোকের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালি তাকে জাতির পিতার আসনে বসিয়েছিলো। জাতির পিতা ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিয়ে শোধ করেছেন জীবনের সকল ঋণ। জনগণের ভালোবাসার বিনিময়ে দেশকে দিয়েছেন  স্বাধীনতা।  

১৯৪৭ সালে বাংলা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। হারিয়ে যায় বাঙালির পরিচয়। সেই হারিয়ে যাওয়ার পরিচয়কে তিনি উদ্ধার করে পাকিস্তানি ব্যারাক থেকে অকুতোভয় বাঙালির লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। সেই যুদ্ধে ছিলেন লক্ষ লক্ষ আওয়ামী লীগের কর্মী, প্রায় তিন লাখ মুক্তিযোদ্ধা, ২ লক্ষ মা বোন যারা হারিয়েছিলেন সম্ভ্রম। আরও ছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বপ্ন ও সমর্থন।  

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্ৰাম করেছে বাঙালি, এনেছে স্বাধীনতা, উড়িয়েছে বিজয়ের পতাকা। আমাদের সেই বিজয়ে প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছিল ভারতীয় সৈনিকেরা। সঙ্গে ছিলেন মহামতি ইন্দিরা গান্ধী। ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী। 

অনেক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাজাকারদের দলে যোগ দেন মোশতাক, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, লেজেহোমো এরশাদ। কিন্তু বাঙালি তাদের স্বাধীনতার আকাশে আবার উড়িয়েছে পতাকা ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে।  কিন্তু দলের লোভী নেতারা যেমন মোশতাক, জিয়া ও এরশাদের হাত ধরে স্বাধীনতাকে জিম্মি করেছে তেমনি একদল সুশীল যারা ছিল ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে তারা আবার ক্ষমতায় বসায় জামায়াত-শিবির, রাজাকারদেরকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। জনতা যখন জেগে উঠে তখন সুশীলরা স্বাগত জানায় সেনা শাসন। ২০০৬ সালে তারা মাইনাস ফর্মুলা নিয়ে আসে। শিরোনাম ছিল মাইনাস টু - কিন্তু অন্তরে ছিল মাইনাস হাসিনা। বাঙালি সেদিন ভুল করেনি। সুশীলরা প্রথমে সফল হয়েছিল বিএনপিকে ভাঙতে। এরপর চেষ্টা চলে আওয়ামী লীগকে ভাঙতে। সুশীলদের সেই চেষ্টাকে ধুলিস্যাৎ করে দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, জনতা। সেই শিক্ষকরা আজ আমলাদের দুই ধাপ নিচেয় স্থান পেয়েছে! বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন কমিশন গঠন করে স্থান করে দিয়েছিলেন শিক্ষকদেরকে। সেগুলো এখন আমলা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিনিত হয়েছে।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন তাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি আরও বলেছেন কোথায় ছিল আওয়ামী লীগের নেতারা যখন ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো। খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন।  কোথায় ছিল আওয়ামী লীগ নেতারা যখন ১/১১ সরকার যখন মাইনাস হাসিনা প্রজেক্ট নিয়েছিল? আজ অনেকেই অনেক কাহিনী শোনান। কিন্তু সেসব কাহিনী দিয়ে যারা সুবিধা ভোগ করেন তারা কি এখনও সঠিক পথে আছেন? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫ সালে যারা দল থেকে দূরে সরে গিয়েছিলো তারা কিন্তু আবার ফিরে এসেছে নতুন রূপে। তাদেরকে আপনি যে ভালোবাসা দিয়েছেন তার মূল্য কি দিচ্ছে? যাদের আপনি মন্ত্রী বানিয়েছেন তাদের আমলনামা কি আপনার কাছে নেই? আপনি কি তাদের ব্যাপারে সতর্ক আছেন কি? 

১৯৬৯ সালে গণ অভ্যুর্থানের নেতৃত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেছিলেন সেই তুখোড় ছাত্র নেতা জনাব তোফায়েল আহমেদকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনিই ডাকসুর নেতৃত্বে ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু খেতাবটি বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন। তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে অনেক। ১/১১ র সময় সুশীলরা তাকে টার্গেট করেছিলো।  তিনি কিন্তু তাদের ফাঁদে পা দেননি। সকলেই জানে রক্ষীবাহিনী প্রস্তুতি নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদেরকে দমন, বিতাড়ন করতে। কারা রক্ষীবাহিনীকে  সেটা করতে দেয় নি? বঙ্গবন্ধু নেই তাই বলে বাংলাদেশ কি আবার পূর্ব পাকিস্তান হবে? যখন শুনলেন বাংলাদেশ বেতার থেকে রেডিও বাংলাদেশ হয়ে গেলো, জয় বাংলা থেকে জিন্দাবাদ হয়ে গেলো তখন ও কি উনারা বোঝেননি - আসলে আমাদের কি সর্বনাশ হতে চলেছে? জনাব তোফায়েল আহমেদ জয় বাংলার সঙ্গে যেমন আপোস  করেননি, তেমনি আপোস করেননি বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে ১/১১ র প্রলোভনে। দলকে অটুট রেখেছিলেন ষড়যন্ত্রের হাত থেকে।  পরাজিত হয়েছিল ১/১১ র কুশীলবরা। পরিত্যাজ্য হয়েছিল মাইনাস ফর্মুলা।  

আজ আবার সেই মাইনাস ফর্মুলা নিয়ে ঘুরছে দেশে বিদেশে ওই ১৯৭৫ সালের ঘাতক ও সুশীলদের শিষ্যরা। আর তাদেরকে লোভের বশবর্তী হয়ে সহযোগিতা করছেন দলের লোকেরাই। তারা বঞ্চিত করছে দলের ত্যাগী নেতাদেরকে হাইব্রিড আমদানি করে। লোভী হাইব্রিডদেরকে এখনই আলাদা করা এবং তাদেরকে মাইনাস করা হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। সেটা না করলে ১৯৭৫ সালের মতই ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হবে। বাংলার স্বাধীনতা আবার শৃংখলিত হবে হায়েনাদের হাতে।  

