ইনসাইড থট

নেত্রী চাইলে দলের প্রয়োজনে যে কোনো মুহূর্তেই দেশে ফিরতে প্রস্তুত


Thumbnail

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের দুঃসময়ের নির্যাতিত কর্মী, সাবেক কর্মী ড. রূপন রহমান ফোন করে বললেন, ‘কবি, স্বাচিপ সম্মেলনে মহাসচিব প্রার্থী হচ্ছো তো?’ একই সময়ে দেশ-বিদেশের আরো অনেক চিকিৎসকই আমাকে এই প্রশ্নটি করেছেন। চিকিৎসকদের গণআকাঙ্খার প্রেক্ষিতে আমার মনে হলো, এবার সম্মেলনে আমার আসলে প্রার্থী হওয়া উচিত।

আমি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) জন্মের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। কেন, কোন পরিস্থিতিতে, নিজের প্রভাবশালী অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাচিপের জন্ম হয়েছিলো, অনেকের চেয়েই আমি তা বেশি বৈ কম জানি না। এই সংগঠনটির সাথে আমার আত্মার সংযোগ। সম্মিলিতভাবে আমরা এই সংগঠনটিকে জননেত্রী শেখ হাসিনার অনুপ্রেরণায় এবং ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বে প্রকৃত অর্থে একটি আদর্শিক সংগঠনে পরিণত করেছিলাম। তখনকার স্বাচিপের প্রতিটি পোস্টার নান্দনিকতায় এবং রাজনৈতিক বক্তব্যে ভীষণ সমৃদ্ধ ছিলো। পোস্টারে ব্যবহৃত শ্লোগানটি সারাদেশব্যপী আলোড়ন সৃষ্টি করতো। আর সেই স্বাচিপের এবারের সম্মেলনের পোস্টারটির শ্লোগান ইতিমধ্যে তিনবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। পত্রিকায় এই পোস্টারটি নিয়ে তুলোধুনা করা হয়েছে। 

কথা ছিলো বঙ্গবন্ধুর গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাচিপ অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। আমরা স্বপ্ন দেখতাম স্বাস্থ্যখাতের সকল দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে স্বাচিপ সোচ্চার থাকবে। আমরা সবসময় ভাবতাম, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশিত পথে স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার ও পরিবর্তনে স্বাচিপ নেতৃত্ব দেবে। কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নির্যাতিত হলে স্বাচিপ তার প্রতিবাদ করবে। আমাদের সেই স্বপ্ন ও ভাবনারা অনেকদিন হয়ে গেলো পথ হারিয়েছে। 

স্বাচিপকে দেখে দূর থেকে আজকাল অনেকটাই চেনা যায় না।  সংগঠনটি যেন আজ খাজা বাবার দরগার মত হয়ে গেছে। এককালের ড্যাব-শিবিরপন্থী যে কোন চিকিৎসক চাইলেই আজ এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। অনেক জেলার স্বাচিপ নেতৃত্বই ড্যাব থেকে আমদানীকৃত। হিজরত করেই তারা নানাধরণের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সাথে জড়িত। তাদের অনেকেই এখন ডিজি অফিসে আসন গেড়েছে। সংগঠনের সদস্য করার জন্য কোথাও কোন স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা নাই। বরং আত্মকলহে মগ্ন এই সংগঠনে নিজেরাই আজ নিজেদের বিরুদ্ধে লেগে থাকায় ব্যস্ত। আজিজ ভাইয়ের মত দুয়েকজন ছাড়া অনেক নেতাকেই দেখেছি নিজেদের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। নেতা হিসেবে পদ-পদবী ভাঙ্গিয়ে নিজের প্রাপ্তিটুকু নিশ্চিত করতেই এরা ব্যস্ত। সংগঠনের নিবেদিত কর্মীদের কথা এরা ভুলেও ভাবে না। গতানুগতিক ধারায় বিশেষ দিবসসমূহ উদযাপন আর সরকারের পক্ষে শ্লোগান দেওয়া ছাড়া স্বাস্থ্যখাতে কার্যকরী পরিবর্তনের লক্ষ্যে স্বাচিপের তেমন কোন কার্যক্রম চোখে পড়ে না। চাটুকারিতা না করেও যে সরকারের হাতকে শক্তিশালী করা যায়, এটি যেন এই সংগঠনের অনেকেরই বিবেচনায় নেই। বিশ্বের যে প্রান্তেই থাকি না কেন, স্বাচিপের বর্তমান অবস্থা দেখে আমাদের অনেকেরই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আমরা ভালো থাকি না, এক ধরণের অস্থিরতায় ভুগি। 

দল বা সংগঠন নিয়ে আমরা কিছু বলতে গেলে ‘তোমরা তো বিদেশে থাকো’ এই ধূয়ো তুলে প্রথমেই তাকে উড়িয়ে দেবার একটা চেষ্টা আমি বরাবরই লক্ষ্য করেছি। তার উপর ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময় নেপথ্যে থেকেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। জন্ম ও পারিবারিক সূত্রে এবং কিছুটা পড়াশুনার কারণে আমি বঙ্গবন্ধুকে বোধের গভীরে ধারণ করি। আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে, পদ-পদবীর চেয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নে কাজ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও দশের উন্নয়নে শেখ হাসিনার দর্শন বাস্তবায়নে সামান্য ভূমিকা রাখাটা নিজের প্রাপ্তির চাইতে অনেক বেশি জরুরী। 

আমি শারীরিকভাবে বিদেশে থাকলেও মানসিকভাবে একটি দিনও দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকি নি। আমি বিদেশে থেকেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি। একাধিকবার সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের সমর্থিত সরকার গত চৌদ্দ বছর ক্ষমতায় থাকলেও আমি দেশে ফিরে এসে কোন রাজনৈতিক বা পেশাগত পদ-পদবী গ্রহণ করি নি। ব্যক্তিগতভাবে আমার ব্যাপক পরিচিতি ও প্রভাবশালী মানুষদের সাথে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ন্যূনতম কোন স্খলনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্রয় দেই নি। অনেক চিকিৎসকের প্রয়োজনে আমি সাধ্যমত পাশে দাঁড়িয়েছি, অনেকের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু কেউ কোনদিনও বলতে পারবে না, এর জন্য কারো কাছ থেকে আমি কোন ধরণের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ কোন সুবিধা বা অর্থ গ্রহণ করেছি। আমার যা কিছু আবদার তা বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনার কাছে, আমার বন্ধুর বাবা ডা. এস এ মালেকের কাছে, আমার অভিভাবকতূল্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ও ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং আমার কিছু বড়ভাই ও বন্ধুর কাছে। এক জীবনে একটা মানুষের কতটুকুই বা প্রয়োজন? বরং একটা সাদামাটা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে সৎ জীবনযাপনের আনন্দটাই আলাদা। আমি সেই আনন্দেই অবগাহন করি রোজ। 

আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন দীর্ঘ চলার পথে রাজপথের সাথীদের কথা খুব মনে পড়ে। অগ্রজসম রুহুল হক স্যার, কামরুল স্যার, শফিক ভাই, কালাম ভাই, ডাব্লু ভাই, শারফুদ্দিন ভাই, ইউনুস ভাই (প্রয়াত), নজরুল ভাই, ইকবাল ভাই, রোকেয়া আপা, মিল্টন ভাই, হামিদ আসগর ভাই, তবিবুর ভাই, নান্নু ভাই, দুলাল ভাই, বাদশা ভাই, জামাল ভাই, সর্দার নঈম ভাই, মোমেন ভাই, লিটন ভাই, সফু ভাই, ইসমাইল ভাই, এমদাদ ভাই, হীরু ভাই, রূপন ভাই, পাঠান ভাই, তারেক ভাই, জহীর ভাই, মিজান ভাই, আসাদ ভাই, ধীমান দা, লিয়াকত ভাই, মান্নান ভাই, ফরহাদ ভাই, পারভেজ ভাই, মুহিত ভাই, শিল্পী ভাই, রায়হান ভাই, টনি ভাই, অনুপ দা, বন্ধু কাওসার, মনিসুর, দেবেশ, হাদি, মুন্না, শেখ মামুন, মিজানুর রহমান কল্লোল, চিত্ত, অনুজসম মশিউর, জহির, ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী, যোসেফ, রবি, শাহীন, বায়েজিদ, নাজির, মুনীর, ত্বরিত, জুলফিকার লেনিন, দীপু,  চিশতি, আরিফ, মুনীর, তুষার,  বাবুল, রাহাত, রিন্টু, টিটু, হাসান, বশির, বাদল, ফিরোজ, তুলিন, লিপন, বিদ্যুত, লিপন বড়ুয়া, বিপ্লব, বিপুল, রনি, রাশিদুল রানা, রিগ্যানসহ আরো কত শত নাম মনে পড়ে। রাজপথের নির্যাতিত বঙ্গবন্ধুর এইসব আদর্শের অনুসারী চিকিৎসকরা তো অধিকাংশই আজো দেশে আছেন, বেঁচে আছেন। তারপরও স্বাচিপ কেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে? কেন এটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ সংগঠন হবে না? কেন এটি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক হাতকে শক্তিশালী করবে না? কেন এটি সাধারণ চিকিৎসকদের কাছে আস্থার সংগঠনে পরিণত হবে না?

এতসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মনে হয়েছে, আগামী ২৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য স্বাচিপের আসন্ন সম্মেলনে আমার মহাসচিব পদপ্রার্থী হওয়া প্রয়োজন। আমি মনোনীত/নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়ে স্বাচিপের রিব্রান্ডিং করবো। উপরোল্লিখিত সমস্যাসমূহ সমাধানে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সবাই মিলে কাজ করবো। ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার মিশেলে আমরা চাইলেই আমূল বদলে দিয়ে স্বাচিপকে একটি কার্যকর সংগঠনে পরিণত করা সম্ভব। শক্তিশালী স্বাচিপ মানে শেখ হাসিনার হাত আরো বেশি শক্তিশালী হওয়া। স্বাচিপ পুনর্গঠনের সেই লড়াইয়ে আমি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে চাই। সন্তানের প্রয়োজনে মা যেভাবে সব ছেড়ে এগিয়ে আসেন, অনেকটা সেরকম ভাবেই। 

সুসময়ে আমি নেপথ্যে থেকেই কাজ করেছি। আজ যখন সরকারবিরোধী একটি ষড়যন্ত্র দেশব্যাপী মাথা চাড়া দিয়ে উঠবার চেষ্টা করছে, তখন আমি দায়িত্ব নিয়ে সামনে দাঁড়াতে চাই। আমার সাইত্রিশ বছরের দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাকে দেশ-জনগণ ও সংগঠনের কাজে লাগাতে চাই। প্রাণপ্রিয় নেত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা চাইলে দলের প্রয়োজনে যে কোন মুহূর্তেই আমি দেশে ফিরতে প্রস্তুত।

লেখক: স্বাচিপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, প্রতিষ্ঠাতা গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক, সাবেক সমাজ কল্যাণ সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সহ-সভাপতি, ঢামেকসু ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

১/১১ এ জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ বিপক্ষ!

