ইনসাইড থট

নৌকা বিজয়ের প্রতীক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮:১১ এএম, ২২ নভেম্বর, ২০২১


Thumbnail

বিশ্বের শোষিত বঞ্চিত নিপিড়িত নির্যানিতত মেহনতী মানুষের অসংবাদিত নেতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের সাথে ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক সে কারণে তিনি প্রকৃতি ও মানুষের ভাষা বুঝতেন পারতেন। নদী মাতৃক এদেশে আবাহমান কাল ধরে প্রধান বাহন ছিল নৌকা। নদীতে পাল তুলে চলত বিভিন্ন ধরনের নৌকা আবার বড় বড় কোষা নৌকায় শুনটেনে মাঝিরা গান ধরতো মাঝি বাইয়া যাওরে, নাইয়া ধীরে চালাও তরণী এ ধরনের অনেক আকর্ষনীয় গান। বঙ্গবন্ধু তাইতো বেছে নিয়ে ছিলেন নৌকা দলীয় প্রতীক হিসেবে। দীর্ঘ ২৪ বছর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের মাঝে শোষণ, বঞ্চনা আর বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্বাধীকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার জন্য শারীরীক ও মানসিক ভাবে জনগণকে প্রস্তুত করে ছিলেন। আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে নৌকা একাকার হয়ে অনুপ্রেরনার প্রতীক হিসেবে শক্তি যুগিয়েছিল। ১৯৬৯ সালের গন অভ্যুত্থানের পর দিয়ে ১৯৭০ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে পূর্ব বাংলার ১৬০টি এবং মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৭টি আসনসহ মোট ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয় লাভের মধ্যদিয়ে বাংলার জনগণের নিরুঙ্কুশ ম্যান্ডেট লাভ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন বাংলার গণমানুষের অসংবাদিত ও অপ্রতিদ্বন্দী নেতা হিসেবে। নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নির্বাচনের এ ফলাফলে পাকিস্তানী শাষক গোষ্ঠি হতচকিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নতুন যড়যন্ত্র আরম্ভ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে দেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সাথে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং দলীয় নেতা কর্মীদের সংগঠিত করে এ দেশের মানুষকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন। তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনে চূড়ান্ত সংগ্রামের আহব্বান জানিয়ে সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। সেই জগৎ বিখ্যাত ভাষনে তিনি বলেন, `এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

২৫ শে মার্চ কালরাত্রিতে পাক হানদার বাহিনী বাংলার মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। গ্রেফতারের পূর্বে ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন নেতা গড়ার এক নিপুণ কারিগর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে তিনি জাতীয় পর্যায়, বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়ে বিভিন্ন স্তরে নেতৃত্ব তৈরী করে ছিলেন। তিনি ছিলেন এ বিষয়ে খুব উদার, শিক্ষা যেমন দান করলে বেড়ে যায় সে রকম নেতৃত্বের গুণাবলি দান করলেও বেড়ে যায় আর এ কারণেই বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রতিদ্বন্দী মহান নেতা। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ১০ এপ্রিল এ দেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এক অধিবেশনে মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করেন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করেন। ঐ দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে গঠন করা হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর বলে খ্যাত মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশের সরকার আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করে।

বিশ্ব বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও মহিয়ষী নারী তৎকালীন ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দীরা গান্ধী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেন। তিনি প্রায় ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান করে তাদের খাওয়া ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বে পরিচালিত ৯ মাসের বীরোচিত মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং তিন লক্ষাধিক মা-বোনের হিন্দুতের বিনিময়ে বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হয়। ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্যদিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ানি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি কাল বিলম্ব না করে শুরু করেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দুরাহ কাজ। একান্ত শূন্যহাতে তিনি দেশ পুনর্গঠনের কাজ আরম্ভ করেন কিন্তু তাঁর চলার পথ মশূন ছিল না। দেশ গঠনে সহযোগিতার বিপরীতে শুরু হয় বিরুধিতা আর বৈরিতা। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে জাসদ ভাক্তন সৃষ্টি করে দেশের রাজনীতিতে সর্বনাশা আগুন জালিয়ে দেয়।। স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতারা বিভক্তির মাধ্যমে শুরু করে চরম নৈরাজ্য উগ্র হঠকারী স্লোগন ও কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত হয় পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টির সিরাজ শিকদার। রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি দের হত্যা, ব্যাংক লট, থানালুট ও পাটের গুদামে আগুনসহ তারা দেশে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আর বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে চালায় চরম মিথ্যা কুৎসা, প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা। এত কিছু প্রতিকূলতার মধ্যে ও বঙ্গবন্ধু দৃঢ়চিত্তে দেশগড়ার কাজে ব্রতী হন। তিনি প্রতিটি সেক্টরে সংস্কার আর নতুন অবয়বে রূপ দান করেন।

বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টিসহ বাম প্রগতিশীল দলগুলো সে সময় দৃঢ়ভাবে বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ালে তাঁর পক্ষে অরাজগতা দমন অনেক সহজ হতো। তথাকতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বৈরী কর্মকান্ডের সুযোগ নেয় স্বাধীনতা বিরোধী দেশী ও বিদেশী অপশক্তি। অবশেষে প্রাসাদ যড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট নৃশংসভাবে জীবন দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে। পরবর্তীতে বাংলার মীর জাফর খন্দকার মোস্তাক আহমেদকে হঠিয়ে সামরিক ফয়মানে ক্ষমতা দখলকরে ১৫ আগষ্টের নেপথ্য নায়ক জিয়াউর রহমান। শুরু হয় হত্যা-কুর রাজনীতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর একই কায়দায় ক্ষমতা দখল করে সেনা শাসক হুয়েইন মোহাম্মাদ এরশাদ। চরম বৈরীতার মধ্যে চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি সে সময় নেতাদের মধ্যে দেখা দেয় অনৈক্য ও বিভেদ এ পর্যায়ে ১৯৮১ সালে ইডেন কাউন্সিলে দিল্লিতে নির্বাচিত মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের ঐকের প্রতীক হিসেবে সভানেত্রী নির্বাচিত করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষনার এক পর্যায়ে নৌকা প্রতীকের বিজয় ১০০ আসন অতিক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথে টনক নড়ে সামরিক জান্তা এরশাদ সাহেবের। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত ভেবে তিনি মধ্য রাতে হঠাৎ ফলাফল প্রকাশ বন্ধ করেন। নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিয়ে আওয়ামী লীগ তথা নৌকা প্রতীককে হারানো হয়। ১৯৯৬ সালে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে জোট সরকার গঠন করে। ২০০১ সালে লতিফ সাহেবের তত্ত্বাবধায় সরকার ষড়যন্ত্র করে আওয়ামী লীগ তথা নৌকা প্রতীকে হারিয়ে দেয়। শুরু হয় সাম্প্রদায়িকতা, নির্যাতন আর প্রতিহিংসার রাজনীতি জীবন দিতে হয় অগনিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীর। নিপিড়ন আর নির্যাতন করে অকুতোভয় শেখ হাসিনাকে দমানো যায় নি। তিনি সব রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে মানুষের ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যান। ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ব্যালট বিপ্লবে নৌকা প্রতীকের বিশাল নিরুঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা দিয়েছেন কিন্তু অর্থ নৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি তাঁকে সে সুযোগ দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন, জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজের সূত্রধরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নৌকা কের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা দীর্ঘ ১২ বছর শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকায় উন্নত ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ার লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (২০০১-২০১৫) এম ডি জি অর্জনে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে প্রণীত প্রেক্ষিত পরিকল্পনা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম দীর্ঘমেয়াদী সুস্পষ্ট কর্মসূচী যা উন্নয়ন অথযাত্রায় পথ নির্দেশক `রূপকল্প-২০২১` নামে অভিহিত। এদিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০১৬-২০৩০ অর্জনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ নতুন প্রেক্ষিত পরিকল্পনা `রূপকল্প-২০৪১` প্রণয়ন করেছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে ইতোমধ্যে ফাস্টট্র্যাকভূক্ত ১০টি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দ, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, ঢাকা দ্রুত গণ পরিবহন মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রাম কর্ণফুলী ট্যানেল ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন স্থাপন। এছাড়াও সারাদেশে ৪ লেন রাস্তা সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। "অপ্রতিরোধ্য অন্নযাত্রায় বাংলাদেশ আজ পৃথিবীতে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৪ নভেম্বর জাতীয়সংঘে এসডিজি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১০ টি মেগা প্রকল্পসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের প্রায় শেষ ধাপে, এগুলো বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হবে ইনশাআল্লাহ তবে আমরা লক্ষ্য করেছি স্বাধীনতার প্রারম্ভে বঙ্গবন্ধুর দেশ পুনর্গঠনের পথ যেমন মসৃন ছিলনা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে ধারবার গতি রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে তেমনি বঙ্গবন্ধুর কন্যার উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথও মসৃন নয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বারবার তাঁর জীবনের উপর হুমকি এসেছে এবং ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে তাই অতি সাবধানে সতর্কতার সাথে এগুতে হবে।

