ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ , ১০ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

মোদি নায়ক নাকি খলনায়ক?

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক 
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার, ০২:২৫ পিএম
মোদি নায়ক নাকি খলনায়ক?

সেদিনের চা বিক্রেতা আজ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশের প্রধানমন্ত্রী। এই দুর্গম দীর্ঘ পথ পারি দিতে অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়েছেন ভারতের বর্তমানে এই সরকারপ্রধান। বলছি নরেন্দ্র মোদির কথা। তিনি ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, বলেছে ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার। তবে একই সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন নীতি ও তাঁর দলের নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সমর্থনের জন্য সমালোচনাও কম হয়নি।

ভারতের জনগণ মনে করে দেশে উন্নয়ন হচ্ছে। দেশ অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ভারতীয় যুব সমাজের কাছেও নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা বর্তমান যে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের থেকে বেশি। মোদির এই জনপ্রিয়তার রহস্য কী?

নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনাতে সহজেই দৃশ্যমান এমন পরিবর্তনগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এতে উন্নয়নের কাজ এবং উন্নয়নগুলো সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব ফেলেছে। শুধু তাই নয় মোদি উন্নয়ন কাজগুলোতে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছন। যেমন তিনি মন্ত্রিপরিষদ ছোট রেখে ১২৫ কোটি রুপি সাশ্রয় করেছেন। এই উদ্যোগে তার মন্ত্রিপরিষদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।

মোদির সেতু ভারত কর্মসূচির আওতায় ২০১৯ সাল নাগাদ ভারতের হাইওয়েগুলোতে কোনো রেলওয়ে ক্রসিং থাকবে না। এই উন্নয়নটি মানুষ সরাসরি ভোগ করতে পারে। এবং এটি সব সময়ই দৃশ্যমান।

২০১৮ সালের মধ্যে ভারতের ১৮ হাজার ৪৫২ টি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মোদি সরকার। মানুষ এর সুবিধা পেতেও শুরু করেছে।

স্বচ্ছ ভারত অভিযান, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, প্রধানমন্ত্রী জন-ধন যোজনা, জীবন জ্যোতি বীমা যোজনা, স্মার্ট সিটি যোজনা, অতল পেনসন যোজনা, সুরক্ষা বীমা যোজনার মত মোদি সরকারের অনেক উন্নয়ন কর্মকান্ডে মানুষকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এবং এই কর্মকাণ্ড গুলোকে মানুষ সব সময়ই দেখতে পারছে।

দেশের অর্থনীতিকে কালো টাকা মুক্ত করতে মোদি সরকার ২০১৬ সালে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল ঘোষণা করে। এমন পদক্ষেপে তিনি বিশ্ব গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। আর ভারতের দেশপ্রেমিক জনগণও শত দুর্দশার মধ্যেও বিষয়টিকে সমর্থন দেয়।

নরেন্দ্র মোদির কথাবলার ঢং, উচ্চারণ সব কিছুই সধারণ ভারতীয়দের মতোই। তাঁর চেহারাতে আভিজাত্যের ছোঁয়া নেই। খুবই সাধারণ পোশাক পরেন। তিনি বক্তৃতাতে প্রথমে কোনো সঙ্কট ও এতে জনগণ কী রূপে প্রভাবিত হবে তা বর্ণনা করেন। তারপর দেশের ধনীক শ্রেণি এই অবস্থায় কীভাবে লাভবান হবে তা বোঝান। এরপর সংকট থেকে উত্তরনে তিনি ও তার সরকার কি করেছেন তা বলেন। এর পর জনগনকে নিজ স্বার্থে কী করতে হবে তা কৌশলে আরোপ করেন। তাঁর বক্তৃতার ঢং হলো, ‘প্রথম প্রথম আপনাদের কষ্ট হবে। কিন্তু দেশের স্বার্থে আপনাদের সহ্যও করতে হবে।‘ এবং এর মঝেই তিনি জনগণের নীপিড়ন ও দুঃখের ঘটনাগুলো মানুষের মনোযোগ ও আবেগকে প্রভাবিত করেন। তিনি যে বাকপটু আর ১০ জন বিখ্যাত নেতার মতোই মানুষকে প্রভাবিত করতে পেরেছেন তা সবাই মেনে নেবে।

নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ইতিহাস যতটা না রোমাঞ্চকর তার থেকে বেশি সরকার বিরোধী। ১৯৭১ সালের শেষে মোদি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে যোগ দেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঘোষণা করেন। তখন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। নরেন্দ্র মোদি গ্রেপ্তারি এড়ানোর জন্য বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করেন। গোপনে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে পুস্তিকা বিতরণ ও বিক্ষোভ সমাবেশ করতেন। তিনি জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে জরুরিকালীন অবস্থা আন্দোলনে সামিল হন। এই সময় তিনি গুজরাট লোকসংঘর্ষ সমিতি নামক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি গুজরাটে বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতেন। এই সময় তিনি গুজরাটি ভাষায় ‘সংঘর্ষ্ মা গুজরাট’ (গুজরাটের সংঘর্ষ) নামে একটি বই লেখেন যেখানে তিনি এই সময়ে ঘটিত বিভিন্ন ঘটনার নিরিখে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। ১৯৮৫সালে নরেন্দ্র মোদিকে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন।

ভারতীয় জনতা পার্টি একটি কট্টরপন্থী হিন্দুত্ত্ববাদী রাজনৈতিক দল। ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর পদ পান। ২০০২ তে হিন্দু তীর্থ যাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনে আগুন লেগে ৬০ জন নিহত হয়য়। এই ঘটনায় গুজরাটে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়। এতে প্রায় দুই হাজার মানুষ মারা যায়। গোধরা অগ্নিকান্ডে মৃত করসেবকদের দেহ আমেদাবাদ নিয়ে যাওয়ার মোদির নির্দেশকে দাঙ্গায় উস্কানি দেয় মোদি সরকার। পরে শহরে কার্ফু জারী করা হয়য় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ধর্মীয় সহিংসতায় মোদি সরকারকে বারবারই পক্ষপাতিত্ত্বমুলক আচরণ করতে দেখা যায়।

হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে নরেন্দ্র মোদির সরকার গোড়া হিন্দুত্ববাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে। গোঁড়া হিন্দুত্ত্ববাদী সংগঠন গুলোও মাথা চারা দিয়ে উঠেছে। এতে ভারতে বসবাসকারী মুসলমান অধিবাসীরা নিপীড়নের শিকার হয়েছে বার বার। দেশটির একাধিক স্টেটে গরু সহ বিভিন্ন গবাদি পশু কোরবানি নিষিদ্ধ করা হয়। কোরবানি ঈদে দেশটির মুসলমান অধিবাসিদের পশু কোরবানির মাধ্যমে তাদের ধর্ম পালনে বাঁধা দেওয়া হয়। কোরবানিকে কেন্দ্রকরে মুসল্লিদের উপর হামালাও চালনো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও মোদির অবস্থান স্পষ্ট নয়। এক মাস আগেই ভারত সফরে এসেছিলেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়ানহু। এই সফরে মোদির ও নেতানিয়ানহুর বন্ধুত্ত্বই বিশ্ববাসী দেখল। আবার ফিলিস্তিন সফরকালে মোদি বললেন ভারত ফিলিস্তিনকে দ্রুত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতকে জিরো টলারেন্স নীতিতে অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছে। ভারত পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনাকে দেশ দুটির এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সাথেও ভারত যে সুপ্রতিবেশির মত আচরণ করছে তা নয়। ট্রাঞ্জিট সহ বিভিন্ন সুবিধা তারা নিচ্ছে। কিন্তু এখনো তিস্তার পানি দিতে তারা রাজি নয়। ভারতে মোদি সরকার বিশ্ব রাজনীতিতে বার বার মন্তব্য করে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে।


বাংলা ইনসাইডার/ডিজি/জেডএ