মন্ত্রিসভার শুদ্ধি অভিযান জনগণের দাবিতে পরিনিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুযোগ আপনি অনেক দিয়েছেন সঠিক পথে চলবার জন্য। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। যে অর্জন বিগত ১৪ বছর আপনার নেতৃত্বে বাঙালি অর্জন করেছে ,তাকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে যারা তাদের এখন মাইনাস করবার সময় যদি মাইনাস ফর্মুলারকারীদেরকে পরাস্থ করতে হয়।  

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণ আপনাকে বঙ্গবন্ধুর মতোই ভালোবাসে। জনগণ আপনাকে বাংলার নক্ষত্র মনে করে। সেটিই আপনার শক্তি। দলের ত্যাগী নেতারা যাতে আপনার থেকে অভিমানে দূরে সরে না যায়, সেজন্য আপনাকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু যাদেরকে বিশ্বাস করতেন তারাই বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছিল। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন বাঙালি তার বুকে গুলি চালাতে পারবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সেই বিশ্বাস ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।  

আপনার সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে বাণিজ্য করছে যারা, টাকা পাচার করছে যারা তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সময়ের দাবি। কাজল রেখা গল্পটা আমার মনে পড়ে।  যারা আপনাকে আগলে রেখেছে বছরের পর বছর তারাই আপনার কাজল রেখা। মোশতাকের পেতাত্মা আপনার কাছেই আছে বোধহয় - তাদের মাইনাস এর  জনদাবি আপনি মানবেন কি? 

১৯৬৯-৭১ ছাত্র নেতারা ছিল বঙ্গবন্ধুর শক্তি। ১/১১ র মাইনাস ফর্মুলা থেকে দেশকে বাঁচাতে ছাত্র -শিক্ষক কাঁধে নিয়েছিল জোয়াল। সেই জোয়াল আমলাদের কাঁধ থেকে সরিয়ে আবার জনতার কাঁধে ফিরিয়ে দেয়া হোক দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। বরেণ্য রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু ফিরে আসুক নেতৃত্বে।  

আজ দেখলাম এক মন্ত্রী নাকি ভারতের কাছে সুপারিশ করেছেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে। তিনি ক'দিন আগে বেহেস্ত তত্ত্ব দিয়ে সরকার ও দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন। ভারতের কাছে কেউ সুপারিশ করলেই শেখ হাসিনার সরকার টিকবে না - কারণ দেশের জনগণ ক্ষমতার মালিক। জনগণের শক্তি ও মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে যিনি এহেন অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন তাদের এই সব অর্বাচীন কথপোকথনে জাতি আবার বিব্রত! দ্রব্যমূল্য মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে চলেছে। সেই সময় ভর্তুকি প্ৰত্যাহার আরও সংকটে পড়েছে জনজীবন। এখন বরেণ্য নেতৃবৃন্দদেরকে জনগণ পাশে চায়। উন্নয়ন পরিকল্পনায় মৌলিক পরিবর্তন এর সঙ্গে সঙ্গে জনসংযোগ রুখে দেবে মাইনাস ফর্মুলা।  

সুশীল  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ইউক্রেন, আমাদের অসুবিধা এবং আমরা

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৯ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail ইউক্রেন, আমাদের অসুবিধা এবং আমরা

ফেব্রুয়ারি ১৮, ১৯৪৪, মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাথে তার বৈঠকে বলেছিলেন, "পার্সিয়ান তেল আপনার। ইরাক ও কুয়েতের তেল আমরা শেয়ার করবো, আর সৌদি আরবের তেল, সেটা শুধু আমাদের”। এভাবেই পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিশ্চিত করে আসছে। জ্বালানি এবং গ্যাসের উপর তাদের সম্পূর্ণ আধিপত্য পশ্চিমা দেশগুলিকে আরও ধনী হতে সাহায্য করেছে এবং তারা দরিদ্র দেশগুলির উপর তাদের ইচ্ছা আরোপ করতে পারছে। অস্ত্র, গোপন কর্মকাণ্ড বা তাদের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (যেমন বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ) মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের আধিপত্য নিশ্চিত করছে। যারাই তাদের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস করেছিল তাদের নির্মমভাবে নিষ্পত্তি করেছে এবং তাদের নির্বাচিত স্বৈরশাসক বা পুতুল শাসক চাপিয়ে দিয়েছে। অন্য অনেকের মধ্যে, আমি আপনাকে শুধুমাত্র একটি উদাহরণ দিচ্ছি: MI6 এবং CIA ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে, যিনি তার দেশের জনগণের স্বার্থে তেল কোম্পানিগুলোকে জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস করেছিলেন। আজও গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষার নামে এসব করা হচ্ছে। নৃশংসতা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন সত্ত্বেও নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাপ্রাপ্ত দেশগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা জাতিসংঘের নেই। কে বা কোন ক্ষমতাশালীদেশ আমাদের মিত্র এবং বন্ধু হওয়া উচিত, কাকে আমরা সত্যিই বিশ্বাস করতে পারি, সে বিবেচনা করার আগে আমাদের অতীত ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছায় তা আলোচনা করতে হবে এবং বিজ্ঞতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রাশিয়ার উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে কিন্তু রাশিয়া প্রতিশোধ হিসেবে যখন ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে, তখন জোর গলায় অভিযুক্ত করে বলছে রাশিয়া গ্যাস সরবরাহ অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। মজার ব্যাপার হল, মনে হচ্ছে পশ্চিম রাশিয়াকে শাস্তি দিতে পারে কিন্তু রাশিয়ার উচিত নীরব থাকা এবং তাদের পারস্পরিক কিছু করা উচিত নয়। যখন পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগত গ্যাস এবং জ্বালানি সরবরাহের দাবি করছে এবং ক্রয় করছে, তখন একই সময় হুমকি এবং শাস্তি সহ নিশ্চিত করছে যেন কোনো উন্নয়নশীল দেশ তাদের অর্থনীতি ও নাগরিকদের বাঁচিয়ে রাখতে নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে রাশিয়ার কাছ থেকে গ্যাস, জ্বালানি এবং খাদ্য না কিনে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করতে জাতিসংঘ কি কিছু করতে পারে বা পারছে?
 