নৌকা প্রতীক নির্বাচন বঙ্গবন্ধুর এক অনদবা সৃষ্টি কারণ সংগ্রামের প্রতীক নৌকা, অনুপ্রেরনার প্রতীক নৌকা, বিজয়ের প্রতীক নৌকা, স্বাধীনতার প্রতীক নৌকা এবং গণ মানুষের হৃদয়ের প্রতীক নৌকা। ১৯৭০ সালে থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচনে ষড়যন্ত্র ছাড়া নৌকাকে হারানো যায়নি। সাম্প্রতিক কালে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় নৌকাকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে চেয়ারম্যান পদে নৌকা প্রতীক নির্ধারণ করায় স্থানীয় তৃণমূল পর্যায়ে দলের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও সংঘাত দেখা দিয়েছে এর উন্নতম কারণ সঠিক ভাবে প্রার্থী নির্বাচন না করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে চাটুকার, মোসাহেব ও অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। উপজেলা কমিটির সাথে কোন আলোচনা না করে সংসদ সদস্যগণ নিজে ইউনিয়ন কমিটির সভাপতির ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা নিয়ে নিজের মনগড়া তালিকা জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর নিয়ে কেন্দ্রে সুপারিশসহ জমা দিচ্ছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে জেলা কমিটির সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদককে ও অবজ্ঞা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মনোনয়ন বাণিজ্য ও নিজের পকেটের প্রার্থী নির্বাচন করার প্রবনতা এর অন্যতম কারণ ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। অধিকাংশ এমপিগন নিজেদের স্বার্থ ও জেদ বহাল রাখার জন্য অনেক সময় দলীয় প্রার্থীর বিরোধীতা করছেন আবার কোন কোন সময় বিদ্রোহী প্রার্থীদের মদদ দেয়ার ফলে দলের অভ্যন্তরে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে।

আমার ধারণা প্রতীক ছাড়া উন্মুক্ত প্রতিযোগীতার সুযোগ দেয়া হলে মেধাবী, জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের সনাক্ত করা সহজ হবে এবং বিভেদ ও সংঘাত নিরসন করা সম্ভব হবে। যুগযুগ ধরে মানুষের মনিকোঠায় নৌকা প্রতীকের আবেদন ছিল বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যৎ ও থাকবে। মেধাবী, ত্যাগী ও জনপ্রিয় প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হলে নৌকার বিজয় হবেই হবে ইনশাআল্লাহ।



মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা


Thumbnail ওমিক্রন, ওমিক্রনের ভবিষ্যতের বিকল্প এবং আমরা

আমদের দেশে এখন গ্রীষ্মকাল, প্রচন্ড গরম, তার সাথে মাঝে মাঝে বর্ষাকালের বৃষ্টি যার ফলে কিছু জেলার বাসিন্দারা বিধ্বংসী বন্যা পরিস্থিতিতে দারুন অসুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন! সমস্ত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং বাধা সত্ত্বেও, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দময় মুহূর্ত অনেক আশা এবং অনুপ্রেরণা দিচ্ছে, ঠিক তখন কোভিডের কারণে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে হাতে গুনা অল্প কিছু লোক সংক্রামিত হওয়া এবং কোনো মৃত্যু না দেখে, ভাবতে শুরু করেছিলাম যে হয়ত আমরা কোভিড-১৯, মহামারীর প্রাদুর্ভাবের পর থেকে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দারুন ভোগান্তির পর কোভিডকে আমাদের পিছনে ফেলে আসতে পেরেছি। আর বার বার কোভিডের "নতুন তরঙ্গের" কারনে কোভিড সংক্রামিত মানুষের এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার কথা সম্ভবত কেউ আর শুনতে চায়নি। কি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হল সাম্প্রতিক বাংলাদেশের তথ্য ইঙ্গিত করছে ওমিক্রন ভেরিয়েন্ট, BA.4 এবং BA.5-এর সাবলাইনেজ, সংক্রমণ বিশ্বজুড়ে অন্যান্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও একটি নতুন তরঙ্গ শুরু করেছে।

আজকাল এখন আর কোভিডের তথ্য সংবাদপত্র বা টেলিভিশন সংবাদের বড় শিরোনাম নয়, মহামারীটি আর সংবাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছে না যেভাবে কিছুদিন আগেও তা করেছিল, তবুও আমরা কোভিড নিয়ে কোথায় আছি এবং আমাদের কী করা দরকার তা নিয়ে জরুরিভাবে আলোচনা আর মূল্যবান সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আমাদের আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয় বরং নতুন তরঙ্গের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের জাতীয় কৌশল কী হওয়া উচিত সবাই বসে তা নিয়ে আলোচনা করা আর জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। আজ ২৮শে জুন সরকার ২০৮৭ জনের সংক্রামিত হওয়ার এবং ৩ জনের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। তাই বলে আতঙ্কে, আমাদের তাড়াতাড়ি এবং ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সুসংবাদ, ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলি খুব একটা গুরুতর নয়, তবে সমস্যা হল ওমিক্রনের এই বৈচিত্রগুলির লোকেদের পুনরায় সংক্রামিত করার সক্ষমতা রয়েছে, এমনকি যারা পূর্বে ওমিক্রনের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন, বা যারা সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছেন বা যারা বুস্টার ডোজও পেয়েছেন তারাও সংক্রামিত হতে পারেন। ফাইজার ভ্যাকসিনের পর পর তিনটি ডোজ পাওয়ার পরেও আমি খুবই হালকা দুই দিনের লক্ষণগুলি সহ ওমিক্রনে সংক্রামিত হয়েছি এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছি। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে "হার্ড ইমিউনিটি" (যেখানে পর্যাপ্ত লোকদের টিকা দেওয়া হয়েছে বা যারা ইতিমধ্যে সংক্রামিত হয়েছে সেখানে আরও সঞ্চালন বন্ধ করা জন্য প্রাকৃতিক অনাক্রম্যতা) পৌঁছানো সম্ভবত অসম্ভব। সাংহাই এবং বেইজিং শহরে চীনা কর্তৃপক্ষের অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত লকডাউনের পরেও ওমিক্রনের বিস্তার বন্ধ করতে সেখানে অসুবিধার কথা আমাদের ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার জন্য বিবেচনা করতে হবে।

যদিও ইদানিং বাংলাদেশে কোভিড রোগের দ্রুত সঞ্চালন উদ্বেগের কারন হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে আশ্বাসের বিষয় হল কোভিডের মুখোমুখি এবং যুদ্ধ জয়ে আজ আমাদের কাছে মোতায়েন করার জন্য প্রচুর বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং সরঞ্জাম রয়েছে। এছাড়াও, গবেষণা বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে ওমিক্রন প্রকৃতপক্ষে হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে ডেল্টার চেয়ে হালকা। বেশিরভাগ মানুষের জন্য, কোভিড-১৯ মৌসুমী ফ্লু থেকে, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলিতে, কম প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। ডেল্টার তুলনায় ওমিক্রনের তীব্রতা হ্রাস পেয়েছে, কারণ সফল টিকা দেওয়ার পরে বেশিরভাগ মানুষ উচ্চ মাত্রার অনাক্রম্যতা অর্জন করেছে। তবে, বিপুল সংখ্যক লোক সংক্রামিত হওয়ার কারণে এবং এর দীর্ঘমেয়াদী বিরূপ পরিণতি হওয়ার পরিনিতি, সফল আর সময় মত এর পরিচালনা, চিকিত্সা যত্নের প্রাপ্যতা এবং বিশাল ব্যয় সম্পর্কে আমাদের এখনি নজর দেওয়া দরকার।

অবশ্যই, এই রোগের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘকালের নেতিবাচক স্বাস্থ্যের ফলাফলের ক্রমবর্ধমান সংখ্যার কথা বিবেচনা করে আমাদের সকলের এবং সরকারের উচিত হবে বারবার কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত হওয়া এড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। বড় চ্যালেঞ্জ হল জীবন ও জীবিকার মধ্যে আমরা কতটা বা কিভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি এবং কি ভাবে কোভিডকে সম্পূর্ণরূপে এড়াতে পারি? মজার বিষয় হল, এই রোগের বাহক আর সংক্রমণের কারন হল আমাদের চেনা জানা অন্যান্য লক্ষণহীন সংক্রামক মানুষ, যাদেরকে আমরা দেখতে, যাদের কাছাকাছি থাকতে, কোলাকুলি করতে, সমাজিকতা বজায় রাখতে বা কাজের কারণে তাদের সম্পর্কে আসাটা আমরা উপভোগ করি। মানুষ হল সামাজিক প্রাণী, এবং তাই অনেক লোকের জন্য আমাদের জীবনের মানের একটি বড় অংশ হল অন্যদের সাথে স্বাধীন ভাবে মেশা - যেমনটি উত্সব, উদযাপন এবং সামাজিক ইভেন্টগুলিতে দ্রুত ফিরে আসা এবং সেই সময় গুলো উপভোগ করা। আর এই কারণেই ভাইরাসটি শীঘ্রই আমাদের ছেড়ে চলে যাবে না, অদূর ভবিষ্যতেও নয়। আমরা ভাইরাসটির সাথে কীভাবে ভালো ভাবে বাঁচতে পারি তা আমাদের শিখতে হবে। কারন একই সাথে আমরা বেঁচে থাকতে এবং আমাদের জীবিকা বজায় রাখতে চাই।

মুখোশ এবং বায়ুচলাচল এখনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা যা আমরা মেনে চলতে পারি। একটি মেডিকেল-গ্রেড মাস্ক পরা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার একটি কার্যকর উপায়, বিশেষ করে জনাকীর্ণ সমাবেশ গুলোয়। আপনি যদি এমন একটি জায়গায় যান, বা চলাচল করেন বা যাএি হন যেখানে অনেক লোক একসাথে আপনার সাথে থাকবে, যা আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপুর্ন সেখানে যাবার আগে হয় আপনার পকেটে বা হ্যান্ডব্যাগে বা ব্রিফকেসে মাস্ক রাখবেন এবং সেখানে থাকাকালিন মুখোশ পরে থাকবেন। এখন থেকে আমরা ভবিষ্যতের বাঙ্গালী সামাজিক আদর্শ হিসাবে এটি গ্রহণ করা শিখতে পারি। আর আমাদের সঠিক এবং পর্যাপ্ত ইনডোর বায়ুচলাচল নিশ্চিত করতে হবে। যাদিও, একমাএ উপযুক্ত বায়ুচলাচল ব্যাবস্থা দ্বারা সংক্রমণের একটি তরঙ্গ বন্ধ করার সম্ভাবনা কম, তবুও আমাদের ইনডোর এবং বদ্ধ পরিবেশে উপযুক্ত পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল নিশ্চিত করা দরকার।

বাংলাদেশের চমৎকার প্রচেষ্টা এবং বিপুল ব্যয়ের জন্য ধন্যবাদ, দেশটি তার বেশিরভাগ জনসংখ্যাকে কার্যকর কোভিড ভ্যাকসিনের দুই ডোজ সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। দেশ সমান সংখ্যক লোককে বুস্টার ডোজ প্রদানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যভাবে ভাল করছে। ভবিষ্যতে বিশেষ করে শুধু মাএ জনসংখ্যার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানুষকে আবারও বুস্টার ডোজ (বার্ষিক হতে পারে) প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সব রকম পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি থাকতে হবে।

কোভিড টিকা দেওয়ার প্রাথমিক অসাধারণ সাফল্য পর, ভবিষ্যতে আবারও কোভিড ভ্যাকসিনের গণ টিকা প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি আরও আলোচনার এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ করব। ধনী দেশ এবং কোম্পানিগুলোর মেধা সম্পত্তি অধিকার (intellectual Property Right) মওকুফ করতে সম্মত হওয়ার অপেক্ষায় থাকাকালীন পুনরায় এই জাতীয় সমস্ত জাতি প্রশস্ত টিকা প্রদানের বহুল ব্যয়ের কৌশলের কার্যকারিতা বিবেচনা করতে হবে। অন্যান্য অবকাঠামোগত বিকাশ অবশ্যই আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হতে হবে। আমি পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি আমঅবকাঠামোগত বিকাশে বিনিয়োগ আমাদের জীবিকা নির্বাহ এবং শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচাতে সহায়তা করবে। আজ সমৃদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলো ধার নিতে এবং প্রচুর পরিমাণে অর্থ কোভিড প্রোগ্রামে ব্যয় করতে পারে কারণ তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমঅবকাঠামো শক্ত ভাবে তৈরি করেছে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান সক্ষমতা নিয়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল অনেক দেশের সেই ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতা আছে এবং তারা সল্প ব্যায়ে তা উৎপাদন করতে পারে, এবং তার ফলে টিকা প্রদানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। আসুন সেই ধনী দেশগুলি এবং সংস্থাগুলিকে দরিদ্র দেশ এবং তাদের নাগরিকদের জীবন আর জীবিকার ব্যয়ে প্রচুর মুনাফা করার বিরুদ্ধে সজাগ হই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং গাভিকে অবশ্যই মেধা সম্পত্তির অধিকার মওকুফ করা নিশ্চিত করতে কঠোর হতে হবে এবং একসাথে কাজ করতে হবে এবং অপ্রাকৃত মুনাফা অর্জনের বিরুদ্ধে তাদের আওয়াজ তুলতে হবে।

যখন আমরা আমাদের নিজস্ব ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি সে সময়ে আমাদের কৌশল কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমি আমার পূর্ববর্তী নিবন্ধে "পরীক্ষা এবং চিকিত্সা" কৌশল গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সমস্ত ফার্মেসি, হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং প্রাইভেট মেডিকেল প্র্যাকটিশনার জায়গা গুলোতে ফাইজার এবং মার্কের অ্যান্টিভাইরাল সরবরাহ করা উচিত, যাতে একটি "চিকিৎসা করার জন্য পরীক্ষা" স্কিম চালু করা যায়, যেখানে কোভিড পজিটিভ পরীক্ষার পরেই, সবাই বিশেষ করে যারা দুর্বল এবং বয়স্ক গোষ্ঠী, যাদের ভ্যাকসিনগুলি কম কার্যকর হতে পারে, তারা কার্যকর চিকিত্সার সেই ওষুধগুলি আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছাড়া পান। এটি কেবল হাসপাতালে ভর্তি হ্রাস করবে না তবে জীবন বাঁচাবে এবং জীবিকা নির্বাহ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখবে।

জনস্বাস্থ্য হল এমন সমস্ত বিষয় যা জনগনকে সুস্থ ও সুখী জীবনযাপন করতে সাহায্য করে। জীবন এবং জীবিকার সুষম কৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেয়। যখন আমাদের "কোভিডের সাথে বাঁচতে পারি" বা “ বাঁচতে পারবো কিনা” সে বিষয়ে জোরালো মতামত প্রকাশ করা অব্যাহত রয়েছে, বাস্তবতা হল এই গ্রহের প্রায় প্রতিটি দেশই, ধনী বা দরিদ্র, উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ এই মহামারী দ্বারা সমানভাবে প্রভাবিত হয়েছে। মানুষ বা দেশ হিসাবে আমরা প্রতিদিন যে সমস্ত সমস্যাগুলির মুখোমুখি হই, অন্যান্য সমস্ত সমস্যাগুলির মধ্যেও এই ভাইরাস বিষয়ে আমরা প্রতিদিন আরও শিখছি এবং এই সংক্রমণ দ্বারা আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বিশাল সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে কার্যকর শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। আমাদের একমত হতে হবে, কোভিড পরিস্থিতি জটিল, এর কোনও দ্রুত এবং সহজ প্রতিকার নেই। না, আমরা এখনও কোভিড-১৯ সমাধান করি নি, তবে আমরা এই রোগটি পরিচালনা করতে আরও চৌকস এবং আরও ভাল হয়ে উঠছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষ দূত ডাঃ ডেভিড নাভারো কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে বলেছেন: “এখন আমাদের অনেকের জন্য, কোভিড-১৯ এর অসুস্থতা জীবন হুমকির পরিবর্তে একটি সাধারন অসুবিধার কারণ হবে, তবে মনে রাখবেন, কিছু লোক বিশেষত দুর্বল, যারা অন্যান্য সহ-অসুস্থতার সাথে বসবাস করছেন এবং এখনও টিকা নিতে অস্বীকার করছেন বা কোন কোভিড ভ্যাকসিন পাননি, কোভিড এখনও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।”

আসুন কোভিড নিয়ে বাঁচতে শিখি, মাস্ক ব্যবহার করি, যত সম্ভব ভিড়ের পরিবেশ এড়িয়ে চলি, যখন আমাদের কোভিডের লক্ষণ থাকে, অবিলম্বে পরীক্ষা করি এবং যদি আমাদের ইতিবাচক পরীক্ষা করা হয় তবে নিজেকে আলাদা করি, মানুষকে আমাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করি। আসুন জাতীর আর আমাদের প্রজন্মের উন্নত ভবিষ্যৎ আর জীবন আর জীবিকার উন্নতির জন্য এক সাথে কাজ করি। আমরা একটি গর্বিত জাতি এবং আমরা বারবার প্রমাণ করেছি যে আমরা এটি করতে পারি।

(এই নিবন্ধটি অন্যান্য প্রকাশনাগুলির সহায়তায় প্রস্তুত করা)


ওমিক্রন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

রাজনীতি হোক গণমুখী, সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্যপূর্ণ


Thumbnail

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির পরদিন সন্ধ্যায় ফেসবুকে আমি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। '২৫ জুন পর্যন্ত হরতাল বা নাশকতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না!' দেশের সমসাময়িক রাজনীতির ধারা হিসাব করলে এমন সম্ভাবনা আসলেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তারপর কি হলো? ৫ জুন পাবনার বেড়ার কিউলিন ইন্ডাস্ট্রি। ৬ জুন রাজধানীর বছিলার জুতার কারখানা। ১০ জুন রাজধানীর নর্দ্দা এলাকায় তুরাগ পরিবহন। ১১ জুন মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটের ফেরি। একই দিনে মৌলভীবাজারে পারাবত এক্সপ্রেসের তিনটি বগি। ১২ জুন রাজশাহী স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা খুলনাগামী সাগরদাঁড়ি আন্তঃনগর ট্রেন। একই দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক চিকিৎসকের রুম। ২০ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক। সবখানেই আগুন। সব কি দুর্ঘটনাবশত লেগে যাওয়া আগুন? কই! স্বাভাবিক সময়ে তো এত আগুন লাগে না! নাকি এটি প্রতিহিংসার আগুন! ব্যর্থতার আগুন! বুকে জ্বলা আগুন! হিসাবের আগুন! খোদ সরকারপ্রধান এসব আগুনের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, 'আমাদের কাছে তথ্য আছে। যারা পদ্মা সেতুর বিরোধিতাকারী তারা এমন কোনো ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটাবে যাতে আমরা ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করতে না পারি'।

আগুনের পাশাপাশি গতানুগতিক বচন অব্যাহত রয়েছে। এসব ফালতু বচন আগেও ছিল। "পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখাচ্ছে সরকার। কিন্তু পদ্মা সেতু আওয়ামী লীগের আমলে হবে না। এ সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে। এ সেতুতে কেউ উঠবেন না। অনেক রিস্ক আছে।" এসব বচন নিয়ে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছিল সে সময়। তখনো দৃশ্যপটে এসেছিলেন মির্জা ফখরুল সাহেব। সাফাই গাইলেন দেশনেত্রীর পক্ষে। তিনি বললেন, দেশনেত্রী ঠিক বলেছেন। তিনি ভুল বলেননি। দেশপ্রেমিকের মত কথা বলেছেন। ‘একটা ভ্রান্ত ও ভুল ডিজাইনের ওপরে পদ্মা সেতু নির্মিত হলে সেটা টিকবে না। তোমরা এখনো এলার্ট হও, চেঞ্জ দ্য ডিজাইন'। এসব পুরনো বচন। গতানুগতিক ধারায় আরো অনেক বচন যুক্ত হয়েছে, হচ্ছে। বিএনপি'র মির্জা সাহেব বললেন, "পদ্মা সেতুর প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাও একদিকে না, দুইদিকে।" অথচ বাস্তবতা হলো ২০০১ সালের ৪ জুলাই তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব মহিউদ্দিন খান মোহন এক নিবন্ধে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। মির্জা সাহেবের কি দরকার ছিল এমন একটি ভুল তথ্য দেওয়ার। অজ্ঞতাবশত যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে পারতেন। আর যদি সজ্ঞানেই বলে থাকেন, তাহলে উনার উচিত ছিল সরকারি নেতাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে তথ্য প্রমাণাদিসহ জাতিকে জানানো। তিনি কোনটাই না করে নিজের দেয়া বচনকে 'ফালতু' প্রমাণ করলেন। জনগণকে ধোঁকা দিলেন, বোকা বানালেন।

সম্প্রতি মির্জা সাহেব বলেছেন, "পৃথিবীর কোনো দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু নেই। পদ্মা সেতুর প্রথম ফিজিবিলিটি রিপোর্ট করে বিএনপি ১৯৯৪/১৯৯৫  সালে। সেই সময় ফিজিবিলিটি রিপোর্ট অনুসারে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। আর এখন সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার হিসাব চাই।" তিনি নিশ্চয়ই জানেন, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদীর পরে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি খরস্রোতা নদী। বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদী পানি নিঃসরণ করে সাড়ে ৭ লাখ কিউমেক। যখন নদীতে প্রবাহিত পানি প্রতি সেকেন্ডে ঘনমিটারে পরিমাপ করা হয় তখন তাকে 'কিউমেক' বলে। ঘনফুটে পরিমাপ করা হলে তাকে 'কিউসেক' বলে। আটলান্টিকের প্রবেশদ্বারে আমাজনের সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ৩ লক্ষ ৪০ হাজার কিউমেক। তার মানে আমাজনের দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ পানি পদ্মা নদী নিঃসরণ করে বর্ষা মৌসুমে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পদ্মার চেয়ে আমাজন কেন বেশি খরস্রোতা। আমাজন নদী সারা বছর প্রায় একই গতিতে পানি নিঃসরণ করে। গড় ২ লক্ষ ৩০ হাজার কিউমেক। পক্ষান্তরে বর্ষার পদ্মা নদী বিশ্বের সর্বাধিক  খরস্রোতা হলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নিঃসরণের পরিমাণ মাত্র ১৫ হাজার কিউমেক। তাতে পদ্মা নদীতে পানি নিঃসরণের গড় পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ হাজার কিউমেক। পদ্মা সেতুর স্থলে গত একশ বছরের গড় সর্বোচ্চ পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ২৮ হাজার কিউমেক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বন্যা বা অতিবন্যার সময় সেতু অঞ্চলে পানি নিঃসরণের পরিমাণ ১ লাখ ৬০ হাজার কিউমেক পর্যন্ত বাড়তে পারে। সে চিন্তা মাথায় রেখেই সেতু প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। আমাজন বয়ে গেছে ব্রাজিল, পেরু আর কলম্বিয়ার উপর দিয়ে। প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীতে কোন সেতু নেই। দেড় লক্ষাধিক কিউমেক পানি নিঃসরণের কথা মাথায় রেখে বিশ্বে দ্বিতীয় কোন সেতু এখনো নির্মাণ করা হয়নি। তাই পৃথিবীর আর কোন দেশে এত ব্যয়বহুল সেতু আর কোথায় পাবেন? এত খরস্রোতা নদীতে আর তো কোন সেতু নেই। তাইতো  নদী শাসনে চলে গেছে খরচের তিন ভাগের এক ভাগ।

মির্জা সাহেব বলেছেন, ৯৪/৯৫ সালে সেতু নির্মাণে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। খুব ভালো কথা। ২৭ বছর আগের কথা। পয়লা জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে এক মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৪১ দশমিক ৭৯ টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণ কালে মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৮৫ থেকে ৮৭ টাকা। এবার আসুন মুদ্রাস্ফীতি। ওয়ার্ল্ড ডাটা ডট ইনফো এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভোক্তা মূল্যের মূল্যস্ফীতির হার গত ৩৪ বছরে (১৯৮৭-২০২১) শতকরা ২ ভাগ থেকে সাড়ে এগারো  ভাগে উন্নীত হয়েছে। এ সময়কালে গড় মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল প্রতি বছর শতকরা ৬ দশমিক ৪। সামগ্রিকভাবে, মূল্য বৃদ্ধি ছিল শতকরা ৭২৫ ভাগ। ১৯৮৭ সালে যে পণ্যের দাম ছিল এক শ টাকা, তা চলতি বছরের শুরুতে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ টাকা। ৮৭ থেকে ৯৪ মাত্র ৭ বছরের ব্যবধান। ডলারের মূল্যমান ও মুদ্রাস্ফীতির হার অনুধাবন করতে পারলে ২৭ বছর আগের সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা কেমনে ৩২ হাজার কোটি টাকা হলো সেটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার প্রয়োজন আছে কি? সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য গড়পড়তা কথা না বলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিন। কোথায় কত পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে বলুন। তাতে আমাদের মত আম জনতার বুঝতে সুবিধে হয়।

বিএনপি'র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা তো সংসদে ঐকিক নিয়ম শেখালেন। কিলোমিটার প্রতি সেতুর খরচ দেখালেন। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তাহলে খরচ কেন বেশি? সব কি আর ঐকিক নিয়মে চলে? সেতুর ডিজাইন দেখুন। প্রস্থ দেখুন। নদীর গতি-প্রকৃতি দেখুন। পাইলিং, পিলার, স্প্যান দেখুন। ভূপেন হাজারিকা সেতু একতলা সেতু। পদ্মা সেতু একটি দ্বিতল সেতু। ভুপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে নদী শাসন করতে হয়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণে শুধুমাত্র নদী শাসনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুতে বসানো হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম পাইল। সর্বোচ্চ ১২২ মিটার গভীর। যে হ্যামার ব্যবহার করা হয়েছে সেটি বিশ্বে সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। হ্যামারের জন্য নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে বহুগুণে। ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ক্যাপাসিটি মাত্র ৬০ টন। আর পদ্মার? ৮ হাজার ২০০ টন। ভূপেন হাজারিকা থেকে ১৩৬ গুণ বেশি। ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতিটি পিলারের ওজন ১২০ টন। আর পদ্মার  ৫০ হাজার টন। ভূপেন হাজারিকা সেতু থেকে পদ্মা সেতুর খরচ কেন বেশি - এটা বোঝার জন্য কি আর প্রকৌশলী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে?

সীতাকুণ্ড ট্রাজেডির সময় চট্টগ্রামবাসী সহমর্মিতার নিদর্শন দেখিয়েছে। আপামর জনসাধারণ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মন্ত্রীরা গেলেন ঘটনাস্থলে, হাসপাতালে। অথচ ক্ষমতার বাইরের বড় বড় রাজনীতিবিদরা গেলেন না সেসব জায়গায়। তাঁরা অফিসে বসে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখিয়ে গেলেন। বড় বড় কথা বলে গেলেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর হলেন। চট্টগ্রাম না হোক, ঢাকার বার্ন ইউনিট এ যেয়ে কজন রোগী দেখে, তাঁদের সাথে কথা বলে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে টিভি ক্যামেরায় চেহারা দেখতে পারতেন। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তো এমন ছিল না। দুদশক আগেও তো সব রাজনৈতিক দল এমন দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সহমর্মিতা, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত। প্রতিযোগিতা হত সহযোগিতার। দুদশক আগের সেই সহমর্মিতার রাজনীতিতে যেন পচন ধরেছে। বিরোধী রাজনীতি যেন দলীয় কার্যালয়ের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। জনমুখীতা নেই। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনার বন্যার কথাই ধরুন। প্রধানমন্ত্রী গেলেন। মন্ত্রীরা যাচ্ছেন। খোঁজ খবর নিচ্ছেন। সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনগুলো রয়েছে মাঠে, পানিতে, ত্রাণ তৎপরতায়। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোথায়? আবারো সেই অফিসে। টিভি ক্যামেরার সামনে। সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করুন। মাঠে থেকে করুন। বন্যার পানিতে দাঁড়িয়ে করুন। জনগণের পাশে থেকে করুন। ত্রাণ দিন, আর সমালোচনা করুন। সে সমালোচনা হোক যুক্তিপূর্ণ, তথ্য সহকারে। দেশবাসী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান পচন আর দেখতে চায় না।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

একটুখানি ইতিহাস

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ২৬ Jun, ২০২২


Thumbnail একটুখানি ইতিহাস

আজ সূর্যোদয়ের অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠি। কর্মহীন থাকার কারনে আমি এখন কোনো রুটিনের মধ্যে বাঁধা নেই। মনেই পড়ছে না, শেষ কবে এত ভোরে উঠে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। ড্রেস আপ সেরে তাড়াতাড়ি নিচে নামি। আমার প্রিয় ও অনুজ সহকর্মী জিল্লুর রহমান চৌধুরী আমার জন্য একটি গাড়ি পাঠান। গাড়িতে পা রাখতেই দেখি, আমার অসুস্থ চালক এসে হাজির। তাৎক্ষণিক মত পাল্টিয়ে নিজের গাড়ি এবং ড্রাইভারকেই নিই। শর্দি জ্বরে সে তিনদিন অনুপস্থিত ছিলেন। বসেই বললাম, চল মাওয়া ঘাটে যাব। হানিফ উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে ট্রাফিকহীন ও টোলমুক্ত রাস্তা পেয়ে অসংখ্য সরকারি গাড়িকে অনুসরণ করে চলেছি। আষাঢ় মাস। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের বিচ্ছিন্ন আনাগোনা। গত ক'দিনের টানা বৃষ্টিতে সিক্তস্নাত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। সকালের রৌদ্রময় উজ্জ্বল আভায় রাস্তার দু'পাশের গাছপালা ঝলমল করছে। আহা! কী নয়নাভিরাম ও নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতন। আমি কী সড়ক পথে জেনেভা থেকে জুরিখে যাচ্ছি? অন্য কোনো সহযাত্রী না থাকায় চালককেই বললাম, দ্যাখো তো খোরশেদ, এটা কী আমাদের চিরকালের চিরচেনা বাংলাদেশ? নাকি ঢাকার অদূরে নতুন কোনো শহর হয়েছে? বিস্ময়কর হলেও সত্য, আজ পুরো পথটাই পদ্মা সেতু হয়ে অপরূপভাবে সেজে আছে। আসলেই ইউরোপ, আমেরিকার সুদীর্ঘ হাইওয়ের মতন এক মসৃণ সিল্কি পথ পাড়ি দিচ্ছি। আমরা পোস্তগোলা ব্রীজ, কেন্দ্রীয় কারাগার, আবদুল্লাহপুর, হাসাড়া, শ্রীনগর হয়ে পদ্মাব্রীজ টোলপ্লাজা অবধি মাত্র পঁয়ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে যাই। 

* মঞ্চের গায়ে খচিত শ্লোগানটা আমার নজর কাড়ে। 'আমার টাকায় আমার সেতু, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু'। এ উদ্বোধনীকে কেবল একটি জাতীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে হবে না। আজ থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও একটি দেশের সক্ষমতার জ্বলন্ত প্রমাণ এবং সামর্থ্যের ইতিবাচক মেসেজ। বলা যাবে না, মহা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন, তবে সুন্দর গোছানো ও বাহুল্য বর্জিত অনুষ্ঠান ছিল। জানা যায়, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যা ৩৫০০ জন। অনুষ্ঠানে গিয়ে মনে হয়েছে, সেতুটি আজ কোনো বক্তৃতার বিষয় হয়ে উঠেনি বরং গভীর আগ্রহ ভরে অপেক্ষমান মানুষের দেখার বস্তুতে পরিণত হয়েছে। কথা বলেছেন মাত্র তিনজন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সেতু মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আজ বাঙালিরা নিজের মাতৃভূমিতে বসে দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী পদ্মার ওপর নির্মিত অভূতপূর্ব এক স্থাপনাকে অবলোকন করছে। এ উৎসব মুখরিত পরিবেশকে অনেকে দ্বিতীয় বিজয় দিবস বলে আখ্যায়িত করেছেন।  

* দেশে সিলেট অঞ্চলে বন্যা আছে। মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের হারও পুনঃবৃদ্ধি পাচ্ছে। টেস্ট করালেই পজিটিভ পাওয়া যাচ্ছে। শনাক্তের হার ১৪.১৮ হয়েছে। যা মধ্যে শূন্যের কাছাকাছি নেমে গিয়েছিল। জানা যায়, গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত হয়েছে ১৬৮৫ জন। কাজেই পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী স্থলে যাওয়ার জন্য করোনা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। সিভিল সার্ভিসের সদ্য সাবেক এবং বর্তমান সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সংক্রমণের কারনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবও যোগদান করতে পারেননি। তবে অনুষ্ঠানটি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপন করা হয়েছে। সেতু বিভাগ কর্তৃক মাস্ক, স্যানিটাইজার, লোগো সম্বলিত কোটপিন এবং স্যুভেনির ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। মন্ত্রী, এমপি, রাজনীতিক,শিক্ষাবিদ, আমলা, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সংস্কৃতি কর্মী, অভিনেতা প্রায় সকলই আমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন বলে মনে হয়েছে। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে উপবিষ্ট হয়ে ডাঃ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর অংশ নেয়া চোখে পড়ার মতো ছিল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও অনেকটা ঘুরে তাঁর পাশে আসন পান। করোনা পরবর্তী বিরতিতে অনেক প্রবীন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হওয়া ছিল বাড়তি প্রাপ্তি। গাড়ি পার্কিং দূরে এবং কঠোর নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় বৃক্ষহীন, ছায়াহীন স্থানে দাঁড়িয়ে মধ্যাহ্ন রোদের প্রখরতায় দাহ হয়েছেন অনেক অশীতিপর অতিথি। 

* তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, বিগত ২০০১ সালের ৪ জুলাই এ সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে সেতুর কাজ শুরু হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দুই স্তর বিশিষ্ট। উপরের স্তরে চার লেনের সড়ক পথ ও নিচের স্তরে রয়েছে একটি ডুয়েলগেজ রেলপথ। মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিমি, পিলার নদীতে ৪০টি, উচ্চতা ১৩.৬ মিটার, প্রস্থ ২১.৬৫ মিটার, এ্যাপ্রোচ রোড মাওয়া-জাজিরা, নদী শাসন দু'পাড়ে ১৪ কিমি, পানির স্তর থেকে উচ্চতা ৬০ ফুট, জনবল ৪ হাজার। পৃথিবীতে দক্ষিণ আমেরিকার  আমাজনের পরে সবচেয়ে খরস্রোতা নদী নাকি পদ্মা। এ সেতুর ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা সরাসরি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগের আওতায় এসেছে। সরাসরি উপকৃত হবে ৩ কোটি মানুষ। দুই তীরে গড়ে উঠবে আধুনিক শহর। সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ হাজার যানবাহন চলবে। টোল আদায় হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। এ সেতুর কাজ সমাপ্ত হয়েছে সাড়ে সাত বছরে। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে রেল যোগাযোগও চালু হবে। এ সেতু নির্মানে ৪টি নতুন বিশ্বরেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সারা বিশ্বে প্রথমবারের মতন সম্পাদন করা হয়েছে এমন ৩টি বিষয় এবং বাংলাদেশে ৭টি নতুন বিষয় প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছে। সেতুর নির্মান ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। 

* ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে সংযুক্তি ও সমৃদ্ধির  জনপদ। বিচ্ছিন্নতার অযুহাত এবং অবকাশ থাকবে না আর। সূর্যাস্তের আগেই কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত একাকার হবে গোটা দেশ। রাজধানী কিছুটা হলেও চাপমুক্ত, ভারমুক্ত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হতে পারে। এবং রেললাইন চালু হলে সাধারণ মানুষের নিত্য যাতায়াত হবে অধিকতর সুবিধাজনক। 

* এদেশে নদী হিসেবে পদ্মা সবসময়ই আলোচিত হয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশে এ নদীর দৈর্ঘ ১২০ কিমি ও গড় প্রস্থ ১০ কিমি। ভাষায়, শিল্পে সাহিত্যে, গানের বাণীতে, গীতিতে পদ্মার ঢেউ এসেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মানিক বন্দ্যােপাধ্যয় বা অন্নদাশঙ্কর রায় সবাই পদ্মার রূপ- রস, প্রমত্ততা,ভাঙা-গড়া আর জেগে ওঠা চরের সিকস্তি পয়স্তি কাহিনি চিত্রায়নের অনুপম কারিগর ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান শ্লোগান মানে পদ্মা দিয়ে শুরু-- 'তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা'। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সেতু অতিক্রম করলেই নতুন প্রশাসনিক বিভাগের নামও পদ্মা। তাই অনুষ্টান স্থল থেকে ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম, সেতুটি কেবল বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নয়, পদ্মাও যেন আমাদের ভাগ্যবতী মা। 

১১ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

পদ্মা সেতু   ইতিহাস  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দেবে পদ্মা সেতু


Thumbnail

অনেকেই বলেছিলেন- সম্ভব না। ভাঙা শব্দ দুটি জোড়া লাগিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন- সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা আজ জাতির সামনে উপস্থিত। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। যার জন্যে অধীর আকুল আগ্রহে গোটা জাতি। বহুল প্রতীক্ষা, কাঙ্ক্ষিত, অনেক সাধনার পরে- ঠিক কোন বিশেষণে জাতির এই মাহেন্দ্রক্ষণটিকে উপস্থাপন করা সম্ভব বুঝতে পারছি না। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় একটি কাজ করে দেখানো একইসঙ্গে আনন্দের, গর্বের এবং সামর্থ্য প্রমাণের।

খুবই কী সহজবোধ্য ছিল নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণাটি? মোটেও না। তবে মনের জোরে অনেক অসাধ্য সাধন হয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন নিজেদের টাকায় এই সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন, তখনও অনেক ‘যদি’ ‘কিন্তু’তে ঘুরপাক খাচ্ছিল জাতির এই স্বপ্নের সেতুটি। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার তেজদীপ্ত অঙ্গীকার জাতিকে এই অমূল্য উপহার এনে দিয়েছে। তাও খুব অল্প সময়ে। এমন এক সময়ে সেতুটির নির্মাণ কাজ দুর্বার গতিতে এগিয়ে গেছে, যখন করোনাভাইরাস মহামারীতে স্থবির গোটা পৃথিবী। অথচ এই কঠিন প্রতিবন্ধকতাও পদ্মার সামনে  দাঁড়াতে পারেনি বাধার দেয়াল হয়ে। 
একেবারে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে আপাদমস্তক আস্ত সেতুটি। পদ্মা সেতুর গায়ে তুলির শেষ আঁচড়টি দেয়ার পর গত সপ্তায় জ্বলে ওঠে দুই পাশের বাতিগুলো। এতেই যেন জেগে উঠল প্রাণের সঞ্চার। তিল তিল করে গড়া আশার চিলতে যেন ধপ করেই উড়তে শুরু হলো এবার। এক সময়ের অন্ধকার পল্লী আজ জ্বলজ্বল করছে পদ্মার আলোয়। আলোকিত হয়েছে চারপাশ। ডানা মেলতে শুরু করেছে দেখা অদেখা উজ্জ্বল স্বপ্নগুলো। পদ্মা সেতুর ছবি দেখে মনে হয় যেন শিল্পীর গাঁথুনি দিয়ে একটু একটু করে বানানো একটি ক্যানভাস। এটি কেবল একটি সেতু নয়, আমাদের সামর্থ্যরে স্মারক হয়ে থাকবে। একইসঙ্গে বিশ্বকে একটি বার্তাও দিয়ে গেল, বাঙালি বরাবরের মতোই অদম্য। আমরা চাইলে সবই পারি।

তবে এই অসাধ্যটি সাধন হতো না, যদি না জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীর সামনে এই অঙ্গীকার করতেন। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, কিভাবে অজেয়কে জয় করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতি বাঙালির জাতির সামনে বহুকাল প্রেরণা হয়ে থাকবে। 

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অনেকগুলো জেলার মানুষ এ প্রথম সড়কপথে পদ্মা পারাপার তথা রাজধানীর সঙ্গে যোগসূত্র রচনা করতে পারবে। শরীয়তপুরের মানুষ নিশ্চয়ই কখনও ভাবেনি উত্তাল প্রমত্ত পদ্মার ঢেউয়ে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়াও নদী পারাপারের বন্দোবস্ত হবে কোনো এক কস্মিনকালে!

পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাবে, যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বঙ্গবন্ধু সেতু, যাকে ঘিরে উত্তরবঙ্গে শিল্প বিপ্লব ঘটেছে। এই সেতুর ফলে উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন হয়েছে তা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় ২% অবদান রেখেছে।

পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এ ধরনের অবদান অনুমান করা হয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যমুনার চেয়ে পদ্মা সেতুর অবদান বেশি হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পদ্মা সেতুর পথ ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ম্যানুফ্যাকচারিং ব্যবসা, আরএমজি, অ্যাসেম্বলিং প্লান্ট, স্টোরেজ সুবিধাসহ অনেক ছোট-বড় শিল্প গড়ে উঠবে। এডিবির হিসাব অনুযায়ী, এই সেতুকে ঘিরে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আঞ্চলিক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। জাইকার হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ভ্রমণের সময় ১০ শতাংশ হ্রাস জেলা অর্থনীতিকে ৫.৫ শতাংশে উন্নীত করবে, যা এই অঞ্চলের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৭ শতাংশ বৃদ্ধি করবে।

শুধু কতগুলো জেলার মানুষ সড়ক পথে ঢাকা ছোঁবার আনন্দ পাবে তা নয়, জাতীয় অর্থনীতিকেও অনেকখানি চাঙা করে তুলবে এই সেতু। এই যেমন যশোরের গদখালীর ফুল, যা বিদেশেও রপ্তানি হয়; অথচ ঢাকায় পৌঁছানোই ছিল বাস্তবতার প্রেক্ষিতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এখন খুব সহজে ঢাকায় পৌঁছে যাবে ভোরে ফোটা ফুলটিও। খরচও পড়বে না আহামরি কিছু। খুলনার মাছ বলুন আর বরিশালের ধান-পান, সবই রাজধানী ছোঁবে কোনো রকমের ঝক্কি ঝামেলা ছাড়াই। এই পণ্য আনা-নেওয়ায় বিশাল একটি ঝামেলা থেকে মুক্তি পাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ, তা সরাসরি ঘুরিয়ে দিবে অর্থনীতির মোড়। বাড়বে জিডিপি। আর গতিশীল হবে অন্তত তিন কোটি মানুষের জীবিকার চাকা।

আজকের এই বিশেষ ক্ষণে সমগ্র জাতির মতো আমরাও আনন্দিত, আহ্লাদিত। আমাদের আনন্দটা একটু বেশিই। কেননা, স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে রয়েছে আমাদের উৎপাদিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী সিমেন্ট এবং বিটুমিন। সেতু নির্মাণে প্রয়োজনীয় সিমেন্টের ৮০ ভাগের বেশি জোগান দিয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ‘দেশ ও জাতির কল্যাণে’ প্রতিপাদ্যে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা বসুন্ধরা গ্রুপ জাতির গর্বের সেতুর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারাটা সীমাহীন আনন্দের।

সেতুটি মসৃণ করতে ভূমিকা রেখেছে বসুন্ধরা বিটুমিন। দেশে উৎপাদিত আধুনিক ও উন্নত গ্রেডের এই বিটুমিন ব্যবহৃত হয়েছে পদ্মাসেতুর সংযোগ সড়কগুলোতেও। বসুন্ধরা বিটুমিনের কারখানা স্থাপনের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের সড়ক খাতে অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দেওয়া। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত নিম্ন গ্রেডের বিটুমিনে সড়ক টেকসই হয় না। ভেঙে যায় নতুন সড়কও। এতে ভোগান্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারকে গুণতে হয় বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা। দেশে বসুন্ধরা বিটুমিন উৎপাদন শুরু হওয়ায় বহুমুখী সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। পদ্মা সেতুর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে এই বিটুমিনের ব্যবহার এর গুণগত মানকেই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

একজন বাণিজ্য সহায়ক নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যা খুবই সহায়ক বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা অন্যান্য দেশের সাথে আমদানি বৈষম্য কমাতে নতুন নতুন উৎপাদনমুখী ব্যবসা অন্বেষণ করছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আরও আশীর্বাদ দরকার যাতে আমদানি সহায়ক শিল্পগুলো দেশীয় উদ্যোক্তাদের দ্বারা সহজে বেড়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, বসুন্ধরাই একমাত্র বাংলাদেশি কোম্পানি, যাদের সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়েছে মূল সেতুর পিলারে। মূল পিলারে আর কোনো দেশি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়নি। এ ছাড়া প্রকল্পের সংযোগ সড়কের কাজ আরো আগে শেষ হয়েছে। পুরো সংযোগ সড়কের কাজ এককভাবে শতভাগ বসুন্ধরা সিমেন্ট দিয়ে হয়েছে। এ ছাড়া জাজিরা ও মাওয়া এই দুই প্রান্তে নদীশাসনের কাজে আমাদের ১৪টি সিমেন্ট সাইলো দেওয়া আছে। এটাও শতভাগ বসুন্ধরা সিমেন্ট দিয়ে হচ্ছে। পদ্মা রেলওয়ে লিংক প্রকল্প যার মাধ্যমে পদ্মা সেতু থেকে যশোর পর্যন্ত রেলপথ তৈরি হচ্ছে সেখানেও এককভাবে শুধু বসুন্ধরা সিমেন্ট ব্যবহৃত হবে। এভাবে দেশের সর্ববৃহৎ মেগাপ্রকল্প পদ্মা সেতুতে চার লাখ টন সিমেন্ট সরবরাহ করে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে বসুন্ধরা সিমেন্ট।

এতসব আনন্দের উল্টো পৃষ্ঠায় দুঃখের গল্পও কম নয়। সেই প্রারম্ভিক ষড়যন্ত্রই কিন্তু শেষ কথা নয়। বরং সেটি ছিল শুরু। এরপর সেতুর একেকটি পিলার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, তার গুজব কল্পনার ডালপালা ছাড়িয়েছে হু হু করে। কোটি কোটি মানুষের আস্থা আর ভরসার এই সেতুটি থামিয়ে দিতে অযুত নিযুত মাস্টারপ্ল্যান ভেস্তে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সার্বক্ষণিক তদারকির কাছে কোনো অপশক্তিই ভিড়তে পারেনি। আমি মনে করি, এই সেতুটি হয়েছে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যার আন্তরিকতার কারণে। অথচ উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশের মানুষ চেয়েছে বলেই শেষপর্যন্ত পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন হয়েছে।’ এই সেতুটিও হয়ে থাকুক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গণমানুষের আস্থা আর ভালোবাসার প্রতীক হয়ে।


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

বিশ্বে শেখ হাসিনা এখন সফলতার প্রতীক, আর বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক


Thumbnail বিশ্বে শেখ হাসিনা এখন সফলতার প্রতীক, আর বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক

বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা আজ সারা পৃথিবীতে সফলতার মূর্ত প্রতীক, তিনি এখন বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক। এটা আজ প্রতিষ্ঠিত, গত এক যুগে বাংলাদেশ পৃথিবীতে মর্যাদার এক আকাশচুম্বী জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশের এই মর্যাদার প্রতীক শেখ হাসিনা, কারণ যে সফলতার কারণে বাংলাদেশের এই মর্যাদা, সেই সফলতার মূল নায়ক তিনি।

শেখ হাসিনার সফলতার গল্প আজ শুধু জাতীয় কিংবা আঞ্চলিক পর্যায়ে নয়, গোটা পৃথিবীতে তাঁর সাফল্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে নেতৃত্ব দেয়া জাতীয় নেতা। অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার মতো সফলতা পাওয়া নেতা পৃথিবীতে বিরল। গত দুই দশকে পৃথিবীর কোন জাতীয় নেতা শেখ হাসিনার মতো এরকম সফলতা দেখতে পারেনি। তাঁর সফলতার গল্প আজ বিশ্ব নেতাদের মুখে মুখে। তাঁর উন্নয়ন কৌশল আজ পৃথিবীর নানা দেশ অনুসরণ করছে। মোটা দাগে বলতে গেলে, শেখ হাসিনা সারা বিশ্বে আজ সফলতার এক প্রতীক। 

রাত পোহালে বাংলাদেশের সর্বশেষ মর্যাদার প্রতীক, বাঙালির স্বপ্নের সেতু, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য পুরো দুনিয়া এখন শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এটা সত্যি, অনেকের মতে পদ্মায় সেতু নির্মাণ বাংলদেশের জন্য এক অসাধ্য কাজ ছিল। তার উপর রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। তাই এই কাজটি বাংলাদেশের কোন নেতা করতে পারবেন- এটি এদেশের অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। অন্যদিকে,  ষড়যন্ত্রকারীরা শেখ হাসিনার শক্তি- সামর্থ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেনি। তারা ভুলে গিয়েছিলো, শেখ হাসিনা বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবের মেয়ে, যে শেখ মুজিব তদানীন্তন বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এবং বিশ্বের পরাশক্তিদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা  নানাভাবে বলে আসছিলো, বাংলাদেশ পদ্মা সেতু নির্মাণের মতো কঠিন কাজটি করতে পারবে না l পুরো পৃথিবীকে অবাক করে দিয়ে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা এই  অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। পিতার মতো শেখ হাসিনাও বিশ্ব মোড়লদের কর্তৃত্বকে  চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ভৌত কাঠামো পদ্মা সেতু নির্মাণ করলেন। শেখ হাসিনা উন্নয়নশীল বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি বিশ্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এই বিশাল কাজটি করতে পারলেন। তাঁর এই কাজের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায়।

বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধির একমাত্র কারণ পদ্মা সেতু নয়। আরও বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আকাশচুম্বী সাফল্য অর্জন করেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ। কৃষি বিপ্লব, পোশাক রপ্তানি, স্বাস্থ্য সেবা, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, দ্রুত সময়ে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, এসডিজি অর্জনে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা চিশ্চিতকরণ, সমুদ্রে অধিকার প্রতিষ্ঠা, তথ্য প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক উন্নয়ন - এসকল ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক সাফল্য দেখিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশ মর্যাদার স্থান করে নিয়েছে। গত একযুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এই সাফল্য দেখিয়ে আসছে। তাই শেখ হাসিনার পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘটনাটি তাঁর নিরবিচ্ছিন্ন সাফল্যের ধারাবাহিকতা l এটি বিচ্ছিন্ন কোন সাফল্য নয়। 

যে আকাশ চুম্বী স্বপ্ন নিয়ে জাতির পিতা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে সেই স্বপ্নকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিলো বাংলাদেশ বিরোধী চিহ্নিত অশুভ শক্তি। তারা ভেবেছিলো, জাতির পিতার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ পথভ্রষ্ট হবে, বাংলাদেশ আর দাঁড়াতে পারবে না। তাদের এই ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নানা কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সেই কমিটমেন্টের সর্বশেষ নমুনা স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ। তাই আজ জাতীয় উদযাপনের এই দিনে জাতির পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই সাফল্য দেখে আজ ভারতের সাবেক একজন সেনানায়ক জেনারেল সুজান সিং উবানের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বের একটি লেখার কথা মনে পড়ছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল উবানের এক গৌরবজনক ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত  তাঁর লেখা বই Phantoms of Chittagong: The "Fifth Army" in বাংলাদেশ  এ উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে বাংলাদেশে কোন যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠেনি। তাঁর লেখায় বাংলাদেশের ভবিষ্যত যোগ্য নেতৃত্বের ইঙ্গিত রয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশ মেধাবী ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিবে। তখন অনেকেই বাংলাদেশকে অনুসরণ করবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও মেধাদীপ্ত নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশের বীরত্বপূর্ণ উত্থান- জেনারেল উবানের প্রায় ৪০ বছর পূর্বের লেখার সত্যতা প্রমাণ করে। 

একজন বাঙালি হিসেবে আজ আমি গর্বিত, আমরা শেখ হাসিনার মতো একজন নেতা পেয়েছি যিনি বাংলাদেশকে আজ বিশ্বে নেতৃত্বের পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন, যিনি বাঙালিকে বিশ্বজয়ের স্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা পিতার মতো জাতিকে মমতা দিয়ে আগলিয়ে রেখেছেন, মহামারী- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও বিপর্যয় সহ সকল বিপদ- আপদ থেকে জাতিকে রক্ষা করে চলেছেন,  দেশকে রক্ষার জন্য পিতার মতো মৃত্যুঝুঁকি কাঁধে নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এই বাংলাদেশ যতদিন বেঁচে থাকবে, কালজয়ী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর নানা যুগান্তরকারী অবদানের জন্য ততদিন তিনি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।


পদ্মা সেতু   শেখ হাসিনা  


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন