ঢাকা, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন তো ইমরান?

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক 
প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার, ০৮:০৫ এএম
মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবেন তো ইমরান?

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। দেশটির সাধারণ নির্বাচনের আংশিক প্রকাশিত ফলাফল থেকে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। কিন্তু ইমরানের ক্ষমতাগ্রহণের আগেই তিনি সম্পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন কিনা এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা হচ্ছে বেশি।

পাকিস্তানের ইতিহাসে একমাত্র শওকত আজিজ ছাড়া আর কোনো প্রধানমন্ত্রীই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। সামরিক অভ্যুত্থান, আততায়ীর হামলাসহ নানা কারণে মেয়াদ শেষ হবার আগেই ক্ষমতা থেকে সরে দাড়াতে হয়েছে দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া প্রায় সবাইকেই।  

নবাবজাদা লিয়াকত আলি খান

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহন করেন নবাবজাদা লিয়াকত আলি খান। কিন্তু মেয়াদ পূর্তির আগেই আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় সাদ আকবর নামের এক ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করে লিয়াকতকে।

খাজা নাজিমুদ্দিন

নবাবজাদা লিয়াকত আলি খানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র দুই বছর। তার শাসনামলেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ।

অভ্যন্তরীণ বিবাদসহ নানা কারণে ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পদচ্যুত করা হয় নাজিমুদ্দিনকে।

মোহাম্মদ আলি

খাজা নাজিমুদ্দিনের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ আলি। তিনিও ছিলেন একজন বাঙালি। বগুড়ার সন্তান মোহাম্মদ আলি ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন। ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৫৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু এক বছর না পেরোতেই ১৯৫৫ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা মোহাম্মদ আলিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।

চৌধুরী মোহাম্মদ আলি

১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে। সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু অভ্যুন্তরীন কোন্দল বাড়তে থাকায় ১৯৫৬ এর ১২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এই রাজনীতিবিদ।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

মোহাম্মদ আলির পদত্যাগের পরই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর শাসনামলেই উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি।  ১৯৫৯ এ রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয় সোহরাওয়ার্দীকে। এরপর ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ইব্রাহিম ইসমাইল চান্দ্রিকার

মুসলিম লীগের এই নেতার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কাল মাত্র ১মাস ২৯ দিন। ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি।

ফিরোজ খান নুন 

১৯৫৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের ৭ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ফিরোজ খান নুন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এরপর সামরিক শাসন জারি করেন ইস্কান্দার মীর্জা। পদচ্যুত হন ফিরোজ খান নুন।

নুরুল আমিন

১৯৭১ সালের ৭ডিসেম্বর পাকিস্তানের ক্ষমতার শীর্ষে আসেন নুরুল আমিন। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান তিনি।

জুলফিকার আলী ভুট্টো

দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৭৩ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) থেকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৭৯ সালে সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।

মোহাম্মদ খান জুনেজো

১৯৮৫ সালে জেনারেল জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন মোহাম্মদ খান জুনেজোকে। ওই বছরের ডিসেম্বরে সামরিক শাসনের ইতি ঘটান তিনি। কিন্তু মেয়াদ পূর্ণ হবার আগেই ১৯৮৮ সালে তাকে বরখাস্ত করেন জিয়াউল হক।

বেনজির ভুট্টো

মোহাম্মদ খান জুনেজো পদচ্যুত হওয়ার পর ওই বছরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। মুসলিম দেশগুলোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি।  কিন্তু ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট তাকে বরখাস্ত করা হয়।

১৯৯৩ সালের নির্বাচনে আবারও জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন বেনজির ভুট্টো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর তাকে পুনরায় বরখাস্ত করা হয়। এরপর ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির এক নির্বাচনী সমাবেশ শেষে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেনজির ভুট্টো।

মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরিফ

মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরিফ তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। বলাই বাহুল্য, কোনোবারই তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। প্রথমবার ১৯৯০ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। দ্বিতীয়বার দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। এরপর ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে আবারও ক্ষমতা গ্রহন করেন তিনি। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে এবারও মেয়াদ পূর্তির আগেই পদ ছাড়তে হয় নওয়াজকে।

জাফরুল্লাহ খান জামালি

২০০২ সালে পাকিস্তানের ১৩তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জাফরুল্লাহ খান জামালি। কিন্তু মাত্র ২ বছর না পেরোতেই ২০০৪ সালে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি।

শওকত আজিজ

জাফরুল্লাহ খান জামালি পদত্যাগের পরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় শওকত আজিজকে। তিনি পাকিস্তানের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। বর্তমানে নির্বাসনে আছেন শওকত।

চৌধুরী সুজাত হুসাইন

২০০৪ সালে ৩০ জুন নিয়োগ পান চৌধুরী সুজাত হুসাইন। পাকিস্তান মুসলিম লীগের এই নেতা মাত্র ১ মাস ২৭ দিন ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। ২৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান তিনি।

 

ইউসুফ রাজা গিলানি

২০০৮ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জয়লাভ করে। দলের মনোনয়ন পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ইউসুফ রাজা গিলানি। কিন্তু ২০১২ সালে সংবিধান লঙ্ঘনের এক মামলায় ৩০ সেকেন্ডের এক প্রতীকী কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। এই রায়ের ফলে প্রধানমন্ত্রী থাকার অধিকার হারান তিনি।

রাজা পারভেজ আশরাফ

ইউসুফ রাজা গিলানি পদচ্যুত হওয়ার পর ২০১২ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন রাজা পারভেজ আশরাফ। ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে ক্ষমতা ছাড়েন পাকিস্তান পিপলস পার্টির এই নেতা।

শাহীদ খাকান আব্বাসী

২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে ৩১ মে ২০১৮ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহীদ খাকান আব্বাসী। এবারের নির্বাচনের আগে ক্ষমতা থেকে সরে দাড়ান পিএমএলএন এর এই নেতা।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদটিকে অনেকেই মিউজিক্যাল চেয়ারের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ২০ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তানকে দুর্নীতিমুক্ত করে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হবার দারপ্রান্ত থেকে তুলে আনবেন বলে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন ইমরান খান। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার তো বটেই, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ইমরান মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেন কিনা সেটাই দেখার বিষয়। 

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