আসুন আমরা তাদের ভন্ডামী দেখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে ভারত বছরের শুরু থেকে রাশিয়ার উপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ভাঙছে। তা নিয়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর মাইকেল পাত্র আমেরিকার ভন্ডামীর কথা বলছিলেন সম্প্রতি ঘটা রাশিয়ার অপরিশোধিত জ্বালানির উচ্চ-সমুদ্র স্থানান্তরের কথা উল্লেখ করে। খোলা সাগরে একটি রাশিয়ান ট্যাঙ্কার একটি ভারতীয় জাহাজের কাছে তেল হস্তান্তর করে বলে জানা গেছে, যা পরে ভারতের ওড়িশা রাজ্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং অবশেষে সেই প্রক্রিয়াজাত তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। তিনি বলেন “আপনি জানেন যারা রাশিয়ান তেল কেনেন তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট আমাদের তাই বলেছেন। মজার ব্যাপার হল, একটি ভারতীয় জাহাজ খোলা সমুদ্রে একটি রাশিয়ান ট্যাঙ্কার থেকে তেল তুলে নিয়ে গুজরাট রাজ্যের একটি বন্দরে নিয়ে আসে। তেল এই বন্দরে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং একক-ব্যবহারের প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত পাতনে পরিণত করা হয়। ভারতীয় জাহাজটি আবার মালবাহী বন্দর ত্যাগ করে এবং খোলা সমুদ্রে তার গন্তব্য নিউইয়র্কের দিকে চলে যায়। এভাবে যুদ্ধ কাজ করে আর এইভাবেই তারা নিজেরা নিষেধাজ্ঞা পালন করছে। মজার কথা হল বিদ্রূপাত্মকভাবে আমাদেরকে নিষেধাজ্ঞা অনুসরণ করতে বলছে”। তিনি জাহাজের নাম বলেননি। মার্কিন দূতাবাস কোনো মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
 
পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আমরা বিশাল আর্তনাদ শুনেছি যে কীভাবে রাশিয়ান যুদ্ধ আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র মানুষকে হত্যা করছে খাদ্য ঘাটতি এবং দাম বৃদ্ধির কারণে। ইউক্রেনকে অবশ্যই আফ্রিকা এবং এশিয়ার দেশগুলিতে খাদ্য রপ্তানি করার অনুমতি দিতে হবে যেখানে তাদের এটি অত্যন্ত প্রয়োজন। নিউইয়র্ক টাইমস তার পত্রিকায় লিখেছে “এখন পর্যন্ত প্রথম ১৪টি শস্য বোঝাই জাহাজ যেগুলি ইউক্রেন ছেড়ে গেছে তার একটিও খাদ্য সংকটের সম্মুখীন দেশগুলিতে যাচ্ছে না। এর মূলত কারণ তারা বাণিজ্যিক চুক্তির অধীনে কেনা শস্য বহন করছে।” সেসব শস্য, প্রধানত পশু খাদ্য ইউরোপের দেশগুলোতে গিয়েছে।
 
যুক্তরাজ্যে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ১০% এর উপরে বেড়েছে, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম বেতন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবারগুলি জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটের কারণে দারুন চাপের মধ্যে রয়েছে৷ এর আগে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে এই সংখ্যাটি সবচেয়ে বেশি ছিল। বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অনুরূপ চিত্র উঠে আসছে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সে দেশগুলোতে নিম্ন আয়ের এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ভুগছে। কর দিয়ে সরকারের আয় বাড়াতে, মানুষকে বেশি মদ পানে উৎসাহিত করছে জাপান সরকার! একটি টাইম বোমা আগুনে ফেটে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি লক্ষ্য করেছি যে অনেক বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা নিয়ে কথা বলছেন। দুঃখজনকভাবে আতঙ্ক ও অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। হ্যাঁ আমাদের এই অনিশ্চয়তা এবং অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে হবে এবং সবাই মিলে একসাথে এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তবে আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, বাংলাদেশ কি বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে নিজেকে কোনো কষ্ট ছাড়াই দূরে রাখতে পারবে? আমাদেরকে, বিশ্বের অন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের মতো, সেই অসুবিধাগুলিকে মেনে নিতে হবে এবং একে অপরকে অসুবিধাগুলো কাটিয়ে উঠতে এবং বেচে থাকতে সাহায্য করতে হবে। আমরা কোভিডের সময় এটি করেছি, আমাদের এখনও কিছু সময়ের জন্য একই কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
 
দেখা যাক সম্প্রতি আইএমএফের কর্মীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে কী বলেছেন। গভীর বিশ্লেষণের পর তারা বলেছেন "বাংলাদেশ কোনো সংকটের মধ্যে নেই। বাংলাদেশ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। যদিও রিজার্ভ কমে গেছে, তবুও সে রিজার্ভ ৪-৫ মাসের সম্ভাব্য আমদানি মেটাতে যথেষ্ট বেশি। চলতি হিসাব অনুযায় ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে। কিন্তু বৈদেশিক ঋণ তুলনামূলকভাবে কম এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা ছাড় দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, সাম্প্রতিকতম আর্টিকেল IV পরামর্শে মূল্যায়ন করা হয়েছে যে বাংলাদেশের ঋণের দৃষ্টিভঙ্গি টেকসই থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে; দেশে ঋণ সংকটের ঝুঁকি কম: সরকারি খাতের ঋণ থেকে জিডিপি অনুপাত প্রায় ৬ শতাংশ, বহিরাগত ঋণের সঙ্গে জিডিপি অনুপাত ১৪ শতাংশ। মহামারী থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ ভালো করেছে। পুনরুদ্ধার অনেক শক্তিশালী ছিল এবং অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় দ্রুত ছিল। তবে, ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তা কিছু কঠিন হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী বৈশ্বিক পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত এবং বাংলাদেশ একটি আমদানি নির্ভর অর্থনীতি। যদিও দ্রব্যমূল্য কমতে শুরু করেছে, তবুও সেগুলি উচ্চতর এবং অস্থির থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার প্রভাব আমদানিতে পড়বে। বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের অনিশ্চয়তার পরিপ্রেক্ষিতে, অর্থপ্রদানের ভারসাম্যের উপর চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণেই এটি একটি উপযুক্ত মুহূর্ত যে বাংলাদেশ সরকার আগে থেকেই আইএমএফের সহায়তা চেয়েছে।" এর পর আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা কী বলবেন আমি শুনতে চাই।
 
