ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৯ আশ্বিন ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

শূন্য অর্থনীতি

অ্যাডায়ার টার্নার
প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০১৮ শনিবার, ০৮:০১ এএম
শূন্য অর্থনীতি

সম্প্রতি লন্ডনের অ্যাডিডাস কোম্পানির ১৬০ জন শ্রমিক দিয়ে ৫ লাখ জোড়া জুতো তৈরি করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে যা অন্যান্য কোম্পানির উৎপাদন হারের তুলনায় পাঁচ গুন অধিক। এতো বেশি উৎপাদনের পরও ব্রিটিশ এক হিসাবে থেকে দেখা যাচ্ছে, ওই কোম্পানির খুচরা বিক্রয় আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৩ মিলিয়ন থেকে ২.১ মিলিয়নে নেমে আসতে পারে। আনলইনে নতুন কাজের ধরন সৃষ্টি হওয়ার কারণেই এটা ঘটছে বলে ধারণা করতেন তারা। একারণে অধিকাংশ আর্থিক সেবা সংস্থাগুলো আনলাইন তথ্য-পক্রিয়াকরণের কাজকে আলাদা রেখে তাদের বর্তমান অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করছে। ফলে উন্নত বিশ্বে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হার কিছুটা ধীর গতির দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকেই।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হলডেন আনলাইন কাজ নিয়ে এক ব্যাখ্যায় বলছেন, যখন কিছু কোম্পানি দ্রুত নতুন সুযোগগুলো উপলব্ধি করে, অন্যরা কেবল ধীরে ধীরে তা করে। তবে এসময় বিষয়টি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যা ওই বিষয়টিকে দ্রুত বৃদ্ধি করে দেয়। কিন্তু এই বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। তিনি বলেন, বিদ্যমান কাজে প্রযুক্তি যেভাবে প্রয়োগ করা হয় তা ভুল জায়গায় প্রয়োগ করার মতো। কারণ কাজের ক্ষেত্র এমন ভাবে তৈরি করা উচিত যেখানে শ্রমিকদের প্রতিটি পদক্ষেপ দেখতে পাওয়া যায়। তাদেরকে পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাছাড়া হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

এ বিষয়ে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের ডেভিড গ্রেবার যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, পৃথিবীর ৩০ শতাংশ কাজই ‘অর্থহীন কাজ’। এই কাজ সত্যিকারের পণ্য ও সেবা উৎপাদনে একদম অপ্রয়োজনীয়। মূলত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও আয় বৃদ্ধির জন্য এগুলো করা হয়। এ ধরনের কাজের প্রধান সমস্যা হলো, এগুলো কেবল অর্থনৈতিক বণ্টনসংক্রান্ত কাজেই আসে। যা প্রতিযোগিতা তৈরি করে। অন্য কোনো কাজে আসে না।

ডেভিড গ্রেবার বিষয়টিকে আসলে অর্থনীতির দিক থেকে ব্যাখ্যা না করে নৃ-তাত্ত্বিক দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি এই ‘অর্থহীন কাজ’ শব্দটিকে ব্যবহার করে শ্রমিকদের উপর ফোকাস করতে চেয়েছেন। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ধরুন, আপনি একটা দানশালা (চ্যারিটি) খুললেন। সেখানে সবাই ভালো ভাবে কাজ করছিল। আপনার দানশালা সঠিক লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ আপনি অন্য একটি দানশালা থেকেও উপার্জনের পথ খুঁজতে শুরু করলেন, তাদের মতো করে উপার্জন শুরু করতে চাইলেন। যে দানশালাটিও আপনার দানশালার মতো নিজের কাজে সমান পারদর্শী। আর এমন হলেই সমস্যা সৃষ্টি হতে শুরু করে।

ডেভিড আরও বলেন, মূল কথা হচ্ছে একটি সমষ্টিগত কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে কর্ম দক্ষতা ও প্রাযুক্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। অন্য কারোর সঙ্গে একই পন্থায় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা নয়।

এই প্রতিযোগিতা সৃষ্টির কারণেই অনেক কাজের ক্ষেত্র হ্রাস পায়। যেমন, সাইবাই ক্রাইম ঠেকাতে একজন সাইবার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য অন্য কোনো কোম্পানিকে নিযোগ করা, প্রতিষ্ঠানের জন্য চিন্তাবিদ রাখা ইত্যাদি। যা শুধু প্রতিষ্ঠানের খরচই বৃদ্ধি করে, তুলনামুলক লাভ কম হয়। এটি ঠিক একজন শিক্ষকের বিবেচনা ছাড়া ভালো গ্রেড দেওয়ার মতো কাজ করে, উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার মতো নয়। তবে অনেক সৃজনশীল কাজও আছে, যেগুলো প্রতিষ্ঠানের জন্য করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জন মায়নার্ড কেইনেস বলছেন, আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য ও সেবা তৈরি করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমস্যা সামাধান করতে হবে। কিন্তু অহেতুক প্রতিযোগিতা তৈরি করে করে নয়। সঠিক উপায়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে। এটা না করতে পারলে ‘শূন্য অর্থনীতি’ অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।


লেখক: যুক্তরাজ্য সরকারের ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অথরিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ফাইন্যান্সিয়াল পলিসি কমিটির সাবেক সদস্য


বাংলা ইনসাইডার/বিপি