প্রকাশ: ১২:০৫ পিএম, ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

বিলম্ব হলেও বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মাইনাস ফর্মুলার বিপক্ষে কথা বলেছিলেন--

১৬জুলাই ২০০৭ইং ছিল বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কারাবন্দি দিবস। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীল নক্সায় ধানমন্ডির সুধা সদন থেকে আটক করে এবং সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ কারাগারে দীর্ঘ ১১ মাস আটক রেখেছিলেন। ১১জুন মুক্তি দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ও সরকারের নেতৃত্বে  বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মাইনাস ফর্মুলার পক্ষ নিয়ে দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রীয় নেতাদের অপতৎপরতা বিগত হলেও ভূলে যাবার নয়।

১/১১ এ সেনা সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলের শুরুতেই আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা কর্মীরা গ্রেফতার,হয়রানি,নির্যাতনের সম্মূখীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সারির নেতাদের গ্রেফতার,মিথ্যা মামলা  দিয়ে হয়রানির এক পর্যায়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে মিথ্যা মামলা সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। রাজনীতিতে মাইনাস ফর্মুলার অংশ হিসেবে প্রথমেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায়ী বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতৃত্বাধীন পর পর পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন সরকার প্রধান খালেদা জিয়াকে প্রথমে আটক না করার পক্ষ অবলম্বন গ্রহণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিলম্বে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

মাইনাস ফর্মুলার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েক জন নেতার সাথে কতিপয় নেতারা সেনা সমর্থিত অবৈধ  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লিপ্সায় ছিলেন।

২০০৭ সালের ১৫ জুলাই শেষে ১৬ জুলাই শুরুতে ধানমন্ডির সুধাসদনে বসবাসরত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বাসভবনে যৌথ বাহিনীর ঘেরাও খবর পেয়ে আতঙ্কিত হলাম। কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে ফোনালাপে অবগত হলাম গন মানুষের নেত্রীকে আটক করার প্রক্রিয়া চলছে। গভীর রাতে জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন কারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাইনাস ফর্মুলার প্রতিবাদী কন্ঠ বিশেষ করে অগ্নি কন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরী, এডভোকেট সাহারা খাতুন ,ডঃ হাছান মাহমুদ,ক্যাপ্টেন (অবঃ) এ বি তাজুল ইসলাম সহ অন্যান্য  নেতৃবৃন্দের সাথে ফোনালাপ করি-আমাদের করণীয় কী। গভীর রাত হওয়ায়  শ্রদ্ধেয় নেতা জিল্লুর রহমান,সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী কে ঘুমিয়ে যাবার কারনে ফোনে পায়নি। জননেত্রী শেখ হাসিনা গ্রেফতারের প্রস্তুতিতে ভীত না হয়ে আমাদের অনেকের সাথেই ফোনে কথা বলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাবার সাহস জুগিয়েছিলেন। ১৬ জুলাই ভোরে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করে কোর্টে নেয়া প্রাক্কালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকেরা প্রতিবাদের শ্লোগানে মুখরিত করে যৌথ বাহিনীর হামলা,নির্যাতন এবং কয়েকজন নারী নেত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন। পাতানো কোর্টে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে গ্রেফতারে শুনানিতে এডভোকেট সাহারা খাতুন সহ আমাদের অন্যান্য আইনজীবীবৃন্দ অংশ গ্রহণ করেন। পাতানো কোর্টে জননেত্রী শেখ হাসিনার জামিন না মঞ্জুর করা হলো। কোর্ট থেকে কারাগারে যাবার প্রাক্কালে কোর্টে উপস্থিত আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের তৎকালীন আইন সম্পাদক এডভোকেট সাহারা খাতুন কে ডেকে কথা বলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জননেতা  জিল্লুর রহমানকে দায়িত্ব দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে জাতীয় সংসদ এলাকায় স্থাপিত অস্থায়ী কারাগারে নেয়া হয়। এদিকে বেগম মতিয়া চৌধুরী  কোর্ট এলাকা থেকে আমাকে গাড়ীতে উঠিয়ে  গুলশানে জিল্লুর রহমান সাহেবের বাসভবনে যাবার পথে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদেরকে। অনেক বাধা-চেষ্টার পর মতিয়া আপা এবং আমি গুলশান আইভি কর্নকডে জিল্লুর রহমান সাহেবের বাসায় পৌছতে সক্ষম হলাম। আমাদের গাড়ীর পিছনে বিভিন্ন টিভি-প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরা এসে আইভি কর্নকডে জড়ো হয়। সাংবাদিকদের নীচে অবস্থান করার অনুরোধ করলে তারা অপেক্ষায় থাকেন। মতিয়া আপা আমাকে নিয়ে লিফটে ছয়তলায় উঠে বাসায় শ্রদ্ধেয় জিল্লুর রহমান কে নেত্রী গ্রেফতার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার জন্য জিল্লুর রহমান সাহেবকে অবহিত করা হয়। এদিকে ভবনের নীচে অপেক্ষারতঃ সাংবাদিকরা বার বার ফোন করে  জিল্লুর রহমান সাহেবের সাক্ষাত নেয়ার  জন্য তাড়া দিচ্ছিল। অনুমতি সাপেক্ষে পরক্ষণেই সাংবাদিকদের উপস্থিতি । ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান সাহেব মতিয়া আপা ও আমাকে পাশে রেখে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার গ্রেফতারের প্রতিবাদ করে অবিলম্বে নেত্রীকে নিঃশর্ত  মুক্তির দাবী জানান। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হীন কার্যকলাপের সমালোচনা করেন । উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু কন্যার গ্রেফতারে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ অবলম্বনকারী মাইনাস ফর্মুলার ষড়যন্ত্রকারীরা উল্যাসিত হয়ে বেশী দিন ঠিকে থাকতে পারেনি। তারাই বঙ্গবন্ধু কন্যাকে আটক রেখেই জাতীয় নির্বাচনে আগ্রহী ছিলেন। নেতা কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এগারো মাস আটক শেষে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । তাই মাইনাস ফর্মুলার ষড়যন্ত্রের রাজনীতির সফলতার মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সংরক্ষিত কারাগারে আটক থাকাকালীন তাঁর নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজধানী সহ অন্যান্য এলাকার বিভিন্ন পেশার ২৫ লাখ মানুষের গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে (তেজগাঁও- বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল জমা করা হয়েছিল। ২৫ লাখ গণ স্বাক্ষর সংগ্রহ এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে জমা কার্যক্রমে অন্যান্যের সাথে আমার ক্ষুদ্র ভুমিকা ছিল।

এদিকে জননেত্রী শেখ হাসিনা বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি এবং আমেরিকা হতে চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার আগে ও পরে দলের ত্যাগী,পরীক্ষিত নেতা কর্মীদের তোপের মূখে সংস্কারবাদীরা অপদস্থের পাশাপাশি তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে  মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে এসে নিজেদের রক্ষায় সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে যে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্হাশীলে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দ্বিধা বিভক্ত ছিল। সেই  সময় জীবনের ঝুকি মোকাবিলা করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখেছিলেন তারা অবশ্যই স্মরণীয় থাকবে। শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, প্রয়াত এডভোকেট সাহারা খাতুন, ওবায়দুল কাদের, প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, রাজি উদ্দীন রাজু, ক্যাপ্টেন (অব) এবি তাজুল ইসলাম, স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, ডাঃ দিপু মনি,  হাবিবুর রহমান সিরাজ, প্রয়াত এডভোকেট রহমত আলী, ডঃ হাছান মাহমুদ, ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দের মধ্যে এডভোকেট কামরুল ইসলাম, ফয়েজ উদ্দিন মিয়া, বজলুর রহমান, প্রয়াত আসলামুল হক,শাহে আলম মুরাদ, আব্দুল হক সবুজ, ডা দিলীপ রায়, হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন, আবুল কালাম আজাদ সহ আরো অনেকে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ ঐ সময় সদ্য বিলুপ্ত সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা ন্যাম ৪নং ভবনে অবস্থান করতেন, একই ভবনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও ছিলেন। দলের একজন কর্মী হিসেবে বহু পূর্ব হতেই মহামান্যের সঙ্গে আমার পরিচয়-যোগাযোগ ছিল, তাছাড়া তাঁর নির্বাচনী এলাকার পাশ্ববর্তী অঞ্চলের নাগরিক ও আমি। প্রিয় নেত্রীর পক্ষে অবস্থান  নেয়া নেতৃবৃন্দের পরামর্শে মাইনাস ফর্মুলার বিপক্ষে কথা বলানোর জন্য  প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ে অনেক নেতার দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দিয়ে সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছি। তেমনি ভাবে তৎকালীন বিরোধী দলীয় উপনেতার অবস্থান ভবনে বার বার ধর্ণা দিয়েছি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং আটক বঙ্গবন্ধু কন্যার মুক্তি আন্দোলনে শরিক হওয়া। তিনি বিলম্ব হলেও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন করে মিডিয়ায় সাক্ষাত দিয়েছিলেন।

জেনারেল (অব) সুবিদ আলী ভুঞা, প্রয়াত কর্নেল (অব) শওকত আলী, ডঃ এম এ জলিল জননেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে তৎ সময়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭জন সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে ৬জনই জননেত্রী 'শেখ হাসিনা' মাইনাস ফর্মুলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। মাইনাস ফর্মুলায় দলের কয়েক জন সিনিয়র নেতার ব্যর্থ চেষ্টা সফল হয়নি।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সহ আরো নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ (সাবেক আইন মন্ত্রী), প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিকুল হক, এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু সহ অন্যান্য আইনজীবীরা বিশেষ সংস্থার বাধার মোকাবিলা করেও কাজ করেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়া (টিভি) টকশোতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন করে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এডভোকেট স ম রেজাউল করিম  সহ হাতে গোনা ক'জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কথা বলেছেন। আত্ম গোপনে থেকে ও জননেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ অবলম্বন ও মুক্তি আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখেছিলেন মোফাজ্জল হোসেন মায়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আফম বাহাউদ্দিন নাসিম, মির্জা আযম, একেএম এনামুল হক শামীম। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পক্ষে অবস্থান ও তাঁর মুক্তি আন্দোলনে  সাবেক ছাত্র নেতাদের মধ্যে ছিলেন আহমদ হোসেন, বি এম মোজাম্মেল হক, সুভাষ সিংহ, এস এম কামাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দী, এডভোকেট রিয়াজুল কাউছার, বলরাম পোদ্দার, শাহজাহান আলম সাজু,আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, এডভোকেট আফজাল হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মারুফা আক্তার পপি, সাইফুজ্জামান শিখর প্রমূখ। আওয়ামী লীগের অঙ্গ  ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ সহ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্হাশীল হয়ে কাজ করেছে। তাছাড়া শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আব্দুল জলিল, কামাল আহমেদ মজুমদার, পংকজ দেবনাথ, ডঃ আওলাদ হোসেন সহ অনেকেই গ্রেফতার হয়েছিলেন।  যারা সুবিধার প্রলোভনে পড়ে  দলে খুনী খোন্দকার মোস্তাকদের  ন্যায় বিশ্বস্ততার ভাব নিয়ে সর্বক্ষেত্রেই তাদের বিচরণ রয়েছে।