কোভিড এবং ইউক্রেন দ্বন্দ্ব বিশ্বের অনেক দেশেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করছে - ধনী বা দরিদ্র। বাংলাদেশ এর থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেনি এবং পারবে না। কিন্তু দেশকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের লোড শেডিং, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, সবই মুদ্রাস্ফীতি ঘটাচ্ছে। কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারে, বাংলাদেশ এবং এর কর্তাব্যক্তিদের উচিত ছিল ভবিষ্যদ্বাণী করা যে এই সমস্যাটি আসছে এবং যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল যেমন বাংলাদেশ গ্যাস ও জ্বালানি অন্বেষণে বিনিয়োগ করা কারন বাংলাদেশে এটি খুঁজে পাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। যখন ধনী দেশগুলি উদীয়মান ক্রমবর্ধমান সমস্যা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের সাথে মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে তার সীমাবদ্ধতা এবং ধনী দেশগুলির বহিরাগত হুমকির সাথে তার জনসংখ্যার কিছু কষ্ট না করে এ জাতীয় সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে পারে?

ইউরোপ এখনও রাশিয়া থেকে গ্যাস, জ্বালানি এবং অন্যান্য পণ্য ক্রয় করে, তুরস্ক (একটি ন্যাটো দেশ), ভারত এবং চীন তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে রাশিয়ার সাথে তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে। রাশিয়ার জ্বালানি কেনার পরিকল্পনা করছে মিয়ানমার। পশ্চিমী ধনী দেশগুলো তা বন্ধ করতে কিছুই করতে পারছে না। কিন্তু গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার নামে সেই শক্তিগুলো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে হুমকি দিচ্ছে এবং কষ্ট ও দুর্দশা সৃষ্টি করছে। জোসেপ বোরেল, ইউরোপীয় কমিশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে তাদের প্রভাব বজায় রাখার জন্য পশ্চিমা দেশগুলির একটি দ্বৈত নৈতিকতা এবং দ্বৈত ব্যবস্থা থাকা দরকার। সম্প্রতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আধিকারিক তার সফর কালে আফ্রিকান দেশগুলিকে রাশিয়ার সাথে নিষেধাজ্ঞা ভেঙে বাণিজ্য করার সাহস না করার জন্য হুমকি দিয়েছেন। বাংলাদেশে আমরা দেখছি চাপ বাড়ছে এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কথা হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অফিস ও রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই এ নিয়ে কথা বলছে এবং চাপ দিচ্ছে। বাংলাদেশের সকল অসুবিধার এবং ঘাটতির সাথে সবাইকে বিবেচনা করতে হবে, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে, চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করতে, ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনসংখ্যার জীবন ও জীবিকা উন্নত করার সব চেষ্টা করছে। এমনকি অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যেও বাংলাদেশ এখনো লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও স্বাধীনতাকে সমর্থন করে।
 
পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে আঙুল তোলার আগে আমি আমাদের নিজেদের কিছু সুবিধাবাদি নাগরিকের দিকে আঙুল তুলতে চাই। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান বাংলাদেশ সফর করছেন (আমি জানি না তিনি ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, মিশর, সৌদি আরব, মায়ানমার বা থাইল্যান্ড সফর করেছেন কি না) এবং আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা তার কাছে ছুটে যাচ্ছেন এবং গর্ব করে বলছেন বাংলাদেশ সরকার ও দেশ খারাপ। দেশে গণতন্ত্র বা কোনো ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই। জাতিসংঘকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আমি সেই লোকদের জিজ্ঞাসা করতে চাই যদি স্বাধীনতা না থাকে তাহলে তারা কীভাবে তার কাছে ছুটে যেতে পারল এবং গ্রেপ্তার বা জেলে না গিয়ে নির্দ্বিধায় যা বলতে চায় তা বলার সুযোগ পেল! আমি জানি না মিশর বা সৌদি আরব বা পাকিস্তানে তারা তা করতে পারত কিনা। হ্যাঁ, আমি একমত যে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার থাকা উচিত, আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত করতে হবে, আমাদের কিছু ঘাটতি আছে এবং আমাদের আরও উন্নতি করতে হবে। তবে আমি বলবো, অনেক ইউরোপীয় এবং আমেরিকায় একই উন্নতি ঘটতে হবে, তাদের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে।
 
আমি একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সাথে প্রথম আলো প্রতিবেদকের সঙ্গে। কোন পরিবর্তন ছাড়াই তিনি যা বলেছেন ঠিক তাই লিখছি: “হাফিজ উদ্দিন: বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা আছে। কিন্তু যারা এই সাংগঠনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে মাঠ গরম করতে পারে, তাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তারা সেই শক্তি প্রয়োগ করতে পারছে না। পরিস্থিতির কারণে তারা শক্তিমান হবে—এখন যাদের দুর্বল মনে হচ্ছে, রাস্তায় নামতে কম্পমান মনে হচ্ছে। এই সরকার সবই করতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে পারবে না—যদি আইএমএফ টাকা না দেয়। বৈশ্বিক কারণে দ্রব্যমূল্য যদি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আর বিএনপিকে মোটিভেট করতে হবে না। সাধারণ মানুষ নিজের গরজে মাঠে নামবে হতাশা থেকে। যখন মানুষের পেটে ভাত থাকবে না, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তখন বিএনপি কী বলল, ওটার কোনো দরকার হবে না। সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি মানুষ নেমে যাবে। সে সময়ে সাধারণ মানুষের রাজপথে বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে সরকারের পতন হতে পারে। তখন এর বেনিফিশিয়ারি তো বিএনপিই হবে।”

এই সাক্ষাৎকারটি প্রতিফলিত করে যে কিছু রাজনৈতিক নেতা এবং বুদ্ধিজীবী কী ভাবছেন এবং কীভাবে তারা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং একটি কর্দমাক্ত মাঠে তারা খেলার চেষ্টা করছেন। সরকার পতনের জন্য এই মানুষগুলো কি ভাবছে বা করবে। তারা, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, দেবপ্রিয়রা, প্রথম আলো এবং গ্যাং কি সত্যিই দেশ এবং এর জনগণের কথা ভাবেন নাকি তারা কেবল ক্ষমতা, প্রভাব এবং পদের লোভী? মনে হচ্ছে বহিরাগত শক্তি দেশের অগ্রগতি ঠেকাতে তাদের সাহায্য করা, দেশের উপর মঞ্জুরি আরোপ করা এবং আইএমএফ যেন ঋণ না দেয় তা নিশ্চিত করার জন্য তারা সবকিছুই করবে।
 
তবুও আমি খুব আশাবাদী কারণ আমাদের একজন দূরদর্শী নেত্রী, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আছেন বলে। আমাদের উন্নতি এবং এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তার রাজনৈতিক দক্ষতা এবং সততাকে কখনই অবমূল্যায়ন করবেন না। তিনি অতীতের অনেক উত্থান এবং সমস্যা থেকে বেঁচে ছিলেন, এমনকি তার জীবন হুমকির মুখ থেকেও। তবুও তিনি কখনো হাল ছাড়েনি। আসুন তার উপর বিশ্বাস রাখি। তিনি আমাদের এই সমস্যাগুলি কাটিয়ে উঠতে নেতৃত্ব দেবেন এবং আমরা এগিয়ে যাব। অনেক মির্জাফর অতীতে চেষ্টা করেছে, এখনও চেষ্টা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তাদের আত্মসম্মান নেই, তাদের দেশের মঙ্গল নিয়ে চিন্তা নেই, তারা আমরা কে বা কী হতে পারি তা নিয়ে গর্বিত নন। তারা শুধু বিশ্বাস করে ক্ষমতায়, আর তা উপভগের। অতীতে আমরা তাদের বন্ধ করেছি, এবং আমরা এখনও করব। আমি অন্য সকলের সাথে বরাবর দাঁড়িয়ে বলবো আমি আমাদের সকল দোষ-ত্রুটি, ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে একজন গর্বিত বাঙালি এবং বাংলাদেশী। অতীতের মতো আমরা বর্তমানের সমস্ত অসুবিধা কাটিয়ে উঠব এবং সফল হব।

ইউক্রেন   রাশিয়া   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আজ বিশ্ব জ্ঞানীর জন্মদিন

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ১৮ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail আজ বিশ্ব জ্ঞানীর জন্মদিন

আজ বিশিষ্ট জ্ঞানী- রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ বিশ্লেষক, কবি ও লেখক, প্রিয় বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের জন্মদিন। আজ তিনি ৬৫ বছরে পা দিলেন। 

তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তিনি স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। প্রদীপ্ত। ভাস্বর। একাডেমিক কিম্বা বাহ্যিক উভয় ক্ষেত্রই সমসাময়িক কালে তাঁর মতন মেধাবী পন্ডিত খুব কমই দেখা যায়। জ্ঞান বিজ্ঞানের হেন কোনো বিষয় নেই সলিমুল্লাহ কম বেশি জানেন না। তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যুক্তি, উপস্থাপনা অতুলনীয়। অসাধারণ। টেবিলটকে, বক্তৃতার মঞ্চে, টিভি টকশোতে তাঁকে অতিক্রম করার লোক পাওয়া মুশকিল। আর এ শুধু আজ নয়, ছাত্রজীবন থেকেই। বহু বাঘা বাঘা শিক্ষাবিদ, পন্ডিত, লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আলোচনায়, বক্তৃতায়, বিতর্কে সলিমুল্লাহকে হারতে দেখিনি। 

পরম বন্ধু, রুমমেট, সহযোদ্ধা হিসেবে খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখার, বোঝার, চেনার সুযোগ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত, দেশপ্রেমিক, সৎ, নির্ভিক, নির্মোহ, সরল সহজ, সাদা মনের এই মানুষটি অত্যন্ত সাদামাটা সাধারণ জীবন যাপন করেন। বিদ্যাবুদ্ধি, জ্ঞান, মেধা, সৃজনশীলতা ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ নেই তাঁর। বিশ্বাস করেন শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক মুক্তির দর্শন মার্ক্সবাদে। অথচ অজ্ঞানতার অন্ধত্বে উজবুকেরা তাঁকে কখনো মৌলবাদী, কখনো প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক বলে সমালোচনা করেন। অত্যন্ত স্পষ্টবাদী, সাহসী, তত্বজ্ঞানী সলিমুল্লাহ কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না। ফলে দলকানা, দলদাস আর 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকর'রা তাঁর সম্পর্কে সেসব অপপ্রচারে বিকৃত সুখ খোঁজেন! 

বন্ধু হিসেবে সলিমুল্লাহ খানকে  নিয়ে আমি গর্ব করি। ৪৬ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের জেনারেশনের সবচেয়ে মেধাবী সলিমুল্লাহ খান, ছাত্র হিসেবে যেমন শিক্ষা জীবনের সব পরিক্ষাতে প্রথম হয়েছেন তেমনি জ্ঞান চর্চায় সমকালের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। আশির দশকে তাঁর সম্পাদিত 'প্রাক্সিস জর্নাল' সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন ছিল। এসময়েও তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেখা, অনুবাদ, বক্তৃতা, আলোচনা, সমালোচনা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখে। 

সলিমুল্লাহ এই শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে কিছু প্রত্যাশা করেন না বলেই তাঁর যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্বেও কোথাও কোনো পদপদবী বাগানোর মোসাহেবি, দালালী করেন না। সবসময় জনগণের পক্ষে ন্যায্য কথা বলেন। যে কারণে সারা পৃথিবীতে রয়েছে তাঁর অগণিত ভক্তকুল এবং শত্রুও। 

এই অনন্য গুণি বন্ধুটির জন্মদিনে আমরা বন্ধুরা আজ বিকাল ৫ টায় আনন্দ আড্ডায় মিলিত হবো। ইচ্ছে করলে যে কেউ লাইভে অংশ নিতে পারেন এই আড্ডায়। 

লিংকঃ https://www.facebook.com/poetmohon


সলিমুল্লাহ খান   মোহন রায়হান  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ডলার ব্যয়ে মিতব্যয়ী হই: অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৮ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail ডলার ব্যয়ে মিতব্যয়ী হই: অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি

চলমান বৈশ্বিক সংকটে সংবাদপত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদন পড়ে আমরা সাধারণ মানুষ কয়েকটি ‘শব্দ‘এর সাথে বেশ পরিচিত হয়েছি। যেমন, ‘দেশের অর্থনীতি, রিজার্ভ ফান্ড, রেমিটেন্স, ইত্যাদি। সকল দেশেই সংকট মোকাবেলা করার জন্য সরকারি কোষাগারে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত থাকে। এই সঞ্চিত অর্থই ‘রিজার্ভ ফান্ড‘। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা নির্ভর করে ঐ দেশের এই রিজার্ভ ফান্ড এর পরিমাণের উপর। কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যত বেশি রিজার্ভ ফান্ড আছে, সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী। সুতরাং দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার না করে, সঞ্চয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসী বাংলাদেশীদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ রেমিটেন্স ও রপ্তানী আয়। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের সেবা খাত ও বৈদেশিক বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment) এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা কঠোর পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ পরিবারের সদস্যদের স্বচ্ছলতার জন্য দেশে পাঠায়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থই ‘রেমিটেন্স‘। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে রেমিটেন্স থেকে। যদিও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে ভিন্ন পথে চলে যায়, সরকারের হাতছাড়া হয়। যদি প্রবাসীদের পাঠানো পুরো অর্থ বৈধ উপায়ে দেশে আনানোর ব্যবস্থা করা হতো, তবে বাংলাদেশে রেমিটেন্স এর পরিমাণ অনেক বেশি হতো। কিন্তু প্রবাসীরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জরুরী প্রয়োজনে কষ্টার্জিত অর্থ দ্রুত নিকটজনের কাছে পৌঁছানোর জন্য অবৈধ হুন্ডির মাধ্যম বেছে নেয়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বর্ননা করছি। আমার বড় মেয়ে কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া শেষে চাকুরী করছে। সম্প্রতি সে তার একমাত্র ছোটবোনকে উপহার কেনার জন্য কিছু পরিমাণ মার্কিন ডলার কানাডার রয়েল ব্যাংক অব কানাডা (RBC)‘র মাধ্যমে পাঠিয়েছিল। সেই ডলারের সমমূল্যের  বাংলাদেশি টাকা বাংলাদেশের ব্যাংকের একাউন্টে জমা হতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের কারনেই হয়তো প্রবাসীরা বাংলাদেশে তার পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বা কোন জরুরি প্রয়োজনে বা তাৎক্ষণিক যে কোন প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে  বাধ্য হয়েই অবৈধ হুন্ডির মাধ্যম ব্যবহার করেন। কারন হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ গ্রাহক তার প্রবাসী নিকটজনের টেলিফোন বার্তা পাওয়ার অল্পক্ষনের মধ্যেই হাতে পেয়ে যায়। সুতরাং বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয় বৃদ্ধির জন্য বৈধ উপায়ে প্রেরিত অর্থের সমমূল্যের বাংলাদেশি মুদ্রা গ্রাহকের নিকট দ্রুততম সময়ে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

যাই হোক, সরকার দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেমন জ্বালানি, ঔষধ, শিল্পের কাঁচামাল, দেশে উৎপাদিত হয় না এমন খাদ্য দ্রব্যসহ অসংখ্য প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির জন্য ব্যয় করে। সরকার সর্বদা আমদানি ব্যয় ও রপ্তানী ব্যয় সামঞ্জস্য রাখতে সচেষ্ট থাকে। এই আমদানি ব্যয় যখনই দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার তুলনায় বেশি হয়, তখনই সরকারকে রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে হয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। 

সরকার সাধারণতঃ রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে চায় না। আমদানী ব্যয় কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলাসবহুল পন্য, অপ্রয়োজনীয় পন্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রকার শর্তারোপ করে থাকে। দেশে উৎপাদিত হয় এমন দ্রব্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা বা কঠিন শর্ত আরোপ করা হলে ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে অভিজ্ঞজন মনে করেন।

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে জ্বালানি তেল আমদানিতে সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটে বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সংকট মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কষ্ট হলেও, সাধারণ মানুষ বাস্তবতার নিরিখে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। 

সরকারি গাড়ী ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারী কর্মকর্তাদের জরুরি সভা ভার্চুয়ালি করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফলে একটি বড় আকারের ডলার সাশ্রয় হবে। তবে সরকারি গাড়িতে যথেচ্ছ জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। সরকারি জ্বালানি তেলের বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, কর্মকর্তা অফিসে থাকাকালীন সময়ে সরকারি পরিবহনের সরকারি চালকগণ ডলার ব্যয়ে উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যবহার করে এয়ানকন্ডিশন চালু করে বিশ্রাম নিতে থাকেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ীতে এরকম দেখা যায় না। কারন সরকারী পরিবহনের জ্বালানি সরবরাহ করা হয় স্লিপ এর মাধ্যমে। বিল পরিশোধ করা হয় সরকারী তহবিল থেকে। অপরদিকে ব্যাক্তিগত গাড়ীর জ্বালানি ক্রয় করতে মালিকের পকেট থেকে ক্যাশ টাকা ব্যয় করতে হয়। 
  
দৈনন্দিন জীবনের জরুরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারকে বাধ্য হয়ে বর্ধিত মূল্যেই জ্বালানি আমদানি করতে হয়। নিয়মিত অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় এই বর্ধিত মূল্য পরিশোধ করতে অপারগ হইলে সরকার  রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে বাধ্য হয়। রিজার্ভ ফান্ড কমলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হবে। সাধারণত  দুর্যোগকালীন সময় যখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস সংকুচিত হয়, তখন সংকট মোকাবেলায় সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করতে রিজার্ভ ফান্ড ব্যবহার করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার (২.১ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। চলতি আগস্টের প্রথম সাত দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৫ কোটি ডলারের। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৯৫ টাকা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ পাঁচ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।

রেমিটেন্সের এই ধারাবাহিকতায় প্রমাণ হয় যে, বৈশ্বিক সংকট থাকলেও রেমিটেন্সের প্রবাহে ব্যাত্যয় ঘটেনি। কিন্তু বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানী তেল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্ভূত অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবেলায় সরকার যেমনি সরকারি বিদেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি ও ব্যাক্তিগত ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর পরিহার করা প্রয়োজন। কারন আমরা বেসরকারি বা ব্যাক্তিগত সফরে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ব্যয় করি। আমরা বিদেশ ভ্রমনে প্রয়োজনীয় ডলার যেভাবেই সংগ্রহ করি না কেন, সব বৈদেশিক মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই সরবরাহ করা হয়, যা রেমিটেন্স ও রপ্তানী আয় ও অন্যান্য উপায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়। আমরা যদি  জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ না করি, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সাশ্রয় হবে। 

এছাড়া বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিলাসী দ্রব্যাদি আমদানি করা হয়। আমরা বলতে পারি, আমার ব্যক্তিগত টাকায় আমি আমদানীকৃত বিলাসী দ্রব্যাদি ব্যবহার করবো, তাতে সরকারের কি। কিন্তু এই বিলাসী দ্রব্যাদি আমদানি করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সুতরাং আমরা যদি আমদানীকৃত দ্রব্যের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরিহার করি এবং বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশীয় পণ্য ব্যবহার করি, তবে আমদানিও কমবে, ডলারও সাশ্রয় হবে। ফলে সংকটকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে রিজার্ভ ফান্ড থেকে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা প্রয়োজন হবে না। দেশের অর্থনীতি মজবুত থাকবে।


ডলার   মিতব্যয়ী   বিদেশ   ভ্রমণ   পরিহার  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৭ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব

বহমান সময়ের স্রোতে এ অদ্ভুত বিষয়টা আকস্মিকভাবে আমার নজরে আসে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের পাশে অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দেখি, সেখানে বেশ ক'জন সমসাময়িক ব্যাচের সহকর্মী বসে আছেন। অবসর পরবর্তী ছুটি অথবা পূর্ণকালীন অবসরে আছেন তাঁরা। নানা বিষয়ে আলোচনাসহ একে অপরের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের বয়স এবং অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। সেখানে সদ্য প্রয়াত একজন সচিবের স্ত্রী এবং সন্তানের সাথেও পরিচিত হলাম। সবাই ব্যাংকিং লেনদেনের উদ্দেশ্যেই এসেছেন। আমার উপস্থিতিতে তাঁরা প্রাণিত হয়েছেন। সমস্বরে বললেন, 'আরে তুমিও তাহলে আমাদের দলে চলে এসেছ' ? আমাদের ভুবনে স্বাগতম ইত্যাদি। আমি মনে মনে বললাম, "ঝরা পাতা গো আমি তোমাদের দলে"। পেনসন, গ্র্যাচুয়েটি, মাসিক ইন্টারেস্টের হার, সঞ্চয়পত্র ক্রয়, আর্থিক লাভ-ক্ষতির ফিরিস্তি। এ বিষয়ে আমিও খানিকটা জ্ঞান লাভ করলাম। একইসাথে চা চক্রের ভেতর দিয়ে একটু নিরুদ্বিগ্ন প্রসন্ন সময়ও কেটে গেল। 

২) ১৯৯২ সালের শেষান্তে এসে আমি প্রথম ব্যাংকে হিসাব খুলি। এর আগে ব্যাংকিং বিষয়ে আমার বাস্তব কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল না। পূর্ববর্তী তিন বছর মাঠ প্রশাসনে চাকরি করলেও আমার বেতন- ভাতাদি ব্যাংকের লেনদেনের আওতায় ছিল না। মাস শেষে তখন হাতে হাতে নগদ অর্থে মাইনা পেতাম। অফিসের বড়ো বাবু নিজেই যাবতীয় ব্যবস্হা করে বেতনের লালচে রঙের একটা খাম হাতে পৌঁছে দিতেন। তাতেই দিব্যি স্বপ্নের দিনগুলো চলে যেত। ব্যাংকের ধারে কাছেও যাওয়া হত না। সেকালে ব্যাংকের এত আধিক্যও ছিল না। এমনকি হাতেগোনা দু'চারটা প্রাইভেট ব্যাংকের কথা মনে পড়ে। 

'৯২ সালের নভেম্বর মাসের উত্তরবঙ্গের সীমান্ত জেলা চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসি। এবং কী যেন এক আশ্চর্য যোগসূত্রে খোদ ইডেন ভবনে অর্থাৎ বাংলাদেশ সচিবালয়ের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত অট্টালিকায় ঢুকে যাই। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ে যোগদানের পরে মাসিক বেতন প্রাপ্তির নিমিত্ত ব্যাংক হিসাবের প্রশ্ন আসে। অগ্রজ সহকর্মীদের পরামর্শে একটি চলতি ব্যাংক হিসাব নম্বর খুলি। সচিবালয়ের সন্নিকটে এবং যাতায়াতের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অগ্রণী ব্যাংক, জাতীয় প্রেস ক্লাব শাখায় এ হিসাব খোলা হল। 

২) আমার হিসাব নম্বর খোলার সময় এ শাখার ব্যবস্হাপক ছিলেন জনৈক মাসুদ এ খান। বেশ স্মার্ট, সৌম্যদর্শন ও চৌকস কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এ শাখার প্রথম দিককার ম্যানেজার। ১৯৮৬ সালে এ শাখার যাত্রা শুরু হলে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় জন।  দেখতাম, সচিবালয়ের উর্ধতন প্রায় সকলের সঙ্গেই তার সদ্ভাব ও দাপ্তরিক যোগাযোগ ছিল। অবশ্য সঙ্গত কারণেই এখানকার দায়িত্ব প্রাপ্তগন সব সময় গ্রাহকবান্ধব, বিনয়ী ও দক্ষ হয়ে থাকেন। বর্তমানে এ পদে আসীন সুধীর রঞ্জন বিশ্বাসও এর বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নন। জানা গেল, সুধীর বিশ্বাস এখানকার ১৬তম ব্যবস্হাপক। এ শাখার জন্য অপরিসীম ধৈর্য্য, অসাধারণ সংবেদনশীলতা ও মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন আধুনিক ব্যাংকার হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় দপ্তরের কর্মে নিয়োজিত এ কর্মচারিগন প্রায় সবাই নিজেকে সর্বাধিক  গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। সবাই অগ্রাধিকার প্রাপ্তির দাবিদার এবং তা তাঁরা অবলীলায় অনবরত অনুশীলনও করেন। এমন পরিস্থিতিতে এক সাথে সকলের মনে জায়গা করে নিয়ে দায়িত্ব পালন করা মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দুরূহ কাজ। 

৩) নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে অগ্রণী ব্যাংকের প্রসার ও বিস্তৃতি ততটা হয়নি। যদিও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই এর আর্থিক পরিষেবা চালু হয়েছিল। উল্লেখ করা যায়, এটা তৎকালীন পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক এবং কমার্স ব্যাংকের সমন্বয়ে একীভূত হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অগ্রণী ব্যাংক নামে চালু হয়। কালের বিবর্তনে আজকের অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাস্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংক। যার সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ৯৬৫টি বিভিন্ন ক্যাটাগরির শাখা এবং কর্পোরেট অফিস। একই সাথে দেশের অন্যতম প্রধান পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবেও পরিগনিত হয়েছে। 

৩) অগ্রণী ব্যাংক জাতীয় প্রেসক্লাব শাখা সম্ভবত বাংলাদেশ সচিবালয় কেন্দ্রিক কর্মচারিদের আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজনে প্রথম কোনো তফসিলী ব্যাংক। চাকরির প্রথম দিকে এ শাখায় গেলে দেখতে পেতাম পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের অসংখ্য (অবঃ) জায়েন্টদের। বসে আছেন নির্ভার। অনুজ ও পরিচিত স্নেহভাজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। স্মৃতি রোমন্থন করছেন। আমরা উঁকি দিয়ে এক পলক তাকিয়ে  কালবিলম্ব না করে সশ্রদ্ধায় নত হয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসতাম। তখন কখনো ভাবি নি, আমরাও একইভাবে একই স্হানে, একই উদ্দেশ্যে এমন অলস সময় কাটাবো। এবং আজও একই রেওয়াজ আঁকড়ে ধরে আপ্যায়ন করে চলেছেন ব্যবস্হাপকগন । অতীতের ধারাবাহিকতায় আজও তারা টাকা জমা বা উত্তোলনের জন্য আগলে রেখেছেন সকল সহযোগিতার হাত। গাড়ি অবধি অনুসরণ করে চলছেন প্রায় সর্বজনের সহায়ক, সর্বত্রগামী ও অনুগত কর্মচারী ফারুক। নব্বই দশকের গোড়া থেকে সে আমার কাছেও আস্হা এবং অবলম্বনের মতন। মনে পড়ে, কয়েক বছর আগেও ব্যাংকে ঢুকেই দেখতাম, সোফায় বসে আছেন ষাটের দশকের দাপুটে সিভিলিয়ান মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, মনজুরে মাওলা বা ড. সা'দত হুসাইন এর মত সিএসপি কর্মকর্তা। টাকা উঠাতে এসে তাঁরা একটা জমকালো আড্ডায় মেতে থাকতেন। আর এ ব্রাঞ্চটা যেন যুগ যুগ ধরে জ্যেষ্ঠ কর্মচারিদের মিলনকেন্দ্রের বিকল্প স্হানে পরিণত হয়েছে।  

৪) আমিও সদ্য অবসরে যাওয়া একজন সিভিল সার্ভেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রায় ৮ বছর বাদ দিলেও প্রশাসনের চাকরিতে দীর্ঘ ৩২ বছর কাজ করেছি। ঘুরেছি মাঠে ঘাটে,তথা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মাঠ প্রশাসনের প্রায় সব ক'টা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করার এক বিরল সুযোগ হয়েছিল। অসংখ্য অগনিত সহযাত্রী সহকর্মীর সান্নিধ্যে থেকে কাজ করার সুবাদে আমার পরিচিতিও বোধকরি একটু বেশি। তবে একটি ব্যাপার বিস্ময়ে এবং আনন্দের সাথে লক্ষ করেছি, যখনই এ ব্রাঞ্চে প্রবেশ করি, যেন কেউ একজন বসে আছেন আমাকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করার। অবসর কালেও সেদিন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার চেকখানা জমা করতে গেলে, দেখি '৭৩ ব্যাচের বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা মাহবুব উল আলম খান মহোদয় বসে আছেন। আহা! কী দেশপ্রেমিক, নির্লোভ ও নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। এখন বয়সের ছাপ কিছুটা দৃশ্যমান। আমি মাস্ক পরিহিত। তথাপি তিনি আমাকে চিনতে ভুল করেন নি। আমার ও পরিবারের কুশলাদি জানতে তিনি কার্পণ্য করেননি। আমরা অনেক দিন ধরে একই মন্ত্রনালয়ে কাজ করেছিলাম। ইদানিং মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট অনুভব করি, আমাকে 'তুমি' বলার মানুষগুলো ঘরে এবং বাইরে সর্বত্রে দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ এ মানুষগুলো অনুজ হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার এক অদৃশ্য প্রেরণা। আমার মনে হয়, ওনাদের জীবন কালের মধ্যেই যেন পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিটি নিশ্বাসের নিরাপদ ঠিকানা লুকিয়ে আছে। 

৫) ভাবছি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের এ শাখাটি কী কেবল ব্যাংকিং করছে ? এটি কী আর দশটা শাখার মতো যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় গ্রাহকদের মাঝে শুধু অর্থ লেনদেন করে চলেছে? না, এর বাইরেও এখানে জনান্তিকে কতিপয় মানবিক দায়িত্বও পালিত হচ্ছে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রতিদিন এখানে আসেন অসংখ্য প্রবীণ কর্মচারী। এঁদের কেউ বিপত্নীক, কেউ স্বামী- সন্তানহারা, আপনজনেরা বিদেশ বিভুঁইয়ে। কেউ কেউ নিঃসঙ্গ এবং একা। কেউ বা নিভৃতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। এমন দুঃখ জাগানিয়া জীবনে শুধু বন্ধু-সুজনের কন্ঠস্বরের প্রবল আকুতি নিয়ে ঘর হতে বের হয়ে আসেন এখানে । অল্প কাজে বেশি সময় নেন। কথা বলার এবং শোনানোর শ্রোতা খুঁজেন। এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সামান্যও বিরক্তিবোধ করেন না বরং সারাক্ষণ সদানন্দ পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন,পাশে থাকছেন। এর কী নাম দেব? আমি বলি এর যথোপযুক্ত নাম হবে আমাদের কর্মচারিদের পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব। 

বোরাক টাওয়ার, ঢাকা 
২ ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

ব্যাংক-ক্লাব  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন