ইনসাইড থট

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও কিছু আত্মজিজ্ঞাসা!

প্রকাশ: ০৮:৩২ এএম, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২১


Thumbnail বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও কিছু আত্মজিজ্ঞাসা!

১০ই জানুয়ারি ১৯৭২। বেলা আড়াইটা। আকাশে ঝকঝকে রোদ। কমেট বিমানের চাকা স্পর্শ করল তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে। উপচে পড়া ভিড় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য। তারপর সেখান থেকে সরাসরি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মঞ্চহীন ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে সেদিন স্বাধীন দেশের লাখ লাখ মানুষের সামনে উচ্চারণ করলেন দেশ-মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কথা, অঙ্গীকারের কথা। তখনও মাথার উপর ছিল রোদের ঝলকানি। সেদিন তিনি পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়েছিলেন এই বলে - “…তোমরা আমার লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, মা-বোনদের বেইজ্জত করেছ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছ, কোটি লোককে ভিটেছাড়া করে ভারতে যেতে বাধ্য করেছ- তারপরেও মনের মধ্যে তোমাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পুষে রাখতে চাই না। তোমরা স্বাধীন থাকো, আমাদের স্বাধীনভাবে থাকতে দাও। তোমাদের সঙ্গে সব চুকে বুকে গেছে।…“

শুধুমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এই উচ্চারণকে যদি বিশ্লেষণ করা যায় যেখানে জড়িয়ে রয়েছে এদেশের প্রতি তার অগাধ প্রেম, ভালোবাসা, আবেগ আর ক্ষমা করে দেবার মত মহান সাহসিকতা ও উদারতার বহিঃপ্রকাশ। অথচ এই মহামানব কেই একদিন চলে যেতে হল ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে সিঁড়ির উপর পড়ে থাকল তার রক্তে ভেজা নিস্তার দেহ। কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে একটি লাল সবুজের সোনার বাংলার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিল ঘাতকেরা ভেবেছিল তাকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে তার সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করবে! সেদিন তারা এতোটুকু ভাবেনি হয়তো বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা যায় কিন্তু তার স্বপ্ন কে হত্যা করা যায় না! কখনো সম্ভব নয়!

এই আগস্ট বাঙালিদের কাছে শোকের একটি মাস। আবার অন্যভাবে বলতে গেলে আত্মিক উপলব্ধির একটি মাস। কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমরা হারিয়েছি জাতির পিতাকে। আমরা সেই সাথে হারিয়েছি বঙ্গমাতাকে, ছোট্ট রাসেলকে। হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুর পুত্র-পুত্রবধূ ও তার নিকট আত্মীয় স্বজনকে। তাই এই মাসটি আমাদের আত্মিক উপলব্ধির একটি মাস। কারণ প্রতি বছর এই মাসটি আসলে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। অন্তরাত্মাকে প্রশ্ন করলে সে প্রশ্ন বারেবারে প্রতিধ্বনিত হয়। বাঙালী হিসেবে স্বার্থপরতার কথা, বিশ্বাসঘাতকতার কথা! আমাদের উপলব্ধি করতে শেখায় জাতি হিসেবে আমরা কত অকৃতজ্ঞ! সেদিন জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেও ঘাতকদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনা হয়নি। তাদের হাত এতোটুকু কাঁপেনি। সেদিন তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ভেবেছিল বাংলাদেশকে হত্যা করবে! তবে তারা ভুলে গিয়েছিল একজন বঙ্গবন্ধুকে হয়তো বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করা যায়, পৃথিবী থেকে সরানো যায় কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশপ্রেম, চিন্তা-চেতনা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে কোটি বঙ্গবন্ধুর জন্ম দেয়। যারা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে তাদের ভালোবাসা, সংকল্প আর আশা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে চায় তার দেখানো মতাদর্শে। তাই বঙ্গবন্ধুর কখনো মৃত্যু হয় না, বেঁচে থাকে জন্ম-জন্মান্তর।

পৃথিবীতে এমন নজির খুব একটা নেই বললেই চলে। স্বাধীনতা-পরবর্তী অত্যন্ত অল্প সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে দেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছিলেন দেশের পুনর্গঠনে, সার্বিক টেকসই উন্নয়নে - আমরা যদি শুধুমাত্র তার সেই সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনাগুলোকে বাস্তবায়ন করতে পারি এখনও আমরা দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হব। যার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথেই হাঁটছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশের কোন মানুষ কখনো আশ্রয়হীন থাকবে না। স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন একটি বাংলাদেশের যেখানে গ্রামীণ অর্থনীতি হবে সুদৃঢ়। স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রত্যেকটি মানুষ হবে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রখর, স্বতন্ত্র এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন তার দেশের প্রত্যেকটি মানুষ খাবার পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে। তার ভাষায় “এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন”। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই পথ চলছেন বাংলার মানুষের জন্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। তিনি সেখানে যুক্ত করছেন নতুন মাত্রা।

তবে কথা থেকে যায় আসলে আমরা সবাই কি সত্যিই তার সাফল্যের জয়গান গাইছি সঠিক সুরে? কিংবা সাফল্য গুলোকে ম্রিয়মান করার জন্য অন্য কোনো অশুভ পদক্ষেপ নিচ্ছি কিনা? কারণ এই আগস্ট আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আগেই বলেছি আত্মোপলব্ধি-পরমাত্মার উপলব্ধি এর কথা। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের জাল কিন্তু ঘর থেকেই শুরু হয়েছিল। এ কথা আমাদের মোটেও ভুলে গেলে চলবেনা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সমূলে ধ্বংস করার পাঁয়তারা কিন্তু তার অতি কাছের মানুষেরাই করেছিল যা ইতিহাসের সাক্ষী। যদি প্রশ্ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর প্রধান অর্জন কি? এক কথায় উত্তর মিলবে “স্বাধীন বাংলাদেশ”। যেখানে যুক্ত রয়েছে মানুষের জীবনের গল্প, শহীদের গল্প, ভাষার গল্প, প্রতিটি রক্তকণা গল্প! অথচ আজ স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা খুঁজে পাই বৈপরীত্য! আমরা খুঁজে পাই সেই সকল স্বার্থপরতার আর অকৃতজ্ঞতার হাতছানি। যারা আজও সোনার বাংলা গঠনে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাফল্যকে রুখে দিতে চায়!

ইতিমধ্যে আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষদের আশ্রয়ন প্রকল্পের নির্মাণ ত্রুটির কথা, বারে বারে পদ্মা সেতুর একই পিলারে আঘাত আনার কথা, নামে-বেনামে ভুঁইফোড় সংগঠনের জেগে ওঠার কথা, করোনাকালীন সময়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অসাধু কর্মতৎপরতার কথা সহ অনেক খবর। সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যারা মনেপ্রাণে ধারণ করে তারা কখনোই এ ধরনের সাফল্যকে ম্রিয়মাণ হতে দেবে না। আমরা জানি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা কোন অন্যায়ের সাথে আপোষ করেন না। দেশকে সোনার বাংলা গঠনকল্পে দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে, দেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি সর্বদা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাহলে এই দায়টা কার? জাতি হিসেবে এ লজ্জা কি আমাদের নয়? যে চরম অবহেলা জনিত কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাণপণ প্রচেষ্টা এবং স্বপ্নপূরণের পথে বাধার সৃষ্টি হয় সে গুলোকে যদি সঠিক সময়ে সঠিক পন্থায় পর্যবেক্ষণ এবং চিহ্নিত না করা হয় তাহলে সকল প্রাপ্তি ম্রিয়মান হয়ে যাবে দিনশেষে। আর জাতি হিসেবে এটি হবে আমাদের জন্য চরম ব্যর্থতার। যে ব্যর্থতাগুলো হয়তো সামনে চরম বিপদ ডেকে আনবে! যার জন্য এখন থেকেই আমাদের সচেষ্ট এবং সদা জাগ্রত থাকতে হবে।

লেখার শেষাংশে মনে করতে চাই মানুষকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু একদিন বলেছিলেন “…মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে।…” তিনি আরও বলেছিলেন “…আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি, সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশী ভালবাসি।…” আমরা কি সত্যি তার সেই ভালোবাসার মূল্য দিতে পেরেছি কিংবা এখনো পারছি? প্রশ্ন থেকে যায় মনে! আর এই প্রশ্নটির সামনে হয়তো একদিন আমাদের সবাইকে দাঁড়াতেই হবে!


বঙ্গবন্ধু   সোহরাওয়ার্দী উদ্যান  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

আজ বিশ্ব জ্ঞানীর জন্মদিন

প্রকাশ: ১২:০০ পিএম, ১৮ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail আজ বিশ্ব জ্ঞানীর জন্মদিন

আজ বিশিষ্ট জ্ঞানী- রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ বিশ্লেষক, কবি ও লেখক, প্রিয় বন্ধু সলিমুল্লাহ খানের জন্মদিন। আজ তিনি ৬৫ বছরে পা দিলেন। 

তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। তিনি স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। প্রদীপ্ত। ভাস্বর। একাডেমিক কিম্বা বাহ্যিক উভয় ক্ষেত্রই সমসাময়িক কালে তাঁর মতন মেধাবী পন্ডিত খুব কমই দেখা যায়। জ্ঞান বিজ্ঞানের হেন কোনো বিষয় নেই সলিমুল্লাহ কম বেশি জানেন না। তাঁর বিশ্লেষণ ক্ষমতা, যুক্তি, উপস্থাপনা অতুলনীয়। অসাধারণ। টেবিলটকে, বক্তৃতার মঞ্চে, টিভি টকশোতে তাঁকে অতিক্রম করার লোক পাওয়া মুশকিল। আর এ শুধু আজ নয়, ছাত্রজীবন থেকেই। বহু বাঘা বাঘা শিক্ষাবিদ, পন্ডিত, লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আলোচনায়, বক্তৃতায়, বিতর্কে সলিমুল্লাহকে হারতে দেখিনি। 

পরম বন্ধু, রুমমেট, সহযোদ্ধা হিসেবে খুব কাছে থেকে তাঁকে দেখার, বোঝার, চেনার সুযোগ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত, দেশপ্রেমিক, সৎ, নির্ভিক, নির্মোহ, সরল সহজ, সাদা মনের এই মানুষটি অত্যন্ত সাদামাটা সাধারণ জীবন যাপন করেন। বিদ্যাবুদ্ধি, জ্ঞান, মেধা, সৃজনশীলতা ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ নেই তাঁর। বিশ্বাস করেন শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক মুক্তির দর্শন মার্ক্সবাদে। অথচ অজ্ঞানতার অন্ধত্বে উজবুকেরা তাঁকে কখনো মৌলবাদী, কখনো প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক বলে সমালোচনা করেন। অত্যন্ত স্পষ্টবাদী, সাহসী, তত্বজ্ঞানী সলিমুল্লাহ কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না। ফলে দলকানা, দলদাস আর 'অল্পবিদ্যা ভয়ংকর'রা তাঁর সম্পর্কে সেসব অপপ্রচারে বিকৃত সুখ খোঁজেন! 

বন্ধু হিসেবে সলিমুল্লাহ খানকে  নিয়ে আমি গর্ব করি। ৪৬ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের জেনারেশনের সবচেয়ে মেধাবী সলিমুল্লাহ খান, ছাত্র হিসেবে যেমন শিক্ষা জীবনের সব পরিক্ষাতে প্রথম হয়েছেন তেমনি জ্ঞান চর্চায় সমকালের সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। আশির দশকে তাঁর সম্পাদিত 'প্রাক্সিস জর্নাল' সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন ছিল। এসময়েও তাঁর জ্ঞানগর্ভ লেখা, অনুবাদ, বক্তৃতা, আলোচনা, সমালোচনা তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখে। 

সলিমুল্লাহ এই শোষণ, নিপীড়ন, বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে কিছু প্রত্যাশা করেন না বলেই তাঁর যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্বেও কোথাও কোনো পদপদবী বাগানোর মোসাহেবি, দালালী করেন না। সবসময় জনগণের পক্ষে ন্যায্য কথা বলেন। যে কারণে সারা পৃথিবীতে রয়েছে তাঁর অগণিত ভক্তকুল এবং শত্রুও। 

এই অনন্য গুণি বন্ধুটির জন্মদিনে আমরা বন্ধুরা আজ বিকাল ৫ টায় আনন্দ আড্ডায় মিলিত হবো। ইচ্ছে করলে যে কেউ লাইভে অংশ নিতে পারেন এই আড্ডায়। 

লিংকঃ https://www.facebook.com/poetmohon


সলিমুল্লাহ খান   মোহন রায়হান  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

ডলার ব্যয়ে মিতব্যয়ী হই: অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি

প্রকাশ: ১১:০০ এএম, ১৮ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail ডলার ব্যয়ে মিতব্যয়ী হই: অপ্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি

চলমান বৈশ্বিক সংকটে সংবাদপত্রের বিভিন্ন প্রতিবেদন পড়ে আমরা সাধারণ মানুষ কয়েকটি ‘শব্দ‘এর সাথে বেশ পরিচিত হয়েছি। যেমন, ‘দেশের অর্থনীতি, রিজার্ভ ফান্ড, রেমিটেন্স, ইত্যাদি। সকল দেশেই সংকট মোকাবেলা করার জন্য সরকারি কোষাগারে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত থাকে। এই সঞ্চিত অর্থই ‘রিজার্ভ ফান্ড‘। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী তা নির্ভর করে ঐ দেশের এই রিজার্ভ ফান্ড এর পরিমাণের উপর। কোন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যত বেশি রিজার্ভ ফান্ড আছে, সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি শক্তিশালী। সুতরাং দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার না করে, সঞ্চয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস প্রবাসী বাংলাদেশীদের কষ্টের উপার্জিত অর্থ রেমিটেন্স ও রপ্তানী আয়। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের সেবা খাত ও বৈদেশিক বিনিয়োগ (Foreign Direct Investment) এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা কঠোর পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ পরিবারের সদস্যদের স্বচ্ছলতার জন্য দেশে পাঠায়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থই ‘রেমিটেন্স‘। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে রেমিটেন্স থেকে। যদিও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে ভিন্ন পথে চলে যায়, সরকারের হাতছাড়া হয়। যদি প্রবাসীদের পাঠানো পুরো অর্থ বৈধ উপায়ে দেশে আনানোর ব্যবস্থা করা হতো, তবে বাংলাদেশে রেমিটেন্স এর পরিমাণ অনেক বেশি হতো। কিন্তু প্রবাসীরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও জরুরী প্রয়োজনে কষ্টার্জিত অর্থ দ্রুত নিকটজনের কাছে পৌঁছানোর জন্য অবৈধ হুন্ডির মাধ্যম বেছে নেয়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বর্ননা করছি। আমার বড় মেয়ে কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া শেষে চাকুরী করছে। সম্প্রতি সে তার একমাত্র ছোটবোনকে উপহার কেনার জন্য কিছু পরিমাণ মার্কিন ডলার কানাডার রয়েল ব্যাংক অব কানাডা (RBC)‘র মাধ্যমে পাঠিয়েছিল। সেই ডলারের সমমূল্যের  বাংলাদেশি টাকা বাংলাদেশের ব্যাংকের একাউন্টে জমা হতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের কারনেই হয়তো প্রবাসীরা বাংলাদেশে তার পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় বা কোন জরুরি প্রয়োজনে বা তাৎক্ষণিক যে কোন প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে  বাধ্য হয়েই অবৈধ হুন্ডির মাধ্যম ব্যবহার করেন। কারন হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ গ্রাহক তার প্রবাসী নিকটজনের টেলিফোন বার্তা পাওয়ার অল্পক্ষনের মধ্যেই হাতে পেয়ে যায়। সুতরাং বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয় বৃদ্ধির জন্য বৈধ উপায়ে প্রেরিত অর্থের সমমূল্যের বাংলাদেশি মুদ্রা গ্রাহকের নিকট দ্রুততম সময়ে পৌঁছানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

যাই হোক, সরকার দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যেমন জ্বালানি, ঔষধ, শিল্পের কাঁচামাল, দেশে উৎপাদিত হয় না এমন খাদ্য দ্রব্যসহ অসংখ্য প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির জন্য ব্যয় করে। সরকার সর্বদা আমদানি ব্যয় ও রপ্তানী ব্যয় সামঞ্জস্য রাখতে সচেষ্ট থাকে। এই আমদানি ব্যয় যখনই দৈনন্দিন অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার তুলনায় বেশি হয়, তখনই সরকারকে রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে হয়। আমদানি ব্যয় বাড়লে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। 

সরকার সাধারণতঃ রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে চায় না। আমদানী ব্যয় কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিলাসবহুল পন্য, অপ্রয়োজনীয় পন্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রকার শর্তারোপ করে থাকে। দেশে উৎপাদিত হয় এমন দ্রব্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা বা কঠিন শর্ত আরোপ করা হলে ডলার বা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে অভিজ্ঞজন মনে করেন।

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারনে জ্বালানি তেল আমদানিতে সংকট দেখা দিয়েছে। এই সংকটে বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সংকট মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কষ্ট হলেও, সাধারণ মানুষ বাস্তবতার নিরিখে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। 

সরকারি গাড়ী ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারী কর্মকর্তাদের জরুরি সভা ভার্চুয়ালি করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ফলে একটি বড় আকারের ডলার সাশ্রয় হবে। তবে সরকারি গাড়িতে যথেচ্ছ জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। সরকারি জ্বালানি তেলের বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহার রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, কর্মকর্তা অফিসে থাকাকালীন সময়ে সরকারি পরিবহনের সরকারি চালকগণ ডলার ব্যয়ে উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত জ্বালানি ব্যবহার করে এয়ানকন্ডিশন চালু করে বিশ্রাম নিতে থাকেন। ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ীতে এরকম দেখা যায় না। কারন সরকারী পরিবহনের জ্বালানি সরবরাহ করা হয় স্লিপ এর মাধ্যমে। বিল পরিশোধ করা হয় সরকারী তহবিল থেকে। অপরদিকে ব্যাক্তিগত গাড়ীর জ্বালানি ক্রয় করতে মালিকের পকেট থেকে ক্যাশ টাকা ব্যয় করতে হয়। 
  
দৈনন্দিন জীবনের জরুরি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারকে বাধ্য হয়ে বর্ধিত মূল্যেই জ্বালানি আমদানি করতে হয়। নিয়মিত অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় এই বর্ধিত মূল্য পরিশোধ করতে অপারগ হইলে সরকার  রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ করতে বাধ্য হয়। রিজার্ভ ফান্ড কমলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হবে। সাধারণত  দুর্যোগকালীন সময় যখন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস সংকুচিত হয়, তখন সংকট মোকাবেলায় সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করতে রিজার্ভ ফান্ড ব্যবহার করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২০৯ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার (২.১ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। চলতি আগস্টের প্রথম সাত দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৫৫ কোটি ডলারের। বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ৯৫ টাকা) টাকার অঙ্কে এই অর্থের পরিমাণ পাঁচ হাজার ২২৫ কোটি টাকা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি।

রেমিটেন্সের এই ধারাবাহিকতায় প্রমাণ হয় যে, বৈশ্বিক সংকট থাকলেও রেমিটেন্সের প্রবাহে ব্যাত্যয় ঘটেনি। কিন্তু বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানী তেল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্ভূত অতিরিক্ত ব্যয় মোকাবেলায় সরকার যেমনি সরকারি বিদেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি ও ব্যাক্তিগত ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর পরিহার করা প্রয়োজন। কারন আমরা বেসরকারি বা ব্যাক্তিগত সফরে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ব্যয় করি। আমরা বিদেশ ভ্রমনে প্রয়োজনীয় ডলার যেভাবেই সংগ্রহ করি না কেন, সব বৈদেশিক মুদ্রা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই সরবরাহ করা হয়, যা রেমিটেন্স ও রপ্তানী আয় ও অন্যান্য উপায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়। আমরা যদি  জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ না করি, অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করি তবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সাশ্রয় হবে। 

এছাড়া বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিলাসী দ্রব্যাদি আমদানি করা হয়। আমরা বলতে পারি, আমার ব্যক্তিগত টাকায় আমি আমদানীকৃত বিলাসী দ্রব্যাদি ব্যবহার করবো, তাতে সরকারের কি। কিন্তু এই বিলাসী দ্রব্যাদি আমদানি করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সুতরাং আমরা যদি আমদানীকৃত দ্রব্যের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার পরিহার করি এবং বিদেশি পণ্যের পরিবর্তে দেশীয় পণ্য ব্যবহার করি, তবে আমদানিও কমবে, ডলারও সাশ্রয় হবে। ফলে সংকটকালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে রিজার্ভ ফান্ড থেকে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা প্রয়োজন হবে না। দেশের অর্থনীতি মজবুত থাকবে।


ডলার   মিতব্যয়ী   বিদেশ   ভ্রমণ   পরিহার  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৭ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব

বহমান সময়ের স্রোতে এ অদ্ভুত বিষয়টা আকস্মিকভাবে আমার নজরে আসে। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ের পাশে অগ্রণী ব্যাংকের শাখায় গিয়ে দেখি, সেখানে বেশ ক'জন সমসাময়িক ব্যাচের সহকর্মী বসে আছেন। অবসর পরবর্তী ছুটি অথবা পূর্ণকালীন অবসরে আছেন তাঁরা। নানা বিষয়ে আলোচনাসহ একে অপরের পারিবারিক খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ছেলেমেয়েদের বয়স এবং অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। সেখানে সদ্য প্রয়াত একজন সচিবের স্ত্রী এবং সন্তানের সাথেও পরিচিত হলাম। সবাই ব্যাংকিং লেনদেনের উদ্দেশ্যেই এসেছেন। আমার উপস্থিতিতে তাঁরা প্রাণিত হয়েছেন। সমস্বরে বললেন, 'আরে তুমিও তাহলে আমাদের দলে চলে এসেছ' ? আমাদের ভুবনে স্বাগতম ইত্যাদি। আমি মনে মনে বললাম, "ঝরা পাতা গো আমি তোমাদের দলে"। পেনসন, গ্র্যাচুয়েটি, মাসিক ইন্টারেস্টের হার, সঞ্চয়পত্র ক্রয়, আর্থিক লাভ-ক্ষতির ফিরিস্তি। এ বিষয়ে আমিও খানিকটা জ্ঞান লাভ করলাম। একইসাথে চা চক্রের ভেতর দিয়ে একটু নিরুদ্বিগ্ন প্রসন্ন সময়ও কেটে গেল। 

২) ১৯৯২ সালের শেষান্তে এসে আমি প্রথম ব্যাংকে হিসাব খুলি। এর আগে ব্যাংকিং বিষয়ে আমার বাস্তব কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল না। পূর্ববর্তী তিন বছর মাঠ প্রশাসনে চাকরি করলেও আমার বেতন- ভাতাদি ব্যাংকের লেনদেনের আওতায় ছিল না। মাস শেষে তখন হাতে হাতে নগদ অর্থে মাইনা পেতাম। অফিসের বড়ো বাবু নিজেই যাবতীয় ব্যবস্হা করে বেতনের লালচে রঙের একটা খাম হাতে পৌঁছে দিতেন। তাতেই দিব্যি স্বপ্নের দিনগুলো চলে যেত। ব্যাংকের ধারে কাছেও যাওয়া হত না। সেকালে ব্যাংকের এত আধিক্যও ছিল না। এমনকি হাতেগোনা দু'চারটা প্রাইভেট ব্যাংকের কথা মনে পড়ে। 

'৯২ সালের নভেম্বর মাসের উত্তরবঙ্গের সীমান্ত জেলা চাপাই নবাবগঞ্জ থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসি। এবং কী যেন এক আশ্চর্য যোগসূত্রে খোদ ইডেন ভবনে অর্থাৎ বাংলাদেশ সচিবালয়ের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত অট্টালিকায় ঢুকে যাই। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ে যোগদানের পরে মাসিক বেতন প্রাপ্তির নিমিত্ত ব্যাংক হিসাবের প্রশ্ন আসে। অগ্রজ সহকর্মীদের পরামর্শে একটি চলতি ব্যাংক হিসাব নম্বর খুলি। সচিবালয়ের সন্নিকটে এবং যাতায়াতের সুবিধার কথা মাথায় রেখে অগ্রণী ব্যাংক, জাতীয় প্রেস ক্লাব শাখায় এ হিসাব খোলা হল। 

২) আমার হিসাব নম্বর খোলার সময় এ শাখার ব্যবস্হাপক ছিলেন জনৈক মাসুদ এ খান। বেশ স্মার্ট, সৌম্যদর্শন ও চৌকস কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি এ শাখার প্রথম দিককার ম্যানেজার। ১৯৮৬ সালে এ শাখার যাত্রা শুরু হলে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় জন।  দেখতাম, সচিবালয়ের উর্ধতন প্রায় সকলের সঙ্গেই তার সদ্ভাব ও দাপ্তরিক যোগাযোগ ছিল। অবশ্য সঙ্গত কারণেই এখানকার দায়িত্ব প্রাপ্তগন সব সময় গ্রাহকবান্ধব, বিনয়ী ও দক্ষ হয়ে থাকেন। বর্তমানে এ পদে আসীন সুধীর রঞ্জন বিশ্বাসও এর বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম নন। জানা গেল, সুধীর বিশ্বাস এখানকার ১৬তম ব্যবস্হাপক। এ শাখার জন্য অপরিসীম ধৈর্য্য, অসাধারণ সংবেদনশীলতা ও মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন আধুনিক ব্যাংকার হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় দপ্তরের কর্মে নিয়োজিত এ কর্মচারিগন প্রায় সবাই নিজেকে সর্বাধিক  গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। সবাই অগ্রাধিকার প্রাপ্তির দাবিদার এবং তা তাঁরা অবলীলায় অনবরত অনুশীলনও করেন। এমন পরিস্থিতিতে এক সাথে সকলের মনে জায়গা করে নিয়ে দায়িত্ব পালন করা মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দুরূহ কাজ। 

৩) নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে অগ্রণী ব্যাংকের প্রসার ও বিস্তৃতি ততটা হয়নি। যদিও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই এর আর্থিক পরিষেবা চালু হয়েছিল। উল্লেখ করা যায়, এটা তৎকালীন পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংক এবং কমার্স ব্যাংকের সমন্বয়ে একীভূত হয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অগ্রণী ব্যাংক নামে চালু হয়। কালের বিবর্তনে আজকের অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাস্ট্রায়ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংক। যার সাথে সম্পৃক্ত প্রায় ৯৬৫টি বিভিন্ন ক্যাটাগরির শাখা এবং কর্পোরেট অফিস। একই সাথে দেশের অন্যতম প্রধান পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবেও পরিগনিত হয়েছে। 

৩) অগ্রণী ব্যাংক জাতীয় প্রেসক্লাব শাখা সম্ভবত বাংলাদেশ সচিবালয় কেন্দ্রিক কর্মচারিদের আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজনে প্রথম কোনো তফসিলী ব্যাংক। চাকরির প্রথম দিকে এ শাখায় গেলে দেখতে পেতাম পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের অসংখ্য (অবঃ) জায়েন্টদের। বসে আছেন নির্ভার। অনুজ ও পরিচিত স্নেহভাজনদের সঙ্গে কথা বলছেন। স্মৃতি রোমন্থন করছেন। আমরা উঁকি দিয়ে এক পলক তাকিয়ে  কালবিলম্ব না করে সশ্রদ্ধায় নত হয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসতাম। তখন কখনো ভাবি নি, আমরাও একইভাবে একই স্হানে, একই উদ্দেশ্যে এমন অলস সময় কাটাবো। এবং আজও একই রেওয়াজ আঁকড়ে ধরে আপ্যায়ন করে চলেছেন ব্যবস্হাপকগন । অতীতের ধারাবাহিকতায় আজও তারা টাকা জমা বা উত্তোলনের জন্য আগলে রেখেছেন সকল সহযোগিতার হাত। গাড়ি অবধি অনুসরণ করে চলছেন প্রায় সর্বজনের সহায়ক, সর্বত্রগামী ও অনুগত কর্মচারী ফারুক। নব্বই দশকের গোড়া থেকে সে আমার কাছেও আস্হা এবং অবলম্বনের মতন। মনে পড়ে, কয়েক বছর আগেও ব্যাংকে ঢুকেই দেখতাম, সোফায় বসে আছেন ষাটের দশকের দাপুটে সিভিলিয়ান মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, মনজুরে মাওলা বা ড. সা'দত হুসাইন এর মত সিএসপি কর্মকর্তা। টাকা উঠাতে এসে তাঁরা একটা জমকালো আড্ডায় মেতে থাকতেন। আর এ ব্রাঞ্চটা যেন যুগ যুগ ধরে জ্যেষ্ঠ কর্মচারিদের মিলনকেন্দ্রের বিকল্প স্হানে পরিণত হয়েছে।  

৪) আমিও সদ্য অবসরে যাওয়া একজন সিভিল সার্ভেন্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রায় ৮ বছর বাদ দিলেও প্রশাসনের চাকরিতে দীর্ঘ ৩২ বছর কাজ করেছি। ঘুরেছি মাঠে ঘাটে,তথা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বাংলাদেশ সচিবালয় এবং মাঠ প্রশাসনের প্রায় সব ক'টা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করার এক বিরল সুযোগ হয়েছিল। অসংখ্য অগনিত সহযাত্রী সহকর্মীর সান্নিধ্যে থেকে কাজ করার সুবাদে আমার পরিচিতিও বোধকরি একটু বেশি। তবে একটি ব্যাপার বিস্ময়ে এবং আনন্দের সাথে লক্ষ করেছি, যখনই এ ব্রাঞ্চে প্রবেশ করি, যেন কেউ একজন বসে আছেন আমাকে 'তুমি' বলে সম্বোধন করার। অবসর কালেও সেদিন প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকার চেকখানা জমা করতে গেলে, দেখি '৭৩ ব্যাচের বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা মাহবুব উল আলম খান মহোদয় বসে আছেন। আহা! কী দেশপ্রেমিক, নির্লোভ ও নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। এখন বয়সের ছাপ কিছুটা দৃশ্যমান। আমি মাস্ক পরিহিত। তথাপি তিনি আমাকে চিনতে ভুল করেন নি। আমার ও পরিবারের কুশলাদি জানতে তিনি কার্পণ্য করেননি। আমরা অনেক দিন ধরে একই মন্ত্রনালয়ে কাজ করেছিলাম। ইদানিং মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট অনুভব করি, আমাকে 'তুমি' বলার মানুষগুলো ঘরে এবং বাইরে সর্বত্রে দিন দিন কমে যাচ্ছে। অথচ এ মানুষগুলো অনুজ হিসেবে আমাদের বেঁচে থাকার এক অদৃশ্য প্রেরণা। আমার মনে হয়, ওনাদের জীবন কালের মধ্যেই যেন পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিটি নিশ্বাসের নিরাপদ ঠিকানা লুকিয়ে আছে। 

৫) ভাবছি, জাতীয় প্রেস ক্লাবের এ শাখাটি কী কেবল ব্যাংকিং করছে ? এটি কী আর দশটা শাখার মতো যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় গ্রাহকদের মাঝে শুধু অর্থ লেনদেন করে চলেছে? না, এর বাইরেও এখানে জনান্তিকে কতিপয় মানবিক দায়িত্বও পালিত হচ্ছে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রতিদিন এখানে আসেন অসংখ্য প্রবীণ কর্মচারী। এঁদের কেউ বিপত্নীক, কেউ স্বামী- সন্তানহারা, আপনজনেরা বিদেশ বিভুঁইয়ে। কেউ কেউ নিঃসঙ্গ এবং একা। কেউ বা নিভৃতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। এমন দুঃখ জাগানিয়া জীবনে শুধু বন্ধু-সুজনের কন্ঠস্বরের প্রবল আকুতি নিয়ে ঘর হতে বের হয়ে আসেন এখানে । অল্প কাজে বেশি সময় নেন। কথা বলার এবং শোনানোর শ্রোতা খুঁজেন। এতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সামান্যও বিরক্তিবোধ করেন না বরং সারাক্ষণ সদানন্দ পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছেন,পাশে থাকছেন। এর কী নাম দেব? আমি বলি এর যথোপযুক্ত নাম হবে আমাদের কর্মচারিদের পরম্পরার ব্যাংক-ক্লাব। 

বোরাক টাওয়ার, ঢাকা 
২ ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। 

ব্যাংক-ক্লাব  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

জাতীয় শোক দিবসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ধৃষ্টতা


Thumbnail

জাতীয় শোক দিবস হচ্ছে সমগ্র জাতির জন্য সবচেয়ে শোকাবহ দিন। কেননা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়। সাথে হত্যা করা হয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে, তার সন্তানদের, পুত্রবধূদের, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাইকে এবং নিকটাত্মীয়দেরকে। যদিও আমরা শুধু ১৫ আগস্টকে জাতীয় শোক দিবসের গুরুত্ব সহকারে পালন করি কিন্তু আসলে সারা বছরই আমাদের অনেকেরই মনের ভিতরে শোকাবহ আবহাওয়া থাকে। আমরা সেটা নিয়েই বেঁচে আছি এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কে তিনি তার বুকে ধারণ করে নিজস্ব দর্শন দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ একের পর এক করে চলছেন। এখন তিনি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, এই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়কের ফটো কোথাও দেওয়া হলো কি না হলো- এই সব কিছুর অনেক ঊর্ধ্বে তিনি। তিনি কারও কাছে কিছু আশা করেন না। বরং সবাইকে তিনি দিয়ে যাচ্ছেন দেশের মঙ্গলের জন্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সকলের প্রতি তিনি যত্নবান। 

স্বাস্থ্য বিষয়ে যদি বলি তাহলে দেখা যাবে, সেই কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, কিডনি ইনস্টিটিউট এর প্রত্যেকটা জিনিস করেছেন এই দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু যে সংবিধানে স্বাস্থ্যের অধিকারের কথা বলেছেন তিনি তার রূপ দিয়েছেন। তাহলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে, দার্শনিক শেখ হাসিনা এই সংগঠনগুলিকে যা করতে বলেন, সেগুলি করা এবং সেগুলির যত্ন নেওয়া। জাতীয় শোক দিবস অত্যন্ত গাম্ভীর্যের সাথে পালন করা হয়। এর আগে দেখা যেত ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন লোক বঙ্গবন্ধুর ছবি ছোট করে দিতেন আর নিজেদের ছবি বড় করে পোস্টার করতেন। সেগুলি আওয়ামী লীগ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যে জিনিসটি সরকার বন্ধ করতে এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়েছে, সেটি হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ফটো দেওয়া এই জাতীয় শোক দিবস কে কেন্দ্র করে। 

গতকাল সোমবার আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহেবের আমন্ত্রণে  একটি শোক সভায় গিয়েছিলাম। শোক সভায় গিয়ে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। কেননা এর আগে নিয়মিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের একটি বিজ্ঞাপন চলেছে। সেই বিজ্ঞাপনে ডান দিকে আছে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের ছবি আর বামদিকে আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবি। তাতে এই জাতীয় শোক দিবসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি কি কাজ করেছে তার বিভিন্ন বর্ণনা। কাজগুলো খুব ভালো করেছে। আমি মনে করি যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দার্শনিক নেতৃত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজগুলো অবশ্যই আমাদের সমর্থন দেওয়া উচিত। আমিও সেগুলো কে সমর্থন দেই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই যে কাজগুলি হিসেবে দিলেন, ডানপাশে মন্ত্রীর ছবি বামদিকে দার্শনিক শেখ হাসিনার ছবি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছবি কোথায়? জাতীয় শোক দিবস তো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। পত্রিকায়ও দেখলাম, যে সব পত্রিকা এই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে পারলে হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করে, সেসব পত্রিকাগুলো গুরুত্বের সাথে এই বিজ্ঞাপন ছেপেছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে কিছু লেখেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তো দার্শনিক রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বাইরে না। তাহলে তাদেরকে কেন তেল দিতে হবে। আমার মনে হচ্ছে যে, এই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যারা বিভিন্ন স্তরের কাজ করছেন, এরা ঘাপটি মেরে থাকা লোক এবং এরা নির্বাচন যত কাছে আসছে তারা তাদের রুপ দেখাচ্ছে। 



স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. মু: আনোয়ার হোসেন হাওলাদার সাহেব উনি একজন সৎ লোক, ভালো লোক বলে শুনেছি। কালকেই প্রথম উনার সঙ্গে আমার দেখা হলো। তাকে আমি যখন বললাম, আপনার বিভাগ থেকে যে বিজ্ঞাপন গণমাধ্যমে গেছে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি নাই কেন। তিনি বললেন, স্যার আমি তো দেখি নাই। একজন সচিব তার বিভাগ থেকে বিজ্ঞাপন যাচ্ছে অথচ তিনি জানেন না। একের পর এক প্রতিদিন সে বিজ্ঞাপন যাচ্ছে এবং সেখানে বঙ্গবন্ধুর ফটো নাই সেটা তার চোখে পড়ে নি। উনি কি মসজিদের ইমামতি করতে এসেছেন? না স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন? এ বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। হেলথের ডিজি একজন খুব সৎ, ভালো এবং আমার সন্তান তুলল্য। তাকে আমি খুব আদর করি। আমিও হেলথের ডিজি ছিলাম। সেখানে অনেক দায়িত্ব। কিন্তু সে দায়িত্ব অবশ্যই সচিব বা মন্ত্রীর পিছনে ঘোরাঘোরি করা নয় কিংবা তাদেরকে খুশি করার বিষয় নয়। দায়িত্ব হলো তাকে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা তাকে যে দায়িত্ব দিবেন সেটা ভালোভাবে করবেন। তিনি দেখবেন দেশের মঙ্গল হলো কিনা এবং স্বাস্থ্য বিভাগ ঠিকমত চলবো কি না। কিন্তু সেরকম অনেক দায়িত্বের ব্যাপারে তার নমুনা দেখি না। আমি সভাতে খুব ইমোশনাল গিয়েছিলাম। আমি খুব পরিস্কার ভাবে তাদেরকে বলেছি কিন্তু তারা তাদের উত্তর দিতে পারেননি। 

এর আগে তারা হঠাৎ করে ২ মে প্রথম মুজিবনগর সরকার পালন করেছিল। সেদিন সেখানে শুধু মন্ত্রী আর দুই সচিব ছিলেন।  আমরা কেউ ছিলাম না। আমার শ্রদ্ধেয় পিতৃতুল্য এইচ টি ইমাম সাহেব তার বইতে আমার কি অবদান ছিল, আমি কোন পদে ছিলাম ভালো করে লিখেছেন অনেক বইয়ে। সে সময় আমাদের সাথে কাজ করতো একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছেন। তাদের কাউকেই সেদিন ডাকা হলো না। আমি সে সময় বলেছিলাম, যে তিনজনকে ডেকেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় এরা তো কিশোর ছিল। তারা তো ভালো ধারণা রাখেন না। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগে কাজ করেছি তাদের ডাকা উচিত ছিল। এটাও আমার মনে হয় তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। কারণ আমাদেরকে তেল দিয়ে তো কোনো লাভ নাই। আমরা তো তাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারবো না। আমার দাবি হচ্ছে সরকারের ভিতরে এই ঘাপটি মেরে থাকা যে সচিব বক্তব্যের শেষে জয় বাংলা বলেননি।  স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মোঃ সাইফুল হাসান বাদল উনি বক্তব্যের শেষ সুন্দর করে জয় বাংলা বলেছেন কিন্তু স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব সেটা করেননি। 

জাতীয় শোক দিবসে যিনি জয় বাংলা বলার প্রয়োজন অনুভব করেন না সেই ধরনের সচিবের আমাদের প্রয়োজন কি আমি বুঝতে সক্ষম নই। আমার দাবি হচ্ছে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হোক। তদন্ত করে বের করা দরকার কোথায় ঘাপটি মেরে থাকা এই সকল লোক আছে, যারা বঙ্গবন্ধুকে অবমূল্যায়ন করে অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে অবমূল্যায়ন করে। এখন দার্শনিক শেখ হাসিনা তো চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। তাকে কি করলেন, তার ফটো দিলেন, কেন দিলেন এতে তার কিছু যায় আসে না। উনি ফটোর জন্য কাঙ্গাল নয়। যদি আপনাদের ফটো দেওয়ার এত ইচ্ছা থাকতে তাহলে আপনাদেরই ফটো দিয়ে ভরিয়ে দিন। আমি খুব গুরুত্ব সহকারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং তার কার্যালয় থেকে অবশ্যই এই বিষয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এই আশা করছি।

জাতীয় শোক   স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়   ধৃষ্টতা   বিজ্ঞাপন  


মন্তব্য করুন


ইনসাইড থট

১৫ আগস্ট বেঁচে যাওয়া দেড় বছরের সেই শিশুটি এখন বরিশালের মেয়র!

প্রকাশ: ১০:০০ পিএম, ১৫ অগাস্ট, ২০২২


Thumbnail ১৫ আগস্ট বেঁচে যাওয়া দেড় বছরের সেই শিশুটি এখন বরিশালের মেয়র!

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভয়াল কালরাতে ঢাকার ২৭ মিন্টো রোডের বাসায় গুলিবিদ্ধ মায়ের কোলের মধ্যে থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া স্বজনের রক্তে ভেজা সেই সময়ের মাত্র দেড় বছরের শিশু আজকের বরিশাল সিটি কর্পোরেশেনর মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে পাদ প্রদীপের আলোয় আসা এক উদীয়মান সূর্য সাদিক আব্দুল্লাহর আলোয় আলোকিত বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির অঙ্গন। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থী হিসেবে তিনি (সাদিক) বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি (সাদিক) বঙ্গবন্ধুর বোন জামাতা শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের জ্যেষ্ঠপুত্র মন্ত্রী পদমর্যাদার পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির আহবায়ক, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ এমপি’র জ্যেষ্ঠপুত্র। পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ নিজেকে শুধু যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেই নয়; দলীয় নেতাকর্মীদের আশা ও ভরসার প্রতীক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। বিএনপির কাছে দখল হয়ে যাওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। মেয়র নির্বাচিত হয়ে সাদিক আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বরিশাল নগরীকে একটি তিলোত্তমা অপরূপা শহরে রূপান্তরিত করার মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ১৫ আগস্ট ভয়াল কালরাতে রক্তঝরা অচিন্তনীয় বিয়োগান্তক অধ্যায়ের শোকগাঁথায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সঙ্গে দাদা তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও চার বছরের ভাই সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাতসহ পরিবারের অনেক স্বজনকে হারিয়েছেন সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। সেই ভয়াল কাল রাতে অলৌকিকভাবে তার (সাদিক) বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, বুলেটবিদ্ধ হয়ে মা শাহান আরা বেগম ও তার কোলে থাকা দেড় বছরের শিশুপুত্র সাদিক আব্দুল্লাহ প্রাণে বেঁচে যান। শরীরে ঘাতকের বুলেট বহন করে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে মা শাহান আরা বেগম ও স্বজন হারানো বাবা আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ন্যায় সাদিক আব্দুল্লাহও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সুখ-দুঃখের অংশীদার। ৭৫’র পরবর্তী সেনাশাসক জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার এবং ১/১১’র সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও মিথ্যা মামলাসহ নানা ষড়যন্ত্রে হয়রানির শিকার করা হয় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার পরিবারকে। তবে সকল চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মাঝেও এ পরিবারটি বরিশালে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একমাত্র ভরসাস্থল ও শেষ ঠিকানা। আজও তারা করে স্বজন হারানোর দুঃসহ বেদনা ভয়াল ও আতঙ্কের কালো রাত্রির রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকরা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের পাশাপাশি হামলা চালিয়েছিল সেরনিয়াবাত পরিবারের ওপর। ওইদিন ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে কৃষকলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন মন্ত্রী (বঙ্গবন্ধুর বোন জামাতা) আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ২৭ মিন্টো রোডের বাসভবনে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। ঘাতকরা তাদের পরিকল্পনা সফল করতে হেভি মেশিনগান সংযোজিত দ্রুতগতির জীপ, প্রচুর পরিমাণে এমুনিশন ও গুলিসহ এক প্লাটুন ল্যান্সার সৈন্য নিয়ে ইতিহাসের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিন্টো রোডের বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজনসহ বরিশালের একটি ব্যান্ড গ্রুপের সদস্যরা। জানা গেছে, হামলাকারীরা প্রথমেই বাসার সিকিউরিটিকে নিষ্ক্রিয় করতে খুব দ্রুতগতিতে পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু করে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। গুলি শব্দে বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙ্গে আতঙ্কিত হয়ে পরেন। ব্যাপক আক্রমণের একপর্যায়ে ঘাতকরা বাড়ির সবকিছু তছনছ করে দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়িতে আক্রমণের শুরুতেই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত তার বাড়ির রেডফোন দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ মনিকে বিষয়টি অবহিত করে জানতে পারেন বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির চারদিকেও একই অবস্থা। এতে সে (রব সেরনিয়াবাত) তাৎক্ষণিকভাবে বিমূঢ় হয়ে বসে পরেন। সে সময় আব্দুর রব সেরনিয়াবাত শুধু মুখে একটি কথাই বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ বংশে বাতি দেয়ার মতো তৌফিক রেখ’। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘাতক সৈনিকরা দরজা ভেঙ্গে বাসার মধ্যে প্রবেশ করে সকলকে নিচতলায় নিয়ে আসে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন-আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার স্ত্রী আমিনা বেগম, মেয়ে বেবী ও বিউটি সেরনিয়াবাত, ছেলে আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী শাহান আরা বেগম ও তার সন্তানসহ বরিশালের অনেকেই। ঘাতকরা দোতালা থেকে সবাইকে অস্ত্রের মুখে নিচতলায় নামিয়ে আনার সময় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ৪ বছর ১ মাস ২৩ দিন বয়সের শিশুপুত্র সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত মায়ের কোলে যেতে চাইলে শহীদ সেরনিয়াবাত তাকে কোলে তুলে নেন। পরিবারের সদস্যসহ অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের ঘাতকরা একটি কক্ষে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এ সময় ঘাতকের হুংকারে আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের স্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর বোন আমিনা বেগম ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন-‘বাবা তোমরা কি আমাদের মাইরা ফেলবা’ এর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ঘাতকদের নির্মম ব্রাশফায়ার। ঘাতকের ক্রমাগত ব্রাশফায়ারে একে একে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পরেন আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, তার স্ত্রী আমিনা বেগম, পুত্রবধূ শাহান আরা বেগম, শহীদ সেরনিয়াবাত ও কোলে থাকা সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাতসহ অন্যান্যরা। কোমরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শাহান আরা বেগমসহ অন্যরা কাতরাচ্ছিলেন। ঘাতকরা এ অবস্থায় চলে যায়। এ সময় আহত বিউটি সেরনিয়াবাত রক্তাক্ত রব সেরনিয়াবাতকে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলে ঘাতকরা ফিরে এসে দ্বিতীয় দফায় গুলি চালায়। ঘাতকের নির্মম ১৬টি বুলেট বিদ্ধ হয় বেবী সেরনিয়াবাতের শরীরে। এ সময় ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়ে যায় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর একমাত্র মেয়ে কান্তা সেরনিয়াবাত ও দেড় বছরের ছেলে (বর্তমান বরিশাল সিটি মেয়র) সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ।


মন্তব্য করুন


বিজ্ঞাপন