এতে ত্যাগী,নির্যাতিত,নিপীড়িত নেতাকর্মীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আমি প্রাণপ্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করছি।

আল্লাহ্ মহান

জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু

 

এম এ করিম
সাবেক সহ সভাপতি
বাংলাদেশ কৃষক লীগ -

সাবেক সহ সম্পাদক
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
কেন্দ্রীয় উপ কমিটি



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া ও বিএনপি’র অপরাজনীতি

প্রকাশ: ১২:০৩ পিএম, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ)আসনের উপ-নির্বাচনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া ইস্যুতে বিএনপি’র অপরাজনীতির স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে।সেখানে ত্যাগী নেতাদের পরিবর্তে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ব্যক্তিদের মূল্য দেওয়ার দলীয় কৌশল জনগণের সামনে প্রকাশ্যে এসেছে।শিক্ষাগত যোগ্যতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতায় এগিয়ে থাকা উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়াকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করে হীনমন্যতার পরিচয় দিয়েছে দলটির শীর্ষ ব্যক্তিরা। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে বিএনপির টিকেটে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। দলীয় সিদ্ধান্তে গত ১১ ডিসেম্বর(২০২২) তিনি জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।২৯ ডিসেম্বর তিনি দলে গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগ এনে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। এদিকে দল থেকে পদত্যাগের পর ওই আসন থেকেই আবারো নির্বাচনের জন্য ১ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র কেনেন তিনি।ওইদিন রাতে কেন্দ্র থেকে দলীয় শৃংঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁকে দলের সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।এই উপনির্বাচনে তার বিপরীতে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী না থাকায় সহজেই তিনি জয় পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ইভিএমে এই উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

 

২.

দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার পরও উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার সঙ্গে বিএনপির নেতারা যে আচরণ করেছেন তা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। এদিকে বিএনপির পদত্যাগে শূন্য আসনের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কাউকে প্রার্থী করছে না। বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ উকিল আব্দুস সাত্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করায় বিষয়টি অন্যান্য দলের কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে।১ জানুয়ারি প্রকাশিত সংবাদসূত্র অনুসারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের বক্তব্য- ‘বিকালে আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার পক্ষে সাদ মোহাম্মদ রশিদ সাড়ে আট হাজার টাকার চালান জমা দিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।’ বিএনপি যে সুস্থ ধারার রাজনীতির বিপক্ষে তা স্পষ্ট হয়েছে বিএনপি ত্যাগ করে রাজনীতিবিদ উকিল আব্দুস সাত্তারের এই মনোনয়নপত্র কেনার ঘটনায়। 

উকিল আব্দুস সাত্তার কুমিল্লা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সহসভাপতি ছিলেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন কুমিল্লা-১ (বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া) আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় লাভ করেন।এরপর তিনি পঞ্চম (১৯৯১), ষষ্ঠ (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি), সপ্তম (১৯৯৬ সালের ১২ জুন) এবং ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে নির্বাচিত হন। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘ ২৮ বছর।২০০১ সালে উকিল আবদুস সাত্তার টেকনোক্র্যাট কোটায় খালেদা জিয়া সরকারের প্রতিমন্ত্রী(২০০১-২০০৬)হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির সেই মেয়াদের বিভিন্ন সময় তিনি চারটি মন্ত্রণালয়ে (আইন, ভূমি, মৎস্য এবং বিদ্যুৎ) দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তিনি এলাকায় যথেষ্ট জনপ্রিয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার। ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত এই ব্যক্তি বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এবং জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ছিলেন।তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বার এ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।পারিবারিক কারণ দেখিয়ে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে শূন্য হওয়া আসনের উপ-নির্বাচনে নিজে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সম্মতি প্রদানের মধ্যেও আছে তাঁর দেশপ্রেমের প্রকাশ।এজন্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একমাত্র ছেলে মাইনুল হাসান তুষারকে নির্বাচনে প্রার্থী করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন।তাঁর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পিছনে যুক্তিও আছে। কারণ বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল থেকে দেখা যায়, তিনি এলাকায় জনগণের আস্থার প্রতীক।সৎ ও সজ্জন বলে বিএনপি’র আদর্শহীন ও দুর্নীতির পরিপোষক নেতারা তাঁর শত্রু হয়ে উঠেছেন।

 

৩.

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল বাড়ি উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার।তিনি ১৯৭৯ সালেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এলাকার মানুষের উন্নয়নে নিবেদিত হন।তারপর তিন দশকের পথ চলায় তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যেমন পরিপক্ব হয়েছে তেমনি স্থানীয় বাসিন্দাদের চিনেছেন নিবিড়ভাবে। কেবল মানুষ নয় তিনি প্রকৃতি ও প্রশাসনের এক অবিসম্বাদিত নেতায় পরিণত হন।ক্রমান্বয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশের অন্যতম স্বচ্ছ রাজনীতির ধারাকে বেগবান করেন।বিএনপি’র মতো দলের নেতা হয়েও নিজেকে সততার কষ্ঠিপাথরে যাচাই করে মানুষের মাঝে টিকে থাকা চাট্টিখানেক কথা নয়।রাজনীতির দুষ্টচক্রকে দূরে ঠেলে নিজেকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন এই নেতা।কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতা, সরাইল-আশুগঞ্জ এর নির্বাচিত সাংসদ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হওয়ায় এলাকায় নিজস্ব কর্মীবাহিনী রয়েছে তাঁর। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে ভূমি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও তিনি নিজে যে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য কাজ করেন এটা পরিষ্কার।

তবে বিএনপি বহিষ্কার করার তিন দিন আগে ২৯ ডিসেম্বর(২০২২) প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন উকিল সাত্তার, যা ৩১ ডিসেম্বর জানিয়েছিলেন তিনি।বিএনপি ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে উকিল সাত্তার পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি করেছি।দলের যে কোনো সময়ে যে কোনো সিদ্ধান্ত আমরা মানছি।সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সংসদ থেকে পদত্যাগ- এটাও মাইনা পদত্যাগ করেছি পার্লামেন্ট থেকে।এখন বুঝতে পারছি যে দলে আমাদের প্রয়োজন নেই; দলের কর্মকাণ্ডে তা বুঝতে পারছি। বৃদ্ধ হয়ে গেছি… মান সম্মান থাকতে থাকতে দল থেকে চলে আসছি।’

উকিল আবদুস সাত্তারকে ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সর্বদলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।(দৈনিক সংবাদ, ২১ জানুয়ারি ২০২৩)২১ জানুয়ারি স্থানীয় এক মতবিনিময় সভায় সরাইলের আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান নেতা উপস্থিত ছিলেন।সরাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদকসহ সেখানে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মধ্যে ছয় জন চেয়ারম্যান অংশ নেন।সাত্তার সাহেব যে ভালো মানুষ, সৎ মানুষ এটা সভায় উল্লেখ করে তাঁকে বিজয়ী করতে হবে বলে মতামত ব্যক্ত করেন নেতৃবৃন্দ।সভায় উপস্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা তাঁর প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন।

এর আগে ২ জানুয়ারি আবদুস সাত্তারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপি।দুই সপ্তাহ পরেই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। তবে যেখানে ‘বি্এনপি’ নামক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভালোবাসা ও নিরলস প্রচেষ্টা এবং সহযোগিতা পাওয়ার কথা ছিল সেখানে নির্বাচিত সাবেক এই এমপি’র বিরুদ্ধে মারমুখী আচরণ প্রকাশ করা হয়েছে, যা ন্যক্কারজনক। অবশ্য ৫ জানুয়ারি (২০২৩)প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুস সাত্তার ছাড়া আরও ১২ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দল প্রার্থী না দেওয়ায় সাত্তারের সঙ্গে লড়বেন সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি মনোনীত মো. আবদুল হামিদ। তবে ভোটের মাঠে তার অবস্থান নাজুক। অন্য প্রার্থীদের অবস্থানও দুর্বল হওয়ায় ‘ওয়াকওভার’ পেতে চলেছেন পাঁচবারের সাবেক এমপি উকিল আব্দুস সাত্তার। অর্থাৎ ভোটের লড়াইয়ে তাকে খুব একটা বেগ পেতে হবে না।১৯ জানুয়ারি (২০২৩) তিনি বলেছেন, পরিস্থিতির কারণে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেন- আপনি পদত্যাগ করে আবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, আসলে কি ব্যাপার? এটা সবাই বুঝেন। সব কথা বলা যায় না। পরিস্থিতির কারণে আমাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আবার নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে ভুল বুঝাবুঝির কোনো অবকাশ নাই। এ সিদ্ধান্ত দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে নিয়েছি।’

এছাড়াও এই রাজনীতিবিদের বক্তব্য হলো- ‘আমি বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশে পদত্যাগ করি। পরে বুঝতে পারি আমি আমার এলাকার জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারি নি। তাই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে চাইছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বতন্ত্র থেকে আমি শুরু করেছিলাম, আবার স্বতন্ত্র দিয়েই আমি শেষ করতে চাই। এজন্য আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনারা আবার আমাকে কলার ছড়া মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন। আমি যেন আপনাদের বাকি কাজগুলো শেষ করতে পারি।’ এভাবেই একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের প্রজ্ঞামণ্ডিত কথা জনগণকে উদ্দীপিত করেছে।

 

৪.

তবে ১ ফেব্রুয়ারির উপ-নির্বাচনে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐক্যের প্রতীক’ উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়ার সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় কিছু নেতাদের অসদাচরণ থেকে বিএনপি’র রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব আত্মপ্রকাশ করেছে।উপরন্তু বিএনপি’র সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সামনে এসেছে। 

প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছর অতিক্রম করে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি সার্বিক বিবেচনায় এখন দিশেহারা, অগোছালো সংগঠন।স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে গোপনে ষড়যন্ত্র করে দলটি এখন বুদ্ধিদীপ্ত ও গঠনমূলক রাজনীতি থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে। বিএনপিকে দেখে এখন মনে হয় বার্ধক্যে ভুগছে।দলটির নেতাদের এখনো যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। দোটানা ভাব তো আছেই তার উপর অহেতুক পরিস্থিতিকে জটিল করে ফেলেন তারা। সহজ, সরলভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে নেতাদের।রাজনীতির মাঠে বিএনপির নেতা-কর্মীদের কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গি এখন কাণ্ডারীহীন, লক্ষ্যহীন যাত্রীর পথ অতিক্রান্ত করার মতো।২০২০ সালে দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে রেখেই সংসদে গিয়েছিলেন বিএনপির সদস্যরা।সেসময় থেকে ২০২২ অবধি সংসদে এমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি, যা বিএনপির জন্য  ইতিবাচক হতে পারে। বরং বিএনপির এক সদস্য সংসদে বলছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃপায় তিনি সংসদে প্রবেশ করতে পেরেছেন। আরেক সাংসদ তাঁর বক্তব্যে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের ‘ক্রসফায়ার’দেওয়ার দাবি তুলে ভয়ঙ্কর মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন।একজন বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে সংসদে বক্তব্য দিয়েছেন।২০১৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যেতে পেরে ও সরকারি ভাতা পেয়েই খুশিতে গদগদ ছিলেন তাঁরা। আওয়ামী লীগ ১৪ বছর ক্ষমতায় আছে। এ সময়ে অনেক নতুন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। রাজনীতি নিয়ে এঁদের অনেকেই এখন খোঁজখবর রাখেন। এঁদের সামনে বিএনপি নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরতে পারেনি।বিএনপির সাংসদদের বালখিল্য আচরণ জনমনে যথেষ্ট হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে, এবং তাদের মাঠের রাজনীতিও তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে পারছে না।পাকিস্তানপন্থী বিএনপি-জামায়াত ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনা তথা এদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

২০২০ সালের করোনা মহামারি কিংবা ২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জনগণকে কোনো ভালো কথা বলে পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির নেতা-কর্মীদের।করোনা ব্যাধির দুর্যোগে অসহায় মানুষের পাশে থাকা জনসম্পৃক্ততার অন্যতম দৃষ্টান্ত হতে পারত এই রাজনৈতিক দলটির।কিন্তু মানুষের জন্য দায়বদ্ধ নন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা কৃষকের ধান কাটা থেকে শুরু করে দুস্থদের ত্রাণ বিতরণে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন  কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। জনসম্পৃক্ততার কারণে বেশ কিছু আওয়ামী লীগ নেতা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি’র লক্ষণীয় কোনো কাজ চোখে পড়ে নি। বরং মহামারি মোকাবেলায় সরকারের বিপুল প্রচেষ্টাকে অভিনন্দন জানাতে কুণ্ঠিত হতে দেখা গেছে তাদের। সরকারের কোনো কোনো ইস্যুতে তারা সমালোচনামুখর হয়েছেন, সফল ও সুন্দর উদ্যোগকে ব্যঙ্গ করেছেন।পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের মতো প্রকল্পের সাফল্যও তারা স্বীকার করেন না। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিকভাবে ফায়দা লুটার জন্য বিএনপি অনেক কাজ করে থাকে।আসলে উন্নয়ন নিয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ নেই। দেশের বর্তমান উন্নয়নের চেয়ে তাদের সময়ে অনেক বেশি উন্নয়ন হয়েছে- এটা বলা কেবল বাতুলতা।সরকারের দুর্নীতির কথা বলারও সুযোগ নেই। কারণ দুর্নীতির দায়ে তাদের শীর্ষ নেতারা উচ্চ আদালত পর্যন্ত দণ্ডিত হয়েছেন। কাজেই তাদেরকে আবার পুরানো ধারায় ফিরে যেতে হচ্ছে।গুরুত্বহীন ইস্যুতে সরকার বিরোধিতা তো আছেই, তার সঙ্গে জামায়াতের মতো ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির উপর তাদেরকে নির্ভর করতে দেখা যাচ্ছে। বিএনপি’র এই অপরাজনীতির ধারা থেকে বের হয়ে এসেছেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ উকিল আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া।

 

৫.

বার্ধক্য উকিল আবদুস সাত্তারকে দমাতে পারেনি। তিনি যেন পুনরায় সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। যে সংগ্রাম শুভ বোধের উন্মীলন ঘটাবে।যে সংগ্রাম তাঁকে যুদ্ধজয়ী করে তুলবে।বিএনপি তাঁর বহিষ্কারের ক্ষেত্রে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকে কারণ দেখিয়েছে।কিন্তু আমাদের প্রশ্ন বিএনপি কি আদৌ সুশৃঙ্খল একটি দল? বরং বিএনপি’কে ত্যাগ করে তিনি মানুষের কল্যাণের রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন।সংবাদপত্রের সূত্রে জানা গেছে, উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে এলাকার স্বার্থে ভোট দিবেন এবং নির্বাচনে কাজ করবেন ব্যাপক সংখ্যক সাধারণ মানুষ।এলাকাবাসীর অভিমত হলো- উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া একজন ভাল মানুষ ও ভদ্রলোক তাই সাধারণ মানুষ তাঁর পক্ষে রায় দিবেন।এছাড়া তিনি কারো ক্ষতি করেননি, তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সৎ ব্যক্তি।’ তাঁর ছেলে মাইনুল হাসান তুষার বলেছেন, ‘আগে বাবার নির্বাচনে শুধু বিএনপির লোকজন মাঠে থাকতেন। এখন তিনি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন। ফলে দলমত নির্বিশেষে সবাই আমার বাবার পক্ষে আছেন। আমরা এটিকে স্বাগত জানিয়েছি।’ ১ ফেব্রুয়ারি ভোট দিয়ে উকিল আবদুস সাত্তারকে নির্বাচিত করার এলাকাবাসীর প্রতিশ্রুতিতে আমরা শুভবোধের জয় ঘোষিত হতে দেখছি।উক্ত আসনের ৩ লক্ষ, ৭৩ হাজার, ১শ’ ৪৮ জন ভোটার তাঁর পক্ষে থাকবেন- এই প্রত্যাশা আমাদের।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত গবেষণা জালিয়াতি প্রতিরোধের আইন


Thumbnail

গবেষণা জালিয়াতি, গবেষণা চুরি, গবেষণা নকল, প্লাগিয়ারিজম এবং চন্দ্ররেণুবিদ্যা নিয়ে সম্প্রতিকালে ব্যাপক আড়োলন সৃষ্টি হয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। এসব শব্দ/প্রত্যয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা পেরিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী -অভিভাবক -শিক্ষকের আলোচনায় স্থান পেয়েছে। আমরা জেনেছি, বরেণ্য অধ্যাপক জাফর ইকবালের রচনায় ও সম্পাদনায় প্রকাশিত ৭ম শ্রেণীর বিজ্ঞান বইতে দুটি অনুচ্ছেদ পাওয়া গেছে যা নকল।  ওই দুটি অনুচ্ছেদ কোনো প্রকার স্বীকৃতি ছাড়া রচয়িতা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি থেকে নিয়ে লেখায় সংযুক্ত করেছেন।  বিষয়টি জনাব নাদিম মাহমুদ প্রথমআলো পত্রিকায় উপস্থাপন করেছেন।  এবং পরবর্তীতে ৭১ চ্যানেলে বিশদ আলোচনা হয়েছে।এবং কোনো প্রকার  রাখঢাক না করে অধ্যাপক জাফর ইকবাল স্বীকার করেছেন যে প্লাগিয়ারিজম হয়েছে। এবং এই ঘটনায় তিনি বিব্রত ও লজ্জিত।

প্রতীয়মান হয়, এই ঘটনার পর সরকার, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নড়েচড়ে বসেছে।  অতীতে গবেষণা জালিয়াতির বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে সংবাদ মাধ্যমের নজর কেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের  শিক্ষক যখন জাল তথ্য দিয়ে পিএইচডি নেন তখন সংবাদ মাধ্যমে সাড়া পড়ে।  এর পর নজরে আসে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সামিয়া রহমানের বিষয়। যদিও তিনি আদালত থেকে অভিযোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।  অন্যদিকে  ৯৮ % গবেষণা চুরির বিষয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।  তারই সূত্র ধরে বাংলাদেশ হাই কোর্ট বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে দায়িত্ব দেয় একটি নীতিমালা প্রবর্তনের জন্য। 

বিগত ২২ জানুয়ারী ২০২৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের একাডেমিক কাউন্সিলের বিবেচনার জন্য একটি নীতিমালা উপস্থাপন করে।  সংবাদ মাধ্যমগুলো সেখান থেকে নীতিমালার বিভিন্ন দিক নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে।  সেই সূত্র ধরে আমি অনুসন্ধান করে নীতিমালার একটি কপি হাতে পাই।  এবং ওই কপিটি হাতে পেয়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই ৩ এর ধারা a  পড়ে।  সেখানে বলা হয়েছে-3(a)The rule shall come into force from the date of approval by the syndicate of the university and shall not have any retrospective effect. অর্থাৎ, এই আইন প্রবর্তনের তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং আইনটির  ভূতাপেক্ষ কার্যকর বলে গণ্য হবে না। নিয়মটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদনের তারিখ থেকে কার্যকর হবে এবং এর কোনো পূর্ববর্তী প্রয়োগ  থাকবে না। এবং দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে,  আইনটি ইংরেজিতে লেখা আছে -The Rule shall be applied to address any offence /misconduct of plagiarism committed or reported from the date of its commencement at the university. অনুবাদ করলে এর অর্থ দাঁড়ায় -বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি( আইনটি ) শুরু হওয়ার তারিখ থেকে সংঘটিত বা রিপোর্ট করা চুরির যে কোনো অপরাধ/অসদাচরণ মোকাবেলার জন্য নিয়মটি প্রয়োগ করা হবে। এভাবে যদি আইনটির অর্থ করা হয় তবে কি এই আইনটিপাশের পূর্বে যে সব জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে এবং সে সম্পর্কে অভিযোগ দেয়া হয়েছে সেগুলোকে কি আমলে নেয়া হবে না এই আইনের আওতায় ? পাঠকদের মনে প্রশ্ন জেগেছে :যদি তাই হয় তবে কি যিনি চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি কি ছাড়া পেয়ে যাবেন ?

বর্তমান নিয়ম অনুসারে একজন গবেষক তার গবেষণাপত্রে এই মর্মে ঘোষণা দেন যে তিনি যা লিখেছেন তা মৌলিক।  তিন আরও ঘোষণা দেন যে, তিনি এই লেখা অন্য কোথায় কোনো ডির্গ্রীর জন্য উপস্থাপন করেননি।  এবং গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক অনুরূপভাবে সমর্থন করে কতৃপক্ষকে আশ্বস্থ করেন যে গবেষকের লেখা মৌলিক।  এসবের মাধ্যমে গবেষণায় শুদ্ধাচার (integrity ) নীতি বাস্তবায়ন করা হয়।  এবং এই শপথ যদি কোনো গবেষক  ভঙ্গ করেন সেজন্য এই ধরণের কাজকে একাডেমিক মিসকন্ডাক্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং বিষয়টি নৈতিক স্খলন হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। 

গবেষণায় চুরি একটি মারাত্মক অপরাধ একারণে যে, তিনি কেবল অন্যের লেখা বা উপাত্ত নিয়ে নিজের দাবি করেছেন এমনটি নয় বরং তিনি দেশ , জাতি, সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যক্তিবর্গ, এবং মানবতার সঙ্গে প্রতারণা করছেন।  এখানে তিনি সকলের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করছেন।  একজন তত্ত্বাবধায়ক/ প্রবন্ধের ক্ষেত্রে একজন রিভিউয়ার সকল শব্দের উৎস সম্পর্কে নাও জানতে পারেন।তিনি ওই গবেষককে বিশ্বাস করেন।এবং এই বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা সকলকেই মানসিকভাবে আঘাত করে।  এবং মানসিক এই যন্ত্রনা একজন তত্ত্বাবধায়ক / রিভিউয়ারকে শারীরিকভাবে অসুস্থ করে।এছাড়া যেহেতু গবেষককে ডিগ্রী দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করা হয় এবং তারা সংশ্লিষ্ট তত্তাবদায়ককে বিশ্বাস করেন।একপর্যায়ে একাডেমিক কাউন্সিল , উপাচার্য একটি মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন। এভাবে অন্যের ক্ষতি করা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

আমরা জানি এই ধরণের অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার বিধান প্রচলিত আছে।  যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৯৮% গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ আমলে নিয়ে একজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে।  অন্যদিকে আরেকটি অভিযোগ আমলে নিয়ে সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষককে শাস্তি দিয়েছে। সেই সঙ্গে অপরাধ বিজ্ঞানের একজন শিক্ষক শাস্তি পেয়েছেন।  তবে আদালত থেকে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অব্যহতি পেয়েছেন।  নিউজ  বাংলা সংবাদ পোর্টাল থেকে জানা যায়  সহযোগী অধ্যাপক জনাব আবুল কালাম লুৎফুল কবীর এর বিরুদ্ধে  পিএইচডি গবেষণা অভিসন্দর্ভের (থিসিস) ৯৮ শতাংশই নকলের অভিযোগ উঠেছিল । তার অভিসন্দর্ভের নাম ছিল ‘টিউবার কিউলোসিস অ্যান্ড এইচআইভি কো-রিলেশন অ্যান্ড কো-ইনফেকশন ইন বাংলাদেশ: অ্যান এক্সপ্লোরেশন অব দিয়ার ইমপ্যাক্টস অন পাবলিক হেলথ (মনিরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ৩১ আগস্ট, ২০২২ ১১:৫৭)’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই গবেষককে শাস্তি দিয়েছে।  এর আগে সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের এবং কলা অনুষদের একজন শিক্ষক শাস্তি পেয়েছেন । সুতরাং, বিদ্যমান আইনটি শাস্তির বিধানকে স্পষ্ট করেছে।  তাই মনে প্রশ্ন জাগে:এই আইনটি অতীতে সংঘটিত ঘটনার বিচার করতে ব্যবহার করা যাবে নাকেন ?এভাবে যদি শাস্তির বিধান প্রণয়ন করা হয় তবে, অনেক অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাবেন। 

এখানে আইনের "প্রিন্সিপাল অফ নন রেট্রোএক্টিভিটি" কার্যকারী হতে পারেনা বলে প্রতীয়মান হয়। "প্রিন্সিপাল অফ নন রেট্রোএক্টিভিটি" একটি অতি বিতর্কিত আইন/নীতি ।  এই আইন দিয়ে পরিবেশের ক্ষতিকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দায় এড়াতে চেষ্টা করে।  আমরা জানি, কিভাবে মাগুরছড়ার পরিবেশে বিনষ্টকারী অক্সিডেন্টাল ও সেভরণকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে "প্রিন্সিপাল অফ নন রেট্রোএক্টিভিটি" এখন অচল।  সুতরাং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি নিয়ম করে যে, এই আইনটি রেট্রোস্পেক্টিভ নয় তাহলে এই মুহূর্তে যেসব অভিযোগ আছে সেগুলোর কি বিচার হবে না ?

গবেষণা চুরি করে যেসব শিক্ষক পদোন্নতি নিয়েছেন তারা নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন।  একজন ছাত্র তার টাকা নেই বলে কনভোকেশনে আসতে পারেনি।  আমাদের জানামতে,আর একজন শিক্ষক গবেষণা চুরি করে পদোন্নতি নিয়ে বিগত ছয় মাস কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা বেতন অতিরিক্ত নিচ্ছেন !এভাবে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আগামী ৩০ বছরে ( পেনশন সহ ) প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করবেন- তার কি বৈধতা পাবে ?

তার বিচার কি হবে না ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি এই বিচার করবে না ? আইনটি পাঠ করে আমাদের মনে এসব প্রশ্ন মনে জেগেছে। গবেষণা চুরি করে পদোন্নতি নেওয়া রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ চুরি এবং তার বিচার না করা চুরিকে বৈধতা দেওয়া। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আছে ভিক্ষুক, গরীব চাষী, ভূমিহীন, গৃহহীন, অসহায় বিধবা, পাথর ভাঙা শিশুর কষ্ট, খেটে খাওয়া মজুরের পানি করা রক্ত-ঘাম। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে আইন প্রস্তাব করেছে তার ৫.২ ধারার a এবং b তে বলা হয়েছে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভান্ডারে রক্ষিত অপ্রকাশিত থিসিস বা অনুরূপ কর্ম চন্দ্র রেণু বিদ্যা (চোর্য বৃত্তির )র অভিযোগ আনা যাবে না বা আওতা মুক্ত থাকবে।  এখানে আরও বলা হয়েছে,ভান্ডারে রক্ষিত সবওইথিসিস থেকে যেসব প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোও আওতা মুক্ত থাকবে। এর অর্থ দাঁড়ায়  জাহাঙ্গীরনগর বা অক্সফর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী করে আসা  একজন শিক্ষক গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন।কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী করে যিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছেন এমন একজন শিক্ষককের বিচার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারবে না।  এবং এই ধারাগুলো কি বর্তমানে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাদেরকে অব্যহতি দিচ্ছে ? তাহলে কি তারা আগামী ২০ থেকে ৩৫ বছর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অবৈধভাবে বেতন নিতে পারবে ? এভাবেই কি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে  ভিক্ষুক, গরীব চাষী, ভূমিহীন, গৃহহীন, অসহায় বিধবা, পাথর ভাঙা শিশুর কষ্ট, খেটে খাওয়া মজুরের পানি করা রক্ত-ঘাম থেকে অর্জিত টাকা লুটপাট চলবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতির বিবেক বলা হয়। এবং সেজন্য একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে গর্ব বোধ করি। সুতরাং, জাগরণের  প্রত্যাশায় জাতি অপেক্ষায়। আশা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওই অভিযোগুলোর বিচার করবে এবং আগামীতে যদি কোনো গবেষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে তবে তার তদন্ত করে ন্যায় বিচার করবে।  প্রস্তাবিত আইনটির উপরোক্ত ধারাগুলো বাদে পুরো আইনটি অনেক ভালো একটি আইন। সেজন্য সকলে প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। আশা করি আইনটি পাশের আগে উত্থাপিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে জাতির বাতিঘর বিতাড়িত হবে দুর্বৃত্ত। জাতি হাসবে ন্যায় বিচারের আলোতে আলোকিত বিশ্ববিদ্যালয় পেয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমাদের অনুরোধ আপনারা উত্থাপিত বিষয়গুলোকে বিবেচনা নেবেন যাতে আমরা আগামীতে লজ্জার হাত থেকে মুক্তি পাই।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হিসাবে গণমাধ্যম ধারালো হাতিয়ার

প্রকাশ: ০১:০০ পিএম, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

"সংবাদপত্র শিল্প আর দশটা সাধারণ শিল্পের মতো নয়, পণ্য তৈরি করিলেই বাজারে বিক্রয় হইয়া যায়; কিন্তু সংবাদপত্রকে জনমতের বাহন হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে হয়।"

উক্তিটি সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার।তিনি লিখেছেন, "দেশে দেশে যুগে যুগে সংবাদপত্রের উপর অসহিষ্ণু শাসকবর্গ হামলা করিয়াছেন এবং শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্রই জয়যুক্ত হয়েছে।.. যাঁরা ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা উপেক্ষা করিয়া সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মধ্যযুগীয় আচরণে লিপ্ত হইয়াছেন, তাহাদের প্রতি আমার অনুকম্পা প্রকাশ করিতে হয়।"

সত্যিই এই পুরুষসিংহ শাসকদের অনুকম্পাই প্রদর্শন করতেন। তা নাহলে যে অর্ডিনান্সের খবরও সংবাদপত্রে ছাপানো নিষিদ্ধ ছিল, সেই তার বিরুদ্ধেই ওই ভাষায় "রাজনৈতিক মঞ্চ" -এর কলাম কি করে লিখতেন?

ফরাসি বিপ্লবোত্তর অরাজকতা লক্ষ্য করে এক মনীষী আক্ষেপ করে লিখেছিলেন, "Liberty, what crimes are being committed in thy name!"- স্বাধীনতা, তোমার নামে কত অপরাধই না অনুষ্ঠিত হচ্ছে! আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী পার করেছে।

তবুও চারদিকে অবক্ষয়, সমাজজীবনের এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে অবক্ষয় ভয়াবহ রূপে নেই। পুরানো সব মূল্যবোধ এখন নিশ্চিহ্ন, নতুন কোন মূল্যবোধও দুর্নিরীক্ষ্য- যে মূল্যবোধে স্বাস্থ্য আর শালীনতার লক্ষণ রয়েছে। একধরনের সরকারি উন্নয়নের চাঞ্চল্য সর্বত্র দেখা যায় সত্য কিন্তু তাকে প্রাণচাঞ্চল্য নামে অভিহিত করা যায় না। যেন মরণের আগে হাত-পা ছোঁড়া। কেননা উন্নয়ন হয়নি রাজনীতির, ভবিষ্যত নেতৃত্বের। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে মানিক মিয়া থাকলে তিনি যুক্তির খড়াগাঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে দিতে পারতেন মিথ্যাকে।

আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়,"আমরা একবার সকলে মিলে জোর করে মানিক মিয়াকে আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বর করেছিলাম। বছর না ঘুরতেই তিনি বললেন, ভেতরের চেয়ে বাইরে থেকেই আওয়ামী লীগের বেশী খেদমত করতে পারবেন। করেছেনও তিনি। আমরণ আওয়ামী লীগের এমন খেদমত যার তুলনা হয় না। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, গোটা জাতি, সারাদেশ, শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, গোটা পাকিস্তান তাঁর কাছে ঋণী। তাঁর অবদান এতো মূল্যবান ছিল যে, ইচ্ছা করলেই মন্ত্রী বা আওয়ামী লীগের পদাধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু সেদিকে তাঁর নজর ছিল না"

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মতো আবুল মনসুর আহমদও বেঁচে নেই। বেঁচে আছে তাঁদের কথা। যেখানেই সাংবাদিকতার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ক্ষুন্ন, সেখানেই তাঁরা আরও বেশী স্মরণীয়। ঠিক সেরূপ, যেখানে গণতন্ত্রের স্বার্থ বিপন্ন, জনগণের স্বার্থ বিপর্যস্ত, সে বিপদ বিপর্যয় শাসকদের ইচ্ছাতেই হোক আর অনিচ্ছাতেই হোক, তাঁদের অভাব সেখানেই তীব্রভাবে অনুভূত। গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ ধারালো হাতিয়ার যে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম, সেই সত্যকে আপাততঃ স্বীকার করে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সরকার মুক্তি দিয়েছে- এটা আমরা অন্ততঃ ধরে নিতে পারি। গণতন্ত্রই যাঁদের শক্তি-উৎস, তাঁদের হাতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবেই বা কেন?

গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ ধারালো হাতিয়ার যে সংবাদপত্র, সেই সংবাদপত্রও অতীতে রেজিমেন্টড হয়েছে। বাক-স্বাধীনতা চাটুকারিতায় নিয়োজিত হয়েছে। আমাদের দেশের সমস্যার জনগণের দুর্দশার অন্ত নেই। কিন্তু বেশীরভাগই কৃত্রিম আমাদের নিজ হাতে তৈরী। শাসক-পরিচালকদের ভুল-ভ্রান্তির জন্য এসব ঘটে। আমাদের জাতীয় জীবনের দুটা প্রধান দিক রাজনীতি   সাংবাদিকতা। আজ দেশে-সমাজে, রাজনীতিতে-অর্থনীতিতে, সাহিত্যে- সাংবাদিকতায়, বিদ্যালয়ে-মন্ত্রণালয়ে যা যা ঘটছে, মনে হয় মানিক মিয়ারা বেঁচে থাকলে এসব ঘটতে পারতো না। এই দুটা দিকেই মানিক মিয়া জীবদ্দশায় ছিলেন অনন্য অতুলনীয়। মৃত্যুর পরেও তাঁর স্থলবর্তী জন্মেনি। সাংবাদিকতায় ছিলেন মিশনারি আর রাজনীতিতে স্টেটসম্যান। এটাই ছিল তাঁর প্রভাবের গূঢ়তত্ত্ব।

শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকেই বঙ্গবন্ধু আর মানিক মিয়ারা আত্মস্থ করেছিলেন দেশপ্রেম, রাজনৈতিক আদর্শবাদ, দুর্জয় সাহস, অমিত তেজ, বেপরোয়া ত্যাগ, স্বচ্ছ চিন্তা, সবল যুক্তি, কুশল-প্রকাশভঙ্গী এবং গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা -সবই। তাঁদের মতো সামরিক স্বৈরাচারের সামনে উন্নত মস্তকে দাঁড়িয়ে জনগণের অধিকারের কথা বলতে বুকের পাটা খুব কম লোকই দেখিয়েছেন।

"আমাদের বাঁচার দাবি" ছয়-দফার সমর্থনে ১৯৬৬ সালের জুনের বিপ্লবে মানিক মিয়া তাঁর ইত্তেফাকের মতো সার্বিক ত্যাগ স্বীকার খুব কম নেতা সংবাদপত্রকেই করতে হয়েছে। মানিক মিয়া ইত্তেফাকের ওপর আইয়ুব খানের জুলুমের নজির দুনিয়ার দ্বিতীয়টি নেই। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় "বস্তুত জনগণের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সাংবাদিকদের ত্যাগ ব্যাপকতায়, সামগ্রিকতায় মহিমা-মর্যাদা অপরিসীম। আমরা যাঁরা সমানে জেল-জুলুম সয়েছি, তাঁরা শুধু শারীরিক মানসিক নির্যাতনে ভুগেছি। মানিক মিয়ার মতো সম্পত্তি ধ্বংস -বাজেয়াপ্ত হয়নি আমাদের আর কারো। এতসব করেও ডিক্টেটররা মানিক মিয়াকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি।

যে গণ-দাবির সমর্থন করার অপরাধে ইত্তেফাক শাসকদের শ্যেনদৃষ্টির শিকার হয়েছিল, মাত্র তিন বছরেরই ছাত্রজনতার সংগ্রামের সামনে আইয়ুব শাহীর পরাজয় ঘটে। ষড়যন্ত্রমূলক কুখ্যাত আগরতলা মামলারও অবসান ঘটে। যা ছিল জঙ্গি ডিক্টেটর আইয়ুবের কুখ্যাত "সিভিল ওয়ার" আর্গুমেন্ট অব ওয়েপনের" দর্প দম্ভের প্রথম নমুনা। রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমেদ তাই লিখেছেন, "জালিমশাহীর নমরুদী আক্রোশে যে বঙ্গবন্ধুকে পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে নির্যাতনের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল সে আগুনের লক্-লকা জিভ উৎকীর্ণ স্ফুলিঙ্গ ইব্রাহিম নবীর কুসুমস্তবকের সুষমা সৌরভ নিয়ে 'ইত্তেফাকের' ফুলাসন পুষ্পমাল্যে রূপান্তরিত হয়েছিল। বাংলাদেশে সাংবাদিকদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার শক্তিধর ডিফেন্ডার হতে হলে পূর্বসূরি মানিক মিয়াদের জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণের বিকল্প নেই। গণতন্ত্রই মানবাধিকারের সর্বশ্রেষ্ঠ রক্ষাকবজ। সীমাহীন শক্তির অধিকার মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সেদেশের সংবাদপত্রগুলো কিভাবে লড়াই করে গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করছেন, এটা দেখে আমাদের সাংবাদিকদের সঙ্কল্পবদ্ধ হতে হবে।

রাষ্ট্র সংবাদমাধ্যম উভয়ের সমন্বয়ের প্রয়োজন, উভয়কে হাত ধরাধরি করে চলতে হয়। যদি না চলে, অথবা উভয়ের গতি হয় অবক্ষয়ের দিকে, তা হলে তা রোধ করার পথ নির্দেশের দায়িত্ব কার? নিঃসন্দেহে সাহিত্য আর  শিল্পের ভুমিকা দীর্ঘমেয়াদি, তার আবেদন ধীরসঞ্চারী, তার ফল দেখা দেয় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর। তাৎক্ষণিকের প্রয়োজন মিটাতে সংবাদমাধ্যম অদ্বিতীয়। সমাজের প্রতিদিনের চেহারাটা সংবাদপত্রেই প্রতিফলিত হয়। প্রায় দর্পণের কাজ করে - চেহারার কালো দাগটা সহজেই নজর কাড়ে, তখন তা মুছে ফেলার জন্য হাতটা ঊর্ধ্বাভিসারী না হয়ে পারে না। প্রায় জৈব তাড়নার মতো কাজ করে। জাতীয় জীবনে গণমাধ্যমের ভুমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিভাবান, সুযোগ্য, দক্ষ কুশলী সাংবাদিকের অভাব নেই। অভাব সাহসী নির্ভীক সাংবাদিকের। যারা সমাজ রাষ্ট্র উভয়কে বিচার করতে আর পথ দেখাতে সক্ষম। সমাজ, রাষ্ট্র আর বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ যেখানে জড়িত- তা এমন বৃহৎ মহৎ বস্তু যে, তার জন্য নিবেদিত সাংবাদিকরা যে কোন নির্যাতনের মোকাবিলা করতে ভীত হতে পারেন না। স্বাধীনতার আগে যে ধরণের নির্যাতনের সম্মুখীন সাংবাদিকরা হতেন, সেরকম পরিস্থিতি অবসান ঘটেছে। তবে ধরন-ধারণ পরিবর্তন ঘটলেও অন্যরূপ, অন্য আকার নির্যাতন যে চলবে না বা এখনো চলছে না সে কথা বলা যায় না। সরকার যারা চালান তারাও দোষে-গুণে মানুষ, তাঁরাও যে মাঝেমধ্যে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছেন না বা ভ্রান্ত নীতির অনুসরণ করেন না তা নয়। সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে ফাঁসাতে সরকারকে কিভাবে আমলাতন্ত্র অসহিষ্ণু পথ বাতলে দিচ্ছিল, তা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। দেশপ্রেমিক সাংবাদিকদের বিপদের ঝুঁকি নিয়ে হলেও সে সবের প্রতিবাদ জানাতে হবে, সরকারের ভুল-ভ্রান্তিকেও দেখিয়ে দিতে হবে আঙ্গুল দিয়ে। এবং রোজিনা ইসলাম ইস্যুতে সাংবাদিকরা তাই করেছে। আশার কথা হচ্ছে, আমরা সাংবাদিকরা রাজনৈতিকায়ণের আওতাধীন আদর্শগত বৈপরীত্যের বেড়াজালে বিভক্ত হলেও সাম্প্রতিক সাংবাদিকদের ঐকমত্যে একটা আশার রেখাপাত দেখতে পাচ্ছি। জাতীয় প্রেসক্লাব, বিএফইউজে, ডিইউজে এবং ডিআরইউ নেতৃত্বের ফলশ্রুতিতে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের মুক্তিকে যে তরান্বিত করেছে - তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিপদের ঝুঁকি নিয়েই এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়েছে।  না করা হলে শুধু যে সাংবাদিক হিসাবে কর্তব্যচ্যুতি ঘটে তা নয়, পেশার প্রতিও করা হয় বিশ্বাসঘাতকতা। দেশের মানুষকে সর্বপ্রকারে সচেতন রাখা আর সচেতন করে তোলাই সংবাদমাধ্যমের এক বড় দায়িত্ব। দায়িত্বপালন রাজনীতিবিদদের দ্বারা হওয়ার নয়। কারণ তাঁরা সবসময় সবকিছুই দলীয় চশমা দিয়ে দেখেন। তাই তাঁদের পক্ষে পুরোপুরি নিরপেক্ষ হওয়া বা যথাযথভাবে সবকিছু দেখা এবং তার মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। পঞ্চাশ ষাটের দশকের ঘটনাবলী সাধারণভাবে একটি প্রগতিপ্রবণ নির্দিষ্ট দিগন্তমুখী থাকার কারণে এবং মুক্তিসংগ্রামের ভাবাদর্শগত বস্তুগত উপাদানগুলো অনিবার্যভাবে স্বাধীন সত্তার দিকে বিন্যস্ত হওয়ার ফলেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। দ্বন্দ্বাত্মক বস্তু গতিধারার মাঝে মাঝে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে বিপ্লবাত্মক উপাদানের মধ্যেই। জট পাকিয়ে দিয়েছে সংগ্রামী ব্যুহ রচনার ক্ষেত্রে। সাময়িক প্রেক্ষিত নিয়েই এসেছে অভিঘাতের তাগিদ। পাকিস্তানি সামরিক শাসকচক্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে জুজু তৈরি করে তা সংক্রমিত হয়েছিল দেশের মানুষের মনেও। নিষেধের বেড়াজাল ছিল চারদিকে। মাঝে মাঝে এই ভয় আর বেড়াজাল ভাঙার জন্য দরকার পড়তো নির্ভীক মানুষের। একজন সাংবাদিকের অবদান তুচ্ছ নয়। তিনি দার্শনিক নন, সমাজকে নতুন দর্শন দান করেন না বটে, কিন্তু চলতি সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের যা কিছু ক্লেদ, যা কিছু অনভিপ্রেত আবর্জনা, সেগুলো রাত্রির আঁধার হতে দিবালোকে তুলে ধরেন। চলতি সমাজকে তিনি আঁধার ছেড়ে আলোর দিকে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। আঁধারের দিকটা দেখিয়ে দেয়া মানে আলোর প্রতি আকৃষ্ট করা। এটাকেই বলে সমাজ চেতনা।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি লক্ষ্য করে সেই মনীষীর উক্তির সঙ্গে সঙ্গে আমার মানসপটে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। দুঃসাহসিক সত্য ভাষণে তাঁর অবদান আজও অনতিক্রম্য রয়ে গেছে। তাঁর সাংবাদিকতা অপক্ষপাত ছিল তা বলবো না, তবে নিজের আদর্শ আর বিশ্বাসে তিনি ছিলেন অনঢ়। বিপদের বহু ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকারের কাছেও কোনদিন নত করেননি মাথা। বিপদের মুখে তাঁর কলম যেন আরও ক্ষুরধার হয়ে উঠতো। হয়ে উঠতেন অধিকতর দুঃসাহসী। আমাদের সাংবাদিকতার বর্তমান চেহারা দেখলে প্রশ্নে জাগে আমরা সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার অতীত ঐতিহ্য অনুসরণ করছি কিনা? আমাদের গণমাধ্যমগুলো 'জলো' হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সমাজ রাষ্ট্র কি এখন সব সমালোচনার উর্ধ্বে পৌঁছে গেছে? নিশ্চয়ই না। আমরা সমালোচনা করবো গঠণমূলক সমালোচনা। করবো নিজেদেরও আত্মসমালোচনা।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক কলামিস্ট।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

জাসদের কঙ্কালসারশূন্য দেহাবশেষ!

প্রকাশ: ০১:০২ পিএম, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৩


Thumbnail

রাজনীতিতে নানা পথ অবলম্বন করেন নেতারা। তারা বেছে নেন উদারপন্থা, মধ্যপন্থা কট্টরপন্থা। স্বাধীনতার আগে এবং পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে উল্লিখিত তিনটি পন্থারই প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য কোন পন্থা কী পরিণতি বয়ে এনেছে, সে দিকে চোখ রাখা যেতে পারে।

প্রথমেই কট্টরপন্থা নিয়ে পথচলা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের কথা বলছি। জাসদ ছাত্রলীগের একটি প্রশাখা।   মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক সিরাজুল আলম খানের তন্ত্রমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ডাকসু ভিপি আবদুর রব, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ শরীফ নূরুল আম্বিয়া সংবাদপত্রে বিবৃতির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপ্লবী সরকার গঠন করে দেশেবৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকায়েমের আহ্বান জানান। এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মুজিব বাহিনীর আরেক অধিনায়ক শেখ ফজলুল হক মণির নির্দেশনায় ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী, ডাকসু জি এস আবদুল কুদ্দুস মাখন ইসমত কাদির গামা দাবি করেন, দেশ পরিচালিত হতে হবে মুজিববাদের ভিত্তিতে।

তারা জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রকেমুজিববাদবলে আখ্যা দেন। ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই শেখ মণিপন্থি ছাত্রলীগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং সিরাজুল আলম খানপন্থি ছাত্রলীগ পল্টন ময়দানে সম্মেলন ডাকে। উভয় গ্রুপই বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অতিথি করে। বঙ্গবন্ধু উপস্থিত হন শেখ মণিপন্থি ছাত্রলীগের সম্মেলনে।

ফলে সিরাজুল আলম খান গ্রুপ ভিন্ন পথে তাদের রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। ছাত্রলীগের উচ্চাকাক্সক্ষী, মেধাবী, প্রতিভাবান, কট্টরপন্থি বিপ্লবী বলে পরিচিত অংশটি জাসদে শামিল হয়। কাজী আরেফ আহমেদ, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, মাহবুবুল হক, হাসানুল হক ইনু, খলীকুজ্জমান, নূরুল আলম জিকু, বি এম গোলাম মোস্তফা, শাজাহান খান, মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামান, বি এম শাজাহান, জিয়াউদ্দিন বাবলুসহ উদীয়মান নেতারাও জাসদের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হন। রোমান্টিসিজম আদর্শিক ভাবালুলতা, মাঠ গরম করা বিপ্লবী বক্তৃতা-বিবৃতি রাতারাতি জাসদকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।কিন্তু অচিরেই নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা হঠকারিতায় বিপর্যয়ের সম্মুখীনও হয় দলটি।

১৯৭২ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাসদ প্রথম কাউন্সিল করে। মেজর এম জলিল সভাপতি, আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। জাসদ ঘোষণাপত্রে বলে, ‘প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েম সম্ভব নয়। শ্রেণিসংগ্রাম সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিপ্লব ছাড়া সমাজতন্ত্রকে আইনের মাধ্যমে কার্যকর করতে গেলে শোষক সম্প্রদায়কে উৎখাত করা যায় না। শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত শ্রেণির জঙ্গি ঐক্য গড়ে তোলার জন্য কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজন। নির্বাচন সাধারণ মানুষকে ঠকানোর বুদ্ধি ছাড়া কিছু নয়। ভোট দেওয়ার যে রীতি তা হলো, মানুষের বিক্ষুব্ধ মনকে দমিয়ে দেওয়ার একটা কৌশল মাত্র। নির্বাচনে মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তি কোনো দিন আসে না।আশ্চর্যের বিষয় ঘোষণাপত্রের এসব নীতিনৈতিকতা জলাঞ্জলি দিল ১৯৭৩ সালের মার্চের প্রথম সাধারণ নির্বাচনেই। তারা অংশ নিল। আবদুর রব এম আউয়াল ঢাকার সংসদীয় আসনে জাতির পিতার বিরুদ্ধেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন। তারা জামানতও হারালেন। জিঘাংসা এতটাই ভয়ংকর যে, ছাত্রলীগের এই দুই সাধারণ সম্পাদক এম আউয়াল, রব রাতারাতি জাতির পিতার সুদীর্ঘকালের অপরিসীম স্নেহ-ভালোবাসার কথা অবলীলায় ভুলে যেতে পেরেছেন।

জাসদ সরকারের মোকাবিলায় সশস্ত্র গোপন পন্থা অবলম্বন করে প্রকারান্তরে আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছিল। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে জাসদ ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতার জন্মদিনের প্রতিও সম্মান দেখানোর কথা ভুলে যায়। তারা জন্য ওই দিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মালেক উকিলের মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে সশস্ত্র হামলা চালায়। পুলিশের সঙ্গে তুমুল সংঘর্ষের জের ধরে জাসদ কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। নেতাদের নিক্ষিপ্ত হতে হয় কারাগারে। জাসদের সশস্ত্র গণবাহিনীর প্রকাশও ছিল একটা চরমপন্থা। দলের কর্মীরা আত্মঘাতী অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তারা একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান। জাসদ গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের প্রকাশ্য ঘোষণায় যুক্ত হয় সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি, নিষিদ্ধ ঘোষিত মাওবাদী বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিও। দেশের থানা, ফাঁড়িতে হামলা করে অস্ত্র লুট আর রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে জাসদের সংঘর্ষের খবর, আওয়ামী লীগের পাঁচজন সংসদ সদস্য হত্যা প্রভৃতি ঘটনাই বঙ্গবন্ধুকে দ্বিতীয় বিপ্লবেরবাকশালকর্মসূচি দিতে বাধ্য করেছিল। জাসদের আরেকটি হীনমন্যতা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। প্রথম বিজয় দিবসে রাজধানীতে নাশকতার হুংকার দেয় সর্বহারা পার্টি। অন্তরালে জাসদ। টহলরত পুলিশের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির কারণে পুলিশের গুলিতে আহত হন বঙ্গবন্ধুর পুত্র শেখ কামাল। জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠের শিরোনাম করা হলো, ‘ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে শেখ কামাল পুলিশের গুলিতে আহত সম্পূর্ণ বানোয়াট মিথ্যা খবরটি প্রচার করে জাসদ চরম এক অসভ্যতার নজির স্থাপন করেছিল। জাসদের বঙ্গবন্ধুকে অস্ত্রবলে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করার দিবাস্বপ্নটিকে মনে হয় ছোট্টবেলারডাকাত-পুলিশখেলা। বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হয়েছিল জাসদের কারণেই। দলটির কারণেই দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সম্মুখীন হন। এক কথায় জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ প্রশস্ত করে দেয়। ইতিহাস একদিন সাক্ষ্য দেবে, জাসদের ভ্রান্ত রাজনীতির মোহে পড়ে স্বাধীনতা-উত্তর সম্ভাবনাময় দুটি প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে গেছে।

দলটির উদ্ভট ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে স্বাধীনতার মূল্যবোধ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নস্যাৎ হয়েছে। নভেম্বরের তথাকথিত সিপাহি বিপ্লব ছিল জাতির জন্য এক অভিশাপ বার্তা। জাসদের গণবাহিনী কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জেনারেল জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটায়। কিন্তু জিয়াকে দিয়ে ক্ষমতা দখলের অভিসন্ধিও নস্যাৎ হয়ে যায়। জাসদ ক্ষমতা দখলের জন্য জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীরউত্তমসহ তার সঙ্গীদের হত্যা করে। জেনারেল জিয়ার চরম বিশ্বাসঘাতকতায় কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়।

জাসদ সভাপতি মেজর এম জলিলের হয় যাবজ্জীবন। সাধারণ সম্পাদক আবদুর রবের ১০ বছর, হাসানুল হক ইনুর সাত বছর, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ আরও অনেক জাসদ নেতাকে দন্ডিত হতে হয় বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ডে। পরবর্তীতে জাসদের এসব নেতা জিয়ার অনুকম্পায় মুক্তি পেলেও নিজেদের বিবাদ-বিগ্রহে দলীয়ভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যান। হায়! জাসদ ভেঙে জাসদ (আউয়াল), জাসদ (রব), জাসদ (সিরাজ), জাসদ (ইনু), জাসদ (আম্বিয়া), বাসদ (মাহবুব), বাসদ (খলিকুজ্জামান) আরও কত কী। মাহমুদুর রহমান মান্নারা তো জাসদ নামই পরিহার করে ভিন্ন পথে চলছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গণবাহিনীরও অস্তিত্ব নেই। জাসদ (ইনু) সমর্থিত ছাত্রলীগেরও বিকাশ নেই। সাইনবোর্ড-সর্বস্ব একখানা ছাত্র সংগঠন মাত্র। জাসদের বহু নেতা এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগে। জাতীয় পার্টিতেও আছেন-যারা মন্ত্রিত্বের টোপ গিলে এরশাদের চামচা বনে যান। জাসদ সভাপতি এম জলিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র চুলোয় দিয়ে শেষ জীবনে ইসলামিক মুক্তি দল করেছিলেন।

শাজাহান সিরাজ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জাসদ থেকে জয়ী হয়ে বিএনপিতে দলবলসহ বিলীন হয়ে নৌ-প্রতিমন্ত্রী হন। অবশ্য ২০০১ সালে ধানের শীষ নিয়ে জয়ী হওয়ার পর পূর্ণমন্ত্রী হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে বিএনপিতে ছিলেন অগাছা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ সালের মন্ত্রিসভার সদস্য হন আবদুর রব। তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর বন্দনা করতেন। কিন্তু ভোল পাল্টে এখন শেখ হাসিনা-বিরোধী। বঙ্গবন্ধুর কথা উচ্চারণই করেন না। আবদুর রব ১৯৮৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে এরশাদের গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা বলে পরিচিত হন। জাসদের কার্যকর নেতা বলতে এখন হাসানুল হক ইনুকে বোঝায়। তাঁর নেতৃত্বাধীন জাসদ আওয়ামী লীগের ১৪ দলে রয়েছে। তিনি তথ্যমন্ত্রী ছিলেন। নিজ দলের প্রতীকে ঝুঁকি নেননি। নৌকা প্রতীকেই বারবার বিজয়ী হন। হাসানুল হক ইনুর দলেও উপদলীয় বিবাদ বিগ্রহ রয়েছে। রব, সিরাজ, ইনুরা যাদের অনুকম্পায় মন্ত্রিত্ব করেন তাদের সঙ্গে তাদের আদর্শগত বৈপরীত্য কোথায় গেল? জাসদের কঙ্কালসারশূন্য দেহবল্লরীতে নেই যৌবন। পড়ে আছে যেন দেহাবশেষ।

এবার আলোচনা করব রাজনীতির আরেকটি পথ নিয়ে। সেটি হলো- সার্বভৌম কর্তৃত্ব করা। সার্বভৌম নেতা একাই সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিম্নস্থদের ওপর চাপিয়ে দেন। নিম্নস্থদের মতামত জানতে চান না। কারণে যে, অবচেতন মনে নেতা আশঙ্কা করেন, নিম্নস্থ ন্যায্য কথা বলছেন, যা তার পক্ষে মানা সম্ভব নয়। এমনকি সম্মানহানিকর। নেতার এসব একাধিপত্য বেশি দিন টেকে না। অল্প সময় দলের কর্মীরা কপট আনুগত্য দেখায়, তবে অচিরেই দলে বিক্ষোভ দেখা দেয়। প্রতিভাবান কর্মীরা কর্মকান্ড থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়, আর যারা লোভী তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। ফলে দলে কোন্দল দ্বন্দ্বের মুখে স্থবিরতা নেমে আসে। এতে সার্বভৌম নেতার কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। যার ফল ভোগ করে কর্মীরা।

প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। সোহরাওয়ার্দী ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। কেন্দ্রের মতো পূর্ববাংলায় আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ১৯৫৪-এর নির্বাচন মানে হক-শহীদ-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন বোঝাত। অথচ বিস্ময়কর যে, ওই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রার্থী হননি। যুক্তফ্রন্টের রূপরেখায় তিন নেতার সিদ্ধান্ত ছিল-নির্বাচনে মুসলিম লীগকে হারিয়ে যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হলে পূর্ববাংলার আইন পরিষদের নেতা হবেন শেরেবাংলা কে ফজলুল হক এবং পাকিস্তান গণপরিষদ নেতা হবেন সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানীর উদার পন্থা গ্রহণ ছিল একটি দৃষ্টান্ত। ১৪৩টি আসন পেয়েও আওয়ামী লীগ শেরেবাংলা কে ফজলুল হককে পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়। অবশ্য নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে। মার্কিনিদের সঙ্গে সিয়াটো চুক্তিতে আওয়ামী লীগ পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী ক্ষেপে যান। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আবার কী, আমিই আওয়ামী লীগ- আমিই মেনিফেস্টো।আওয়ামী লীগে তাঁর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র ছিল যে, সোহরাওয়ার্দীর অতি অনুগত কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও নেতার বক্তব্য সমর্থন করেননি, বরং তিনি মর্মাহত হন। কট্টরপন্থি সোহরাওয়ার্দী সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট শুধু ভাঙেনি, আওয়ামী লীগও কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে ভেঙে যায়। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) একটা পর্যায়ে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হারাতে হয়। নেতা-কর্মীদের জীবনে নেমে আসে চরম নিপীড়ন নির্যাতন। তার আগে নেতৃত্বের দ্বিতীয় প্রণালিটির কথা উল্লেখ করছি। এটি হলো, হিমশীতল, যন্ত্রবৎ, নিয়মানুবর্তী কর্মিপন্থা। অথচ হিমশীতল নিস্পৃহ পদ্ধতিতে কর্মনিপুণতা আনার চেষ্টা যথাযথ নয়। যেসবমেশিনশাসক বা নেতার অধীনে কাজ করে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ কর্মদক্ষতা প্রয়োগ করে না। এই পথ অবলম্বনকারীরা আক্ষরিক অর্থে পুস্তিকার আলোকে পথ চলেন। প্রতিটি প্রণালি সাধারণ বিষয়গুলোর জন্য পথনির্দেশ মাত্র-এটা তারা বুঝতে চান না। বিশ্লেষকদের মতে, নেতারা সাধারণ মানুষকে যন্ত্র মনে করেন। আর মানুষ যেসব জিনিস ঘোর অপছন্দ করে তার মধ্যে একটা হলো যন্ত্রের মতো আচরণ। আর তৃতীয় পন্থা অবলম্বনকারী হলেন, ‘মানবিক বোধসম্পন্ন নেতা’-যিনি শ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব দিতে পারেন। নেতৃস্থানীয় বলতে বোঝায় প্রচন্ড ব্যস্ত নেতা। নেতৃস্থানীয়রা কর্মযুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়ান। তবে নেতৃস্থানীয়রা কিন্তু বেশ খানিকটা সময় কাটান, যখন তাদের একমাত্র সঙ্গী হয় ভাবনাচিন্তা। বিভিন্ন ধর্মের মহাপুরুষরা, প্রত্যেকেই বেশ খানিকটা সময় একা থাকতেন। অনেক নেতার মধ্যেই এভাবে উদারতার সৃষ্টি হয়, হয়ে ওঠেন মধ্যপন্থি। মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিশু, বুদ্ধ, কনফিউসিয়াস জীবনের ঘোরপ্যাঁচ থেকে দূরে একা নিজের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। তাঁরা একাকীত্বে পেয়েছেন চিন্তার স্বাধীনতা, চিন্তার গভীরতা।

ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট পোলিও আক্রান্ত হওয়ার পর সেরে ওঠার সময় যদি একা না থাকতেন, তাহলে আদৌ নিজের অসাধারণ নেতৃত্বের ক্ষমতা বিকশিত করতে পারতেন কি না সন্দেহ।

হ্যারি ট্রুম্যান দীর্ঘ সময় মিসোরিতে একাকী কাটিয়েছেন। অ্যাডলফ হিটলার বেশ কিছু বছর জেলজীবন কাটিয়ে ছিলেন বলেই ক্ষমতার পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন। এই জেলে বসেই কুখ্যাতমাই কেম্ফলেখার সুযোগ পেয়েছিলেন, যাতে বিশ্বজয়ের কূটকৌশলের উল্লেখ ছিল এবং জার্মানরা যার অন্ধ ভক্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কট্টরপন্থা তাঁকে ধ্বংস করে। কমিউনিজমের কূটনীতিতে সুদক্ষ লেনিন, স্ট্যালিন, মার্কস সব নেতা জেলে বসেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্বিঘ্নে তৈরি করার সুযোগ পান। মহাত্মা গান্ধী একাকীত্বের কারণেই তাঁর ভিতরে অহিংসবাদী চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠে। একইভাবে নেলসন ম্যান্ডেলাও বিকশিত হন জেলবন্দি হয়ে। যেমন দীর্ঘ কারাজীবনে বঙ্গবন্ধুও বিকশিত হয়েছেন।  

মানবিক পন্থা অনুসরণ করে সুদক্ষ হয়ে উঠেছিলেন তাঁর সুফলও উপভোগ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মানবিকতাবোধের পরিণাম প্রশংসনীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুকে গোপনেও নিন্দা করা হতো না। তিনি নিজের অধীনস্থদের কাজে বেশি নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। যে কারণে তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতিতে সহকর্মীরা একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। দেশে ফিরে কর্মযজ্ঞেও সম্পূর্ণ নিরাপত্তা পেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির চিরবন্ধুর পথ পরিহার করে যখনই সার্বভৌম ক্ষমতার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ব্রত হলেন, তখনই নিজ দলের মধ্যেই সহকর্মীরা অনেকে ষড়যন্ত্রে যুক্ত হলো।   সেই ষড়যন্ত্রের কুৎসিত চেহারা ফুটে ওঠে খুনি মোশতাকের মন্ত্রিসভায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা গোটা বাঙালি জাতির জন্য মহা ট্র্যাজেডি। মোশতাকের পতনের পর আওয়ামী লীগের পুনর্জীবনের মাধ্যমেবাকশাল’-কে না বলার মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছিল, যেসার্বভৌম কর্তৃত্বপন্থা অবলম্বন সঠিক ছিল না। খুনি মোশতাকও ১৫ দিনের মাথায় বাকশাল আদেশ বাতিল করে সার্বভৌম ক্ষমতার পথ এড়িয়ে চলছিলেন।

হিমশীতল যন্ত্রবৎ নিয়মানুবর্তী কর্মিপন্থা অনুসরণকারী মানে কমিউনিস্ট পন্থা। এটার প্রতিও মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়নি।

সংসদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সংসদীয় পদ্ধতির মধ্যে নিহিত। সংসদ সার্বভৌম অর্থ প্রকারান্তরে জনগণই সার্বভৌম। সেই সংসদের প্রধান নেতা নিঃসন্দেহে সর্বদিক দিয়ে প্রশংসনীয়।   কিন্তু সদস্যরা কতটা মানবিকতাবোধ সম্পন্ন এবং এর সংখ্যা কত সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি দেশের মানুষের আস্থা শতভাগ। আর সেই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া খুবই কঠিন। তবে হাঁটি হাঁটি করে গণতন্ত্রের জন্যই হাঁটছে বাংলাদেশ। অবিরাম হাঁটার কারণেই এবং জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার বদৌলতেই শেকড় থেকে শিখরে-অগ্রসরমান সমুজ্জ্বল বাংলাদেশ।          

সোহেল সানিলেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক  কলামিস্ট।



মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন