ঢাকা, বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০, ২১ শ্রাবণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
Bangla Insider

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের কার কেমন পরিণতি

বিশ্বজুড়ে ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০১৮ শনিবার, ০৮:০২ এএম
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের কার কেমন পরিণতি

পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্প্রতি শপথ নিয়েছেন সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া দেশটির সরকার প্রধানের পদটিকে অনেকেই ফুটন্ত কড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। এর আগে যারা পাক প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন তাঁদের প্রায় কারোরই খুব একটা সুখকর পরিণতি হয়নি। আততায়ীর হামলায় নিহত হওয়া, দীর্ঘ কারাভোগ, নির্বাসন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিণতিও ভোগ করতে হয়েছে তাঁদের।

নবাবজাদা লিয়াকত আলি খান

১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করেন লিয়াকত আলি খান। কিন্তু মেয়াদ পূর্তির আগেই আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হয় তাঁকে। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় সাদ আকবর নামের এক ব্যক্তি গুলি করে হত্যা করেন তাঁকে।

খাজা নাজিমুদ্দিন

লিয়াকত আলি খানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন। তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র দুই বছর। তার শাসনামলেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে ঢাকায় আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। অভ্যন্তরীণ বিবাদসহ নানা কারণে ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল পদচ্যুত করে সরকারের বাইরে পাঠানো হয় নাজিমুদ্দিনকে। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৬৪ সালে ৭০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নিজ শহর ঢাকায় তাঁকে দাফন করা হয়।

মোহাম্মদ আলি

খাজা নাজিমুদ্দিনের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ আলি। তিনিও ছিলেন একজন বাঙালি। বগুড়ার সন্তান মোহাম্মদ আলি ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন। ১৯৫৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এরপর ১৯৫৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। কিন্তু এক বছর না পেরোতেই ১৯৫৫ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা মোহাম্মদ আলিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। যদিও ১৯৬২ সালে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৬৩ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মোহাম্মদ আলী ওই পদে বহাল ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে বগুড়া জেলায় দাফন করা হয়।

চৌধুরী মোহাম্মদ আলি

১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে। সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়তে থাকায় ১৯৫৬ এর ১২ সেপ্টেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এই রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিন রোগে ভুগে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানা যায়।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

মোহাম্মদ আলির পদত্যাগের পরই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাঁর শাসনামলেই উর্দুর সঙ্গে বাংলাও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি।  ১৯৫৯ এ রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয় সোহরাওয়ার্দীকে। এরপর ১৯৬২ সালে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এনে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯৬৩ সালে দেশের বাইরে যান সোহরাওয়ার্দী।  লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থানকালে ১৯৬৩ এর  ডিসেম্বরে তিনি মারা যান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাঁদের দোসরদের ষড়যন্ত্রেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে মনে করেন অনেকেই।

ইব্রাহিম ইসমাইল চান্দ্রিকার

মুসলিম লীগের এই নেতার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কাল মাত্র ১মাস ২৯ দিন। ১৯৫৭ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। ১৩ মার্চ ১৯৬৮ সালে লাহোরে তাঁর মৃত্যু হয়।

ফিরোজ খান নুন

১৯৫৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের ৭ম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ফিরোজ খান নুন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এরপর সামরিক শাসন জারি করেন ইস্কান্দার মীর্জা। পদচ্যুত হন ফিরোজ খান নুন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর তার পৈতৃক নিবাস নুরপুর নুন গ্রামে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

নুরুল আমিন

১৯৭১ সালের ৭ডিসেম্বর পাকিস্তানের ক্ষমতার শীর্ষে আসেন নুরুল আমিন। বাঙালি এই নেতা নিজ জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নুরুল আমিন পাকিস্তানে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৭৪ সালের ২ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়।

জুলফিকার আলী ভুট্টো

দীর্ঘ সামরিক শাসনের পর ১৯৭৩ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) থেকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। এক ব্যক্তিকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯৭৯ সালে সামরিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।

মোহাম্মদ খান জুনেজো

১৯৮৫ সালে জেনারেল জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন মোহাম্মদ খান জুনেজোকে। ওই বছরের ডিসেম্বরে সামরিক শাসনের ইতি ঘটান তিনি। কিন্তু সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকলে মেয়াদ পূর্ণ হবার আগেই ১৯৮৮ সালে তাকে বরখাস্ত করেন জিয়াউল হক। ১৯৯৩ সালের মার্চে  যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।

বেনজির ভুট্টো

মোহাম্মদ খান জুনেজো পদচ্যুত হওয়ার পর ওই বছরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। মুসলিম দেশগুলোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন তিনি।  কিন্তু ১৯৯০ সালের ৬ আগস্ট তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।

১৯৯৩ সালের নির্বাচনে আবারও জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হন বেনজির ভুট্টো। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর তাকে পুনরায় বরখাস্ত করা হয়। এরপর ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির এক নির্বাচনী সমাবেশ শেষে আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন বেনজির ভুট্টো। পাক সেনাবাহিনীই এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কলকাঠি নেড়েছে বলে মনে করেন অনেকেই।

মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরিফ

মিয়া মুহম্মদ নওয়াজ শরিফ তিনবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। বলাই বাহুল্য, কোনোবারই তিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। প্রথমবার ১৯৯০ সালের ১ নভেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। দ্বিতীয়বার দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। এরপর ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে আবারও ক্ষমতা গ্রহন করেন তিনি। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে এবারও মেয়াদ পূর্তির আগেই পদ ছাড়তে হয় নওয়াজকে। বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় ১০ বছরের কারাভোগ করছেন তিনি। রাজনীতিতে আজীবন নিষিদ্ধও করা হয়েছে তাঁকে। একই মামলায় তাঁর মেয়ে মরিয়ম নওয়াজও সাত বছরের কারাভোগ করছেন।

জাফরুল্লাহ খান জামালি

২০০২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন জাফরুল্লাহ খান জামালি। কিন্তু মাত্র ২ বছর না পেরোতেই ২০০৪ সালে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে পিএমএল (নওয়াজ) এর এই নেতা চলতি বছর পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ এ যোগ দেন।

শওকত আজিজ

জাফরুল্লাহ খান জামালি পদত্যাগের পরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় শওকত আজিজকে। তিনি পাকিস্তানের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছেন। বর্তমানে নির্বাসনে আছেন শওকত আজিজ।

চৌধুরী সুজাত হুসাইন

২০০৪ সালের ৩০ জুন নিয়োগ পান চৌধুরী সুজাত হুসাইন। পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম) এর এই নেতা মাত্র ১ মাস ২৭ দিন ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। ২৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীত্ব হারান তিনি। বর্তমানে পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের জোটসঙ্গী হিসেবে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের অংশ হয়েছেন তিনি।

ইউসুফ রাজা গিলানি

২০০৮ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) জয়লাভ করে। দলের মনোনয়ন পেয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ইউসুফ রাজা গিলানি। কিন্তু ২০১২ সালে সংবিধান লঙ্ঘনের এক মামলায় ৩০ সেকেন্ডের এক প্রতীকী কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। এই রায়ের ফলে প্রধানমন্ত্রী থাকার অধিকার হারান তিনি। বর্তমানে পিপিপির বিভিন্ন সভায় দেখা যায় তাঁকে।

রাজা পারভেজ আশরাফ

ইউসুফ রাজা গিলানি পদচ্যুত হওয়ার পর ২০১২ সালের ২২ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন রাজা পারভেজ আশরাফ। ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে ক্ষমতা ছাড়েন পাকিস্তান পিপলস পার্টির এই নেতা। এবারের নির্বাচনেও দেশটির জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

শাহীদ খাকান আব্বাসী

২০১৭ সালের ১ আগস্ট থেকে ৩১ মে ২০১৮ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহীদ খাকান আব্বাসী। এবারের নির্বাচনের আগে ক্ষমতা থেকে সরে দাড়ান পিএমএলএন এর এই নেতা। নির্বাচনে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে একটিতেও জয় পাননি তিনি।

নবাবজাদা লিয়াকত আলি খান থেকে শাহীদ খাকান আব্বাসী, প্রায় প্রত্যেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় কিংবা ক্ষমতা হারানোর পরে ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন। কেউ কেউ নির্বাসিত অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কারও আবার স্বাভাবিক মৃত্যুর সৌভাগ্যটুকুও হয়নি। নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জন্য কী অপেক্ষা করছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বাংলা ইনসাইডার/এএইচসি/জেডএ